সাধারণত যে কোনও দীর্ঘমেয়াদী বায়োপিকের ক্ষেত্রেই, দু’জন বা কখনও কখনও তিন জন অভিনেত্রীকেও দেখা যায় একটি চরিত্রে অভিনয় করতে। ‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ ধারাবাহিকের সম্প্রচার শুরুর সময় তো বটেই, তার পরেও বহুদিন পর্যন্ত শোনা গিয়েছিল যে রানি রাসমণির পরিণত বয়সের চরিত্রচিত্রণ করবেন অন্য কোনও অভিনেত্রী। কিন্তু সব জল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়ে, এই ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রায় ২০ বছরের যাত্রাপথটি নিজেই পার করেছেন ১৬ বছরের দিতিপ্রিয়া রায়।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

স্মরণাতীত কালে বাংলা টেলিজগতে এমন নজির নেই। বাংলা বিনোদন জগতের ইতিহাসেও এমন নজির রয়েছে কি না সেটা গবেষণার বিষয়। তবে বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে। নটী বিনোদিনী যখন ক্যালকাটা ন্যাশনাল থিয়েটারে পা রাখেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১২। মোটামুটি ১৪-১৫ বছর বয়স থেকেই তিনি সীতা, দ্রৌপদী, রাধা, প্রমীলা এমন বহু ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। শুধু বিনোদিনী নন, ওই সময়ের বাংলা থিয়েটারের বহু অভিনেত্রীই কিশোরী বয়স থেকেই পাকাপোক্ত, বয়স্ক চরিত্রে অভিনয় করতেন। 

ছবি সৌজন্য: জি বাংলা

কিন্তু ছোটপর্দা হোক বা বড়পর্দা, ১৬ বছরের এক কিশোরী ৩০ বছরের এক ঘোর সংসারী নারী চরিত্রে রূপদান করছেন যিনি তিন সন্তানের মা, এমন নজির খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ। কীভাবে এই অসাধ্যসাধন করছে দিতিপ্রিয়া? ‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’-র গবেষক ও উপদেষ্টা শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, দিতিপ্রিয়া একজন ‘সেরিব্রাল অ্যাকট্রেস’। অভিনয়ের একটি সহজাত ক্ষমতা তার মধ্যে তো রয়েছে বটেই, পাশাপাশি সে তার বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে চরিত্র ও দৃশ্য বুঝে নিতে পারে খুব সহজেই। 

এবেলা ওয়েবসাইটকে শিবাশিস জানালেন, ‘‘মেয়েটির মধ্যে একটি পয়েন্ট অফ ব্রিলিয়ান্স রয়েছে। খুব কৌতূহলী মন। গল্প কোন দিকে এগোচ্ছে, রানির জীবনে কী কী ঘটতে চলেছে, মাঝেমধ্যেই ফোন করে জানতে চায়। আর সেইমতো ও নিজেকে তৈরি করে। এখন লক্ষ্য করবে ও সংলাপ বলার সময় গলাটা একটু ভারী লাগে। একজন বয়্স্ক মানুষের কণ্ঠস্বর কেমন হতে পারে সেই নিয়ে অনেকটা আলোচনা হয়েছিল, আমি ওকে কিছু পরামর্শ দিয়েছিলাম। তার পরে ওটা ও ডেভেলপ করেছে। শুধু আমি নয়, পরিচালক রাজেন ওকে ভীষণ ভাবে হেল্প করে। তবে ও কিন্তু একজন অভিজ্ঞ অভিনেতার মতোই সিনের টেম্পোটা বোঝে। আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যেটা, সেটা হল দিতিপ্রিয়া থেকে রানি— এই ট্রান্সফরমেশনটা। এমনিতে খুব ছটফটে, আমুদে, স্টুডিওর মধ্যে হয়তো ব্যাডমিন্টন খেলে বেড়াচ্ছে। কিন্তু যেই রানির সাজটা শুরু হয়, আস্তে আস্তে একটা পরিবর্তন আসে এবং সেটা কিন্তু বোঝা যায়। আমি এর আগে একজনের মধ্যেই এরকম অসাধারণ ট্রান্সফরমেশন দেখেছিলাম। সে যখন এসেছিল তখন ভাল করে বাংলা সংলাপ বলতে পারত না। খুব অ্যাংলোসাইজড একটা উচ্চারণ ছিল। কিন্তু একজন ভাল পরিচালকের গাইডেন্স তাকে যে জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিল, সেটা বাংলা টেলিভিশনের দর্শক জানেন— ‘মহাপ্রভু’ ধারাবাহিকের যীশু সেনগুপ্ত।’’

ছবি সৌজন্য: জি বাংলা

নিঃসন্দেহে সহজাত অভিনয়ক্ষমতা না থাকলে ১৬ বছরের কিশোরী ৩০ বছরের পরিপক্ক রানি রাসমণির এই ইলিউশনটি তৈরি করতে পারত না। যাঁরা প্রথম থেকে ধারাবাহিকটি দেখছেন, তাঁরাও একমত হবেন যে ১১ বছরের রানি থেকে ৩০ বছরের রানির পরিবর্তনটি এমনভাবেই দৃশ্যায়িত হয়েছে যে কখনও কোনও সময়ে তা অস্বাভাবিক লাগেনি। রানির সাজ পাল্টেছে, মেকআপ পাল্টেছে, পাশাপাশি পাল্টেছে চরিত্রের বয়স অনুযায়ী অভিব্যক্তি। সবটাই এত সূক্ষ্মতার সঙ্গে করেছে দিতিপ্রিয়া যে অনেক দর্শক হয়তো তার আসল বয়সটিও ভুলতে বসেছেন। 

এই অসাধ্যসাধন কী করে করল এই খুদে তারকা? ‘‘আমি বলব এটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ, ভবতারিণী মায়ের আশীর্বাদ। যখন অ্যাকশন শব্দটা শুনি, আমার মধ্যে কিছু একটা হয়, আমি নিজেও ফিল করি। আর সবাই বলে যে অ্যাকশন আর কাটের মধ্যে আমাকে একদম অন্য রকম লাগে। রাণী রাসমণি এমনিতেই আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। আর আমি তো চরিত্রটা শুরু থেকে করছি, তাই এই জার্নিটা আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। অনেকটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো। যেমন এই সপ্তাহে যেটা দেখানো হচ্ছে যে ইংরেজ সাহেবকে শাস্তি দিচ্ছে রানি, আমার দারুণ লাগছে। তাছাড়া আমার বিশ্বাস যে রাণীরও আশীর্বাদ রয়েছে আমার উপরে, নাহলে হয়তো এটা হতো না।’’