‘বন্‌ধ ডেকেছে।’ এই শব্দবন্ধটি শুনলেই কী রকম একটা শিহরণ জাগত মনে। যাঁদের অফিস না গেলেও চলবে, তাঁদের তো দিঘা বা মন্দারমণি পাক্কা। অথবা নিছক মাংস ভাত খেয়ে তাস খেলা বা লম্বা ঘুম। ছোটদের স্কুল-কলেজ নেই সেদিন। সুতরাং, রাস্তার উপরে বা মাঠে ঘাটে বল পেটানো। 

অফিসযাত্রী বাঙালির কপালে তখন তেমন দুঃখ ছিল না। এখন যেমন আগের দিন রাতে অফিসে থেকে যেতে হবে নাকি ভোর ভোর বেরিয়ে পড়তে হবে— তা নিয়ে চালাতে হয় বিস্তর আলোচনা। ট্রেনের ওভারহেড তারে কলাপাতা পড়ার বা রাস্তার মাঝখানে দাদাদের ঝাণ্ডা গেড়ে বসে পড়ার আগেই পৌঁছতে হবে অফিসে। দরকার হলে অ্যাম্বুলেন্সে করে।

বিকেলে রাজনৈতিক নেতাদের সদর্প ঘোষণা, বন্‌ধ সফল ও সর্বাত্মক। বাঙালির জীবনে বন্‌ধ নামক ছুটিটা বারো মাসে তেরো পার্বনের মতোই ধরা বাঁধা ছিল।

আমাদের এক পাঠিকা সুচরিতা গোস্বামী অবশ্য বলছেন, আগের বন্‌ধের থেকে এখন চরিত্রগত একটা পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘আগে বন্‌ধ মানেই বাড়িতে খাওয়া, হইচই। বিকেলে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। পরিবারের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কাটানো, পাড়ার রাস্তায় খেলা করা। এখন বন্‌ধ মানে ঝুঁকি আর ‘নো ছুটি’।’’

কিন্তু সেই ছুটির মুডের গুড়ে বালি। যে তৃণমূলনেত্রী কথায় কথায় বন্‌ধ ডেকে বাংলাকে তাতিয়ে দিতেন, দিতেন ছুটির আমেজ সেই তৃণমূলনেত্রী নীতি বদলে ফেলায় মুশকিল হয়েছে আম বাঙালির। জোর যার মুলুক তার। সরকার চাইলে অনেক কিছুই হয়। দেখাই যাচ্ছে সেই ছবি। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

পাম অ্যাভিনিউয়ের ‘পিতামহ ভীষ্ম’ যতই শিল্পপতিদের বলে আসুন যে তাঁর দল বন্‌ধ ডাকে বলে তিনি লজ্জিত, কিন্তু সেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাতেই ফি বছর শ্রমিক সংগঠনের বন্‌ধ পালন হত রাজ্যে।

সেই ছবি পাল্টেছে। বাস চলছে, ট্রেন চলছে। অফিস হচ্ছে। আদালত কাজ করছে। মাঝে মধ্যে দু’একটা ছিন্ন ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে বটে, তবে তা নগণ্য। 

আগের মত ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে হয় না। কোথায় গণ্ডগোল বেঁধে যায়, কোন বাসে কে আগুন ধরিয়ে দেয়, চিন্তায় রাতে ঘুম হত না। তার থেকে বাড়িতে থাকাই ভাল ভেবে নিতে ভালবাসত আম বাঙালি। এখন চিন্তা অনেক কম। 

সেই ছুটির আমেজ হারিয়ে গেলেও স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তবে কি এবার রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে বন্‌ধ তামাদি হয়ে গেল?

এবেলা.ইন-এর পাঠক, একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী অশোক রায় লিখছেন, ‘‘যা হয়েছে একদিকে ভালই হয়েছে। এক দিন বন্‌ধের মানে কত লোকসান, সাধারণ রোজ হিসেবে খেটে খাওয়া মানুষের কত ক্ষতি এই পুজোর সময়। কত সরকারি সম্পত্তি নষ্ট। একটু যদি সবাই ভেবে দেখত তাহলে কেউই বন্‌ধ ডাকতো না।’’

তবে একই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, ‘‘আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এটা করবে, অনেক কিছুর মত এটাও জানবে না যে, পশ্চিমবঙ্গে বন্‌ধ বলে একটা কিছু ছিল।’’

কারও কারও মনে গর্ব বোধও হয়। পশ্চিমবঙ্গকে যখন 'West' না বলে 'Waste' বেঙ্গল বলা হতো সেটা শুনতে কারও ভাল লাগত না। এবেলা.ইন-এর অন্য এক পাঠিকা ঈশিকা রায় বলছেন, ‘‘দরকার নেই এরকম ছুটির দিন। এধরনের বন্‌ধ আজ পর্যন্ত কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। আমি মিস্ করি না এরকম বন্‌ধ। বরং, গর্ব বোধ করি বন্‌ধ না হওয়ার জন্য।’’

বন্‌ধের বিকল্প কী হতে পারে? তা নিয়ে রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা ভাবতেই পারেন। আমাদের পাঠক ভাস্কর বিশ্বাস বলছেন, ‘‘চিন্তা করার কিছু নেই। যে হারে দাম বাড়ছে তাতে একদিন এমনিতেই সব বন্ধ হয়ে যাবে। যাঁরা মনে করছেন বন্‌ধ করার কোনও মানে নেই, এতে কিছু হয়না, তাঁরা সবাই নিজের জীবনের দাবি না মিটলে কোনও না কোনও কাজ বন্ধ করেই না হয় প্রতিবাদ করুন।’’

এই বন্‌ধ বিতর্ক চলতে থাকুক। ছুটি নিক ছুটি। কাজ আসুক সবার হাতে। প্রতিবাদীদের হাতে থাকুক পেনসিল। আমরা উন্নয়নের পথ ধরে এগিয়ে চলি।