বিষয়টা অনেকটা জোক-এ পরিণত হয়েছে। এমনকী যাঁরা বাংলা ধারাবাহিক দেখতে ভালবাসেন, গল্পের নায়ক-নায়িকাকে প্রায় পরিবারের সদস্যের মতোই মনে করেন, সেই দর্শকও জানেন যে নতুন ধারাবাহিক শুরুর একমাসের মধ্যে না হলেও দু’মাসের মধ্যেই বাজবে বিয়ের সানাই। 

বিগত কয়েক বছরে বাংলা টেলিভিশনে যতগুলি ধারাবাহিক এসেছে, সেখানে হাতে গোনা কয়েকটিতে এর ব্যতিক্রম দেখা গিয়েছে। যে সব ধারাবাহিক শিশুকেন্দ্রিক যেমন, ‘পটলকুমার গানওয়ালা’, ‘মা’ অথবা হালফিলের ‘ঝুমুর’, সেখানে মূল চরিত্রের বিয়েই হল ক্লাইম্যাক্স। অনেকটা সেই রূপকথার গল্পের মতো— হ্যাপিলি এভার আফটার। তাই আগেভাগে বিয়ে হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন উঠছে না। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

এছাড়া ব্যতিক্রম ‘কিরণমালা’ বা ‘সাত ভাই চম্পা’-র মতো পুরোপুরি রূপকথাকেন্দ্রিক ধারাবাহিকগুলি। তা বাদে প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে হয় মূল চরিত্র দু’টির বিয়ে দিয়ে শুরু হয়েছে গল্প, নয়তো কিছুদিনের মধ্যে গল্পের ট্র্যাক বইতে শুরু করেছে বিয়ের খাতে। প্রশ্ন হল, ‘কেন’? 

এক্ষেত্রে সবার আগে যাঁর মুণ্ডপাত করতে উদ্যত হন দর্শক, তিনি হলেন গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার। কিন্তু তাঁরা কি সত্যিই এমন গল্প লিখতে চান? এক বছর আগে এবেলা ওয়েবসাইটকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ‘রাশি’, ‘বধূবরণ’ এবং ‘আমার দুর্গা’-র চিত্রনাট্যকার অসিতা ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন, অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেক সময় সাততাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিতে হয় মূল চরিত্রের।

কারণ বাংলা ধারাবাহিকের সাংসারিক কূটকচালি, শাশুড়ি-বউমার কাজিয়া, পারিবারিক ষড়যন্ত্র ইত্যাদি ইত্যাদি সমাজ-সংস্কৃতিকে কলুষিত করছে বলে সর্বত্র শোরগোল উঠলেও, সাপ্তাহিক টিআরপি রেটিং কিন্তু অন্য কথা বলে। আশ্চর্য রকম ভাবে দেখা যায় যে নায়ক-নায়িকার প্রেমপর্বের চেয়েও বেশি টিআরপি দেয় বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ি-ননদ-জায়েদের সঙ্গে নতুন বউমার ঠুকঠাক টকঝালমিষ্টি বাক্যবিনিময়। 

শ্বশুরবাড়িতে নায়িকা প্রচণ্ড অপদস্থ হলেও রেটিং ভাল থাকে। আর যদি পাকেচক্রে, ঘটনার ফেরে নায়কের আর একটি বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়, তবে তো আর কথাই নেই। ধারাবাহিকের দ্বৈত বিয়ে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া সারাক্ষণ সরগরম থাকলেও আশ্চর্যজনক ভাবে গল্পের ট্র্যাক সেই দিকে এগোলেই রেটিংও বাড়ে চড়চড় করে।

দর্শকের অপছন্দ হলেও টিআরপি-র গুরুত্ব চিরদিন ছিল এবং থাকবে। কারণ টিআরপি না থাকলে কমবে বিজ্ঞাপন, অর্থাৎ কমবে আয়।  

বিষয়টা তাই অনেকটা এখন দুষ্টচক্রের মতো চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে চলেছে। এই দুরন্ত ঘূর্ণির থেকে বেরনোর কি কোনও উপায় নেই? প্রশ্ন রইল চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ও প্রযোজকদের কাছে। এবং অবশ্যই দর্শকের কাছেও, যাঁদের হাতেই আসলে রয়েছে টিআরপির চাবিকাঠি।