২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস দ্বারা নির্ধারিত ধর্ষণের সাম্প্রতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, ধর্ষণ লিঙ্গ নিরপেক্ষ। মানসিক ধর্ষণ বা ইমোশনাল রেপ-এর সংজ্ঞা নিয়েও অ্যাকাডেমিক স্তরে আলোচনা চলছে, যদিও আইনগত ভাবে তা কোনও দেশে এখনও বাস্তবায়িত কি না সে ব্যাপারে কোনো তথ্য  প্রতিবেদকের কাছে এই মুহূর্তে নেই। কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে শারীরিক ধর্ষণ পৃথিবীর ঘৃণ্যতম অপরাধগুলির মধ্যে একটি। শিশু-ধর্ষণ অবশ্যই অপরাধের মাত্রা কে আরও ভয়াল করে তোলে। এগুলি সর্বজনজ্ঞাত তথ্য, জনসাধারণকে জানানোর জন্য আলাদা করে কোনও প্রতিবেদনের প্রয়োজন নেই।  

ধর্ষকের কঠিনতম শাস্তি প্রাপ্য, তা নিয়েও কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।  তবে সেই কঠিনতম শাস্তি ফাঁসি হওয়া উচিত কি না, সে নিয়ে অবশ্যই দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন আছে। দু’-এক কথায় এ বিষয়ে মতামত দেওয়া অপরিণত চিন্তাধারার প্রকাশ মাত্র।  

যে কোনও গভীর অপরাধেরই মতো, ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীকে আড়াল করার জন্য যখন রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা দেখতে পাওয়া যায়, তখন তার পিছনে প্রধানত দুটি কারণ থাকে। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

প্রথমত, অপরাধ সংঘটিত হওয়া যেহেতু আইনশৃঙ্খলার অভাবের পরিচায়ক, সেহেতু অপরাধ সরকারি ভাবে নথিভুক্ত করলে জনগণ আস্থা হারাতে পারে শাসকের ওপর। রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাদানে অক্ষম, সেই ভেবে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং টলে যেতে পারে শাসক দলের গদি। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র অপরাধীকে আড়াল করবে অপরাধ যাতে নথিভুক্ত করতে না হয়, যাতে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কোনো প্রমাণ না থাকে। পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডের নির্যাতিতা সুজেটকে দেহোপসারিণী হিসেবে দেগে দেওয়া রাষ্ট্রের এই ধরনের কাজের উদাহরণ।  `এমনটা তো হয়েই থাকে' বিবৃতি দেওয়া, কামদুনির অলিতে গলিতে আলো আঁধারিতে শাসকদলের বাহুবলীদের বিষাক্ত সরীসৃপের মতো ঘোরাফেরা বা নির্ভয়ার ঘটনার প্রতিবাদে জড়ো হওয়া মানুষের ওপরে লাঠিচার্জ— এই সবই ক্ষমতা আগলে রাখার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের সক্রিয় উদ্যোগের প্রতিভাস মাত্র।  

কাঠুয়া ধর্ষণ-কাণ্ডের প্রতিবাদ বেঙ্গালুরুতে। ছবি: রয়টার্স

অপরাধ আড়াল করা নয়, বরং তাতে ইন্ধন যোগানো এবং অপরাধীকে প্রকাশ্যে সমর্থন করা, রাষ্ট্রশক্তির দ্বিতীয় গোত্রের পাপ, যার ভয়াবহতা অবর্ণনীয়। কারণ এই গোত্রের পাপে শাসকশক্তি বিশেষ স্বার্থ এবং উদ্দেশ্যে সক্রিয় ভাবে অপরাধে অংশগ্রহণ করে। পূর্ব-পরিকল্পিত ভাবে, সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে।

নারোদা পাতিয়ায় এ জিনিস আমরা পরিষ্কার দেখেছি। আফরাজুলের ক্ষেত্রে আমরা তার ইঙ্গিতও পেয়েছি। মুসলমান মহিলাদের কবর থেকে তুলে এনে ধর্ষণ করার মহৎ কর্তব্যে অনুপ্রাণিত করেছিলেন রাষ্ট্রযন্ত্রের যে মুখপাত্র, পুরস্কার হিসেবে তাঁর হাতে একটি রাজ্যের শাসনভার ন্যস্ত করার ইতিহাসও আমাদের অজানা নয়। 

রাষ্ট্রের এই পেশিশক্তির আস্ফালন কোনও একটি দেশের ভৌগোলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ— এমন শিশুসুলভ ধারণা না করাই ভালো। পাশাপাশি কোনও একটি মাত্র ধর্মীয় সম্প্রদায়ই যে মৌলবাদের ধারক ও বাহক এই ধরনের অশিক্ষিত বক্তব্য না রাখাই শ্রেয়। ভৌগোলিক সীমানায় যে ধর্মের কারবারিরা ক্ষমতা আগলে রাখতে সচেষ্ট, তাঁরাই দ্বিতীয় গোত্রের অপরাধে অংশগ্রহণ করবেন।  কারণ, প্রকৃত প্রস্তাবে ধর্মীয় মৌলবাদ বলে কিছু হয় না। যা হয় সেটা হল, ক্ষমতার দম্ভ অটুট রাখার অস্ত্র হিসেবে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান ঘটানো এবং সেই সূত্রে  সুপরিকল্পিতভাবে মৌলবাদী তৈরি করা ও তাদের তোষণ। 

শম্ভুলাল এর কথা যেমন মনে রাখা উচি।, তেমনই প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সুপ্রিম কোর্ট-এর সামনে থেকে আইনের দেবীর ভাস্কর্য উপড়ে ফেলার  সাম্প্রতিকতম ঘটনাকেও ভুললে  চলবে না।  

কাঠুয়ার নিষ্পাপ শিশুটির সঙ্গে যা ঘটেছে, সেই ঘটনাকে অতএব, নির্ভয়া, কামদুনি বা অন্যান্য অজস্র নারী বা শিশু ধর্ষণের থেকে আলাদা ভাবে দেখা প্রয়োজন।  এটি বিহারের রোহতাসে গত ১০ এপ্রিল ঘটে যাওয়া শিশু ধর্ষণ (ধর্ষণকারী মিরাজ আলমকে এই ঘৃণ্য ঘটনার অব্যবহিত পরেই গ্রেফতার করা হয়েছে)-এর থেকেও চরিত্রগত ভাবে আলাদা।  

প্রেক্ষিত হিসেবে বরং এটি আফরাজুলের ঘটনার সঙ্গে মেলে। সেখানেও নাবালক-নাবালিকাকে জড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল অপরাধ কাণ্ডের অংশীদার হিসেবে। আট বছরের বালিকাকে ধর্ষণ করে  যেমন নির্বিকার ছিল এক নাবালক, তেমনই আর এক নাবালক অকম্পিত হাতে ভিডিওয় তুলে রেখেছিল একটি মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে কাঠকয়লা বানিয়ে দেওয়ার অমানবিক দৃশ্য। এবং শম্ভুলালকে প্রক্ষেপ করার চেষ্টা হয়েছিল নায়ক হিসেবে।  

এগুলো আমরা জানি।  আবারও কি কাঠুয়া কাণ্ডের মতো কিছু ঘটবে ভবিষ্যতে? আবার আফরাজুল? 

সম্ভবত, হ্যাঁ।  ঘটবে।  ঘটেই যাবে।  একের পর এক।  

কারণ আমি বা আমরা কিছু করতে পারব না। করব না।  কারণ আমাদের মধ্যে `আমরা' নেই। প্রতিটি আমি পৃথক পৃথক সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে আলাদা সত্তা। তাই `আমরা' বলে কিছু হয় না। যা হয় তা স্বার্থনিবিড় একাধিক ‘আমি’-র শর্তসাপেক্ষ সমন্বয় মাত্র। পার্সোনাল স্টেক মেনটেইন করার হিসাব কষে গড়ে ওঠা এই সমন্বয় কখনও আমরা হয়ে উঠতে পারে না। পারেনি। পারবে না।  

শম্ভুলালের স্ত্রী’র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তিন লক্ষ টাকা জমা পড়েছিল। আমি আটকাতে পারিনি।  জোধপুরে রামনবমীর উদযাপনের সময় শম্ভুনাথকে নিয়ে ট্যাবলো বানানো হয়েছিলো। আমি কিছু করতে পারিনি। আফরাজুলের বাড়ির লোক ঠিক সেই ভাবেই দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বসে ছিলেন, যেভাবে বসেছিলেন আসিফার মা, আসিফার সবুজ জামাটা সামনে নিয়ে।  

জানি।  জানি হে।  দেখেছি সবই।  প্রচণ্ড  প্রতিবাদও  তো করেছি।  করিনি? ডিপি পালটে দিয়েছি ফেসবুকের।  আমার যেন মেয়ে না হয় বলেছি।  পরজন্মে  মেয়ে হয়ে না জন্মাই  যেন, সেকথাও বলেছি।  ইস! খুব কান্না পাচ্ছে তাও  বলেছি। এগুলো তীব্র প্রতিবাদ নয়? 

রাষ্ট্রযন্ত্র জানে, যে এটাই  আমার 'তীব্র প্রতিবাদ'  (আই পি এল চলছে না এখন তো, তাই। না চললে কী হতো তা অবশ্য বলা একটু মুশকিল। আমি ঠিক বলতে পারছি না সেক্ষেত্রে আমি কী করতাম)। তাই নিশ্চিন্ত থাকুন আফরাজুল পুড়িয়ে পার পেয়ে গিয়েছিল যেমন, কিংবা কবর থেকে তুলে এনে ধর্ষণ করার ফতোয়ায় পুরস্কার, তেমনই হয়তো কাঠুয়ার বাচ্চা মেয়েটার বেলাতেও পার পেয়ে যাবে অপরাধী! 

অামদাবাদে কাঠুয়া-কাণ্ডের প্রতিবাদ। ছবি: রয়টার্স

প্রতিবাদের ওম জুড়িয়ে যেতে কতদিনই বা।  নিজে থেকে যদি জুড়িয়ে না যায় তাহলে আমার এলাকায় রাষ্ট্র তিনদিনে খুলে দেবে একটি শপিং মল। জাস্টিস ফর আসিফা র ডিপি পালটে ফেলে স্টারবাকস-এ ক্যাপুচিনোর মগ হাতে ছবি যে দেবই দেব তখন, রাষ্ট্র তা বিলক্ষণ জানে।  

শপিং মল কাজে না দিলে, মুখের ওপরে পনেরো কি সতেরো শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ছুড়ে মারবে। কিছু শতাংশ কমিয়ে দেবে আইফোনের বিক্রয়মূল্য (সেই করটা অবিশ্যি তুলে নেবে চালের দাম বাড়িয়ে)। ঝনঝন করে মুদ্রা ছড়িয়ে পড়বে আমার  চারিদিকে। আমি সারমেয়র ন্যায় নির্লজ্জ লাঙ্গুল সঞ্চালনায়  রাষ্ট্রের উচ্ছিষ্ট চেটে নেব। 

আসিফা? কে আসিফা? কেই বা আফরাজুল বটে? দারা-পুত্র- পরিবার, তুমি কার কে তোমার— বলেই কি যাননি মহৎ জনেরা? 
অতএব  ....

চেনে। রাষ্ট্র আমাকে চেনে।  তাই মুচকি হাসে। আমার প্রতিবাদের দৌড় কতদূর, এবং পরবর্তী ক!দিনের জন্য, জানে তো, তাই।

মাঝে মাঝেই ঝামরে উঠে ধর্ষকের লিঙ্গকর্তনের দাবি করব - সেটা অবশ্য কর্তব্য।  আমি কী কী 'বাদী' সেই স্পিরিট জাগিয়ে রাখা প্রয়োজন - মার্ক্স, মনু, কোলনতাই, জেটকিন নিয়ে ঝড় তুলব আমি,  কফি কাপ ও সোশ্যাল মিডিয়ায়। আমাদের মধ্যে, থুড়ি, বাকি ‘আমি ’দের মধ্যে একটু ডিস্টিংগুইশড থাকব না, তা কী করে হয়! ধর্ষক পুরুষের লিঙ্গ কেটে নাও, কি পুরুষমাত্রেরই লিঙ্গ কেটে নাও - এই  দাবি জানাতে থাকব।  

কিন্তু ক্ষমতা বা রাষ্ট্রের মস্তক ছেদনের কথা বলার সাহস হবে না আমার। সাহস করব না সে দাবি তোলার।  সে কাজে বড় সমস্যা। গুহ্যদ্বারে পুলিশের রুল ঢুকে যাওয়া সমস্যার ব্যাপার। আমি সংসারী মানুষ, দুটো করে খাই, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ  নয়। বরং পারলে, পদলেহনের প্রতিযোগিতায় নাম লেখানোর চেষ্টা করব। উচ্চতর সামাজিক অবস্থানের প্রতিশ্রুতি, ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগ জুটে যাওয়া, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, ফুলমাল্য ও উত্তরীয়, সভাপতির পদ, গ্রান্ট— ইত্যাদির কোনও কিছু যদি একটু আধটু জুটে যায় ভাগ্যে।  

চেনে।  রাষ্ট্র আমাকে চেনে।  সব `বাদী' দের চেনে।           

আসিফার দিদি চেনে কি আমাকে? আরাত্রিকা যার নাম? সে নয় বছরে পড়ল কিছুদিন আগে।  এই নপুংসক বাপ কে চেনে কি সে? চিনে উঠতে পেরেছে কি এখনও? যেদিন পারবে, সেদিন সেও কি আমারই দলে নাম লেখাবে? নাকি নপুংসকের হাজার মুখোশ (যার ভিড়ে কবেই হারিয়ে গেছে মুখ, মুখোশই আসল মুখ এখন), সেই হাজার মুখোশে সে গুনে গুনে লাথি মারবে - এক, দুই, তিন...

তাই হোক, তবে তাই হোক।  ভণ্ড এই নপুংসকের মুখে গুনে গুনে লাথি মারুক আমার সন্তান। থুতু দিক। সে নিজের বাপ বা মা হলেও, দিক।  আমি পারিনি, কুকুরের মতো ল্যাজ নেড়ে নেড়ে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগেই আমার যাপন।  তারা এই যাপন চর্চা ঘৃণা করুক, তারা রাস্তায় নামুক, রক্তবীজের ঝাড়ের মতো।  আবার আসিফা ঘটা আটকে দিক। আটকাক আবার আফরাজুল হওয়া।

(লেখক এলাহাবাদের হরিশ চন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটে মহাকাশ বিজ্ঞানের গবেষক-অধ্যাপক। মতামত নিজস্ব)