এ যেন অন্ধকার থেকে তার আলোয় ফেরা। ষোল বছরের মেয়ের এ যেন নীরব প্রতিবাদ। সম্মানের সঙ্গে মাথা তুলে বাঁচার অমোঘ জেদ। তবু অ্যাথলেটিক্সের ট্র্যাকে ঝড় তোলা রাজশ্রী প্রসাদের সোনার দিনেও একটা কালো মেঘ সবসময় ঘুরে বেড়াচ্ছে তাঁর ইছাপুরের বাড়ির উঠোনে। যেটা ষোল বছরের মেয়ের কাছে চরম অস্বস্তির।
যে বাড়িতে বসে মা তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন পিটি ঊষা হওয়ার, সেই বাড়িতেই বাবার নির্মম ব্যবহারে প্রতি মুহূর্তে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ছোট্ট রাজশ্রী। হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত জাতীয় ইয়ুথ অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে জোড়া সোনা (১০০, ২০০ মিটার) জিতেও তাই দু’চোখ ভরা জল রাজশ্রীর। একই বাড়িতে থেকেও মা-মেয়েদের আলাদা করে রেখেছেন রাজশ্রীর বাবা। ফিরেও তাকান না। কারণ কী? পরপর দুই মেয়ে জন্মেছে বলেই হয়তো এই কঠোর শাস্তি পেতে হচ্ছে রাজশ্রীদের। আর সেজন্যই রাজশ্রী দেখিয়ে দিতে চায়, সে কারও চেয়ে এতটুকু কম নয়। বলছিল, ‘‘আমাকে অনেক বড় হতে হবে। মা অনেক কষ্ট করেছে। অলিম্পিক্সে অংশ নেওয়া আমার আসল লক্ষ্য। এখন থেকেই তার মানসিক প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছি। আমার সাফল্যই আমার যন্ত্রণায় মলমের কাজ করতে পারে।’’ 

মিট শেষ করে অ্যাথলিট বন্ধুদের সঙ্গে । ছবি সৌ: ফেসবুক

এমন সাফল্যের দিনে জীবনে কোনও আফশোস রয়ে গিয়েছে? ‘‘আমার বাবা যদি পাশে থাকত, তবে হয়তো আমার আরও সুবিধে হত। অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম,’’ হায়দরাবাদ থেকে ট্রেনে ফেরার পথে ফোনে কথাগুলো বলতে বলতেই হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে রাজশ্রী। তাকে কোনও ভাবেই থামানো যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পরে নিজেকে সামলে নিয়ে ফের বলতে শুরু করল, ‘‘মা সেলাই করে অনেক কষ্টে আমাদের মানুষ করছে। দিদি বাংলায় মাস্টার ডিগ্রি করছে। আমিও খেলাধুলোর পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। মা বলেছে, পড়াশোনা না করলে বড় সাফল্য পাওয়া যাবে না।’’
গত বছরই মাধ্যমিক পাস করেছে রাজশ্রী। দ্বিতীয় ডিভিশনে। এখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ে। দিদি জয়শ্রী আবার ইছাপুরের বাড়ি থেকে বলছিলেন, ‘‘রাজশ্রীর পড়াশোনায় খুব আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু খেলার জন্য সেভাবে পড়ার সময় পায়না ও। মাত্র একমাস পড়ে মাধ্যমিক দিয়েছিল। দ্বিতীয় ডিভিশনে পাস করেছে।’’ খেলাধুলো, পড়াশোনা ছাড়াও রান্না করতে ভালবাসে রাজশ্রী। তার প্রিয় খাবার পনির। সুযোগ পেলেই পনির রাঁধতে বসে যায়। হায়দরাবাদ থেকে ফিরে মায়ের হাতের পনির খাওয়ারই অপেক্ষা করে রয়েছে সে।
এমনিতে নুন আনতে পান্তা ফোরায় অবস্থা রাজশ্রীদের। তাই ছোটবেলা থেকেই পুষ্টির ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। বড় রুগ্ন চেহারা তার। তবে ট্র্যাকে নামলে সে বাঘের মতোই ক্ষিপ্র হয়ে ওঠে। তার কোচ গোপাল দেবনাথের দাবি, রাজশ্রীর জন্মগত প্রতিভা রয়েছে। তাকে ভালভাবে ট্রেনিং করালে ভারতের অন্যতম সেরা অ্যাথলিট হতে পারবে। রাজশ্রীর দাবি, ‘‘আমি অনেক ছোট। ভারতের সেরা অ্যাথলিট হব কিনা জানি না। তবে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট থেকে ভারতকে সাফল্য এনে দেওয়াই আমার প্রাথমিক লক্ষ্য।’’ রোজ ট্রেনে প্রায় ৪৫মিনিট সফর করে কাঁচরাপাড়া পৌঁছয় রাজশ্রী। সেখানে থেকে প্রায় কুড়ি মিনিট হেঁটে জোনপুর ট্রেনিং সেন্টারে যায়। তারপর তো কঠোর অনুশীলনের ধকল রয়েছে। সেভাবে পুষ্টিকর খাওয়ার পায়না। তবু লড়াই থেকে সরে আসেনি ষোল বছরের মেয়েটি।।
মে মাসে ব্যাঙ্ককে এশিয়ান মিট রয়েছে। তার জন্য পরের মাসের শুরু থেকেই জাতীয় শিবির শুরু হয়ে যাবে। তারপর জুনে ফ্রান্সে বিশ্ব স্কুল মিটে অংশ নেওয়ার কথা তার। আপাতত এই দুই টুর্নামেন্টকে পাখির চোখ করেই এগোচ্ছে রাজশ্রী। স্বপ্ন অলিম্পিক্সের মঞ্চ।