দেবস্থানে নরবলি দানের প্রথা যে ভারতে বেশ ভাল মাত্রাতেই প্রচলিত ছিল তার প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে আবহমান সাহিত্য ও কিংবদন্তিতে। ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ থেকে শুরু করে ১৯ শতকের ‘কপালকুণ্ডলা’-তে পর্যন্ত নরবলি প্রদান করে ইষ্টদেবীর সন্তুষ্টিবিধানের বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। কালের প্রকোপে সেই সব শিউরে ওঠা ঘটনা বন্ধ হলেও আজও সংবাদমাধ্যমে নরবলির ঘটনা কালেভদ্রে উঠে আসে। নরবলি বন্ধ হলেও এদেশের বিভিন্ন দেবস্থানে পশুবলির বিষয়টি চলে আসছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু এমন মন্দির আজও ভারতে বর্তমান, যেখানে বছরে একটি বিশেষ দিনে নররক্ত দিতেই হয় দেবীকে। এবং সবথেকে বড় কথা, মন্দিরটি রয়েছে পশ্চিমবঙ্গেই।

কোচবিহারের বড়দেবীর মন্দিরের ইতিহাসটাই কেমন যেন গা-ছমছমে। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, বিশু আর শিশু নামে দুই ভাই বড়দেবীর উপাসনা শুরু করেন। বিশু অর্থাৎ কোচবিহারের তৎকালীন রাজা বিশ্ব সিংহ নাকি স্বপ্নাদেশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, এই উপাসনার ব্যাপারে। তাঁদের পারিবারিক দেবালয় মদনমোহন-বাড়ির অঙ্গনেই ময়নাগাছের ডাল পুঁতে এই ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ পুজোর সূচনা করা হয়। দেবীর চেহারা বেশ ভীতিউদ্রেককারী। তাঁর গাত্রবর্ণ লাল, তাঁর দ্বারা দলিত অসুরের গাত্রবর্ণ সবুজ। দেবীর বাহন সিংহ অসুরের পায়ে কামড়ে ধরে রয়েছে আর অসুরের হাতে কামড় বসিয়েছে একটি বাঘ। আর দেবীর দু’পাশে অবস্থান করছেন, দেবীর দুই সখি— জয়া-বিজয়া। বলাই বাহুল্য এই মূর্তি দেবী দুর্গার।

কাল প্রবাহিত হয়ে চলেছে। সেদিনের রাজবৈভব থেকে কোচবিহার সরে এসেছে বহু দূরে। কিন্তু বন্ধ হয়নি বড়দেবীর পুজো। আজও কোচবিহারের মহাশ্মশানে ময়না গাছের ডাল পুঁতে বোধন হয় দেবীর। এবং দেবীপক্ষে দুর্গোৎসবের সময়েই উদ্‌যাপিত হয় দেবীর পূজা। এই পুজো আজও কোচবিহারে রাজপরিবারে নিজস্ব পুজো। একটি দেবোত্তর ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানেই এই পুজো হয়। মহালয়ার পরদিন থেকেই শুরু হয় পুজো। ষষ্ঠীর দিন থেকে পুজো পুরোমাত্রায়। কথিত রয়েছে, একদা এই মন্দিরে নিয়মিত নরবলি হত। আজ থেকে ২৫০ বছর আগে মহারাজ নরনারায়ণের আমলে নরবলি নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু এই কিংবদন্তি থেকেই যায় যে, দেবী নররক্ত না পেলে কুপিত হন। তাই প্রতি বছর মহানবমীর দিন এখানে এক বিশেষ ধরনের বলির ব্যবস্থা করা হয়।

মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিলগ্নে বড়দেবীর মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় ‘গুপ্তপূজা’। বাইরের লোকের প্রবেশ তখন নিষিদ্ধ। পুরেহিত এবং রাজবংশের প্রতিনিধিই মূলত থাকেন এই উপচারের সময়ে। এখানে রাজপরিবারের প্রতিনিধি তাঁর আঙুল কেটে কয়েক ফোঁটা রক্ত দেন দেবীর পদতলে। বলি দেওয়া হয় মানুষের প্রতীক একটি পুতুলকে। তুমুল রিদিমে ঢাক বেজে ওঠে, মানুষ আত্মহারা হয়ে যান বলির মুহূর্তে। সাম্প্রতিকের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় আবহমান। কোনও সংলাপ কি নির্মিত হয় তখন? আর কেউ না জানুক, স্বয়ং বড়দেবী বোধ হয় জানেন সেই সত্য।