তৃণমূল কংগ্রেসের চোখে মুকুল রায় এখন ‘বুড়ো ভাম’, ‘গদ্দার’, ‘চাটনিবাবু’। নতুন নতুন বিশেষণে প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদককে সম্বোধন করছেন তৃণমূল নেতারা। বাবা-ছেলে যতই বোঝাপড়া থাকুক এক পুত্রের কাছে পিতা সম্পর্কে এমন কটূক্তি শোনা যথেষ্টই অস্বস্তির। আর সেটাই সহ্য করতে হচ্ছে শুভ্রাংশু রায়কে। কারণ, তাঁর বাবা মুকুল রায় এখন দল ছেড়ে বিজেপিতে।

সোমবার ধর্মতলায় ছিল উত্তর কলকাতা যুব তৃণমূল কংগ্রেসের সমাবেশ। মূলত বিজেপির মঞ্চ থেকে মুকুল রায় যে তোপ দেগেছেন তার জবাব দিতেই এই সমাবেশ ডাকা হয়। তবে সমাবেশে কোনও আকর্ষণই ছিল না। তাই সমাগমের বিচারে জমেওনি সমাবেশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো নয়ই, যুব সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ওই সমাবেশে যোগ দেননি। দেওয়ার কথাও ছিল না। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সেই মঞ্চে বক্তব্য রাখার জন্য আহ্বান করা হয় শুভ্রাংশুকে। দলেরই এক বিধায়ককে কেন এমন অস্বস্তি ফেলতে চাইল তৃণমূল কংগ্রেস? কেন তাঁর উপরে এমন অহেতুক চাপ তৈরি করা হল? তিনি তো এখনও পর্যন্ত কোনও বিরূপ আচরণ বা মন্তব্য করেননি। বাবা দল ছাড়ার পরেও তিনি বারবার জানিয়ে এসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁর একমাত্র নেত্রী।

এমন প্রশ্ন উঠছে তৃণমূলের অন্দরেই। দলেই একাংশ মনে করছে বাবা দল বদলেছেন বলে ছেলেও চলে যাবে এটা ধরে নিয়েই যেন চাপ তৈরি করা হচ্ছে শুভ্রাংশুর উপরে। 

এক রাজ্য নেতার বক্তব্য, ‘‘ভারতে একই পরিবারে বিপরীত মতের রাজনৈতিক দলের নেতার সহাবস্থানের নজির কম নেই। কিন্তু সেখানে অন্তত বাবার জন্য ছেলেকে এই ভাবে চাপে ফেলা হয় না। এটা ঠিক হচ্ছে না।’’ এমন মন্তব্য ঘরোয়া আড্ডাতেও চাপা গলায় বলতে হচ্ছে নেতাদের। কারণ, তৃণমূল কংগ্রেসে মুকুল-পর্ব যে অবিশ্বাসের আবহ তৈরি করেছে তাতে যে কোনও মন্তব্যেরই অন্য মানে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সকলেই ভয় পাচ্ছেন।

উত্তর কলকাতা যুব তৃণমূল কংগ্রেসের সমাবেশে শুভ্রাংশুকে আহ্বান করার পিছনে একটা চমক দেওয়ার চেষ্টাও ছিল। রবিবার আয়োজকদের একাংশের বক্তব্য ছিল, বীজপুরের বিধায়ক রাজ্য যুব তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক। তাই তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? অতীতে ক’টা সমাবেশে যুব তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদককে এই ভাবে আলোর বৃত্তে আনা হয়েছে? প্রশ্ন উঠছে তৃণমূলের অন্দরেই। সেই অংশের নেতারা মনে করছেন, যে চাপ শুভ্রাংশুর উপরে তৈরি করা হল সেটা চলতে থাকলে ইচ্ছা না থাকলেও বীজপুরের বিধায়ককে ‘অন্য’ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু তার বদলে এখন শুভ্রাংশুকে কিছুটা ‘স্পেস’ দিলে সেটা দলের পক্ষে ভাল হত।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত যা জানা গিয়েছে, তাতে শারীরিক কারণে এদিনের সভায় থাকতে পারেননি বলে জানিয়েছেন শুভ্রাংশু। কিন্তু, সেটা না হয়ে সত্যিই যদি তিনি এই সমাবেশকে এড়িয়ে গিয়ে থাকেন তবে তা বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। তৃণমূলের প্রাক্তন ‘চাণক্য’-র যোগ্য পুত্রের মতোই কাজ।

সোমবারের সমাবেশে অর্জুন সিংহ থেকে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যরা যে ভাষায় মুকুল রায়কে আক্রমণ করেছেন তা সেই মঞ্চে বসে হজম করা সহজ হত না মুকুল-পুত্রের পক্ষে। 

শুভ্রাংশু তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক। যুব তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক। বিজেপি বিরোধী যে কোনও সভায় তিনি আগুন ঝরাতে পারেন তাঁর গলায়। হোক না সেটা বাবার নতুন দল। কিন্তু সোমবারের সমাবেশ তো আর বিজেপি-বিরোধী ছিল না। এই সভার এক এবং অদ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল মুকুল রায়কে জবাব দেওয়া। ‘গদ্দার’ প্রমাণ করা।