বাঁশবনে যেন শেয়াল রাজা! ভ্রমণেচ্ছু আমাদের ছোট্ট দলের আমিই একমাত্র পুরুষ সিংহ। তা সত্ত্বেও ভয়ে হাত-পা সেঁধিয়ে গিয়েছিল যখন আমরা মৌসিনরামের পথে পা বাড়ালাম।

শিলং থেকে যাত্রা শুরুর সঙ্গেই আমাদের পিছু নিয়েছিল তুমুল বৃষ্টি। আর রাস্তাও চেরাপুঞ্জির মতো নয়। বেশ সংকীর্ণ। এক দিকে খাড়া পাহাড়, অন্য দিকে গভীর খাদ। আমাদের গাড়ি চলেছে খাদের পাশ দিয়েই। 


জলের ধারা থেকেই তৈরি হয়েছে শিবলিঙ্গ।

মাঝে মাঝে উলটো দিকের গাড়িকে রাস্তা দিতে গিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছিল আরও কিনারায়। রাস্তার ধারে কোনও লোহার গার্ডও ছিল না। 

মেঘ আর বৃষ্টির মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছিল ছোট ছোট জনপদ, স্কুলমুখো কচিকাচাদের কলতান, বাজার-দোকান। সামনে-পিছনে, ডাঁয়ে-বাঁয়ে চারপাশ বৃষ্টিতে সাদা হয়ে রয়েছে। তাই খুব সন্তর্পণে গাড়ি চালাচ্ছিল রাজদীপ। এতগুলো মানুষের প্রাণ তারই হাতে। 

প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম মৌসিনরাম। ছাতা মাথায় দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। 

চারপাশে সবুজে মোড়া পাহাড়। তারই মাঝে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা-কালো মেঘের সেতু। যেন মেঘের গায়ে পা রেখেই পৌঁছে যাওয়া যাবে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে। 

পাহাড়ের গা বেয়েই সিঁড়ি নেমে গিয়েছে মৌসিনরাম গুহার দিকে। যার স্থানীয় নাম মাওজিমবুইন। চারপাশের উঁচু ঘন বনরাজির মাঝে ধ্যানগম্ভীর নগাধিরাজের কোলে এক বিস্ময়কর বিশাল স্ট্যালাগমাইটের গুহা। গুহার অন্দরে প্রাকৃতিক ভাবেই গড়ে উঠেছে এক শিবলিঙ্গ, যার মাথায় অহর্নিশি পড়ছে বিন্দু বিন্দু জল।


গুহার দিকে...

চারদিকে শুধুই প্রশান্তি। কারণ, এখানে মানুষের ভিড় খুবই কম। হয়তো পথের দুর্গমতার কারণেই। কিন্তু, বছরের একটি দিন এখানে ঢল নামে পূণ্যার্থীদের। শ্রাবণ মাসের একটি বিশেষ দিনে।

বেলা গড়িয়েছে অনেকটাই। কিন্তু কষ্ট করে এসে এমন দুর্লভ অভিজ্ঞতার শরিক হতে পেরে শরীর-মন বেশ ফুরফুরে হয়ে গিয়েছিল। 

মৌসিনরাম ছেড়ে এবার অন্য পথে। বৃষ্টি ও দৃষ্টির প্রতিবন্ধকতাও সরে গিয়েছে। চারপাশ বেশ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। গাড়ির পাশ দিয়ে হুশহাশ করে পেরিয়ে যাচ্ছে দোকানপাট, পরিপাটি করে গড়ে তোলা মানুষের ঘর-সংসার, দৃষ্টিনন্দন গির্জা।


উষ্ণ জলধারা

এক জায়গায় গাড়ি থামাল রাজদীপ। সরু এক রাস্তা ঘরে হেঁটে এগিয়ে চললাম আমরা। নজরে এল ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড— ‘জাকরেম হট স্প্রিং’। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে তপ্ত বারিধারা। নারী-পুরুষের স্নান করার জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। মনে পড়ে গেল, বাংলার বক্রেশ্বরের কথা। অনাদরে, অবহেলায় পড়ে থাকা উষ্ণ প্রস্রবণ।

বেলা শেষ হতে চলেছে। পর দিন যাব মাউলিংনং ও ডাউকি। তার আগে আজই দেখে নিতে হবে ‘স্যাক্রেড ফরেস্ট’। এক সবুজ প্রশস্ত মাঠের ধারে গিয়ে গাড়ি দাঁড়াল। মাঠের অন্য প্রান্তেই সেই পবিত্র বনানী। সেই প্রাচীন বনরাজির মাঝেই নাকি থাকেন স্থানীয় জনজাতির মৃত পূর্বপুরুষের আত্মারা। 

স্থানীয়দের বিশ্বাসকে মর্যাদা জানিয়ে ফিরে এলাম খালি হাতে। কারণ, এখান থেকে একটি পাতাও নিয়ে আসার অনুমতি নেই।

লেখকের অন্যান্য প্রতিবেদন—

• সাদা মেঘের ঘাড়ে চড়ল কালো মেঘ! বর্ষায় অনবদ্য সেই পাহাড়