গোরার বাড়ি ঝাড়খণ্ডের বালিঝোরিতে। বাবা খাইরু হো দু’বছর ধরে পঙ্গু হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন! দু’বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন মা চামেনিও। গোরার চার দাদা। বাবার চাষের জমিতে এখন কাজ করেন বড়দা। তাতেই গোরাদের সংসার চলে। 

২০১৩-তে স্থানীয় অর্জুন অ্যাকাডেমিতে তির ছোড়া শুরু করেছিল গোরা। বড়দার উৎসাহে। অপরিসীম আর্থিক অনটন। তবু, দমে যাননি গোরার দাদা। ওর কোচদের অন্যতম একজন, বি. শ্রীনিবাস রাও ঝাড়খণ্ডের দুগনি তিরন্দাজি অ্যাকাডেমি থেকে ফোনে বললেন, ‘‘অসাধারণ প্রতিভা। সম্প্রতি ভারতীয় পুরুষ তিরন্দাজদের মধ্যে এত নিখুঁত কম দেখেছি। অলিম্পিক্সে ওর পদক পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।’’ 

সাব-জুনিয়র, জুনিয়র পর্যায়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপগুলোয় ঝাড়খণ্ডের হয়ে নেমে দশটারও বেশি সোনা জিতে ফেলেছিল গোরা। যার মধ্যে ২০১৪’র জাতীয় স্কুল গেমসে ছিল তিনটে সোনা। তখনও ঝাড়খণ্ড তিরন্দাজি সংস্থার কর্তারা বুঝতে পারেননি গোরা এক বিস্ময়! না হলে ওই পর্যায়ে প্রত্যেক জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে গোরার সোনা বাঁশের ধনুক আর তির ছুড়ে আসবে কেন? কেনই বা ঝাড়খণ্ড তিরন্দাজি সংস্থাকে আবেদন পত্র লিখে গোরা’কে জানাতে হবে নিজের দুর্দশার কথা? সেই বাঁশের ধনুক আর তিরগুলোও তো স্থানীয় অর্জুন অ্যাকাডেমি থেকে তার পাওয়া!

মঙ্গলবার বিকেলে পুণে থেকে ফোনে এই প্রসঙ্গে গোরার সহাস্য মন্তব্য, ‘‘আসলে সাব-জুনিয়র ও জুনিয়র পর্যায়ে জাতীয় স্তরে বাঁশের ধনুক আর তির ব্যবহার করেই সোনাগুলো পেয়েছিলাম। তাই হয়তো রাজ্যসংস্থার লোকেরা ভেবেছিল আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ওই ধনুকেই পদক আসবে!’’
গোরা’কে দু’বছর আগে ঝাড়খণ্ড তিরন্দাজি সংস্থা উপহার দিল দু’লক্ষ  ৭০ হাজার টাকা দামের আধুনিক ধনুক আর তির। নতুন সরঞ্জাম নিয়ে জীবনে প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সোনাজয়!

এখনও চাকরি পায়নি গোরা। ঝাড়খণ্ডের দুগনি অ্যাকাডেমি থেকে গতবছর তাকে নিয়ে গিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পুণের তিরন্দাজি হোস্টেল। সেখানে ক্যাডেট হিসাবে সে রয়েছে। থাকা, খাওয়া সমেত সমস্ত সুযোগ সুবিধা পেয়ে অভিভূত গোরা। বলল, ‘‘অর্জুন অ্যাকাডেমি থেকে ঝাড়খণ্ড রাজ্য সংস্থার দুগনি অ্যাকাডেমিতে আমার ভর্তি হওয়ার নেপথ্যের কোচের নাম হেমন্ত মোহান্তি। স্যারই আমাকে প্রথম বলেছিলেন তিরন্দাজি নিয়ে লেগে থাকতে। এই খেলাই আমার ও পরিবারের আর্থিক অনটন ঘোচাবে।’’ হেমন্ত স্যারই প্রথম তৈরি করে দিয়েছিলেন ধনুক হাতে গোরার নিশানা। গোরা বলছেন, ‘‘দুগনি’তে শ্রীনিবাস স্যারের কাছে ট্রেনিং শুরু করার আগে আমি সাব-জুনিয়র আর জুনিয়র পর্যায়ে জাতীয় স্তরে অনেকগুলো সোনা জিতে ফেলেছিলাম।’’

হেমন্ত মোহান্তি ছাড়াও আরও একজনের কথা গোরার মুখে। তিনি দীপিকা কুমারী। যাঁর লড়াইয়ের কাহিনী ও উত্থান নিয়ে সম্প্রতি বেরিয়েছে ৪৫ মিনিটের তথ্যচিত্র। দীপিকার সঙ্গে বার দু’য়েক কথা হয়েছে গোরার। বলল, ‘‘দীপিকা আমাদের প্রত্যেকের কাছে অনুপ্রেরণা। আমাকে বলেছিল শুধু পরিশ্রম করে যেতে। সাফল্যের আর কোনও রাস্তা নেই।’’ 

দীপিকার জীবনী নিয়ে বেরনো তথ্যচিত্র দেখেছে গোরা। সে-ও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যে, তার জীবন নিয়েও একদিন তৈরি হবে এমনই বলিষ্ঠ একটি তথ্যচিত্র। গোরার স্বপ্নে রয়েছে আরও একটা বাড়তি ছবি। অলিম্পিক্সের মঞ্চ থেকে পদক জিতে দেশে ফেরার পর গোরা দেখছে দু’বছর ধরে প্যারালিসিসে বিছানায় শুয়ে থাকা বাবা আনন্দে এবং গর্বে আবার তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়েছেন!