চলছে জোর লড়াই। অধিকারের লড়াই। ঠিক যেমন টিভি সিরিয়ালে সাংসারিক লড়াই চলতেই থাকে, চলতেই থাকে তেমনই সিরিয়ালের শ্যুটিং বন্ধ নিয়ে লড়াই চলছেই। দফায় দফায় বৈঠকও চলছে। তবুও টিভি সিরিয়ালের শুটিং নিয়ে অচলাবস্থা মিটল না। শনিবার থেকে টানা বন্ধ শ্যুটিং।

কিন্তু কেন এমন অবস্থা? আর্টিস্ট ফোরামের ডাকে ধর্মঘট শুরু হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে শোনা যায়। তেমনটাই দাবি করেছেন প্রযোজকরা। সেটা মানতে নারাজ ফোরাম। মঙ্গলবার ফোরামের পক্ষে অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, ‘‘অদ্ভুত ভাবে মানুষের কাছে বলা হচ্ছে, অভিনেতারা কাজ বন্ধ করেছেন। এটা ভুল। শ্যুটিং প্রযোজকরাই বন্ধ করেছেন। আর্টিস্টরা মেকআপ করে বসেছিলেন। প্রযোজকরা কলটাইম দিলে কাল সকালে থেকেই কাজ শুরু করা যাবে।’’

না, বুধবার সকালেও শ্যুটিং শুরু হচ্ছে না। কারণ, মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত কোনও সমাধান সূত্র মেলেনি। খুব সহজে মেটারও নয়। সেটা বোঝা গিয়েছে মঙ্গলবার আর্টিস্ট ফোরামের বৈঠকের ছবি দেখেই। মঙ্গলবার দুপুরে দক্ষিণ কলকাতার নজরুল মঞ্চে আর্টিস্ট ফোরামের সাধারণ বৈঠক বসে। সেখানে টলি ও টেলি পাড়া মিলিয়ে হাজার দেড়েক অভিনেতা, অভিনেত্রী উপস্থিত ছিলেন। তার মধ্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, জিৎ, ভরত কলরা যেমন ছিলেন তেমনই ছিলেন এই প্রজন্মের অভিনেতা, অভিনেত্রীরা। আর তার পরেই তার পর টেকনিশিয়ান স্টুডিওয় সাংবাদিক সম্মেলন করে আর্টিস্ট ফোরামের পক্ষে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বুঝিয়ে দেন— বল আপাতত প্রযোজকদের কোর্টে। আর্টিস্ট ফোরাম কোনও ভাবেই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী নয়।

 

আর্টিস্ট ফোরামের এই আন্দোলনের পিছনে মূল দাবি, বকেয়া পারিশ্রমিক মিটিয়ে দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শ্যুটিং শেষ করা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করানো যাবে না। প্রযোজকদের এখনও দাবি, ১৫ অগস্টের মধ্যে বকেয়া মেটানোর কথা থাকলেও স্বাধীনতা দিবসে ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। সেটা অভিনেতাদের ই-মেল করে জানানো হয়েছিল। 

অভিনেতাদের বক্তব্য, শনিবার থেকে বন্ধ হয়েছে শ্যুটিং। আর স্বাধীনতা দিবস ছিল বুধবার। মাঝের দু’টো দিন তো ব্যাঙ্ক বন্ধ ছিল না। তবে কেন এমন যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রিয় সিরিয়ালের এক অভিনেত্রীর বক্তব্য, ‘‘অমানুষিক ভাবে খাটিয়ে নেওয়া আর সময় মতো পেমেন্ট না দেওয়াটা এই প্রথম নয়। মাঝে মাঝেই এটা হয়। আমাদের অনেক কষ্ট আড়াল করে মানুষকে বিনোদন দিতে হয়। অভিনয় করে যেতে হয়। দিনের পর দিন ১০ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে চলে শ্যুটিং। অথচ পয়সা দেওয়ার সময়ে আজ নয়, কাল।’’

এ নিয়ে প্রযোজকদেরও যুক্তি রয়েছে। তাদের বক্তব্য, অনেক সময়েই শিল্পীরা দেরী করে আসায় শ্যুটিং-এ সময় বেশি লেগে যায়। এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে। ওভারটাইম চায় অভিনেতারা কিন্তু কখন থেকে সময় গোনা শুরু হবে তা নিয়ে আর্টিস্ট ফোরাম কিছু ঠিক করেনি। সোমবার কয়েকজন প্রযোজক ও কয়েকটি প্রথম সারির চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বৈঠক করেন। সেখানে বলা হয় আর্টিস্ট ফোরাম যে চুক্তির কথা বলছে সেটা আসলে ‘মিনিটস অভ দ্য মিটিং’ ছাড়া আর কিছুই নয়। 

এরও জবাব দিয়েছেন প্রসেনজিৎ। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘‘একটা জায়গায় সই করা মানে আমরা ওটাকে মিনিটস বলি। ইন্ডাস্ট্রিতে যাতে কোনও সমস্যা না হয় সে কারণে মাননীয় মন্ত্রী দুটো বডি তৈরি করেছেন। একটা সিনেমার, অন্যটা টেলিভিশনের জন্য। কোনও সমস্যার সমাধান না হলে সংশ্লিষ্ট বডি উদ্যোগী হয়। এর আগে প্রচুর মিটিং হয়েছে। মিনিটসে যখন সই করছি, আমরা ধরে নিতে পারি, পরের স্টেপটা হবে একটা এগ্রিমেন্ট। এমওইউ হবে। দু’পক্ষ মেনে নিলাম, কাজটা শুরু হোক, তার পর ফর্মালিটি হবে। কিন্তু ওঁরা তো সেটাই মানছেন না।’’ উল্লেখ্য গত ৭ জুলাই রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের উপস্থিতিতে ওই চুক্তিতে সই করে আর্টিস্ট ফোরাম, ফেডারেশন ও প্রযোজকরা। এখন সেই চুক্তি নিয়েই তৈরি হয়ে বিভ্রান্তি।

এক প্রযোজক আর্টিস্টদের নিয়ে তাঁদের সমস্যার কথা বলতে গিয়ে দাবি করেন, ‘‘অনেক অভিনতাই মাসের মধ্যে চার বার টাকা ধার চান। পয়সা তো দেওয়ার কথা ১৫ তারিখের মধ্যে। কিন্তু তিন চার দিন শ্যুটিং করেই যাঁরা হাত পাতে তাঁদের কী হবে? আমরা তবে এর পরে প্রয়োজনে আগাম টাকা দেব না তো!’’

প্রযোজকদের বিরুদ্ধে সরব এখন গোটা টলিউড। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় মঙ্গলবার মারাত্মক এক অভিযোগও তুলেছেন। তাঁর দাবি, আর্টিস্টদের থেকে টিডিএস কাটা হলে অনেক প্রযোজক দেড় বছর ধরে তা জমা দেয়নি আয়কর বিভাগে। এই অভিযোগ তুলে প্রসেনজিৎ-এর প্রশ্ন— ‘‘এটা কোন আইনের মধ্যে পড়ে? এটা তো অন্যায়। শিল্পী তো তার বেনিফিট পাচ্ছে না।’’

আর্টিস্টদের নিয়েও বড় অভিযোগ রয়েছে প্রযোজকদের। তাঁদের বক্তব্য, অনেক শিল্পীই এক সঙ্গে একাধিক কাজ করেন। একই দিন বিভিন্ন সিরিয়ালের শ্যুটিং করেন। কোথাও ১০ ঘণ্টা সময় দেন না অথচ সব জায়গা থেকেই পুরো পারিশ্রমিক নেন। 

সব মিলিয়ে এখন পরিস্থিতি যেখানে তাতে তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। অতীতেও রাজ্য সরকারের উদ্যোগে একাধিকবার টলি পাড়ার সমস্যার সমাধা হয়েছে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও উদ্যোগ নিয়েছেন। এবারেও কি সেটা হবে? অপেক্ষায় টলিউড। অপেক্ষায় বাংলা সিরিয়ালের দর্শকরা।