সে ছিল এক রূপকথার বিয়ে। গোটা গ্রহটা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল সেই বিয়ের দিকে। সাদা-কালো টিভিতে ভারতের মানুষ— শহরের ইন্টেলেকচুয়াল, গ্রামের কৃষক, মঠের সন্ন্যাসী, খোলার চালের বস্তিবাসী, বেপাড়ার পথ হারানো মেয়ে— সব্বাই হাঁ করে দেখেছিল সেই রূপকথা। বিয়ে যদি হয়, এমন ভাবেই যেন হয়— ভেবেছিল মফস্‌সলের শ্যামলা মেয়েটিও। ১৯৮১ সাল। পৃথিবীটা তখন অন্য রকম। গ্লোবালাইজেশনের নাম কেউ শোনেনি, সোভিয়েত ইউনিয়ন নামের একটা দেশ ছিল তখন, কমিউনিস্ট নামের এক মনুষ্য প্রজাতি নাকি ঘৃণা করতো পুঁজি নামের এক দানবকে। সেই সময়ে বিলেত নামের এক দেশের রাজপুত্তুরের সেই বিয়ে নতুন এক রূপকথা হয়ে দাঁড়ায় তৃতীয় বিশ্বের মানুষের কাছে।


সুখের সেদিন! চার্লস আর ডায়না। ছবি: ফেসবুক

চার্লস আর ডায়না— এই দু’টি নাম ১৯৮০-র দশক থেকে প্রবাদে পরিণত। আদর্শ দাম্পত্যের উদাহরণ দিতে হলে কলকাতার রোয়াক আওয়াজ তুলত যুক্তরাজ্যের যুবরাজ ও যুবরানির নামে। চার্লস ও ডায়নার বিয়ের ছবি তখন শহরের আনাচে-কানাচে ভাইরাল। মা-পিসিরা খানিক নাক সিঁটকে বলতেন, ‘অমন পরির মতো মেয়েটার এমন লেপাপোঁছা স্বামী!’  তা তাঁদের নজর লেগেই হোক অথবা অন্য কোনও কারণে সেই রূপকথার বিয়ে কিন্তু বেশিদিন টেকেনি। দেড় দশক পেরিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রাজকীয় দাম্পত্য। বিয়ের ভিডিও দেখে যে কিশোর-কিশোরীরা স্বপ্নজাল বুনেছিল, তারা তখন যুবক-যুবতী। ১৯৯০-দশকের যৌবনটাই নাকি ছারখার হয়ে গিয়েছিল চার্লস-ডায়নার ডিভোর্সের কারণে।

দেখুন সেই রূপকথার বিয়ের ভিডিও

বিবাহ বিচ্ছেদের পরে মাত্র একবছর বেঁচে ছিলেন এই স্বপ্নসুন্দরী। বড়ই ঝঞ্ঝাময় সেই বেঁচে থাকা। যেন নিজেকে শেষ করে দিতেই চাইছিলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। ১৯৯৭-এর ৩১ অগাস্ট প্যারিসে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় ডায়না আহত হন। এবং সেই দিনই তিনি মায়া কাটান এই মরসংসারের। সেই দুর্ঘটনায় তাঁর সঙ্গেই মারা গিয়েছিলেন তাঁর সেই সময়ের প্রেমিক ডোডি ফায়েদ। ডায়নার অন্ত্যেষ্টিও পৃথিবীর কাছে হয়ে থাকে এক স্মরণীয় ঘটনা।

তার পরে মানুষের স্মৃতিতে ধুলো জমেছে। কাল এসে কোথাও ভুলিয়ে দিয়েছে ডায়না নামের মানবীটির কথা। যুবরাজ চার্লস ২০০৫-এ বিয়ে করেন ক্যামিলা পার্কার বাওয়েলসকে। এক অন্য সংসারে তিনি অন্য রকম মানুষ হয়ে বেঁচে আছেন। রূপকথা ছেড়ে গিয়েছে তাঁকে।


মাদার টেরেসা ও ডায়না। ছবি: ফেসবুক
 

কিন্তু সম্প্রতি সংবাদ শিরোনামে ফিরে এলেন যুবরানি ডায়না। ২০ বছর গোপনে থাকার পরে তাঁর কিছু অডিও টেপ প্রকাশ পেল। ‘ডায়না- হার ট্রু স্টোরি’ নামের এক ঝড় তোলা বইয়ের লেখক অ্যান্ড্রু মর্টনের সৌজন্যেই জানা যাচ্ছে কী বলে গিয়েছিলেন ডায়না সেই গোপন টেপ-এ। এই রেকর্ডিংগুলি এক ডাক্তারের সঙ্গে কথোপকথন। এবং এই টেপগুলিতে ধৃত রয়েছে তাঁর গভীরতর যন্ত্রণার কথা।

ইংল্যান্ডের এক প্রখ্যাত সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে, এই টেপ থেকে শোনা গিয়েছে এমন সব কথা, যা আগে কল্পনাও করা যায়নি। ১৯৯১-এ করা সেই টেপ-এ ডায়না বলেছিলেন, বিয়ের এক সপ্তাহ পরেই তিনি অবসাদগ্স্ত হয়ে পড়েন। বোঝেন, এ বিয়ে টেকার নয়। তিনি টের পান তাঁর স্বামী অন্য নারীতে (ক্যামিলা) আসক্ত। ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন তিনি। ওজন কমতে থাকে, খাওয়ায় অনীহা দেখা দেয়। অবসাদ এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, ডায়না নিজের কবজিতে ব্লেড চালিয়ে আত্মহত্যাও করতে চান। এই আত্মহত্যার চেষ্টার কথা মর্টনও তাঁর বইতে লিখেছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর সূত্র ছিল ডায়নার কিছু বন্ধুর সাক্ষ্য।

দেখুন ডায়নার অন্ত্যেষ্টির ভিডিও

ক্যামিলাকে ঘিরে এক অদ্ভুত সন্দেহে ভুগতে থাকেন ডায়না। স্বামীর সবকিছুই যেন তাঁর রহস্যময় বলে মনে হতো। এই অবসেশনই তাঁকে ক্ষইয়ে দিতে তাঁকে। জীবনের টান-বাঁধনগুলোকে শিথিল করে দিতে থাকে তাঁর।

পাঁচ বছরের সেপারেশনের পরে ডিভোর্স। ততদিনে ডায়না দুই সন্তানের মা। কিন্তু ততদিনে সব বন্ধনই কি কেটে গিয়েছে তাঁর? জীবনের মানে বলতে কি আর কিছুই বেঁচে ছিল না তাঁর কাছে? এ সব প্রশ্ন আজ অধরা থেকে যাবে। কারণ, ডায়না নাম্নী মানবীটি তাঁর যাবতীয় রূপ আর ঔজ্জ্বল্য নিয়ে মিলিয়ে গিয়েছেন ইতিহাস নামক এক ধূসর জগতে।


‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে...’, ছবি: ফেসবুক

তবুও হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগে। জাগিয়ে তোলে প্রিন্সেস ডায়নার ‘সুইসাইড টেপ’। হ্যাঁ, ওই নামেই ডাকা হচ্ছে সেই রেকর্ডিংকে।