দেবী কৌষিকীর উল্লেখ আমরা পাই ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’-তে। মহিষাসুরের সঙ্গে দেবী দুর্গা যখন রণে অবতীর্ণা হন, তখনই দেবীর সাহায্যার্থে কৌষিকী দেবীর আবির্ভাব ঘটে। তিনি মূল মাতৃকাশক্তিরই আর এক রূপ।

তন্ত্রোক্ত ‘দেবীসুক্ত’ থেকে জানা যায়, অসুরকুলের সঙ্গে মহারণে দেবী কৌষিকী আবির্ভূতা হয়ে তাঁর সৌন্দর্যে অসুরদের আকৃষ্ট করেন এবং তাদের ধ্বংসে প্রবৃত্ত হন। তিনি ব্যাঘ্রবাহিনী, তাঁর রূপ একমাত্র অগ্নির সঙ্গে তুলনীয়। তিনি মহামায়ার দেহকোষ থেকে উদ্গতা হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম কৌষিকী। তাঁর গাত্রবর্ণ কালিকার মতোই ঘোরকৃষ্ণ তবে তাতে সহস্র চন্দ্রের দ্যুতি বর্তমান। শুম্ভ-নিশুম্ভ বধে তিনি মহামায়ার সহায়িকা শক্তি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

মহিষাসুরের সঙ্গে যে যুদ্ধে মহামায়া অবতীর্ণা হয়েছিলেন, সেই যুদ্ধে দেবীর বিভিন্ন রূপ প্রকট হয়। কালিকা বা চামুণ্ডা রূপটিও এই কালেই দৃশ্যমান হয়েছিল বলে ‘দেবীপুরাণ’ জানায়। কৌষিকী সেই সব দেবীশক্তির মধ্যে অন্যতমা।


দেবী তারা। বাংলার প্রাচীন চিত্র

বাংলার শাক্ততীর্থ তারাপীঠে দেবী কৌষিকীর উদ্দেশে নিবেদিত তিথিতেই মাতৃকাশক্তির আরাধনা করা হয়। ‘দশমহাবিদ্যা তন্ত্র’ অনুসারে দশ মহাবিদ্যার দ্বিতীয় বিদ্যা তারার আবির্ভাব হয়েছিল কৌষিকী অমাবস্যায়। ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’ বা ‘দেবীপুরাণ’-এ উল্লিখিত কৌষিকী ও তারাকে অভিন্না বলে মনে করেন অনেকেই। কালিকা কৌষিকীরই পরিবর্তিত রূপ এমন সমর্থনও পুরাণে পাওয়া যায়। দেবী তারার আট রূপ- উগ্রতারা, ভদ্রকালী, মহোগ্রা, নীলসরস্বতী, তারিণী, মহানীলসরস্বতী, একজ্বটা ও বজ্রা। এর মধ্যে কৌষিকী ও একজ্বটা দেবীকে অনেক তান্ত্রিক অভিন্না বলে মনে করেন। বাংলার শাক্ত পরম্পরায় ‘বুড়ি তারা’ নামে এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই দেবীই তারা মায়ের প্রকৃত রূপ বলে বিবেচিত। কিন্তু পুরাণে বর্ণিতা কৌষিকীর সঙ্গে এই দেবীর মিল সামান্যই। তবু এঁকেই মহাকালীর প্রাকভাষ হিসেবে জ্ঞান করেন তান্ত্রিকরা। এবং কৌষিকী অমাবস্যায় তাঁর আরাধনা করেন।

বীরভূমের দেবী তারার মন্দির অতি প্রাচীন শক্তিপীঠ। ইতিহাসবিদরা অনুমান করেন, প্রাচীন প্রকৃতি উপাসনার স্থল ছিল এই স্থান। পরে বৌদ্ধতন্ত্র ও হিন্দু তন্ত্রের পীঠস্থান হয়ে ওঠে। কৌষিকী অমাবস্যা বৌদ্ধ ও হিন্দু— উভয় তন্ত্রেই গুরুত্বপূর্ণ তিথি। আজকের তারাপীঠে এদিনের মাতৃকা উপাসনা সেই স্মৃতিই বহন করে চলেছে। কথিত আছে, এই তিথিতেই মহাসাধক বামাখ্যাপা সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। সেদিক থেকে দেখলে, তারাপীঠে এই তিথিতে বিশেষ পূজার অনেকগুলি কারণই বিদ্যমান।