সংকটময় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রাজ্যকে স্তব্ধ করার মরিয়া লড়াইয়ে অবতীর্ণ একজন। অন্যজন যে কোনও মূল্যে কলকাতা-সহ রাজ্য সচল রাখতে চান। 

কে জিতবেন আজ, শুক্রবারের যুদ্ধে?

সূর্যকান্ত মিশ্র? নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? নাকি বাঙালির শাশ্বত ‘ছুটিপ্রিয়’ মানসিকতা?

মূলত বাম এবং কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠনগুলির ডাকা দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টা বন্‌ধের দিন এ রাজ্যে রাজনীতির ময়দানে ফের মুখোমুখি বঙ্গ-রাজনীতির দুই প্রতিপক্ষ। বেলা কিছুটা গড়ালেই বোঝা যাবে শেষ হাসি কে হাসবেন। তবে যুদ্ধের ২৪ ঘণ্টা আগে বৃহস্পতিবার সরকারি এবং বিরোধী একে অপরকে লক্ষ্য করে তোপ দেগে বুঝিয়ে দিয়েছে, কেউই জমি ছাড়তে রাজি নয়।

জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে বাস টার্মিনাস, ট্রাম ডিপো, রেল স্টেশন, মেট্রো স্টেশন এবং ফেরিঘাটে পুলিশ পিকেট রাখছেন মমতা। নামানো হচ্ছে রিজার্ভ ফোর্সের অফিসারদেরও। সরকারি কর্মচারীদের রাতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে নবান্নে। বস্তুত, এই বন্‌ধ ব্যর্থ করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বেনজির সমস্ত পদক্ষেপ করেছেন। শহরজুড়ে সাহায্যমূলক হোর্ডিং দিয়েছেন। বাছাই খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। যারা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করবে, তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমনকী, বন্‌ধে ভাঙচুর করলে বন্‌ধ সমর্থকদের থেকে জরিমানা আদায় করা সংক্রান্ত একটি আইন তৈরি করার বিষয়ও রাজ্য ভাবনাচিন্তা করছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন তিনি বলেন, ‘‘আরেকটা নতুন আইন তৈরি করতে যাচ্ছি। কেউ ভাঙচুর, ড্যামেজ করলে ক্ষতিপূরণটা তাকেই দিতে হবে। হোম সেক্রেটারির সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি ওঁকে বলেছি আইনটা তৈরি করতে।’’

সরকারি দফতরে হাজিরা স্বাভাবিক রাখতে ফরমান জারি করেছে অর্থ দফতর। দোকানপাট খোলা রাখার আর্জি জানিয়েছেন মমতা। বন্‌ধের দিন গাড়ি বা দোকানে হামলা হলেও সরকার আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেবে। তার পরেও বামেদের উপর চাপ বাড়াতে নিজে বলেছেন, ‘‘শুক্রবার কোনও ধর্মঘট হচ্ছে না। আসুন আমরা বাংলাকে সচল রেখে বাংলা মা’কে এগিয়ে নিয়ে যাই। আমরা বন্‌ধের রাজনীতি করি না। বাংলাকে সচল রাখার রাজনীতি করি।’’ মুখ্যমন্ত্রীর আরও বক্তব্য, ‘‘শ্রমিকদের অসন্তোষ থাকতেই পারে। আমি শ্রমিকদের পক্ষের লোক। কিন্তু সেটা বলার আলাদা উপায় রয়েছে। সামনে পুজো রয়েছে। পুজোর বাজার রয়েছে। ৫ তারিখ আমাদের শিক্ষক দিবসও রয়েছে। কাজেই সকলে সচল থাকুন।’’

মুখ্যমন্ত্রীর আরও বক্তব্য, ‘‘আমরাও ছোটবেলায় অনেক বন্‌ধ করে দেখেছি। দেখলাম, নিজেদের প্রচার ছাড়া ওতে আর কিছুই হয় না।
তার জন্য কেন মানুষের ক্ষতি হবে? তাই গত ১০-১২ বছর বন্‌ধ বন্ধ করে দিয়েছি!’’
সূর্য অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী ধর্মঘট ভাঙার হুমকি দিচ্ছেন। দাবি আদায় না-হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় থাকব!’’ আলিমুদ্দিন সূত্রের খবর, ধর্মঘট শুরুর আগেই দলের রাজ্য দফতরে চলে এসেছেন সূর্য। তার পরে এসেছেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর অপর সদস্যেরা। গত বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের লজ্জাজনক পরাজয়ের পর দলে এবং ফ্রন্টে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন সূর্য। এরপর জেলায় জেলায় বৈঠক করে হতাশ কর্মীদের চাঙ্গা করতে বন্‌ধের দিনটিকেই পাখির চোখ করেছেন তিনি। প্রতিটি সভাতেই বলেছেন, বন্‌ধকে সামনে রেখেই বামেরা ঘুরে দাঁড়াবে। এই অবস্থায় বন্‌ধের কোনও প্রভাব রাজ্যে না-পড়লে বামেরা যেমন রাজনীতিতে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে, তেমনই সূর্যের নেতৃত্ব নিয়েও ফের প্রশ্ন উঠবে। তাই রাস্তাকে বেছে নেওয়া ছাড়া সূর্যের আর রাস্তা নেই। 
মমতা অবশ্য সকালেই শহর ছাড়ছেন। আজই তাঁর বিদেশ সফর শুরু। তবে তিনি না-থাকলেও থাকবেন তাঁর কর্মীরা। পাশাপাশি, ‘সিঙ্গুর উৎসবে’রও ডাক দেওয়া আছে। গোটা রাজ্যে এদিন বন্‌ধ ব্যর্থ করার প্রচার চালিয়েছেন তৃণমূলকর্মীরা। আজও তাঁরা বন্‌ধ মোকাবিলার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েই ময়দানে নামবেন। বস্তুত, মমতা যে বন্‌ধ ব্যর্থ করতে এবার বাড়তি উদ্যোগী হচ্ছেন, তা বামেরাও জানেন। সূর্য তো আছেনই, এদিন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তথা সিটু’র রাজ্য সভাপতি শ্যামল চক্রবর্তী চ্যালেঞ্জ করেছেন, ‘‘রাজ্য সরকার বন্‌ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে যুদ্ধ হবে! আমরা রাস্তায় থাকব। রাজ্য সরকার বন্‌ধ ভাঙতে বলপ্রয়োগ করার চেষ্টা করছে। নানান ফরমান জারি করছে। আমরা রাস্তাতেই থাকব। আক্রান্ত হলে কী করব, সে বিষয়ে রাস্তাতেই সিদ্ধান্ত নেব।’’ শ্যামল নিজে থাকবেন হাজরা পার্ক এলাকায়। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর ‘খাসতালুকে’।
শহর এবং শহরতলিতে বামেরা অবশ্য এখন কার্যত অস্তিত্বহীন। দক্ষিণ শহরতলির যাদবপুর, বিজয়গড়, শহিদ স্মৃতি কলোনি এবং উত্তর কলকাতার বেলেঘাটা ছাড়া কসবার বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায় বামেদের প্রভাব রয়েছে। এই এলাকাগুলিতে বন্‌ধের প্রভাব পড়তে পারে। শহরের বাকি অঞ্চলে জনজীবন স্বাভাবিক থাকবে বলেই মনে করছে শাসকদল। 
কিন্তু বাঙালি কি সাড়া দেবে মুখ্যমন্ত্রীর প্রচেষ্টায়? নাকি ছুটি খাবে ভরপুর!