SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ

অগস্ট ১০, ২০১৭
Share it on
মিলিটারির এক সাহেব ওখানে খুন হয়েছিল, তাকে নাকি মাঝে মাঝে দেখা যায়৷ সে রাতের সেই পাল্কিযাত্রাকে তিনি স্মরণীয় করে রেখেছেন অবন ঠাকুর তাঁর 'ভূতপত্রীর দেশ' বইটিতে৷

(পূর্বপ্রকাশিতের পর)

বাড়ীর বাইরেও অবনীন্দ্রনাথ ভূতের দর্শন পেয়েছিলেন৷ একবার কৃষ্ণপক্ষের রাতে অবনীন্দ্রনাথ সপরিবারে পাল্কি করে যাচ্ছিলেন পুরী থেকে কোনার্ক৷ সমুদ্রের পাশ দিয়ে বালির উপর দিয়ে কুড়ি মাইল পথ চলছেন, মাঝে মাঝে পাল্কির দরজা খুলে তারায় ভরা আকাশের সৌন্দর্য দেখছেন৷ চলতে চলতে একবার পাল্কির দরজা খুলেছেন— তাঁর চোখে পড়ল পাল্কির পাশ দিয়ে ওই ছন্দেই লাঠি আর লন্ঠন হাতে কেউ হেঁটে চলেছে৷ পাশে পাশে চলা পাল্কির বেহারাদের কথাটা বলতেই তারা ভয়ার্ত কন্ঠে অবনীন্দ্রনাথকে বলল দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়তে৷ তিনি কিছু বুঝতে না পেরে অন্যদিকের দরজা খুলে দেখলেন, টুপি মাথায় এক সাহেব ঘোড়ায় চড়ে পাল্কির পাশ দিয়ে চলে গেল৷ তিনি তখনও কিছুই বোঝেননি, পরে জানতে পারেন  মিলিটারির এক সাহেব ওখানে খুন হয়েছিল, তাকে নাকি মাঝে মাঝে দেখা যায়৷ সে রাতের সেই পাল্কিযাত্রাকে তিনি স্মরণীয় করে রেখেছেন তাঁর 'ভূতপত্রীর দেশ' বইটিতে৷


‘ভূত পত্রীর দেশে’-র প্রচ্ছদ, অলঙ্করণ। ফাইল ছবি

ছয় নম্বর বাড়ীর প্ল্যানচেটের চক্রে অবনীন্দ্রনাথ নিজে কখনও বসেছিলেন কি না তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না৷ তিনি একবার প্ল্যানচেটের মাধ্যমে জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন বলে শোনা যায়, যদিও তাঁর কোনও লেখায় বা স্মৃতিচারণে এই প্রসঙ্গের উল্লেখ নেই৷


অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কালের অমোঘ চক্রে একদিন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে প্রেতচক্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার রেশ ছড়িয়ে পড়ে ঠাকুরবাড়ির ঘনিষ্ঠদের মধ্যে৷ ১৮৭৭ সালে, মূলত জ্যোতিরিন্দ্র-রবীন্দ্রের উদ্যোগে দেখা দিল পারিবারিক পত্রিকা 'ভারতী'৷ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পত্রিকাটির একটা বিশেষ স্থান আছে৷ প্রথম দিকে পরিবারের সদস্যরা এর পাতা ভরালেও এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একটি তরুণ সাহিত্যিক-গোষ্ঠীও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন৷ এঁদের পুরোধা ছিলেন মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায় ও সৌরীন্দ্রমোহন  মুখোপাধ্যায়৷ প্রথম দু’জন ভূতের গল্প লেখায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন, ভূতের গল্পগুলো তাঁরা বলতেন নিজের নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা, তৃতীয়জন ছিলেন ভূত-গবেষক৷ সৌরীন্দ্রমোহন প্রেতচর্চার বিভিন্ন দিক নিয়ে এক সিরিজ ছোট ছোট বই লিখেছিলেন৷ সেগুলি বাজারে বহুদিন অমিল হওয়ার পরে বছর তিরিশ আগে 'পরলোক বিচিত্রা' নামে দুই খণ্ডে নতুন করে সংকলিত করে প্রকাশ করা হয়েছিল৷ তিনজনের মধ্যে মণিলালের যৌবনে অকালমৃত্যু হয়েছিল৷ সৌরীন্দ্রমোহন দাবি করেন, মৃত্যুর অব্যবহিত পরে মণিলাল সশরীরে তাঁর বাড়ী এসে বিদায় নিয়ে যান৷ এখানে জানিয়ে রাখি, সৌরীন্দ্রমোহনকে অনেকেই হয়তো চিনতে পারছেন না কিন্তু তাঁর কন্যাকে আমরা সবাই চিনি— তিনি হলেন প্রবাদপ্রতিম রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্র৷


বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ছবি: উইকিপিডিয়া

ভারতী সাহিত্যিক গোষ্ঠীর ভূত-পরলোক ইত্যাদি নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা পরবর্তী প্রজন্মের অন্তত দু’জন সাহিত্যিককে প্রভাবিত করেছিল৷ তন্ত্র, মন্ত্র ও পরলোকে অগাধ বিশ্বাস ছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷ তাঁর লেখা 'দেবযান' মূলত মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে৷ বইটি বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে আলোড়ন তুলেছিল, সমালোচকরা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন, 'দেবযান' বাংলা সাহিত্যের এক সম্পদ, এ জাতীয় লেখা তার আগে হয়নি। আমার মতে, পরেও নয়৷ ভ্রমণবিলাসী বিভূতিভূষণের অলৌকিক অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বড় কম ছিল না, তারানাথ তান্ত্রিকের গল্পদু’টি তার প্রমাণ৷ শুনেছি, মারা যাবার কদিন আগে, এক পরিত্যক্ত গ্রাম্য শ্মশানে, তিনি নিজের মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করেছিলেন৷ বিভূতিভূষণের সমসাময়িক আর এক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় কিছু অবিস্মরণীয় ভৌতিক কাহিনী লিখে গিয়েছেন— তিনি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়৷ জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শী এই সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস কতটা ছিল জানি না, কিন্তু শুনেছি তিনি মৃত্যুর পর প্ল্যানচেটে আবির্ভূত হয়ে তাঁর সদ্যপ্রকাশিত গ্রন্থাবলির বাণিজ্যিক সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেন৷ পরেও তাঁকে প্রেতচর্চার আসরে পাওয়া গিয়েছে বলে জানা যায় ৷


লীলা মজুমদার ও সত্যজিৎ রায়, ছবি: উইকিপিডিয়া

সত্যাজিৎ রায়ের পারিবারিক বাসস্থান 'গড়পারের রায়বাড়ি'-তে ভূত নিয়ে ভাবনাচিন্তা হতো, এঁদের এক পূর্বপুরুষ শবসাধনা করতে গিয়ে ভূতের চড় খেয়ে মরেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে৷ এই পরিবারের দু’জন— লীলা মজুমদার ও সত্যজিৎ রায়— অসাধারণ ভূতের গল্প লিখতেন৷ সত্যজিৎ রায় মনে হয় অবিশ্বাসীর দলে পড়তেন না, কারণ ফেলুদার গল্পেও প্ল্যানচেট এসেছে একাধিক বার ৷

চল্লিশের দাঙ্গা, তারপরে স্বাধীনতা ও দেশভাগের পরে উদ্বাস্তু সমস্যা বাংলা সাহিত্যে কিছু মূলগত পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছিল৷ বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় ভূতের গল্পের ধারাটি, কেন না ওপার বাংলা থেকে শরণার্থীরা আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে মহানগরের যাবতীয় পোড়ো ও ভূতুড়ে বাড়িতে ভূতেদের হটিয়ে জবরদখল করে থাকতে শুরু করে দেন, যার ফলে যাবতীয় রহস্য-রোমাঞ্চের অবসান ঘটিয়ে বাড়িগুলো নিতান্ত স্বাভাবিক দেখাতে লাগলো৷ কয়েক বছর আগে পরিচালক অনীক দত্তর প্রথম প্রয়াস 'ভূতের ভবিষ্যৎ' ছবিটি ভূতেদের এইভাবে বাড়িছাড়া হওয়ার চিন্তা কেন্দ্র করেই তৈরি৷

লঘুতা বর্জন করে বলতে পারি, স্বাধীনতার পরবর্তীকালে ভূত সম্পর্কে বিশ্বাসের জায়গাটা এখনও বেশ কিছুটা নড়বড়ে হয়ে রয়েছে৷ যদিও বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অনেক ভাল ভাল ভূতের গল্প লেখা হয়েছে, কিন্তু লেখকরা অনেকেই জোর গলায় বলেছেন সেগুলো নিছকই গল্প, তাতে সত্যের বাষ্পও নেই৷ ভাল ভূত ও অলৌকিক কাহিনি লিখতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কিন্তু তিনি খাতায় নাম লেখানো অবিশ্বাসী ছিলেন৷ বিভূতি-তনয় তারাদাস ভালই শুরু করেছিলেন, কিন্তু তাঁর অকালবিয়োগ উদ্ভাবনের গতিকে ব্যাহত করেছে৷ এখন ভূতের ধারা একা বহন করে নিয়ে চলেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, তাঁর একান্ত নিজস্ব স্টাইলে৷

তবে আশার কথা, তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ অলৌকিক আর ভূত সম্পর্কে বেশ আগ্রহ দেখান৷ অলৌকিকের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিকে মিলিয়ে তাঁরা এক নতুন রসসৃষ্টির চেষ্টা করছেন ৷ এঁরা আছেন বলেই পরশুরামের মহেশ মিত্তিরের মতো বলা যায়— ‘‘ও হরিনাথ, আছে, আছে, সব আছে, সব সত্যি..’’  

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -