SEND FEEDBACK

‘খারাপ’ মুসলমানদের খড়ের গাদা থেকে ‘ভাল’ মুসলমান বাছতে বলে দেশ

অগস্ট ২৭, ২০১৮
Share it on
মুসলিম মহল্লা মানেই কি পাকিস্তান জিতলে চাঁদ-তারা আঁকা সবুজ পতাকা আর দমাদম চকলেট বোম?

‘মুল্‌ক’ মানে মুলুক-তার মানেই মুল্লুক। হ্যাঁ,আপনি যখন আপিসের আনমনা ছোকরা জুনিয়রটিকে খেঁকিয়ে বলেন, কোন মুল্লুকে থাকো— তখন অবশ্যই তার দেশ-গাঁয়ের খোঁজ করেন না, মনটা কোথায় পড়ে আছে, সেটাই জানতে চান। তবে মনের সঙ্গে মুলুক মানে দেশের একটা নিবিড় যোগ রয়েছে। বা বলা যায়, মনের যোগ না থাকলে মুলুক আর ‘মুলুক’-ই থাকে না। ‘মুল্‌ক’ নামে সিনেমাটায় পরিচালক অনুভব সিংহ বোধ হয় এই কথাগুলোই বেশ চড়া গলায় কড়া করে বলতে চেয়েছিলেন। আসছি সে কথায়।

রবীন্দ্রনাথ যখন ‘ভারততীর্থ’ কবিতাখানা লিখছেন, তখন এন.সি.আর বা রাষ্ট্রীয় পঞ্জি-ফঞ্জির কোনো গপ্পো ছিল না। কবি তাই নিশ্চিন্তে ‘এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে’ মগের মুল্লুক বানাতে চেয়েছেন। যেখানে দুনিয়ার সব ‘ঘুসপেটিয়া’ অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়ে এক দেহে লীন-টীন হয়ে জটিল ‘ডেমোগ্রাফিক’ সমস্যা বানিয়ে ফেলে। মোদী-অমিত শাহ জামানায় ‘দু’হাত বাড়ায়ে’ ওসব উদারতা ‘ইয়ে’ করতে গেলে কবিকে ‘দেশদ্রোহী’ ট্যাগ মেরে ‘টুকরা-টুকরা’ গ্যাং-এ ভর্তি করে দেওয়া হতো। তার পর তাঁকে সোশ্যাল মিডিয়ায় দিনরাত অ্যায়সা ‘ট্রোল’ করা হতো যে, কবিগুরু ‘নাইটহুড’-এর পাশাপাশি, নোবেল পুরস্কার পর্যন্ত সারেন্ডার করে দিতেন।

তবে সেতো যা হতো, হতো। কিন্তু রবিঠাকুর কবিতায় যেটা বলেছেন, তার মানে তো এই যে, কাঁহা কাঁহা মুল্লুক থেকে লোকজন ভারতবর্ষে ঢুকে পড়ে, এই পরের মুলুক-কেই আপন মুলুক বানিয়ে ফেলেছে। ‘আর্য-অনার্য’, দ্রাবিড়-শিখ— সব্বাই মিলে গায়ে-গায়ে সাড়ে বত্রিশ ভাজা হয়ে থাকাটাই এই মুলুকের ট্র্যাডিশন করে ফেলেছে। এই মুল্‌ক তাই সব্বার। নাগরিক পঞ্জিতে যাদের নাম আছে কিংবা নেই— যাঁরা ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ নামে জেলখানার ভিতরে আছেন বা বাইরে— ভোটার লিস্টে যাদের নামের পাশে ‘ডি’ ছাপ্পা পড়েছে বা পড়েনি— তাঁরা সব্বাই একই মুলুকের বাসিন্দা।


‘মুল‌্ক’ ছবির একটি দৃশ্য, ছবি: ট্রেলার থেকে

‘ডি’ মানে ডাউটফুল-সন্দেহভাজন নাগরিক। রাষ্ট্র তেতো মুখ করে ভোটার লিস্টিতে তাদের নাম তুলেছে বটে, কিন্তু খটকা যাচ্ছে না। ‘ডাউট’, অবিশ্বাস খুব গোলমেলে চিজ। পেহলু খান ধর্মে মুসলমান— গরু খেতেও পারেন। এখন তিনি ও তাঁর ‘শাকরেদরা’ গরুগুলো খাওয়ার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন না দুধ দোওয়ানোর জন্য, তা নিয়ে ‘ডাউট’ রয়েছে। এখন এই ‘ডাউট’ বা সন্দেহের বশে যারা তাকে পিটিয়ে মারল, রাজস্থানের আদালত তাদের ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ দিয়েছে। কারণ, মৃত্যুশয্যায় পেহলু খুনী হিসেবে যাদের নাম বলেছিলেন, তারা যে কিচ্ছুটি করেনি, ‘স্পটেই’ ছিল না, তা নিয়ে পুলিশের কোনও ‘ডাউট’ ছিল না।

এই মুল্‌ক পেহলু খানের, আবার তার খুনীদেরও। কাঠুয়ার ছোট্ট আসিফার, তার খুনী-ধর্ষকদেরও। দাভোলকর-পানেসর-গৌরী লঙ্কেশের, আবার সনাতন সংস্থার সদ্য আটক সন্ত্রাসবাদী পান্ডা বৈভব রাউতেরও। তবে এই মুল্‌ক-এ মুসলমানদের অবস্থানটা যে বেশ ‘ডাউটফুল’, তাই নিয়ে বাকি মুলুকের মনে কোথাও কোনো ‘ডাউট’ নেই। মুসলমান মানেই ঘরের ফ্রিজে গরুর মাংস আর বাড়ির উঠোনে গাদাগাদা কাচ্চা-বাচ্চা থাকবেই (সংঘ-পুরুষের অমর কথামৃত স্মরণে রাখুন— “হম্ পাঁচ, হামারা পঁচ্চিশ”)! মুসলিম মহল্লা মানেই পাকিস্তান জিতলে চাঁদ-তারা আঁকা সবুজ পতাকা আর দমাদম চকলেট বোম। আপনার নাম যদি অমর, এমনকী অ্যান্টনিও হয় তাহলে আপনি খুল্লমখুল্লা জাভেদ মিয়াদাঁদ, ওয়াসিম আক্রম বা শাহিদ আফ্রিদির ভক্ত হতে পারেন। কেউ আপনার দেশভক্তি নিয়ে ‘ডাউট’ করবে না। কিন্তু যেই জানছেন, আকবরও ইমরানের জবর ফ্যান, অমনি ‘বলেইছিলাম’-গোছের সবজান্তা চোখ টেপাটেপি শুরু হয়ে যাবে।


‘মুল্‌ক’-এ ঋষি কপূর, ছবি: ট্রেলার থেকে

‘মুল্‌ক’ ছবিটায় মুসলমানদের নিয়ে এইসব স্টিরিওটাইপগুলোর পালটা জবাব দেওয়ার বিশেষ চেষ্টা করা হয় নি। বা সেগুলোকে তেমন পাত্তাই দেওয়া হয়নি। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র বেনারসের সিনিয়র উকিল মুরাদ আলির (ঋষি কপূর)বাড়ির দেওয়ালে এলাকার গৈরিক বাহিনী কাঠকয়লা দিয়ে হিন্দি-ইংরেজিতে লিখে যায়— ‘পাকিস্তান যাও’, ‘গো টু পাক’! আশপাশের মহল্লার মুসলমানেরা গায় পড়ে সান্ত্বনা, উপদেশ, ‘উস্কানি’ দিতে এলে, মুরাদ তাদের ঝাঁঝিয়ে বলে দেন—লিখবেই তো! যতদিন না পাকিস্তান জিতলে আমাদের মহল্লায় পটকা ফাটানো-মিষ্টি বিলোনো বন্ধ না হবে, ততদিন এসব আমাদের ঝেলতেই হবে। তার মানে মুসলমানদের নিয়ে আম মেজরিটি পাবলিকদের যা ভাবনা-চিন্তা, আপনা কওম-এরই একজন সিনিয়র সিটিজেনকে দিয়ে সেটাতে ছাপ্পা মারিয়ে নেওয়া হলো। ছবিটা নিয়ে মুসলিম তোষণের অভিযোগের বেলুনও ফুস হয়ে গেল।

আবার এই উকিল-সাহেবই কোর্টে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন “আপ মেরি দাড়ি আউর বিন লাদেন কি দাড়িমে ফারক নেহি কর পা রহে, তো ভি মুঝে হক হ্যায় মেরি সুন্নত নিভানে কা”। একেবারে সাবেকি সংবিধানের গোড়ার কথা। এই ভারতের মহা-মুলুকের সব লোকেরই নিজের নিজের মতো ধম্মকম্ম করার হক রয়েছে। টিকি-তিলকওয়ালা হিন্দু বামুনের ছেলের যেমন ধূমধাম করে পৈতে হতে পারে, তেমন দাড়ি-টুপিওয়ালা মুসলমান বাবাটাও লোকজন ডেকে ক্ষীর-বিরিয়ানি খাইয়ে ছেলেদের ‘সুন্নত’ করাতে পারে। আমার দাড়ির সঙ্গে লাদেনের দাড়ি মেলে,আর আমাদের রীতি-রেওয়াজের সঙ্গে দেশের পঁচাশি শতাংশ হিন্দুদের মেলে না বলে, আমরা আইডেনটিটি লুকিয়ে ঘরে কাঁটা হয়ে বসে থাকব, এমনটা নয়।


‘মুল্‌ক’ ছবিতে আশুতোষ রানা, ছবি: ট্রেলার থেকে

খুবই সোজাসাপটা নাটকীয় ডায়ালগ। কিন্তু মুশকিলটা হল ‘মুল‌্ক’ সিনেমার সমস্ত জরুরি-জোরালো কথাগুলো আদালত-ঘরেই বলাবলি হয়। আর কে না জানে, ‘দামিনী’-ই হোক কিংবা ‘পিঙ্ক’, বলিউডের কোর্ট মানে ড্রামাবাজির চূড়ান্ত। সত্যিকারের কোর্টে যা যা বলা যায় না, করা যায় না, এখানে সেগুলোই দাপিয়ে করা হয়— রিয়্যালিটির ধার না ধেরেই। ‘মুল‌্ক’-এ যেমন সরকার পক্ষের উকিলের ভূমিকায় আশুতোষ রানা সারাক্ষণ ওভার-অ্যাক্টিং করে গেলেন। কারণ, তিনি আসলে প্রাণপণে এখনকার রাষ্ট্রের বা সরকারের কম্যুনাল, পক্ষপাতদুষ্ট মুখ হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। তিনি তাই চেঁচিয়ে ফাটিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মুখে সেইসব সংলাপই বসানো হয়েছে, সংখ্যাগুরু জনগণ ভারতের মুসলমানদের সম্পর্কে যে কথাগুলো ভাবতে, বিশ্বাস করতে ভালবাসে। কিন্তু সরকার, পুলিশ বা তাদের উকিলের মনে যাই থাক, ভরা আদালতে, জজসাহেবের সামনে সব কথা বলা যায় নাকি?

ছবিতে জজসাহেবের ভূমিকাটাও বেশ অদ্ভুত। সরকারী উকিল যখন সওয়ালের নামে খোলাখুলি ঘৃণার বেসাতি খুলে বসেছেন— জাতধম্ম তুলে রীতিমত গালাগালি করছেন, জজ তখন দুয়েক বার নরম গলায় ‘আরে সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলবেন না’-গোছের মন্তব্য করেই চেপে যান। বরং ‘ভুলটা কি বলেছেন’, ‘আপনাদের সমাজে তো এমনটা হয়েই থাকে’ ইত্যাদি উস্কানি দিয়ে চলেন! বুঝতেই পারছেন, আদালতের রেকর্ড-এ এইসব কথাবার্তা থাকতেই পারে না। কিন্তু চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে, এক পক্ষ যখনই একটা ক্লিশে উগ্রতা দেখায়, অন্য পক্ষকেও তখন গতে বাঁধা কথাবার্তাগুলো সুর চড়িয়ে বলতে হয়।

এই লেখকের অন্য ব্লগ

মুরাদ আর তার ভাই বিলালের হয়ে কোর্টে কেসটা লড়ছিলেন তাদের বাড়িরই হিন্দু বউমা তাপসী পান্নু। মসজিদে যাওয়া, নমাজ পড়া ঘোর মুসলমান শ্বশুরের ‘কনভার্ট’ না হওয়া, শিবমন্দিরে পেন্নাম ঠোকা, বাড়ির সব অন্য মেয়ে-বউদের চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেক উচ্চশিক্ষিতা বধূটি, কোর্টে দাঁড়িয়ে যা বললেন, সেখানেও চোখা যুক্তির চেয়ে ভেজা আবেগই বেশি। কথাগুলোও সাতপুরোনো! ‘ভারতের মুসলমানদের আর কতদিন দেশভক্তির প্রমাণ দিয়ে যেতে হবে’ কিংবা ‘এই মুল্‌ক হিন্দুরও যেমন, তেমনই মুসলমানেরও’— এইরকম আর কী! কিন্তু এইসব ‘ক্লিশে’ বক্তিমে শুনেই একটু আগেও উলটো-পালটা কথা বলা জজসাহেবের হৃদয় পরিবর্তন হয়ে গেল। মুরাদের ভাই, এক নিহত সন্ত্রাসবাদী ছেলের মৃত বাবা, বিলালকে রাস্ট্র-পুলিশ বিচার-ব্যবস্থা বা-ইজ্জৎ রেহাই দিয়ে দিল।

অথচ ছবিটা যে জায়গাটা থেকে শুরু হয়েছিল,সেখানে অতটা সহজে, সিস্টেম-এর উপরে অত অগাধ-সরল ভরসা রেখে সবকিছু শান্তি-কল্যাণ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল না। একটা সাধারণ শান্তিপ্রিয়, ক্ষমতার উপরতলায় কোনও রকম ‘কানেকশন’-হীন মুসলমান পরিবারের একটা ছেলে সত্যি সত্যি জঙ্গিদলে নাম লেখালে ,রাষ্ট্র-সমাজের ‘মেজরিটিজম্’ তাদের কিভাবে হেনস্থার একসা করে, বাপ-মা-ভাই-বোন-জ্যাঠা-মামা সবসুদ্ধ টানা-হ্যাঁচড়া চলতে থাকে, কাশ্মীর-উত্তরপ্রদেশ-গুজরাট-মহারাষ্ট্রে তার রাশি রাশি নমুনা আছে। এখানে সিনেমাটা সেখানটায় ঢুকতে গিয়েও পাশ কাটিয়ে কোর্ট-রুমের সস্তা নাটুকেপনায় ঘেঁটে গেল।


‘মুল্‌ক’ ছবিতে তাপসী পান্নু, ছবি: ট্রেলার থেকে

আসলে বলিউড যখনই এ ধরনের গনগনে, স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে ছবি বানায়, তখন কিছু কিছু ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স’-এর রাস্তায় চলে যেতেই হয়। যেমন, সত্যি অবস্থাটা যাই হোক, রাষ্ট্র-সংবিধানের ‘বেসিকস’গুলোর গায়ে আঁচটুকুও লাগতে দেওয়া যাবে না। ‘কমিউনাল’ উত্তেজনার হাওয়া হুশ করে বেরোতে দিতে,ডাঁয়ে-বাঁয়ে সেফটি ভালভ-এর বন্দোবস্ত রাখতে হবে। এ ছবিতে যেমন পুলিশের জঙ্গি-দমন শাখার কড়া-কট্টর দেশভক্ত মুসলমান পুলিশ অফিসারটি। গোটা কওম-এর নাম খারাপ করা ইসলামি জঙ্গিদের প্রতি তাঁর এতটাই ঘেন্না যে, জ্যান্ত পাকড়ানোর সুযোগ থাকলেও, তিনি তাকে এনকাউন্টারে ঝাঁঝরা করে, তার পর লাশটাকে জন্তু জানোয়ারের মত ঠ্যাং ধরে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার হুকুম দিতে পারেন। রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের মনটা তাতে খুশি-খুশি হয়ে যায় কি না জানা নেই, কিন্তু আশপাশের মুসলমান মহল্লার বাসিন্দাদের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।

এই প্রসঙ্গেই আর একটা কথা বলার আছে। ছবিটাকে যাতে কিছুতেই মুসলিম তোষণ বলা না যায়, পরিচালক সে দিকে রীতিমতো নজর রেখেছেন। তাই গল্পের কেন্দ্রে থাকা মুসলমান পরিবারটির চারপাশে কওম-এর বাদবাকি যে মানুষজনকে মসজিদে, মহল্লায়, অলিতে-গলিতে, সান্ত্বনার নামে মুরাদ আলিকে উস্কানি দিতে আসা ভিড়ের মধ্যে, এমনকী ফ্ল্যাশব্যাকে ১৯৯২-এ বাবরি মসজিদ ভাঙার বদলা নেওয়ার শপথে দেখা যায়। তারা কিন্তু সংঘ-পরিবারের রঙে আঁকা স্টিরিওটাইপ ছাড়া কিছু নয়। এ-ও হয়তো এক রকম ব্যালেন্সের খেলাই! খারাপ মুসলমানদের খড়ের গাদা থেকে সূঁচের মত একটা আধটা ভাল মুসলমান খুঁজে নিতে হবে, যারা রাষ্ট্র মানে ‘মেজরিটির’ ‘মনের মতন’। তাদেরকে রাষ্ট্র সুরক্ষা দেবে— বাকিদের ‘ঠেঙ্গা’। ভারতমাতা, থুড়ি মুলুক কি জয়!

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -