SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

মেয়েরা যদি ‘আপনা হাত জগন্নাথ’ দেখায়, তা হলেই কি পুরুষের ঘরে আগুন

জুন ২৬, ২০১৮
Share it on
ছেলেদের ওসব অভ্যেস থাকে। তাই বলে একটা মেয়েমানুষ ক্যামেরার সামনে আপনা হাত জগন্নাথ হচ্ছে, আবার জাঁক করে বলেও বেড়াচ্ছে-এতটা বেহায়াপনা সহ্য করা যায়? নাকি করা উচিত?

ওরা সব্বাই বড়লোকের বিটি লো...। অবশ্য সব্বার লম্বা লম্বা চুল নেই! যাদের নেই তাদের খাটো চুলেও নানারকম কায়দার হেয়ার কাট্। আসলে বাপের পয়সা থাকলে কী-ই না হয়! মাথায় চৌষট্টিটা খাবলা কেটে, তাতে সাড়ে ছত্রিশ রকম রং মাখিয়ে সঙ সেজে বেড়ালেই বা কে কী বলতে যাচ্ছে। ‘বীরে দ্য ওয়েডিং’-এর চারটে মেয়ে তাই গোটা ছবি জুড়ে, যখন-তখন, যেমন খুশি তেমন সেজেছে। যেন সিনেমা নয়, ফ্যান্সি ড্রেস-এর একজিবিশন বা ফ্যাশন শো চলছে। কখনও মাথায় অ্যাত্তো বড় একটা হলুদ রঙের কাপড়ের ফুল, কখনও আবার অফ শোল্ডার টপও গা থেকে খসে খসে পড়ছে!

আর এইসব ব্যাপারগুলো সাক্ষী সোনি বলে মেয়েটার বেলাতেই বেশি বেশি করে ঘটে। কারণ বন্ধুদের সবার মধ্যে তার বাবাই সবচেয়ে বড়লোক। কয়েক কোটি টাকা খরচা করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়ে সেই বিপুল ‘ইনভেস্টমেন্ট’ টেমস নদীর জলে ভাসিয়ে, অমন হাই প্রাইস বিয়েটাকে লন্ডনে কোমায় রেখে আপাতত বাপের বাড়িতে চড়াও হয়ে আছে। আর পিতার টাকা খসিয়েই পিতৃতন্ত্রের গুষ্টির ষষ্ঠীপুজো করছে।


করিনা, সোনম, স্বরা, শিখা। চার কন্যার দাপটে ‘বীরে দি ওয়েডিং’ জমজমাট। ছবি: ট্রেলার থেকে

সাক্ষী আর তার বাল্য-সখীর দল এই যে তাদের চলনে-বলনে-অশনে-ব্যসনে সব সময়ে একটা চড়চড়ে চড়া, বহু লোকের হাড়পিত্তি জ্বালানো প্রায় ৪২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট মার্কা ‘লাউড-পনা’ উঁচিয়ে রাখে, সেটাকে পুরুষবাদের বিরূদ্ধে ইচ্ছে করে, গায়ে পড়ে অন্তর্ঘাত ঘটানোর চেষ্টা বলাই যায়। এবং পরিচালক শশাঙ্ক ঘোষ সুদ্ধ গোটা টিম ‘বীরে দ্য ওয়েডিং’-এর এই ‘চেষ্টা’টা যে মোটামুটি চাঁদমারি ফুটো করে দিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কিছু লোকের চিড়বিড়িনি দেখেই সেটা মালুম পাওয়া যাচ্ছে।

এখানেও মূল টার্গেট সেই সাক্ষী সোনি মানে স্বরা ভাস্বর। এমনিতেই তার দোষের অন্ত নেই। এক নম্বর: তিনি চান্স পেলেই জে.এন.ইউ-হায়দ্রাবাদ-দিল্লি— যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশদ্রোহীদের পক্ষে, মোদীজির বিরূদ্ধে যা-তা বলেন। ‘গোরক্ষক’ (নাকি গোরাক্ষস-আমাদের বাঙালি কানে শুদ্ধ হিন্দি উচ্চারণে দুটো প্রায় একই রকম শোনায়!)থেকে শুরু করে যে কোনও কিসিমের সেনা-মোর্চা-বাহিনীকে রেয়াৎ করেন না। দু’নম্বরী দোষ: কাঠুয়া কাণ্ডে নিহত-নির্যাতিতা যাযাবর বালিকা যাতে ন্যায্য বিচারটুকু পায়, সে জন্য ‘বীরে দ্য ওয়েডিং’-এ তাঁর সহ-নায়িকা করিনা ও সোনম কাপুরের সঙ্গে মুখ খুলেছেন। এবং তিন নম্বর দোষ: ‘পদ্মাবৎ’ ছবিতে সঞ্জয় ভংশালী যেভাবে কাছা খুলে জওহরব্রতর গুণ গেয়েছেন, স্বরার তাতে মনে হয়েছিল, বলিউডি পুরুষতন্ত্রের কাছে, মেয়েরা এখনও ‘যোনি’ ছাড়া কিচ্ছু নয়। ম্লেচ্ছ পুরুষের নোংরা ছোঁয়া থেকে তাকে বাঁচাতে তাই আগুনে ঝাঁপ দিয়ে পুড়ে মরার প্রথাকে এত জাঁকজমক করে দেখানো হয়েছে।


পরিবারের স্থিতিকে টলিয়ে দেওয়াই কি এই ছবির উদ্দেশ্য? ছবি: ট্রেলার থেকে

ভ্যাজাইনা নিয়ে স্বরার এত ভ্যাজভ্যাজানি এমনিতেই অনেককে খচিয়ে রেখেছিল— বিশেষ করে সংঘ পরিবার ও তাদের ‘তুতো’ বা দূর-সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনদের! তার উপরে সেই স্বরা ওরফে সাক্ষী সোনিকেই দেখা গেল ‘বীরে দ্য ওয়েডিং’-এ কম্বলের তলায় ভাইব্রেটর নিয়ে জমিয়ে আরামসে হস্তমৈথুন করতে। ছবিতে সাক্ষীর ডায়ালগ-মাফিক যার ডাকনাম— ‘আপনা হাত জগন্নাথ’। আধুনিক নারীর যৌন-স্বাধীনতার নয়া তরিকা। স্বামী অফিস ফাইলে ‘ব্যস্ত্’ বা অন্য মেয়েতে মস্ত্— কুছ পরোয়া নেই! ভাইব্রেটর হ্যায় না! নিজের হাতে নিজেকে সুখ দিন। পর্দায় অবশ্য বিছানার উপর আলগোছে রাখা সেই সুখের ঘরের ‘চাবি’টাকে অফ ফোকাসে দেখানো হয়েছে। নইলে সেন্সর বাগড়া দিতে পারত। তবে ভারতের সেন্সর ছাড় দিলেও ভারতীয় ‘ঠাকুমারা’ স্বরা এন্ড কোম্পানীকে ছাড়েননি। অমনই এক পৌনে হিন্দুস্থানী ঠাকুমার সোয়া হিন্দুস্থানী নাতনি,(যিনি আবার নাকি বিজেপি-র মতাদর্শে বিশ্বাসী!)টুইট করেছেন — ‘‘এক্ষুনি ‘বীরে দ্য ওয়েডিং’ দেখে বেরোলাম। সঙ্গে ছিলেন আমার ঠাকুমা। হস্তমৈথুনের ওই দৃশ্যটায় আমরা দুজনেই খুব অস্বস্তিতে পড়ি। ঠাম্মা বাইরে বেড়িয়ে বলল— হম হিন্দুস্থানী,এই ছবির জন্য পুরো হিন্দুস্তানের লজ্জা পাওয়া উচিত।’’

প্রিয়া শাহ নামে মুম্বাইয়ের যে মেয়েটি এই টুইটটা করেছিলেন, তাঁর ঠাকুমার মতোই আরো অনেক স্বদেশি ঠাম্মা এবং তাদের শুদ্ধ্-দেশি তথা সংঘ পরিবারের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ নাতি-নাতনিরাও সাক্ষী তথা স্বরার এহেন ‘নির্লজ্জ’ হাতের কাজে যৎপরোনাস্তি স্ক্যান্ডালাইজড্ হয়েছেন। আর ‘পদ্মাবৎ’ ও কাঠুয়া-কাণ্ডের পরে আরও একবার সোশ্যাল মিডিয়া ভরে ট্রোল-বানে স্বরা ভাস্বরকে লেডি ভীষ্মের মতো শরশয্যায় চিৎ করে ফেলেছেন। ব্যাপারটা এরকম নয় যে, বলিউডের সিনেমায় এই প্রথম বার হস্তমৈথুন বা স্বমেহনের দৃশ্য দেখা গেল। কিন্তু সেখানে তো চরিত্ররা প্রায় সব্বাই পুরুষমানুষ; ছেলেদের ওসব অভ্যেস থাকে। তাই বলে একটা মেয়েমানুষ ক্যামেরার সামনে আপনা হাত জগন্নাথ হচ্ছে, আবার জাঁক করে বলেও বেড়াচ্ছে-এতটা বেহায়াপনা সহ্য করা যায়? নাকি করা উচিত?


পিতার হোটেলে খেয়ে পিতৃতন্ত্রের গুষ্টি উদ্ধার, নাকি প্রকৃত প্রতিবাদ? ছবি: ট্রেলার থেকে

তাছাড়া ছবির নামে যতই ‘ওয়েডিং’ কথাটা থাকুক, কিংবা সিনেমার চার সখী বিয়েবাড়ির হুল্লোড়-কেনাকাটা-সাজগোজ নিয়ে যতই আদিখ্যেতা–হ্যাংলামো করুক— আসলে তো এখানে ঘোর উত্তর ভারতীয়, হিন্দু, সামাজিক বিয়ে ব্যবস্থাটাকে নিয়েই ব্যাপক খিল্লি করা হয়েছে। কমেডি-রং-তামাশার ছলে তার চোলি-ঘাঘরা-লেহেঙ্গা-শেরওয়ানি ধরে যখন-তখন হ্যাঁচকা টান মারা হয়েছে। আর সেই অন্তর্ঘাতটা করছে কারা?চারটে মেয়ে! ব্যবস্থাটাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে টিকিয়ে রাখাটাই যাদের সামাজিক দায়িত্ব। ছবিতে নায়ক বলতে কেউ নেই। পুরুষ চরিত্র যে ক’টা আছে তারা সব্বাই মিনমিনে ম্যাদামারা। আর মেয়েগুলো সব মনু ও ‘মোদী-সংহিতা’ মাফিক বিলকুল মদ্দা-মার্কা! গলগল করে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে, কোঁৎ-কোঁৎ করে হুইস্কি-ভদকা গিলে, চার-ছয়-আট অক্ষরের হিন্দুস্তানী আর বিলিতি খিস্তির বন্যা ছুটিয়ে, এই চারকন্যা গোটা সিনেমা জুড়েই ধুন্ধুমার হল্লা মাচিয়ে বেড়ায়।

শরীর নিয়ে এদের চারজনের কোনো আতুপুতু-নেকুপুষুপনা নেই। আর তাতেই ছেলেরা ঘাবড়ে যায় বেশি। একটি মেয়ে অবনী যখন তার ‘অ্যারেঞ্জড্’ ভাবী বরকে পাবলিকলি চুমু খেতে চায়, এমনিতে স্মার্ট-হ্যান্ডসাম ছেলেটি ভয়ে লজ্জায় সিঁটিয়ে গুটিয়ে, লাল-নীল-বেগুনি হয়ে, কোনওরকমে পালিয়ে বাঁচে। তাও তো অবনী স্রেফ একটু চুমু চেয়েছিল। চারকন্যার আর একজন, মীরার ইংরেজ বর, ইংলিশ টু হিন্দি অভিধান ঘেঁটে ‘অর্গাজম’-এর যে দুর্ধর্ষ প্রতিশব্দটা খুঁজে বার করেছিল, সেই ‘চরমসুখ’ চেয়ে বসেনি! আসলে ‘আপনা হাত জগন্নাথ’ থেকে ‘চরমসুখ’ সব ব্যাপারেই এই মেয়েগুলো বড্ড যেন চরমপন্থী, জেদি একবগ্গা টাইপের। নিজেদের পছন্দ,ইচ্ছের চেয়ে তারা আর কিছুকেই বেশি দাম দেয় না।


সুমিত ও করিনা। ছবি: ট্রেলার থেকে

ছেলেরা মেয়েদের এতটা ইচ্ছের বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। এমনকী বিছানাতেও কতদূর পর্যন্ত গেলে, কোন মুহূর্তে মেয়েটির ‘চরমসুখ’, সেটাও ছেলেরাই ঠিক করে দিতে চায়। কারণ তাতেই তাদের পরম সুবিধে। চরমসুখের মাপকাঠিটা মেয়েদের হিসেবমাফিক হলে, যৌন-যুদ্ধে আমাদের মর্দাঙ্গি তো খতড়ে মে পড়্ যায়েগা! ‘রিয়েল স্বরা’ (স্বরা ভাস্বরের টুইটার হ্যান্ডেল)-কে যারা ট্রোল করে যাচ্ছে, তারাও সত্যিটা জানে বলেই গলার জোরে সবটা দাবিয়ে রাখতে চায়— যাকে বলে ‘আন্ডার কন্ট্রোল’!  ওয়েডিং দেখে লজ্জায় জড়সড় ঠাকুমারা তাদের ঢাল হয়েছেন। তার আড়ালেই লকলকাচ্ছে পুরুষতন্ত্রের তলোয়ার— খনাদের জিভ কাটার জন্য। 
 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -