SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

পুনর্জন্ম কি সত্য! কী বলছে বিজ্ঞান, কী বলছেন মনীষীরা, পর্ব ৩

অক্টোবর ৩০, ২০১৭
Share it on
জিশুর গুরু জন দ্য ব্যাপটিস্ট আগের জন্মে মহামুনি এলাইজা ছিলেন, এ রকম একটা জনশ্রুতি প্যালেস্টাইনে চালু ছিল৷

গত শতকের সাতের দশকেই আরো কয়েকটি গবেষণাভিত্তিক কাজ সাধারণ মানুষকে মনস্তত্ত্বের এই দিকটা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে উৎসাহিত করেছিল৷ মনস্তত্ত্ববিদ হেলেন ওয়ামবাক মধ্য-সত্তরে গোটা আমেরিকান মহাদেশ থেকে বিভিন্ন বয়সের সাড়ে সাতশো নারী-পুরুষকে সম্মোহিত করে প্রাক্-জন্ম অবস্থায় নিয়ে গিয়ে তাদের জন্মের মুহূর্তের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে বলেন ৷ সম্মোহিত অবস্থায় হেলেন এদের পূর্বজন্ম নিয়েও কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেন, যথা—
- আপনি কি স্বেচ্ছায় জন্ম নিয়েছেন?
- জন্ম নিতে কেউ কি আপনাকে সাহায্য করেছিল? এবং উত্তর হ্যাঁ হলে হেলেন প্রশ্ন করতেন— সে কে?
- পুনর্জন্মের জন্য আপনি এই শতাব্দী কেন বেছে নিলেন?
- নারী বা পুরুষ হবার সিদ্ধান্তও কি আপনার?
- আপনি কি আপনার এ জন্মের পিতা-মাতাকে চিনতেন? উত্তর হ্যাঁ হলে প্রশ্ন করা হতো— গত জন্মে তাঁদের সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক ছিল?
- এ জন্মে যাঁদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক আছে, তাঁদের কি আপনি গত জন্মে চিনতেন?

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

হেলেন দুটি প্রশ্নের মধ্যে পাঁচ সেকেন্ডের বিরতি রাখতেন এবং শেষ প্রশ্নের পর প্রশ্নকারীকে জাগিয়ে তার হাতে কাগজ-কলম ধরিয়ে দিয়ে ওই ঘুমে-জাগরণে মেশা অবস্থাতেই উত্তরগুলি লিখে ফেলতে বলতেন, যাতে তাদের সচেতন সত্তা অবচেতনের উপরে প্রভুত্ব করার সময় না পায়৷ একটি উত্তরপত্রের উদাহরণ দিচ্ছি—
প্রশ্ন— আপনি কি স্বেচ্ছায় জন্ম নিয়েছেন?
উত্তর— হ্যাঁ, আমি স্বেচ্ছায় জন্ম নিয়েছি৷ কেউ একজন আমাকে সাহায্য করেছিল, কিন্তু সে কে আমি জানি না, শুধু তার কন্ঠস্বর মনে আছে৷ সদয়, দয়ালু ও জ্ঞানবান কেউ, যাঁকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায়৷ আমি জন্মানোর জন্য এই বিশেষ সময়টা বেছে নিই, কেন না সামনে একটা বিশাল পরিবর্তন আসছে, তাতে আমি সাহায্য করতে চাই৷ আমি পুরুষ হতে চেয়েছিলাম, কারণ তাতে আমার কাজের সুবিধা হবে৷ আমার এ জন্মের মা কোনও এক জন্মে আমার স্ত্রী ছিলেন, আমার বাবা গতজন্মে ছিলেন আমার ছেলে৷ আমার গত জন্মের বন্ধু বা প্রেমিকদের অনেককে ছায়ার মতো মনে পড়ে, তার বেশি কিছু বলতে পারছি না৷

হেলেন ওয়ামবাক । ছবি: উইকিপিডিয়া

এই গবেষণায় যাঁদের প্রশ্ন করা হয়েছিল তাঁদের ৮১% জানিয়েছিলেন, তাঁরা স্বেচ্ছায়  জন্ম নিয়েছেন। বাকি ১৯ শতাংশের মধ্যে কিছু মানুষ জানান যে, তাঁরা জন্ম নিতে আপত্তি করেছিলেন৷ বাকিরা বলেছিলেন, তাঁদের মতামত চাওয়া হয়নি৷ এই বিভাগটা কিসের ভিত্তিতে করা হয়, সে সম্বন্ধে উত্তরদাতারা কোনও আলোকপাত করতে পারেননি৷ তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন উপদেষ্টা আত্মাদের জন্ম-মৃত্যুর ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে তাদের পুনরায় জন্ম নিতে উৎসাহিত করেছিল৷ হেলেন ওয়ামবাকের বই "লাইফ বিফোর লাইফ" (১৯৭৯) গোটা পশ্চিমী দুনিয়ায় আলোড়ন ফেলে দেয়৷ পাঠক মাত্রেই স্বীকার করলেন, জন্মান্তরের এরকম অকাট্য প্রমাণ তাঁরা আগে কখনো পাননি ৷

এই গবেষণার যে দিকটা সকলকেই আকর্ষণ করেছিল তা হল— জন্মান্তরের বিচিত্র পটভূমিতে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব৷ শতকরা ৮৭ ভাগ উত্তরদাতা জানিয়েছিলেন, এ জন্মের বাবা-মা-বন্ধু-প্রেমিককে তাঁরা গতজন্মেও চিনতেন৷ এই চেনার পরিধি কত ব্যাপক, কতটা অদ্ভুত,  চিন্তা করা যায় না৷ যেমন একজন বলেছিলেন— তিনি গতজন্মে জেলের আসামী ছিলেন এবং এই জন্মে গতজন্মের কারারক্ষকের ছেলে হতে চেয়েছিলেন, যে কারারক্ষক তাকে সকাল-বিকেল চাবুক মারতো৷ আর এক জনের উত্তর ছিল— ‘'গত জন্মে আমি আমেরিকাতেই থাকতাম৷ আমি একটি ফরাসি চার্চে পাদ্রী ছিলাম আর আমার এই জন্মের স্বামী ছিলেন এক রেড ইন্ডিয়ান, যাঁর সঙ্গে আমার মতবিরোধ ছিল, তাঁকে আমি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে পারিনি।’’

জন দ্য ব্যাপটিস্ট, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির তুলিতে। ছবি: উইকিপিডিয়া

পশ্চিমী বৈজ্ঞানিকদের পক্ষে কিন্তু জন্মান্তর ব্যাপারটা মেনে নেওয়া একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল৷ পূর্বজন্ম আছে— এই কথাটা আমরা যত সহজে মেনে নিই পাশ্চাত্য সংস্কৃতি তত সহজে মানতে পারে না কারণ আত্মা চিরন্তন এবং মৃত্যুর পরেও তার অস্ত্বিত্ব থাকে— এই তত্ত্ব হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম ছাড়া আর কোনও ধর্মে বলা হয়নি৷ ভারতীয় দর্শন বলে— মানবজীবনের প্রাণশক্তি হলো আত্মা এবং এই আত্মা অবিনশ্বর৷ কর্মফল ও জন্মান্তর জীবনের আধার৷ বিভিন্ন জন্মের কর্মচক্রের মধ্য দিয়ে জীব পূর্ণতার দিকে এগোয়৷ এই তত্ত্ব বোঝাতে ভগবান বুদ্ধ নিজের বিভিন্ন জন্মের অভিজ্ঞতা বলেছিলেন, যা ‘জাতকের গল্প’ নামে পরিচিত৷ 

কিন্তু ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম জন্মান্তরে বিশ্বাস করে না, সেখানে আত্মা মৃত্যুর পরে শেষ বিচারের দিনের প্রতীক্ষায় থাকে৷ অবশ্য অনেক পণ্ডিত মনে করেন, বর্তমান খ্রিস্টানদের কাছে এই জন্মান্তর পরিত্যজ্য হলেও জিশু ও তাঁর অনুগামীরা সম্ভবত জন্মান্তর মানতেন৷ জিশুর গুরু জন দ্য ব্যাপটিস্ট আগের জন্মে মহামুনি এলাইজা ছিলেন, এ রকম একটা জনশ্রুতি প্যালেস্টাইনে চালু ছিল৷ তারও আগে গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর রচনায় পরজন্মের ইঙ্গিত পাওয়া যায়৷ এসত্ত্বেও জন্মান্তর ব্যাপারটা ইউরোপ-আমেরিকায় ঠিক দানা বাঁধতে পারেনি৷ পশ্চিমী রূপকথায় আমরা দেখতে পাই দেহান্তর— যাকে বলা হয় Transmigration of soul ৷ শাপগ্রস্ত রাজপুত্র কোলাব্যাং হয়ে যায়, আর রাজকুমারী চুমু খেলে পুরোনো রূপ ফিরে পায়— এ গল্প বিশ্বের সব শিশুর জানা৷ বিলিতি রূপকথায় দুটি চরিত্র থাকবেই— জাদুকর আর ডাইনীবুড়ি ৷ এরা অসীম ক্ষমতার অধিকারী এবং সুযোগ পেলেই মানুষের অনিষ্ট করে, তাদের জন্তু-জানোয়ার বানিয়ে ফেলে৷ এই থিমেরই কিছুটা রকমফের দেখা যায় পূর্ব ইউরোপের লোককথায়, সেখানে মানুষ ইচ্ছেমতো দেহান্তরের সাহায্য নেকড়ে কি রক্তচোষা বাদুড় হয়ে মানুষের ক্ষতি করে বেড়ায় ৷ ড্রাকুলা মিথ তো বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে ৷

(ক্রমশ)

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -