SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

পুনর্জন্ম কি সত্য! কী বলছে বিজ্ঞান, কী বলছেন মনীষীরা, পর্ব ৪

নভেম্বর ১৩, ২০১৭
Share it on
পুনর্জন্মের প্রমাণ অন্বেষণে হেমেন্দ্রনাথ দাবি করেছিলেন যে, তিনি ৬৮ বার বিশ্ব পরিক্রমা করেছেন, সব দেশেই জাতিস্মর খুঁজে বার করতে পেরেছেন৷

মরণোত্তর জীবন ও প্রেততত্ত্ব নিয়ে গবেষণামুলক কাজ আমেরিকা-ইউরোপে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে শুরু হলেও জন্মান্তরবাদ একটা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় বলে স্বীকৃত হয়েছিল কয়েকজন বৈজ্ঞানিকের অসাধারণ কিছু আবিষ্কারের ফলে৷ এঁদের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় আমেরিকার ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়ান স্টিভেনসনের নাম৷ তিনি জন্মান্তর নিয়ে কাজ করেছেন চল্লিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে৷ জাতিস্মরের সন্ধানে গোটা পৃথিবী ঘুরেছেন, লিখেছেন তিনশোর মতো গবেষণাপত্র এবং চোদ্দটি বই৷ গবেষণার কাজে স্টিভেনসন ভারতবর্ষেও এসেছিলেন৷ জনৈক বিশেষজ্ঞের ভাষায়, স্টিভেনসন ছিলেন একাধারে ঐতিহাসিক, আইনজীবী ও মনস্তাত্বিক, তাই তাঁর কাজ এত নিঁখুত এবং প্রামাণ্য৷ ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর জগদ্বিখ্যাত বই ‘Twenty Cases Suggestive of Reincarnation’৷ স্টিভেনসনের লেখা পড়লে বোঝা যায়, তিনি ছিলেন অসাধারণ বাকসংযমী ৷ তাঁর লেখায় কখনোই অতিশয়োক্তি থাকতো না৷ তথ্যের বাইরে গিয়ে কোনো মতামত দিতেন না৷ তাই পরিণত বয়সে স্টিভেনসন যখন ঘোষণা করলেন— "সমস্ত তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে মনে হচ্ছে পুনর্জন্ম সত্য, মনে হয় লোকে আগেও জন্মেছে এবং মৃত্যুর পরে আবার জন্মাবে", তখনই ইউরোপ-আমেরিকায় জন্মান্তরবাদ সম্পর্কে academic চিন্তা-ভাবনা শুরু হয় এবং খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই Parapsychology বিজ্ঞানের অন্যতম একটি বিষয় রূপে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মান্যতা পায়৷

এই ব্লগের অন্যান্য পর্ব

জন্মান্তরবাদ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার সত্যিকারের স্বীকৃতির দরজা খুলে গিয়েছিল সাতের দশকের শেষ থেকে, যেদিন আমেরিকার ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, ড. স্টিভেনসনের এক ছাত্রী জন্মান্তর নিয়ে গবেষণা করার জন্য ডক্টরেট ডিগ্রি পেলেন৷ তাঁর নাম সতওয়ন্ত পসরিচা৷ আমাদের অসীম গর্বের বিষয় যে ইনি এক ভারতীয়, যিনি বিদেশে আদৃতা হয়েও তাঁর ভারতীয়ত্ব বিস্মৃত হননি৷ ড. পাসরিচা বিদেশে শিক্ষা সমাপ্ত করে আশির দশকে দেশে ফিরে বেঙ্গালুরুর নিমহ্যানসের (NIMHANS, National Institute of Mental Health And Neurosciences) সঙ্গে যুক্ত হন৷ সম্প্রতি তিনি অবসর নিয়েছেন৷

ইয়ান স্টিভেনসন, ছবি: উইকিপিডিয়া

ভারতের একান্ত নিজস্ব চিন্তা জন্মান্তরবাদের বিশ্বের প্রাঙ্গণে স্বীকৃতির মহাকাব্যে নায়িকা বলে যদি ড. সতওয়ন্ত পসরিচার নাম তুলে ধরি তা হলে একজন প্রতিনায়কের নামও করতে হয়, ঘটনাচক্রে তিনি বাঙালি৷ এবার সেই প্রসঙ্গে দু-চার কথা বলেই আজকের মতো দাঁড়ি টানব৷

পাঁচের দশকের কথা৷ আমি তখন বড় হচ্ছি, সব কিছুতে অসীম কৌতূহল, রোজ খবরের কাগজ পড়া অভ্যাস, একদিন রবিবারের বাংলা কাগজে একজনের নাম আর ছবি চোখে পড়ল৷ তিনি মানুষের পরজন্ম নিয়ে গবেষণা করছেন, নাম হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ব্যাপারটা ভালো বুঝিনি, মা ও দাদার শরণ নিলাম, তাঁরা আমার বুদ্ধির মাপ অনুযায়ী বিষয়টি সাজিয়ে দিলেন৷ কি বুঝেছিলাম মনে নেই, কিন্তু নামটা মনে গেঁথে গিয়েছিল৷ তার একটা কারণ হয়তো ভদ্রলোক বাঙালি হলেও তাঁর কাজ সব রাজস্থানে, থাকেনও জয়পুরে৷ তখন সবে অবনীন্দ্রনাথের ‘রাজকাহিনী’-র সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, রাজস্থানকে মনে হতো স্বপ্নরাজ্য৷ 

পুনর্জন্মের বিজ্ঞানভিত্তি আজও কি অন্ধকারে? ছবি: পিক্সঅ্যাবে

তার পরেও মাঝে মাঝে কাগজে হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম বেরত, বিদেশে তাঁর গবেষণা কীরকম সমাদর পাচ্ছে তার বিবরণ দিয়ে৷ পরে বুঝেছি, সেই সময় জাতিস্মরের সন্ধানে ইয়ান স্টিভেনসন ভারতে এসেছিলেন, হেমেন্দ্রনাথ হয়েছিলেন তাঁর সফরসঙ্গী৷ স্টিভেনসন তাঁকে স্বীকৃতিও দিয়েছিলেন এবং সেই সুবাদে আমেরিকার বিশিষ্ট গবেষকদের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও হয়েছিল৷ ১৯৬৩ সালে রাজস্থানের রাজ্যপাল ড. সম্পূর্ণানন্দ জয়পুরে রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্যারাসাইকোলজি বিভাগ খুলে হেমেন্দ্রনাথকে তার প্রধান নিযুক্ত করেন ৷ ভারতে এটিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে পরামনোবিদ্যা স্বীকৃত হয়েছিল৷ এর পরেই সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে হেমেন্দ্রনাথের পরিচয়৷ ‘সোনার কেল্লা’-র নির্মাণে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল, সিনেমার শেষে কৃতজ্ঞতা স্বীকারের তালিকায় তাঁর নামও আছে৷ কাহিনির প্যারাসাইকোলজিস্ট ডাঃ হাজরার চরিত্রটি তাঁর আদলে গড়া অনুমান করা যেতে পারে— দু’জনের নামের নৈকট্য— হেমেন্দ্র আর হেমাঙ্গ, চোখে পড়ার মতো৷ সাতের দশকেই হেমেন্দ্রনাথ দেশ ছেড়ে পাকাপাকিভাবে বিদেশে চলে যান৷ কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পরে তাঁর কাজ সমাদৃত হয়নি৷

হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ছবি: ইউটিউব

পুনর্জন্মের প্রমাণ অন্বেষণে হেমেন্দ্রনাথ দাবি করেছিলেন যে, তিনি ৬৮ বার বিশ্ব পরিক্রমা করেছেন, সব দেশেই জাতিস্মর খুঁজে বার করতে পেরেছেন৷ কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সে দাবি স্বীকৃতি পায়নি৷ জন্মান্তর সম্বন্ধে প্রামাণ্য গ্রন্থের লেখক হ্যান্স টেনডাম লিখেছেন— "ব্যানার্জী জনপ্রিয়তা ভালোবাসেন এবং দ্রুত লিখতে পারেন, কিন্তু তাঁর কাজ স্টিভেনসনের ধারেও আসে না৷ তাঁর পুনর্জন্ম সন্বন্ধীয় ধারণা ধর্মভিত্তিক, গবেষণাভিত্তিক নয় (Religious and not empirical)"৷ একজন গবেষণাকারীর এতবড় অসম্মান সচরাচর চোখে পড়ে না৷

এর পরে হেমেন্দ্রনাথকে নিয়ে দেশেও অনেক প্রশ্ন উঠেছিল৷ দর্শনশাস্ত্রের কৃতী ছাত্র হেমেন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়েই গতানুগতিক ছকে না হেঁটে নতুন পথ বেছে শুরু করেছিলেন জন্মান্তর নিয়ে গবেষণা৷ কিন্তু এই গবেষণা করতে উচ্চশিক্ষার সারস্বতকেন্দ্র বলে খ্যাত কলকাতা বা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে তিনি রাজস্থান কেন বেছে নিয়েছিলেন, তার কোনও সদুত্তর মেলেনি৷ পথিকৃৎ হিসাবে দেশে সাফল্য, পরিচিতি এবং খ্যাতি— সবই পেয়েছিলেন হেমেন্দ্রনাথ, কিন্তু যখন তাঁর গবেষণা বিদেশের বৈজ্ঞানিকদের আতসকাঁচের মধ্যে দিয়ে দেখা হল, তখন তাঁর তথ্যসংগ্রহের প্রক্রিয়া থেকে বিশ্লেষণের পদ্ধতি— সবকিছুতেই কেন খামতি প্রকট হয়ে উঠল? কিসের অভাবে তাঁর কাজ বৃহত্তর বিদ্বৎসমাজকে খুশি করতে পারল না? প্রশ্নবাণে বিধ্বস্ত হেমেন্দ্রনাথ কিছুদিনের মধ্যেই হেমাঙ্গ হাজরার রোলমডেল না হয়ে প্রতারক ভবানন্দে পরিণত হলেন— এ শুধু তাঁর একার নয়, আমাদের জাতীয় ট্র্যাজেডি৷ 

এই বিস্মৃত, ভাগ্যহত, বঙ্গসন্তান যিনি সম্ভবত প্রথম ভারতীয় পরামনোবিদ, সেই হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যাযের কথা দিয়ে এই লেখা শেষ করলাম৷ জন্মান্তরবাদ ও জাতিস্মর নিয়ে বহু প্রামাণ্য গবেষণা দেশে বিদেশে হয়েছে, এবং আজও হচ্ছে৷ অনুসন্ধানকারীরা অনেক চমকপ্রদ তথ্য সংগ্রহ করে জাতিস্মরবাদ সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল বাড়িয়ে চলেছেন৷ এর পরে আপনাদের সামনে নিয়ে আসবো সেই সব গবেষকদের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় থেকে কিছু মণি-মুক্তা৷

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -