SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

জন্মান্তরের আশ্চর্য কাহিনি, লিখে গিয়েছেন বিশেষজ্ঞরাই

নভেম্বর ২৮, ২০১৭
Share it on
‘‘বিষণচাঁদের কথা মতো পিলহিবিটে গিয়ে তাঁরা সত্যি পৌঁছে গেলেন তার পূর্বজন্মের বাড়িতে৷ সেখানে গিয়ে শুনলেন, সে বাড়িতে সত্যিই লক্ষ্মীনারায়ণ নামে একটি ছেলে ছিল৷ ছেলেটি জমিদারের একমাত্র সন্তান ছিল এবং অকালে মারা গিয়েছে৷’’

জন্মান্তর সম্পর্কে এর আগে আমরা দেখেছি কী ভাবে পাশ্চাত্যের বেশ কিছু গবেষক অক্লান্ত পরিশ্রম করে সংশয়ী, অবিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীদের বাধ্য করেছিলেন জন্মান্তরবাদকে মান্যতা দিতে৷ বলা বাহুল্য, এর জন্য তাঁদের ভূরি ভূরি অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয়েছিল৷ কী ধরনের তথ্য দিয়ে তাঁরা প্রমাণ করতে পেরেছিলেন জন্মান্তরবাদ এবং পূর্বজন্মের স্মৃতি শুধুমাত্র কল্পনার ফানুস নয়?  আমরা এবার সেদিকেই মন দেব৷

এই প্রসঙ্গে সবার আগে যাঁর গবেষণার কথা বলা দরকার, তিনি হলেন অধ্যাপক ইয়ান স্টিভেনসন৷ সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করতে করতে তিনি এক অত্যাশ্চর্য তত্ত্বে উপনীত হন ৷ তিনি দেখতে পেলেন— অনেক ক্ষেত্রেই শিশু অবস্থায়, বিশেষ করে তিন বছর বয়স পর্যন্ত, যখন শিশুটি সবে মাত্র কথা বলতে শেখে, তখনও তার স্মৃতিতে পূর্বজন্মের অনেক কথা মনে থাকে৷ সাত থেকে নয় বছর বয়সের মধ্যে সাধারণত এই স্মৃতি ঝাপসা হতে থাকে৷ তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা আরও জোরালো হয়ে ওঠে— এমন ঘটনাও রয়েছে৷ তিনি প্রায় দু’হাজার এ রকম স্মৃতির সংকলন করেছিলেন ৷

ইয়ান স্টিভেনসন (১৯১৮-২০০৭), ছবি: উইকিপিডিয়া

ষাটের দশকে স্টিভেনসন ভারতবর্ষে এসে জন্মান্তর সম্পর্কে গবেষণা শুরু করেন৷ শুধু উত্তর ভারত থেকেই তিনি ১০৫টি জন্মান্তরের ঘটনা নথিবদ্ধ করেন৷ দেখা যাক, ঘটনাগুলি কী রকম৷

স্টিভেনসন ভারতবর্ষে আসার আগেও কিন্তু জাতিস্মর নিয়ে এদেশের সংবাদপত্রে আলোচনা ও উৎসাহ দেখা গিয়েছিল৷ সংবাদপত্রে বের হওয়া একটি ঘটনা স্টিভেনসনকে এতটাই উৎসাহিত করেছিল যে, তিনি ভারতবর্ষে এসে ঘটনাটি সম্পর্কে বিশদভাবে খোঁজখবর নিয়ে তাঁর গবেষণার অঙ্গ হিসাবে নথীভুক্ত করেছিলেন ৷ 

ঘটনাটির শুরু ১৯২১ সালে উত্তরপ্রদেশের বেরিলি শহরে৷ বেরিলির এক গরিব কায়স্থ পরিবারে একটি শিশুর জন্ম হয়৷ বাবা মা সন্তানের নাম রাখেন বিষণ চাঁদ৷ দশ মাস বয়স হতেই বিষণ আধো আধো ভাষায় বার বার একটি শব্দ বলত— বাবার মনে হতো সে বলতে চাইছে—‘পিলহিবিট’৷ ঠিকমতো কথা বলা শুরু করতেই সে দাবি করল যে, সে আসলে পিলহিবিটের লক্ষ্মীনারায়ণ৷ তার বাবা জমিদার ছিলেন৷ সে স্কুলে হিন্দি, উর্দু ও ইংরেজী শিখেছে৷ তাদের বাড়িতে মহিলা ও পুরুষের ঢোকা-বেরনোর আলাদা দরজা ছিল৷ বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অনেক লোক এসেছিল৷ তার কাকার নাম হরনারায়ণ, এবং তার বাড়ি সবুজ রংয়ের৷ তাদের প্রতিবেশীর নাম ছিল সুন্দরলাল৷ এই সুন্দরলালের সঙ্গে তার ঘুড়ির লড়াই হতো৷ মাইকুয়া নামে তার এক কালো, বেঁটে ভৃত্য ছিল যে ভাল রান্না করতো৷ বাবার মৃত্যুর পরে তার কিছু আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে মামলা হয়েছিল৷ তার এক বান্ধবী ছিল, যার নাম পদ্মা৷ সে পদ্মাকে খুব ভালবাসত, তাই একদিন মত্ত অবস্থায় পদ্মার ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখে একজন বেরোচ্ছে আর তাই দেখে খেপে গিয়ে লোকটাকে সে খুন করেছিল৷ এর পরে তাকে গা ঢাকা দিতে হয়, তখন তার মা তার জন্য রান্না করে পাঠাতেন৷ কোনও কাজের জন্য তাকে সাহারানপুরে যেতে হয়েছিল আর সেখানেই তার মৃত্যু হয়৷ তখন তার বয়স ছিল কুড়ি বছর৷ বিষণ আবদার করতে থাকে, তাকে তার আসল বাড়ীতে নিয়ে যেতে হবে৷ ছেলের কথাবার্তা শুনে বিষণের বাড়ির লোকের তো মাথা খারাপ হবার অবস্থা! তারা ভাবল, ছোট ছেলের কথায় আমল না দিলে কিছুদিন পরে ভুলে যাবে৷ কিন্তু বিষণ যত বড় হতে লাগল, ততই তার পিলহিবিটে নিজের বাড়িতে যাওয়ার বায়নাও বাড়তে থাকে৷ তার ক্রমাগত ঘ্যানঘ্যানানিতে অতিষ্ঠ হয়ে তার অভিভাবকরা তাকে পিলহিবিটে নিয়ে যেতে বাধ্য হন৷ সেখানে গিয়ে তাঁদের আরো হতবাক হবার অবস্থা৷ বিষণ অনায়াসে তার পূর্বজন্মের বাড়ি, সুন্দরলালের বাড়ি এবং দু-একটি পরিচিত দোকানও খুঁজে বার করে দেয়৷ 

ছবি: পিক্সঅ্যাবে

বিষণচাঁদের কথা মতো পিলহিবিটে গিয়ে তাঁরা সত্যি পৌঁছে গেলেন তার পূর্বজন্মের বাড়িতে৷ সেখানে গিয়ে শুনলেন, সে বাড়িতে সত্যিই লক্ষ্মীনারায়ণ নামে একটি ছেলে ছিল৷ ছেলেটি জমিদারের একমাত্র সন্তান ছিল এবং অকালে মারা গিয়েছে৷ লক্ষ্মীনারায়ণ স্কুলের পাট চুকোবার আগেই তার পিতা ছেলের জন্য বিশাল সম্পত্তি রেখে চোখ বোজেন৷ অল্প বয়সে প্রচুর কাঁচা টাকা হাতে পেয়ে লক্ষ্মীনারায়ণ বখে যায়৷ সে লাগামছাড়া উদ্দাম জীবন কাটাতে থাকে এবং পৈতৃক সম্পত্তি অনেকটাই উড়িয়ে ফেলে৷ মাসখানেকের উদ্দামতার পরে সে কয়েক সপ্তাহ শান্ত হয়ে ঘরে বসে ধর্মচর্চা করত, কিন্তু কিছুদিন পরেই আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যেত৷ অনেক বখাটে ছেলের মতো তারও অল্পেই মাথা গরমের স্বভাব ছিল৷ পদ্মা নামে লক্ষ্মীনারায়ণের একটি পছন্দের সঙ্গিনী ছিল৷ এক সন্ধ্যায় তার এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে মেয়েটির ঘর থেকে বেরতে দেখে তার মাথায় রক্ত চড়ে যায়৷ সে সোজা পকেট থেকে পিস্তল বার করে ছেলেটিকে খুন করে৷ মাথা ঠান্ডা হবার পর সে ফেরার হয়ে অন্য শহরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়৷ সেখানেও বেপরোয়া জীবনযাপনের ফলে তার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে এবং বছরখানেকের মধ্যেই সে মারা যায়, তখন তার বয়স বত্রিশের মত৷ এই ঘটনা ঘটেছিল প্রায় একশো বছর আগে, ১৯১৮ সালে৷

দুই পরিবার বিষণচাঁদের সব কথা শুনে দেখতে পান যে বিষণচাঁদের জন্মান্তরের স্মৃতিতে মাত্র তিনটি ভুল আছে - 

১) হরনারায়ণ তার বাবার নাম ছিল, কাকার নয়৷ 

২) সাহারণপুরে লক্ষ্মীনারায়ণ গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু সেখানে তার মৃত্যু হয়নি, সে মারা গেছিল পিলহিবিটেই। 

৩) লক্ষ্মীনারায়ণের মৃত্যু কুড়ি বছরে নয়, বত্রিশ বছর বয়সে হয়েছিল ৷ 

বিষণকে যখন পিলহিবিটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তখনও তার গতজন্মের মা জীবিত৷ তাঁর সঙ্গে বিষণের বেশ ভাব হয়ে যায়৷ কিন্তু তার গত জন্মের কয়েকজন আত্মীয় যখন তাকে কিছু উপহার দিতে যায়, তখন সে মুখের ওপর বলেছিল— ‘‘সেবার তো আমার রক্তদর্শন করতে চেয়েছিলে, এখন এত ভালোবাসা কিসের?’’ গতজন্মের জ্ঞাতিবিবাদের তিক্ততা সে এক জন্ম পরেও ভুলতে পারেনি৷  

ছবি: পিক্সঅ্যাবে

সাত বছর বয়সের পর বিষণের গতজন্মের স্মৃতি আস্তে আস্তে ঝাপসা হতে থাকে৷ এই সাতটা বছর সে নিজ পরিবারে পরবাসীর মতো ছিল৷ তার চড়া মেজাজের জন্য সকলে তটস্থ হয়ে থাকত, তাকে সিল্কের কাপড় কিনে না দেওয়ার জন্য সে বাবা-মার সঙ্গে ঝগড়া করত, খাবার পছন্দ না হলে থালা টান মেরে ছুঁড়ে বলতো— ‘‘পিলহিবিটে আমার চাকরেরাও এত খারাপ খায় না৷’’ শুদ্ধ নিরামিষাশী পরিবারে জন্মালেও মাছ-মাংসের প্রতি তার আসক্তি বহু বছর ছিল৷ শৈশবে শীতকালে ব্র্যান্ডি খাওয়া তার অভ্যাস ছিল, যদিও এই আসক্তি সে আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠেছিল৷ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মেজাজও আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে যায়৷ যৌবনে বিয়ে করে সে স্বাভাবিক ভাবে সংসার করে, গত জন্মের উচ্ছৃঙ্খল স্বভাব এজন্মে তার মধ্যে ছিল না৷ কিন্তু পিলহিবিটের স্মৃতি সে পুরো ভুলতে পারেনি৷ বিষণের যখন তেইশ বছর বয়স, তখন সে পদ্মাকে খুঁজে বার করে৷ পদ্মা তখন প্রায় বৃদ্ধা, তবু তাকে আলিঙ্গন করে সে আবেগে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল৷ সেই রাত্রে বিষণ পুরোনো দিনের মতো এক বোতল মদ নিয়ে পদ্মার ঘরে গিয়েছিল কিন্তু পদ্মা বিষণকে বুঝিয়ে বলে যে, আগের সম্পর্ক আর সম্ভব নয়৷ বোঝা গেল, ‘মধুমতী’, ‘মিলন’, ‘মেহবুবা’ নিছক গালগল্প নয়, কারও কারও জীবনে গত জন্মের প্রেম থেকে যায়৷

স্টিভেনসন যতদিনে ভারতে এসেছিলেন, ততদিনে বিষণও গত হয়েছেন৷ তিনি অনেক চেষ্টা করেও লক্ষ্মীনারায়ণ আর বিষণচাঁদের কোন ফোটো জোগাড় করতে পারেননি, সুতরাং তাদের চেহারায় কোনও মিল ছিল কি না, তা বলা সম্ভব নয়৷ তবে একটি তথ্য তাঁকে অবাক করে দিয়েছিল৷ কিশোর বিষণ একবার পিলহিবিটে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল এবং তার চোখে কিছু সমস্যা দেখা গিয়েছিল৷ খবরটা জানতে পেরে লক্ষ্মীনারায়ণের মা তার জন্য এক শিশি আই-ড্রপ পাঠিয়ে দিয়ে বলেছিলেন— এটা ব্যবহার করলে লক্ষ্মী সুস্থ হয়ে উঠতো, হয়তো বিষনও উপকার পাবে৷ আর হলও তাই৷ দেহান্তর হলেও তাদের শারীরিক প্যাটার্নটা হয়তো একই ছিল, আর এ কথা সম্ভবত জন্মদাত্রী মা-ই সবচেয়ে ভাল বুঝতে পেরেছিলেন৷ 

(ক্রমশ)

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -