SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

পিছনে কার পায়ের শব্দ! কীভাবে অবিকৃত থাকে পাঁচ বছরের পুরনো মড়া

জুলাই ২৩, ২০১৮
Share it on
কলকাতা ফেরার পথে এক রাত্রি আমাদের শিলিগুড়িতে কাটাতে হয়। সে রাতে আমার স্ত্রী বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, গভীর রাতে মামির মমি এসে তাঁকে নানা বিভীষিকা দেখায়।

‘‘যাদুকরের মন্ত্র কয়, শুকনো মড়া জ্যান্ত হয়’’

উপরের ছড়াটি আমি লিখিনি, লিখেছেন হেমেন্দ্রকুমার রায়। অনেক ছোটবেলায় পড়েছিলাম, গল্পটা ভুলে গিয়েছি, কিন্তু এই লাইন দুটো বার বার আমার মাথায় ঘুরেছে ক’দিন আগে যখন সিকিম বেড়াতে গিয়েছিলাম!

কথায় বলে- তুমি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে। আমি বঙ্গ ছেড়ে  সিকিম গেলেও আমার ভৌতিক কপাল আমাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি, তার প্রমাণ দ্বিতীয় রাতেই পাওয়া গেল। আমরা গিয়েছিলাম দক্ষিণ সিকিমের টেমিতে। এখানকার চায়ের সুনাম আছে, আমরা উঠেওছিলাম চা বাগানের মধ্যে একটি রিসর্টে। ছবির মতো জায়গা, ঘর থেকে বেরোলেই কাঞ্চনজঙ্ঘা স্বাগত জানান, অবশ্য আকাশে মেঘ না থাকলেই সেটা সম্ভব।

রিসর্টে ঢুকেই একটা ভাল আয়তনের বসার জায়গা, যাকে বলে লাউঞ্জ। তার শেষ প্রান্তে খাবার ঘর আর ওয়াশরুম। দশটা নাগাদ রাতের খাওয়া শেষ করে আমরা লাউঞ্জে জড়ো হলাম, খাবার টেবিলের গল্প শেষ করতে। আমি ভাবলাম কথা শুরু হওয়ার আগে হাত-মুখ ধুয়ে নিই। আমি ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই ঠিক পিছনে পায়ের শব্দ শুনলাম। আমি ফিরে তাকাইনি, কেন না অলিখিত বিধি হল—  আমার পায়ের কিছু সমস্যা রয়েছে বলে নতুন জায়গায় গেলেই কোনও বন্ধু আমার পিছন পিছন চলেন দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য। খাবার ঘর থেকে ওয়াশরুম পৌঁছতে দশ-বারো পা হাঁটতে হয়, আমি গোটা দূরত্বটা পায়ের শব্দ শুনতে শুনতে ওয়াশরুমে ঢুকতেই দেওয়ালজোড়া আয়নায় দেখলাম আমার পিছনে কেউ নেই। একটু চমকে হাত না ধুয়েই বেরিয়ে দেখলাম বন্ধুরা লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, তাঁরা কেউ আমার পিছু নেননি। কিন্তু যে পায়ের শব্দ আমি পরিষ্কার শুনেছি, সেই পায়ের মালিক কোথায় গেলেন? আলো-ঝলমলে লাউঞ্জে, গা ঢাকা দেওয়ার কোনও জায়গা নেই। 

আমরা সকলে পরের দিনের ঘোরাঘুরি, গাড়ি বুকিং এই সব পাকা করছি, এমন সময়ে পটকা ফাটার মতো একটা শব্দ করে লাউঞ্জের সব আলো নিবে গেল। কোনওমতে দু’একটা সোলার লাইট চালু করে  অবস্থা সামলানোর চেষ্টা করা হল, কিন্তু ততক্ষণে আমাদের মুড অফ হয়ে গিয়েছে। আড্ডায় দাঁড়ি টেনে আমরা যে যার বিছানায় ঢুকে পড়লাম।

পাহাড়ে বা জঙ্গলে বিদ্যুতের সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হতেই পারে, এ নিয়ে চিন্তা করার মানে হয় না। কিন্তু সেদিন দুপুরের ঘটনাগুলো মনে একটা কালো ছায়া ফেলেছিল বলে অস্বস্তিটা যাচ্ছিল না। আমরা গিয়েছিলাম টেমি থেকে রাবাংলা, ওখানকার বুদ্ধ পার্ক ও অন্যান্য দ্রষ্টব্য জায়গা দেখতে। রিসর্ট থেকেই গাড়ি ও ড্রাইভার ঠিক করে দিয়েছিল। ড্রাইভারটি মাঝবয়সি, বেশ চালাক চতুর মনে হল, নাম শেরপা। গাড়ি ছাড়ার পর দেখলাম, সে অবিরাম কথা বলে নেপালি, হিন্দি ও স্থানীয় উপভাষার মিশ্রণে। যে কারণে আমরা তার কথা পুরো বুঝিনি, মোটামুটি সারমর্ম ধরে নিচ্ছিলাম। এটাও বুঝলাম যে সে স্বীকার না করলেও বাংলা ভালই বোঝে। ঘণ্টাখানেক পথ চলার পর সে হঠাৎ বলল, সামনেই তার গ্রাম। সেখানকার মঠে এক অতি শক্তিশালী রিম্পোচে বাস করেন, তাঁকে দর্শন করলে আমাদের ভাল হবে। তিব্বতে গুরুস্থানীয় লামাদের ‘রিম্পোচে’ বলা হয়, সেটা জানতাম। কিন্তু সেই মুহূর্তে গুরুদর্শনের বিশেষ স্পৃহা  ছিল না। আমরা বলে দিলাম, এখন যেখানে যাবার জন্য বেরিয়েছি, সেগুলো আগে সেরে নিই। ফেরার সময় গুরুকে প্রণাম করে গেলেই হবে। শেরপা আমাদের কথায় খুব খুশি হল না, কিন্তু আমাদের যুক্তি অস্বীকার করতেও পারল না।


গুরু পদ্মসম্ভবের মূর্তি। সিকিম। ছবি: শাটারস্টক

আমরা বুদ্ধ পার্ক দেখে যখন বেরোলাম, তখন একটা বাজে। আমরা দুপুরের খাওয়ার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু ভবি ওয়াজ নট ফরগেটিং, শেরপা আবদার করল, আমাদের তার মঠে যেতেই হবে, তাতে আমাদেরই ভাল হবে। তার পর সে কিছু অদ্ভুত কথা বলল, যা আমরা ঠিক বুঝলাম না। মনে হল সে বলছে, পাঁচ বছর হল মারা গিয়েছে তবুও এখনও বেঁচে— এইসব। সে গাড়ি থামাল এক জায়গায়, যেখানে অনেকগুলো খাড়া সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে, উপরে উঠলেই মঠ। আমি বললাম, অসম্ভব, এই সিঁড়িতে উঠতে গেলে আমাকে এখানেই দেহ রাখতে হবে। বাকিরাও আপত্তি জানালেন। শেরপা একটু চিন্তা করে বলল, আচ্ছা, আর একটা রাস্তা আছে। একটু ঘুরতে হবে, কিন্তু হাঁটতে হবে না। বলে সে গাড়ি ঘোরাল।

যে রাস্তা দিয়ে সে আমাদের নিয়ে চলল, তাকে পথ বললে বাড়তি সম্মান দেওয়া হবে, ছাগল চরার গলি বললেই ভাল হয়। প্রতি মুহূর্তে ভাবছিলাম গাড়িটা উলটোবে না তো! যাই হোক, একটু পরে গাড়ি থামলো একটা খালি জমিতে, বুঝলাম মঠে এসে গিয়েছি। নেমে দেখলাম, মঠ না বলে বসতবাড়িই বলা উচিত। দুটো ছোট একতলা বাড়ি আর দু’তিনজন লোক। ও পাশের খোলা জায়গায় রান্না হচ্ছে, সেখানে কয়েক জন মহিলা দাঁড়িয়ে... সম্পূর্ণ পারিবারিক ছবি, আধ্যাত্মিক কিছু চোখে পড়ল না। বাড়ির সামনে একটা লাল টুকটুকে টাটা সুমো দাঁড়িয়ে।

শেরপা এর মধ্যে কাজে লেগে গিয়েছে। সে লোকগুলির সঙ্গে কথা বলে জানাল, রিম্পোচে আমাদের দর্শন দেবেন, তবে প্রথামাফিক আমাদের কিছু নজরানা দিতে হবে। একটা সিল্কের স্কার্ফে দুটি একশো টাকার নোট মুড়ে আমরা তৈরি হলাম। 

আমাদের ভিতরের ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। খুব বড় না হলেও বেশ আরামের ঘর, মেঝে জোড়া কার্পেট, তাতে লাল, কালো, বাদামি অনেক রং। কোণে একটা চেয়ারে রিম্পোচে বসে, লামাদের মেরুন কাপড় পরা, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, মজবুত দোহারা গড়ন, চোখে বুদ্ধির ছাপ।  আমি আর আমার স্ত্রী হাত তুলে নমস্কার করলাম, আমাদের ভক্তিমতী বান্ধবী আর তাঁর পরিবার গড় হয়ে প্রণাম করলেন। রিম্পোচে আমাদের হাতে আশীর্বাদী ব্ল্যাক ফরেস্ট পেস্ট্রি তুলে দিলেন। এই সময় যা ঘটল, তাতে আমি একটু চমকালাম। রিম্পোচে তাঁর এক চেলাকে ডেকে আমাদের বান্ধবীকে দেখিয়ে বললেন, ওঁর গোড়ালিতে একটা জোঁক উঠে পড়েছে, ওটাকে তুলে বাইরে ফেলে দাও।

আমরা বাইরে জুতো খুলে এসেছিলাম, কিন্তু পায়ে মোজা ছিল। গোড়ালি অর্থাৎ পায়ের পিছনে লাগা জোঁককে সামনে থেকে দেখতে পাওয়া অসম্ভব, বিশেষ করে ওই রংচঙে কার্পেটের উপরে। কিন্তু উনি কথাটা এত সহজ ভাবে বললেন যে, কিছু অস্বাভাবিক মনেই হল না। তার পর উনি বললেন, আমি খুব দুঃখিত আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না, আমাকে এখনই বেরোতে হবে। আপনারা সব ঘুরে দেখুন, বিশেষ করে মামিকে দেখতে ভুলবেন না—  বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।


জপযন্ত্র, সিকিম। ছবি: শাটারস্টক

আরও ধাঁধা লেগে গেল। মামি মানে মা, না মামার স্ত্রী, না মিশরের ফ্যারাও— কিছুই বুঝলাম না। বাইরে আসতে এক বৃদ্ধ লামা, এক নবীন চেলা আর শেরপা আমাদের আলোকপ্রাপ্তির ভার নিলেন। তাঁদের বক্তব্য হল, রিম্পোচের মা উচ্চবর্গের সাধিকা ছিলেন। বছর পাঁচেক হল তিনি গতায়ু। কিন্তু তিনি নির্দেশ দিয়ে যান, তাঁর কোনও দাহসংস্কার হবে না, তাঁর দেহ ওই ভাবেই রাখতে হবে। সকলে দাবি করলেন যে, এত বছর, কোনও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ছাড়াই দেহটি অবিকৃত থাকার কথা নয়। তা ছাড়া, তাঁর বারণ সত্ত্বেও কেউ একজন তাঁর দেহের ফোটো তুলেছিল। সে ছবিতে দেখা গেল আরও দু’টি হাত যোগ হয়েছে এবং হাত দু’টি রয়েছে মঞ্জুশ্রী মুদ্রায়। তাঁরা সে ছবি আমাদের দেখালেন। তাঁরা যেমন বলেছিলেন, ব্যাপারটা তেমনই, কিন্তু আজকাল কম্পিউটারে এত কিছু করা সম্ভব যে, এ নিয়ে আমার মতো আনাড়ির কিছু না বলাই ভাল।

অন্য যে একতলা বাড়ির কথা বলেছিলাম, সেটি এই মা-কাম-মমির মন্দির। সেখানে তিনি দেবীর মতো অধিষ্ঠিতা, তাঁর মাথায় মুকুট, হাত দু’টি যোগমুদ্রায় রাখা। কিন্তু তাকে ঠিক স্বাভাবিক লাগে না, শরীরে একটা শুকনো কালচে ছাপ। আমি লেনিন, মাও ও হো চি মিনের সংরক্ষিত শরীর দেখেছি, তার স্বাভাবিকত্বের সঙ্গে এর কোনও তুলনা চলে না। তিনি যে নিয়মিত পূজিতা হয়ে থাকেন, তার প্রমাণ চারদিকে ছড়ানো। নানা রকম তান্ত্রিক যন্ত্রের উপস্থিতি দেখে মনে হয়, ওই শরীরকে হয়তো বজ্রযান মতে কোনও গুহ্য ক্রিয়ার জন্যও ব্যবহার করা হয়। সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা খুব প্রীতিপ্রদ হল না।

কিন্তু আমাদের ভিআইপি সুলভ খাতির করে এই দৃশ্য দেখানোর কারণ কী হতে পারে? রিম্পোচের চেলার কাছ থেকে একটি সাব-প্লটের হদিশ পেলাম। শেষ কারমাপার মৃত্যুর পরে সিকিমের বিখ্যাত রুমটেক সঙ্ঘারাম এখনও অধ্যক্ষহীন, কয়েক জন প্রার্থী মাঠে নেমে পড়েছেন। আমাদের রিম্পোচে তাঁদের অন্যতম, কিন্তু দলাই লামার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভাল নয় বলে তিনি বিশেষ সুবিধা করতে পারছেন না। আমাদের কথা শুনে চালক শেরপার ধারণা হয়েছে আমরা প্রভাবশালী, তাই সে আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে, আমরা একটু জোর খাটালে রিম্পোচের কপালে শিকে ছিঁড়ে যেতে পারে। আমারই কপাল, চাণক্যপণ্ডিত সাধে বলে গিয়েছেন— অফিসারং শতধৌতেন আমলাত্বং ন মুঞ্চতে! কুর্তা পাজামা পরা গরিব ব্রাহ্মণকে এরা প্রভাবশালী ঠাউরে নিল।


রহস্যময় সিকিম। ছবি: শাটারস্টক

আমরা যখন মঠ থেকে বেরিয়েছি, রিম্পোচের লাল গাড়ি তখনও দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ তিনি ঘরেই রয়েছেন। বর্ষার আগে রাস্তা সারানোর কাজ চলছে বলে ট্রাফিক একটু শ্লথ। কুড়ি-পঁচিশ মিনিট পরে আমরা একটা মোড়ে পৌঁছলাম। রাস্তা যেখানে দু’ভাগ হয়ে গিয়েছে, একটা নীচে টেমির দিকে, অন্যটা উপরে গ্যাংটক যাবে। আমরা মোড়ে এসেই দেখলাম, ঠিক পিছনেই রিম্পোচের গাড়ি। তিনি একটু মৃদু হেসে গ্যাংটকের দিকে চলে গেলেন। আমি শেরপাকে বললাম, উনি আমাদের পরে বেরিয়ে আমাদের ধরে ফেললেন কী করে, সে একটু হেসে বলল— উনি এ রকম প্রায়ই করে থাকেন।
 
এ গল্প এখানেই শেষ, কিন্তু কয়েকটি বাড়তি তথ্য পাঠককে জানিয়ে দিই—

পরের দিন আমরা সিকিম ছেড়ে কালিম্পঙের একটি ছোট গ্রামে চলে এলাম। গুগল ম্যাপের পরিষ্কার পথনির্দেশ তাকে বুঝিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও শেরপা ভুল রাস্তা ধরে আমাদের আড়াই ঘণ্টার পথ ছয় ঘণ্টায় নিয়ে এল। সারা রাস্তা সে আমাদের শোনাল, জায়গা ভাল নয়, আমাদের খুব কষ্ট হবে ইত্যাদি। তার মনস্তত্ত্ব আমি আজও বুঝিনি।

কলকাতা ফেরার পথে এক রাত্রি আমাদের শিলিগুড়িতে কাটাতে হয়। সে রাতে আমার স্ত্রী বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, গভীর রাতে মামির মমি এসে তাঁকে নানা বিভীষিকা দেখায়। সেসব কথা সবিস্তারে বললে যুক্তিবাদীরা ‘স্বপ্নো নু, মায়ানু, মতিভ্রমো নু’ বলে আমাকে তাড়া করবেন। 
 
এই ক’দিন আমার বার বার মনে হয়েছে, সিকিমের চোখ-জুড়োনো অরণ্যের শ্যামলিমার গভীর গহনে এক আদিম ভয় কোথায় যেন লুকিয়ে রয়েছে। এর রহস্য হয়তো কোনওদিনই আমরা জানতে পারব না।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -