SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

বায়োপিকের ‘সঞ্জু’ ঠিক কতটা সঞ্জয়! কোন চালে বেরতে চাইলেন হিরানি

জুলাই ১৪, ২০১৮
Share it on
ছবির এন্ড স্ক্রোল-এর যে আইটেম নাম্বারটায় ,রনবীর ‘সঞ্জু’ কাপুরের সঙ্গে আসলি সঞ্জয় দত্তও হাজির, সেখানে সঞ্জয় মিডিয়াকে ‘ওয়াট লাগানো’-র একটা অশ্লীল ভঙ্গি প্রায় করে ফেলেছিলেন।

বলিউডের নাম যদি এখন ‘বায়োউড’ বা ‘বায়োপিকিস্তান’ দিয়ে দেওয়া যায়, খুব একটা বোধ হয় আপত্তি উঠবে না। সেই অনেক বছর আগে কে একজন বলেছিলেন না, সেক্স আর শাহরুখ খান ছাড়া বলিউডে অন্য কিছু বিকোয় না। এবার কিন্তু কোট্-টা একটু রিভাইজ করার সময় এসে গিয়েছে মামু! এখন সেক্স যদি বা বিকোয়, শাহরুখ একেবারেই নয়। বরং সলমন-ব্র্যান্ডের বাজার রয়েছে-আর নিশ্চয়ই বায়োপিকেরও। নইলে এত কিসিমের জীবনী-সিনেমা বাজারে আসছে কেন? গত কয়েক বছরে মুম্বাইয়া সিনেমার লিস্টিতে একবার চোখ বোলান।কত রকমের জীবন নিয়েই না বায়োপিক বানানো হয়েছে। তাদের কেউ সেলিব্রেটি, তো কেউ নন্-এনটিটি। কেউ চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট থেকে ডাকাত, তো কেউ ওয়াগন ব্রেকার থেকে স্টার-অ্যাথলেট।বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মেয়ে-বক্সার,বিশ্বকাপ জেতা ছেলে-ক্রিকেটার, সুপারস্টার ইমপস্টার, দুনিয়া কাঁপানো টেররিস্ট, দক্ষিণী পর্নস্টার,সমকামী প্রোফেসর—তালিকা ফুরবেই না।

আগেকার বলিউডে কখনও-সখনও এক-আধটা ‘ফুলনদেবী’, হঠাৎ একটা ‘সর্দার’-এর মতো ছবি হয়ে যেত। তা-ও ডাকুরানি বা বল্লভভাইকে নিয়ে সেসব ছবি বলিউডের মেইনস্ট্রিমে পেঁয়াজি করতে যেত না। আর্ট বা প্যারালাল সিনেমার খোপটায় চুপটি করে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকত। এক বার একবছরে পাঁচ-পাঁচটা ভগৎ সিং পর পর রিলিজ হয়ে, সবক’টাই ফ্লপ করেছিল। অথচ ‘সঞ্জু’ দেখুন, প্রথম দিনের কালেকশনে নাকি ‘বাহুবলী-টু’কেও টপকে দিয়েছে। তিনদিনেই নাকি বিধু চোপড়া-রাজু হিরানিদের ক্যাশবাক্সে ১৮৬ কোটি টাকা ঢুকে গিয়েছে!আর সাত দিনে সেটা বেড়ে ২৮০ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। ভাবা যায়! বক্স অফিসের অমন যে লাকি-ম্যাসকট সলমন খান, গ্রিক পুরাণের রাজা মিডাসের মতো তিনি নাকি যা ছোঁবেন তাই সোনা, তাঁর সেই ‘রেস-থ্রি’ও ‘সঞ্জু’র সঙ্গে রেসে হেরে ট্র্যাকের ধারে খোঁড়াচ্ছে। তা হলে সঞ্জুবাবার মহিমাটা একবার বুঝুন। তবে ‘গুরু’র আগেই ‘চেলা’র প্রসঙ্গটা যখন এসেই পড়ল তখন সে কথাটাই আগে হোক। ‘সল্লু মিঁয়া’ মানে আমাদের সলমন ভাই বায়োপিকের এই হাই বাজারেও একটুও ‘জীবন-মুখী’ নন।। মানে তিনি নিজেও জীবনী-ছবির অফার নেবেন না, অন্য কেউ করলেও তাঁর সহ্য হবে না।যেমন আমরা সবাই জানি ছটা-আটটা প্যাক-ফ্যাশনের আগের জমানায় জিম-জমাট, মাসল ভরাট শরীর বানানোর সাধনায় সঞ্জয় দত্তই ছিলেন সলমনের আইডল। ছ-মাস অন্তর বান্ধবী পাল্টানোর নেশাতেও সঞ্জুই সল্লুর মেন্টর কি না, সেটা অবশ্য কেউ বলেনি।তবে সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক ব্যাপারটা সলমনের ঠিক হজম নেহি হুয়া। বিশেষ করে, সঞ্জুর ভূমিকায় রনবীর কপূর, এটা তো তিনি একদম মানতে পারছেন না। তাই ‘সঞ্জু’-র ট্রেলার লঞ্চ-এর পর পাবলিক যখন রনবীরের ‘লুক’ দেখে ফিদা, সলমন বলে দিলেন— ধুর্,কিচ্ছু ঠিকঠাক নেই। সঞ্জুর ভূমিকায় স্বয়ং সঞ্জয় দত্তকেই কাস্ট করা উচিত ছিল।


‘রুস্তম’ (২০১৬), ছবি: ইউটিউব

লাও ঠ্যালা! হলিউডে যখন ‘আলি’ ছবিটা হল,তখন মহম্মদ আলির ভূমিকায় তাঁকে না নিয়ে উইল স্মিথকে কেন নেওয়া হল, এমন প্রশ্ন কেসিয়াস ক্লে উর্ফ মহম্মদ আলিও তোলেননি। অথচ তাঁর মতো দেমাকি, নার্সিসিস্ট লোক হয় না। আজীবন ‘আয়াম দ্য গ্রেটেস্ট’ বলে ছাতি থাবড়ে এসেছেন। সত্যি বলতে, সলমনের ফর্মুলা-মাফিক বায়োপিক বানানো বেশ ঝামেলার। মিলখা সিংহকে দাড়ি চুলে কলপ করে, জিম-ফিমে ঝাঁপিয়ে নিজের ভূমিকায় ভাগদৌড় করতে হত। ফারহান আখতারের এত কষ্ট করে বানানো ‘বডি’ বৃথা যেত। সুশান্ত সিংহ রাজপুতের বদলে খোদ মহেন্দ্র সিং ধোনিকেই নিজের বায়োপিকে অ্যাকটর হতে হলে অন্তত বেশ কয়েকটা ওয়ান-ডে, টি-টোয়েন্টি সিরিজ-টুর্নামেন্ট ছেড়ে দিতে হত। তাও এ তো গেল জ্যান্ত লোকেদের কথা। যাঁরা ধরাধামেই নেই, তাঁদের জীবনীচিত্র বানাতে কি স্টুডিও-ফ্লোরে তেপায়া টেবিল লাগিয়ে, প্ল্যানচেটের আসর বসিয়ে,আত্মা নামাবেন? ‘হরর’ আর ‘বায়োপিক’ এক প্যাকেজে একাকার! বিনোদনের ডবল ধামাকা— রোমাঞ্চের রোমহর্ষক ‘কম্বো’-অফার!

যাই হোক, সলমনের কথা বলিউডে কেউই সিরিয়াসলি নেয় না, আমরাও নিলাম না। তবে ১০০ কোটি টাকার ক্লাবে সল্লুকে যিনি আজকাল নিয়মিত টেনশন দিচ্ছেন, সেই অক্ষয় কুমারের কিন্তু বায়োপিক-এ কোনও অ্যালার্জি নেই। তিনি এর আগে যে ‘রুস্তম’ বা ‘প্যাডম্যান’ করেছেন, সেগুলোকে অনেকটা ফিকশন্-এর পুর ঠাসা সিকি বা আধা বায়োপিকই বলা যায়। সেসব দিয়ে নেট প্র্যাকটিস সেরে এই বার তিনি পুরোদস্তুর বায়োপিক-এ। তাঁর নতুন ছবি ‘গোল্ড’-এ অক্ষয় ১৯৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিক-এ ভারতীয় হকি টিম-এর ক্যাপ্টেন বলবীর সিংহ ‘বাবু’। স্বাধীনতার পরে ভারতীয় হকির প্রথম সোনালি সাফল্যের নায়ককে নিয়ে ছবিটা মুক্তি পাচ্ছে ১৫ই আগস্টের মুখে-মুখেই। বোঝাই যাচ্ছে, ছবিটায় বলবীরের জীবনযুদ্ধের রিয়্যালিটির পাশেপাশেই দেশভক্তির গনগনে আবেগ ভরপুর থাকবে।

মিলখা সিংহের বায়োপিক ‘ভাগ মিলখা ভাগ’-এও, পশ্চিম-পঞ্জাব থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মিলখাকে ভয়ঙ্কর রকম অ্যান্টি-পাকিস্তান হিসেবে দেখানো হয়েছে। গুলি-বন্দুক নিয়ে যুদ্ধের বদলে তিনি তাঁর পুরো এনার্জি তখনকার চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানি অ্যাথলিটকে হারাতেই খরচ করে ফেলেন। স্রেফ পাকিস্তানকে ঠেস দেওয়ার প্রবল উত্তেজনায় ১৯৬০-এর রোম অলিম্পিকে একটুর জন্যে পদক হারানোর অমর ট্র্যাজেডির চেয়েও, নেহাত আমন্ত্রনমূলক দক্ষিণ এশীয় একটা আটপৌরে অ্যাথলেটিক্স মিট্-ই ছবির ফোকাল পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। তবে ‘ভাগ মিলখা ভাগ’-ই মোটামুটি বলিউডকে হাতে ধরে শিখিয়ে দিয়েছিল বক্স অফিসে উতরোনোর জন্যে বায়োপিকে কী কী ‘পুরকি’ বা ভেজাল মেশাতে হয়।


‘ভাগ মিলখা ভাগ’, ছবি: ইউটিউব

সিনেমার ‘মিলখা’, বাইসেপ-ট্রাইসেপ, বাঁদিক ডানদিক মিলিয়ে প্রায় ডজন খানেক প্যাক-ফ্যাকে ঢেউ তুলে পুশ্-আপ করছেন। আর তাঁর পিঠের উপরে ফিনফিনে মোলায়েম রেশমি কাপড়ের মতো ঝুলে আছেন এক বিদেশিনী। অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপ— কোথাও এমন ‘রমনীয়’ অভিজ্ঞতা মিলখার জীবনে কখনও ঘটেনি। কিন্তু সিনেমার খাতিরে তিনি আপত্তি তোলেননি। সেখানে ‘সঞ্জু’বা সঞ্জয় দত্তের জীবনটাই তো সিনেমার মতো। সেখানে বানানো মশলা আমদানি করার দরকারই পড়ে না। তা ছাড়া সঞ্জুই প্রথম বলিউডের কোনও অভিনেতার যাকে বলে ‘অথরাজইজড’ বায়োপিক। এর আগেও বলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সিনেমার চরিত্র হয়ে এসেছেন। কিন্তু সেসব ফিলম উইদিন ফিলম— নায়ক-নায়িকারা কেউ পারভিন বাবির মতো, কেউ বা ওয়াহিদা রহমান-গুরু দত্তের ছায়া অবলম্বিত।

রাজু হিরানি সেখানে সঞ্জয় দত্তের আস্ত রক্ত-মাংসের জীবনই নাড়াঘাঁটা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সঞ্জুবাবার সত্যিকারের জীবনটাকে একটা টিপিক্যাল ‘রাজকুমার হিরানি ফিলম’ বানিয়ে দিলেন। সেটা কখনও ‘মুন্নাভাই এম.বি.বি.এস’, কখনও ‘লাগে রহ মুন্নাভাই’, কোনও সময়ে বা ‘থ্রি ইডিয়টস’। রাজু হিরানির ছবির যা যা প্রবণতা, যেমন মেলোড্রামা সেন্টিমেন্টে ডুবিয়ে ভিজিয়ে, চিত্রনাট্যকে একেবারে মুখে দিলে গলে যায় এমন তুলতুলে নরম বানিয়ে রাখা— স্মার্ট, মাঝারি, কখনও বা স্রেফ চ্যাংড়া-স্ল্যাপস্টিক গোছের রয়েছে।

অথচ শাসন আর আদরের ‘কেমিক্যাল লুচা’ বা ভারসাম্যের এদিকে ওদিকে ‘বিগড়ে হুয়ে’, আহ্লাদি, অভিমানী, ‘মামাজ্ বয়’, ৫৯ বছরেও যাঁর মনের বয়স কখ্‌খনো টিন-এজ পেরোয় না, এমন একজন রংদার-মেজাজি, মাচো-নায়ককে নিয়ে কী ভীষণ অন্যরকম একটা বায়োপিক হতে পারত। কিন্তু রাজু হিরানি সঞ্জয় দত্তকে পর্দার টপোরি ‘মুন্নাভাই’য়ের বাইরে ভাবতেই পারলেন না। রাজুর সব ছবিতেই একটা ইস্যু লাগে।এখানে ইস্যু হল— সঞ্জয় বনাম সর্বভারতীয় মিডিয়া। ছবির এন্ড স্ক্রোল-এর যে আইটেম নাম্বারটায় ,রনবীর ‘সঞ্জু’ কাপুরের সঙ্গে আসলি সঞ্জয় দত্তও হাজির, সেখানে সঞ্জয় মিডিয়াকে ‘ওয়াট লাগানো’-র একটা অশ্লীল ভঙ্গি প্রায় করে ফেলেছিলেন। রিল-এর সঞ্জু রনবীর যেন তাঁকে সামলে সুমলে টেনে নিয়ে গেলেন।পর্দাতেও তো তিনি ‘রিল আর রিয়্যাল’ মাখামাখি করা সঞ্জুকে ওভাবেই সামলেছেন।পর্দার সঞ্জয় যেমন রনবীর সেটাকেই চিত্রনাট্যের বাস্তব-এ ট্রান্সক্রিয়েট করেছেন।


‘সঞ্জু’ (২০১৮), ছবি: ইউটিউব

সে কাজটায় তিনি একশোভাগ সফল।তাই ছবিটাও সুপারহিট। কিন্তু একই সঙ্গে ‘সঞ্জু’ বলিউডি বায়োপিক-এর ঘরানায় একটা বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি করে দিল। ছবিতে সঞ্জুর বন্ধু কমলির ভাষায় বলা যায়— রাজু এখানে তাঁর ‘সাবজেক্ট’-এর সঙ্গে ‘ঘপাঘপ’, মানে সেক্স করলেন। কিন্তু ভালবাসলেন না। এবং সঞ্জয়ের জীবন থেকে বাদ দিতে দিতে সড়ক-সাজন-বাস্তব-এর সাফল্য, প্রথম দুই স্ত্রী, মেয়েদের, এমনকী মাধুরী দীক্ষিতকেও ছেঁটে ফেললেন! খলনায়ক-এর ইমেজে হোয়াইট ওয়াশ ছাড়া তা হলে আর রইল কী?

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -