SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

সেই দেখা হল, কিন্তু...

ডিসেম্বর ১৪, ২০১৫
Share it on
সেই রেলগাড়ি গাঁদাফুলের মালায় সাজানো। লোকজন হইহই করে উঠল। ঠাকুমা আমার দুই বগলের নীচে হাত দিয়ে ধরে উঁচু করে তুলে ধরলেন— ‘‘ও মনু, দ্যাখতে পাইতাসো? দ্যাখছো?’’

আমার বাল্যস্মৃতি, নাকি তা শৈশবস্মৃতি, চলচ্চিত্রের মতো। মনে পড়লে অনেকটাই চলতে শুরু করে দেয়। স্পষ্ট এবং তা ধাবমান। শৈশবে চোখে কাজল টেনে লাল জুতোটি পায়ে পরিয়ে একটি পথ হাঁটি-হাঁটি-পা-পা করিয়ে, অনেকটা পথ কোলে তুলে ঠাকুমা রোজ বিকেলে আমাকে স্টেশনে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। কেবল আমার ছোট পিসিকে আমার মনে নেই। আমার যখন দু’বছর বয়স, বিবাহের বছরকাল পরেই তিনি সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। তৎকালে প্রসূতির মৃত্যু নাকি প্রায়শই ঘটত। ওই মৃত্যুতে আমাদের পরিবার এত শোকাহত হয় যে, সেই পিসির কোনও ছবি আমাদের বাড়িতে নেই। হতে পারে এই কারণেই ছোট পিসিকে আমাকে মনে নেই।

শ্রীরামপুর স্টেশন

ঠাকুমা আমাকে রোজ বিকেলে যেমন বেড়াতে নিয়ে গেছেন, তেমনি সে দিনও নিয়ে গেছেন। মনে পড়ে স্টেশন এলাকা সে দিন ছিল জমজমাট। ভিড়ে আমার ভয় করছিল, তা-ও মনে পড়ছে, এই এখন। তখনই একটা ট্রেন এল, সে সময়ে বলতাম রেলগাড়ি, সেই রেলগাড়ি গাঁদাফুলের মালায় সাজানো। লোকজন হইহই করে উঠল। ঠাকুমা আমার দুই বগলের নীচে হাত দিয়ে ধরে উঁচু করে তুলে ধরলেন— ‘‘ও মনু, দ্যাখতে পাইতাসো? দ্যাখছো?’’

আমি দেখতে পেলাম, ফুলে ফুলে সাজানো একটা কামরায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে টুকটুকে ফরসা একটা লোক ধবধবে সাদা পোশাক, মাথায় সাদা টুপি, হাসি হাসি মুখে হাত নাড়ছে। তার বুকের বোতামে একটা লাল গোলাপ ফুল। দেখতে দেখতে আমাকে কোলে নিয়ে ঠাকুমা নিজে দেখার জন্য একটা বেঞ্চের উপর জনতাকে ঠেলেঠুলে উঁচু হয়ে দাঁড়ালেন। ধীরে ধীরে সে ট্রেন চলে গেল। হালকা হতে লাগল স্টেশনের ভিড়। ঠাকুমা আমাকে বললেন, ‘‘দ্যাখতে পাইসো তো জহরলাল?’’ ওই আমি প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে দেখলাম।

তারকেশ্বর ব্রাঞ্চ লাইনে বৈদ্যুতিকরণের ট্রেন উদ্বোধন করতে এসেছিলেন, সে পরে জেনেছি। তখন আমার চার বছর বয়স। এর কয়েক মাসের ভিতর আমার দু-তিন জন সমবয়সি বন্ধু এবং বান্ধবীও হল। বিকেল হলেই আমরা স্টেশনের দিকে বেড়াতে যেতাম। আমাদের শ্রীরামপুর স্টেশনটি অতীতে ছিল জিটি রোডের লাগোয়া। সে স্টেশন চালু অবস্থায় আমি অবশ্য দেখিনি। লোকে সেই স্টেশনের নাম তৎকালে দিয়েছিল ‘পুরনো স্টেশন’। সেখানে টিকিট কাউন্টার ভবন, রেল কর্মচারীদের আবাসন, মালখানা গুদাম এ সব ছিল। এখনও সে সবের জীর্ণ অবশেষগুলি আছে। ওই পুরনো স্টেশনের ওভার ব্রিজটি ছিল জিটি রোডের লাগোয়া। পরিত্যক্ত স্টেশনের ওভার ব্রিজটি ছিল আমাদের এবং আমাদের মতো অনেক ছেলেপিলের বেড়ানোর স্থল।

পুরনো স্টেশনটিতে যেতে হতো শহরের কেন্দ্রস্থলের নতুন স্টেশনটি পার হয়ে, যে নতুন স্টেশনটিতে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে দেখেছিলাম। যেতাম পুরনো স্টেশন। বিকেলবেলা পুরনো স্টেশনের ওভার ব্রিজ থেকে নজর রাখতাম আমি এবং অনেকে, যারা ছেলেপিলে, বিকেলবেলায় গাঁদাফুলের মালায় জড়ানো আর কোনও রেলগাড়ি আসে কি না।

সে সময়ে মাঝেমধ্যেই রটে যেত, নেতাজি ফিরে আসবেন। পূর্ণচন্দ্র বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে গিয়েছি তখন। দেওয়ালে দেওয়ালে কারা যেন লিখে দিত— ‘নেতাজি আসছেন’। আমি ও আমার বন্ধুরা, তপনকুমার দত্ত, মণিমালা বন্দ্যোপাধ্যায়, আমরা ভাবতাম ফুলে ফুলে ঢাকা ট্রেন থেকে সুভাষচন্দ্র হাত নাড়বেন। সে সময়ে একবার কল্যাণীর মাঠে ২৩ জানুয়ারি জন্মদিনটিতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এসে উপস্থিত হবেন, এমন একটা ঘোষণা কারা যেন করে দিল। মনে পড়ে, দলে দলে লোক লঞ্চে গঙ্গা পেরিয়ে ব্যারাকপুর দিয়ে কল্যাণীর উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল ২৩ জানুয়ারি দিনটিতে। বেনেপাড়ায় আমাদের বাড়ির অদূরেই গঙ্গাতীর। সকালবেলা ওই লোকজনদের যেতে দেখলাম।

কল্যাণীর মাঠে খুব গন্ডগোল হয়েছিল। নিরাশ মানুষজনের হা-হুতাশের গোলমাল। পরদিন খবরের কাগজে দেখলাম। আমাদের বাড়িতে খবর কাগজ পড়ার অভ্যাস বরাবরের। জওহরলাল নেহরুরের মৃত্যুর খবর যে দিন সংবাদপত্রে বের হল, সে দিন ভোরবেলা বাবা বাংলা-ইংরেজি তিনখানা খবরের কাগজ বাড়ির বারান্দায় বিছিয়ে নিয়ে পড়তে বসে পড়লেন। মা আমাকে বললেন, ‘‘তুই আজকে বাজারে যা।’’ শ্রীরামপুরের পশ্চিমদিকের গ্রামগুলি থেকে চাষের আনাজপাতি, পুকুর-দিঘির মাছ নিয়ে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতে করতে নতুন স্টেশনের কাছে নতুন একটা বাজার বসিয়েছিলেন এই বিক্রেতারা। সেই সময়ে শ্রীরামপুরের পশ্চিম দিকে, অর্থাৎ আমাদের দিকে বাড়িঘর কম থাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়ির লোকজনকে এই বাজারের ব্যাপারীরা চিনতেন। আমি বাঘ-মার্কা একটি দু’টাকার নোট পকেটে নিয়ে বাজারে যখন গেলাম এই মদনকাকা, মাসিপিসিরা অন্য খদ্দেরদের আনাজপাতি, মাছ বেচতে বেচতে আমাকে বললেন, ‘‘খোকা, তুমি একটু দাঁড়াও।’’ ফাঁকা হতে এঁরা আমার ব্যাগে দরদাম ছা়ড়াই জিনিসপত্র ভরে দিতে লাগলেন। দু’টাকা ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে আমি ফেরতও পেতে থাকলাম। আমার থলি আনাজপাতি, আলু-বেগুন, পটল এবং মাছ— এ সবে ভরে গেল। তা-ও আমার দু’টাকা ফুরলো না। কিছু পয়সা ফেরত পেলাম। জীবনে আমি এই একটি দিনই বাজার করেছি।

জ্যোতি বসু

নতুন স্টেশনের উল্টোদিকেই রেলের আর এম এস মাঠ। পরে এই মাঠের নাম হয় গাঁধী ময়দান। এ মাঠে খেলাধুলো, মেলা— এ সব হতো। তবে ভোট বা কোনও রাজনৈতিক উপলক্ষ হলেই হতো জনসভা। একদিন বিকেলে পুরনো স্টেশনের ওভার ব্রিজে যাওয়ার পথে নতুন স্টেশনে দেখলাম সিঁড়ি দিয়ে গটগট করে নেমে আসছেন জ্যোতি বসু। তখন রোগা জ্যোতি বসু। এঁর ছবি আমি সংবাদপত্রে দেখেছি, চিনতে পারলাম। সঙ্গে কয়েকজন ‘‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’’ ধ্বনি দিতে দিতে তাঁকে আর এম এস মাঠের জনসভার দিকে নিয়ে গেলেন।

আর এম এস মাঠের এ সব জনসভা আমরা বালকের দল শ্রীরামপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তখন শুনতাম। জেলা শহরগুলির অনেক বাড়িতেই সে সময়ে বিদ্যুৎ ছিল না। বেনেপাড়ার ভাড়া বাড়ি ছেড়ে ডাক্তারবাগান লেনে আমাদের যখন নিজেদের বাড়ি হয়, সে বাড়িতেও কয়েক বছর বিদ্যুতের আলো আসেনি। হ্যারিকেনের একটি চিমনির কথা আমার মনে আছে। তাতে ছোট্ট, একেবারে খুদে হরফে ‘নট’ লেখার পরে বড় বড় হরফে লেখা ছিল ‘মেড ইন জার্মানি’।

কেরোসিনের তখন বড় আকাল। চালের আকাল তো আরও বড়। কেরোসিনের অভাবে লম্প, কুপি, হ্যারিকেন না-জ্বালাতে পেরে পড়াশোনা ডকে ওঠায় ছাত্ররা রাস্তায় নামল। বসিরহাটে নুরুল আমাদের মতোই ক্লাস সেভেনের ছাত্র, যে দিন পুলিশের গুলিতে মারা গেল, তামাম বাংলায় আমরা ক্লাস সেভেনের ছেলেরা বড় হয়ে গেলাম।

পরের বছরই ভোট। ১৯৬৭-র ওই ভোট প্রচারে মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন যে দিন আর এম এস মাঠে বক্তৃতা দিলেন, শ্রীরামপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে বালকোচিত রাগ হল। যাকে বলে, ক্রোধ। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, হাত মুঠো। আমার পাশে ইন্দ্রনীল, অসীম। মনে হল ওরাও ছটফট করছে। কত বিচিত্র চিন্তা মাথায় এল। ভাবলাম, বড় হয়ে যদি একবারও মুখোমুখি হই ...

প্রফুল্লচন্দ্র সেন

তার পরে তো কত কাণ্ড হল। যুক্তফ্রন্ট, নকশালবাড়ি, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ, কাশীপুর-বরানগর, বারাসত, নবগ্রাম গণহত্যা, জেলে জেলে রাজনৈতিক বন্দি হত্যা, জরুরি অবস্থা, বামফ্রন্ট। আশির দশকের শেষ দিকটায় থিয়েটার রোডে শাশুড়ির অফিস ইন্ডিয়ান অয়েলের দিকে যাচ্ছি। হঠাৎ ঘনশ্যামের সঙ্গে দেখা। ঘঞ্চু, যে সোমক দাস নামে লেখে। ঘঞ্চু বলল, ‘‘তুই আমার সঙ্গে চল। প্রফুল্ল সেনের একটা ইন্টারভিউ নিতে যাব।’’ আমি তখন ‘যুগান্তর’-এ কাজ করি। মিডলটন স্ট্রিটে অশোককৃষ্ণ ঘোষের ফ্ল্যাটে থাকতেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। গিয়ে দেখি, করিডরের জানলাগুলির কাচ অধিকাংশই ভাঙা। সিঁড়িতে, করিডরে ধুলো। প্রফুল্ল সেনের ফ্ল্যাটের সামনে হকারের দিয়ে যাওয়া সংবাদপত্র ভাঙা জানলা দিয়ে আসা হাওয়ায় ফরফর করে উড়ছে। বেল টিপতে বোঝা গেল, ভিতর থেকে খুব চেষ্টা করা হচ্ছে ছিটকিনি খোলার। অবশেষে দরজা খোলা হলে দেখলাম, বর্ষীয়ান এক শীর্ণ মানুষ, ময়লা ছেঁড়া গেঞ্জি, লঙ্গি পরনে। দেখামাত্র চিনলাম। শ্রীরামপুরের হুগলি কংগ্রেস অফিসে দেখেছি। তিনি বদুদা, নির্মলেন্দু দে। বিছানায় শুয়ে আছেন কঙ্কালসার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন। ময়লা বিছানায় ছড়িয়ে আছে মুড়ি।

কথা বললেন অতি ক্ষীণ গলায়, আস্তে আস্তে। কথা বলতে থেমে থেমে শ্বাস নিচ্ছিলেন। হঠাৎ ঘড়ঘড়ে গলায় বলে উঠলেন, ‘‘বদু, জল দাও।’’

ঘরের কোনে কুঁজো। কুঁজো থেকে জল ঢালতে বদুদার হাত কাঁপছিল। আমি গ্লাসে জল ঢেলে প্রফুল্ল সেনকে খাইয়ে দিলাম।     

  • আরও পড়ুন :  
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -