SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

ভারতের ইতিহাসের একাধিক কথা কি সত্যিই বলেছিলেন নস্ত্রাদামুস

এপ্রিল ৩, ২০১৭
Share it on
কোথায়, কার কাছ থেকে ভবিষ্যৎ দেখার গুপ্তবিদ্যা তিনি লাভ করেছিলেন, সেকথা কোথাও প্রকাশ করে যাননি। যৌবনে তিনি দীর্ঘ আট বছর পরিব্রাজক হয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, অনেকের ধারণা তখনই তিনি এই জ্ঞানের সন্ধান পান।

কয়েকদিন আগে সংবাদমাধ্যমে দেখলাম এক বিদেশি পুরাতত্ত্ববিদ দাবি করেছেন, একটি পুরোনো ট্রাংক থেকে কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছে, তাতে নাকি গুজরাটে জাত এক নরেন্দ্রামাসের কথা বলা হয়েছে, যিনি ভারতের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে যাবেন। একদল পুরাতত্ত্ববিদের ধারণা, ওই পাণ্ডুলিপির রচয়িতা মধ্যযুগের বিখ্যাত ফরাসি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নস্ত্রাদামুস এবং তিনি ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কথাই বলেছেন। এই দাবির সত্যমিথ্যা নির্ধারণ পণ্ডিতেরা করবেন কিংবা ভবিষ্যৎ প্রমাণ করবে, আমরা বরং আলোচনা করি এই নস্ত্রাদামুস নামক মানুষটি কে এবং তিনি কী করতেন।

এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলেই আমার চোখের সামনে একটি অস্পষ্ট ছবি ভেসে ওঠে। প্রায় পাঁচশো বছর আগে ফ্রান্সের সালোঁ শহরে একটি বাড়ি, তার ছাদের চিলেকোঠার ঘরে আলো জ্বলছে, সেই আলো অনুসরণ করে দেখতে পাচ্ছি একটি নির্জন কক্ষে এক বৃদ্ধ প্রাচীন পাঁজিপুথির মধ্যে নিমগ্ন হয়ে বসে পড়াশুনা করছেন। তাঁর সামনে একটি ধাতুনির্মিত তেপায়া টেবিল, তার ওপরে রয়েছে একটি জলপূর্ণ পাত্র আর পাশে একটা ছোট লাঠি। পাঠ শেষ করে বৃদ্ধ তাঁর দণ্ডটি তুলে নিয়ে টেবিল স্পর্শ করলেন, তার পর পাত্র থেকে জল নিয়ে ছড়িয়ে দিলেন তাঁর নিজের মাথায় ও অঙ্গবস্ত্রে। তার পরে স্থির দৃষ্টিতে বসে রইলেন ওই জলপাত্রের দিকে চেয়ে। দেখতে দেখতে পাত্রের জল ঘোলাটে, আবিল হয়ে উঠল, তারপর সে জলে নানা ছবি ফুটে উঠতে শুরু করল। সেই নির্জন কক্ষে কায়াহীন কে যেন বৃদ্ধের পাশে এসে বসল, বৃদ্ধ মুহূর্তের জন্য শিহরিত হয়ে উঠলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই নিজের স্থৈর্য্য ফিরে পেলেন এবং শুনলেন সেই অশরীরী মৃদু কন্ঠে ধারাবিবরণীর মতো কী যেন বলছে। ক্ষিপ্রহাতে বৃদ্ধ সেই কথাগুলো লিখতে শুরু করলেন, তাঁর দৃষ্টি কিন্তু জলপাত্রের উপরেই।


নস্ত্রাদামুস, পুরনো উডকাট

কয়েক দশক আগে নির্মিত দীর্ঘ তথ্যচিত্র ‘Nostradamus: The Man Who Saw Tomorrow’ শুরু হয়েছিল এই ভাবেই। ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন হলিউডের প্রবাদপ্রতিম পরিচালক-অভিনেতা অরসন ওয়েলেস। দৃশ্যটি কাল্পনিক হলেও অসত্য নয়। রাতের পর রাত জেগে আগামী দিনের পৃথিবীকে এমন ভাবেই দেখে নিতেন মধ্যযুগের এক অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন সাধক মিশেল দ্য নস্ত্রাদেম, লোকের কাছে যিনি নস্ত্রাদামুস নামে খ্যাত হয়েছিলেন। এক অলৌকিক শক্তি তাঁকে এই সব দেখাত, সেই শক্তির বলেই তিনি জানতেন যে, তিনি যা দেখছেন তা মিথ্যা নয়।

কিন্তু মধ্যযুগের ইউরোপে এ রকম অলৌকিক শক্তির অধিকারী হওয়া খুব নিরাপদ ছিল না। সেযুগে ব্ল্যাক ম্যাজিক ও ডাকিনীবিদ্যা চর্চার অভিযোগে হাজার হাজার নিরাপরাধ হতভাগ্যকে শূলে চড়ে বা জীবন্ত দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। তার উপরে নস্ত্রাদামুস ছিলেন ইহুদী, সুতরাং সন্দেহের অঙ্গুলি সারাক্ষণই তাঁর দিকে বাড়ানো থাকত। অথচ এই জ্ঞানের ভাণ্ডার নীরবে বহন করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। তাই চার লাইনের হেঁয়ালি ছড়ার মাধ্যমে তিনি তাঁর আশ্চর্য্য দর্শনকে লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেন । সাবধানী নস্ত্রাদামুস জনপ্রিয়তার প্রত্যাশী ছিলেন না, ভবিষ্যদ্বাণীকে তাই তিনি ব্যাসকূটের জটিলতায় আচ্ছন্ন করে রাখেন। কিন্তু তাঁর কিছু কিছু ভবিষ্যভাষণ যখন তাঁর জীবদ্দশাতেই মিলে যেতে শুরু করে, তখন তাঁর খ্যাতি এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, স্বয়ং দেশের রানী তাঁর গুণগ্রাহী হয়ে ওঠেন। নস্ত্রাদামুস-লিখিত সেই ভবিষ্যদ্বাণীর নামটিও হেঁয়ালিপূর্ণ। একশোটি চৌপদীর এক-একটি স্তবকের তিনি নাম দেন ‘সেঞ্চুরি’ ।এই রকম দশটি সেঞ্চুরিতে লেখা হয় আগামী পাঁচ শতকের ইতিহাস।


নস্ত্রাদামুস, ছবির শিল্পী তাঁরই পুত্র সিজার

ব্যক্তিগত জীবনে নস্ত্রাদামুস ছিলেন খ্যাতকীর্তি চিকিৎসক। ফ্রান্সে প্লেগ মহামারীর প্রতিকার করে তাঁর হাতযশ দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া জ্যোতির্বিদ্যায় ও জ্যোতিষশাস্ত্রে তাঁর ভালো দখল ছিল। কিন্তু কোথায়, কার কাছ থেকে ভবিষ্যৎ দেখার গুপ্তবিদ্যা তিনি লাভ করেছিলেন, সেকথা কোথাও প্রকাশ করে যাননি। যৌবনে তিনি দীর্ঘ আট বছর পরিব্রাজক হয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, অনেকের ধারণা তখনই তিনি এই জ্ঞানের সন্ধান পান।

১৫৬৬ সালে পরিণত বয়সে মৃত্যুর পর নস্ট্রাচৌপদী দুর্বোধ্য পাগলের প্রলাপ বলে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতেই বসেছিল। ১৭৮১ সালে ভ্যাটিক্যানের এক কমিটি তাঁর রচনার তীব্র নিন্দাও করে। কিন্তু আট বছরের মধ্যে ফরাসি বিপ্লব শুরু হওয়ার পর থেকে লোকের ধারণা বদলাতে থাকে। ফরাসি বিপ্লব শেষ হওয়ার পরে দেখা গেল, বিপ্লবের সূচনা থেকে নেপোলিয়নের পতন পর্যন্ত ফ্রান্সের ইতিহাসের প্রধান ঘটনাগুলির নিখুঁত বিবরণ ওই হেঁয়ালির মধ্যে লুকোনো রয়েছে। পড়তে পড়তে বোঝা যায়, গত চারশো বছরে  পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কমই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, নস্ত্রাদামুসের লেখায় যার উল্লেখ নেই। এর মধ্যে গত শতকের দু’টি বিশ্বযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সমস্যাও রয়েছে । এই জন্যই চার শতাব্দী ধরে নস্ত্রাদামুসের ‘সেঞ্চুরি’ বেস্ট সেলারের তালিকায় রয়ে গেছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লস সেঞ্চুরি পাঠোদ্ধার করে নিজের ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা করেছিলেন, আবার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে হিটলারের প্রচারসচিব সেঞ্চুরি-র মনগড়া ব্যাখ্যা খবরের কাগজে ছাপিয়ে লোকেদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, নাৎসীদের জয় অবশ্যম্ভাবী। আজও নানাভাবে লেখাগুলির ব্যবহার হয়ে চলেছে।

বেশিরভাগ চৌপদীই এত ঝাপসা যে, বিভিন্ন টীকাকার নিজেদের পছন্দমতো ব্যাখ্যা করে নস্ত্রাদামুসকে আরোই দুর্বোধ্য করে তুলেছেন এবং যেখানে কোনও ব্যাখ্যাই পাননি, সেখানে ভবিষ্যতে মিলবে বলে দায় এড়িয়েছেন । এই জন্য যুক্তিবাদীরা বলেন যে, সেঞ্চুরি-র ভবিষ্যৎবাণী কিছুটা কাকতালীয় ও বাকিটা গোঁজামিল।

এবার দেখা যাক নস্ত্রাদামুস ঠিক কী লিখে গিয়েছিলেন ।

নস্ত্রাদামুস একশোটি চৌপদীর দশটি স্তবক লিখেষিলেন, অর্থাৎ এক হাজারটি ছড়া। এর মধ্যে সপ্তম স্তবকের আটান্নটি চৌপদী পাওয়া যায়নি, সুতরাং হাতে থাকে ৯৪২টি শ্লোক। এর মধ্যে শ’চারেক শ্লোকের অর্থ টীকাকারদের যাবতীয় শ্রম সত্বেও এখনও পরিষ্কার হয়নি। তার একটা প্রধান কারণ ছড়াগুলিতে যে বিশেষ ঘটনার ইঙ্গিত রয়েছে, সেটি ঘটলে তবেই তার অর্থ পরিষ্কার হয়, অন্যথায় ধোঁয়াশা থেকেই যায়। আরও মনে রাখতে হবে যে, ভ্যাটিক্যানের ক্রোধ এড়াবার জন্য নস্ত্রাদামুস প্রচুর ইচ্ছাকৃত জটিলতা সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বহুভাষাবিদ ছিলেন, তাই ফরাসির সঙ্গে লাতিন, হিব্রু শব্দ ইচ্ছামতো মিশিয়েছেন, সাধারণত কোনও ব্যক্তির নাম করেননি এবং চার শতাব্দীর মধ্যে অবাধ বিচরণ করেছেন পারম্পর্যের পরোয়া না করে। শব্দগুলি উল্টে পাল্টে খেলা করেছেন, যেমন অনেক জায়গায় দেখা গেছে Paris হয়েছে Rapis,  Roi অর্থাৎ রাজা হয়েছেন Noir । এই জন্যই সেঞ্চুরি-র ব্যাখ্যা করা এত কঠিন। তবে সব টিকাকারই একমত যে তিনি শুরু করেছিলেন,  ফ্রান্সের সব থেকে ভয়াবহ দিনগুলি— ফরাসী বিপ্লবের বিবরণ দিয়ে।


ফরাসি বিপ্লব: টেনিস কোর্টের শপথ, সমকালীন শিল্পী দাভিদের তুলিতে

আমার অক্ষম অনুবাদে সেই চৌপদীটি এই প্রকার—

‘ঝটিকাপ্রবাহ এসে উলটে দেবে শিবিকার সারি,
আচ্ছাদনে মুখ ঢাকা, কাউকে যায় না আর চেনা,
প্রজাতন্ত্র বিড়ম্বিত নবাগত জনতার চাপে,
লাল ও সাদার মাঝে অবিরাম তীব্র দ্বন্দ্ব চলে।’  (স্তবক ১ শ্লোক ৩)

মধ্যযুগের ফ্রান্সে পাল্কী ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতীক, সুতরাং ঝোড়ো হাওয়ায় পাল্কী উল্টে যাবার অর্থ খুবই স্পষ্ট । বিপ্লবের পরে প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হল, কিন্তু ক্ষমতালোভী নবাগতেরা, মানে জ্যাকোবিন গোষ্ঠী, তাকে ঠেলে দিল স্বৈরতন্ত্রের দিকে।  সাদা হল বুর্বোঁ রাজবংশ ও তাদের সমর্থকের প্রতীক আর বিপ্লবের রং বলা বাহুল্য রক্তবর্ণ ।
এখানে আমার কাছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে 'প্রজাতন্ত্র' শব্দটির ব্যবহার— মূল চৌপদীতে আছে  La Republique । ষোড়শ শতাব্দীতে প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব অকল্পনীয় ছিল ।

ফরাসী বিপ্লবের মূল ঘটনা হল রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ এবং রাজা ষোড়শ লুই-এর হত্যা। নস্ত্রাদামুস লিখেছিলেন—

‘নিশিরাত: কুটিল বন্ধুর পথে রেনের অরণ্যভূমিতে
পথ চলে দম্পতি, রানি শ্বেতপ্রস্তরের মতো।
ধূসর পোশাক পরে সন্ন্যাসী রাজা, ভেরেনিজ শহরেতে,
নির্বাচিত নরপতি, ঝড়, অগ্ন্যুৎপাত, ঝনাৎকার।’ (স্তবক ৯ ,শ্লোক ২০)

ইতিহাসের ছাত্রের কাছে এ ঘটনা এত পরিচিত যে, ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। ১৭৯১ সালের ২০শে জুন রাজা ষোড়শ লুই ও রানি মারি আঁতোয়ানেত বিপ্লবীদের হাত এড়িয়ে পালান।  ছদ্মবেশী রাজার পরনে ছিল যাজকের ধূসর পোশাক। কিন্তু ভেরেনিজ শহরে তাঁরা ধরা পড়ে যান এবং বহু বাদ-বিসংবাদের পর (ঝড়,অগ্ন্যুৎপাত) প্রথমে রাজা ও কিছুদিন পরে রানি উভয়েই গিলোটিনে প্রাণ দেন। নস্ত্রাদামুসের চৌপদীটি পড়লে মনে হয় তিনি নিজেই যেন সেই ঐতিহাসিক পলায়নের প্রত্যক্ষদর্শী। রাজার মৃত্যুর পরে রানি চুপচাপ কারাগারে সাদা পোশাক পরে থাকতেন, তাঁর মাথার চুলও সাদা হয়ে গিয়েছিল— রানি তাই শ্বেতপ্রস্তরের মতো। একটি অদ্ভুত প্রয়োগ চৌপদীর শেষ শব্দটি । নস্ত্রাদামুস ব্যবহার করেছেন slanche, যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হল to slice । শব্দটির মধ্যেই যেন গিলোটিনের আওয়াজ পাওয়া যায়। এই চৌপদীতে আর একটি লক্ষ্যণীয় শব্দ হল 'নির্বাচিত নরপতি' । ফ্রান্সের ইতিহাসে ষোড়শ লুই প্রথম সম্রাট, যাঁকে দেশের গণপরিষদ মনোনীত করেছিল।

রাজা ও রানির পরিণতি বিষয়ে নস্ত্রাদামুস আরও বেশ কয়েকটি চৌপদী লিখেছিলেন। বিষয়ের পুনরাবৃত্তি না করে বরং আমরা দেখি, এর পরে নস্ত্রাদামুস কী লিখছেন—

‘বিচিত্র নাম তার, কোনওদিন কোনও রাজা করেনি ধারণ,
তবুও সে মহানাম, সুগম্ভীর বজ্রধ্বনিসম।
থরথর কম্পিত ইতালি, স্পেন ও ইংল্যান্ড,
বিদেশী নারীর প্রতি মনোযোগ যার সুগভীর।’ (স্তবক ৪,শ্লোক ৫৪)


দাভিদের তুলিতে নেপোলিয়ন

এরও বিশদ ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। যথার্থই নেপোলিয়ন নামের কোন রাজা আগে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেননি। তাঁর নামে একদিন গোটা ইউরোপ সত্যই কেঁপে উঠেছিল। আরও আশ্চর্য, নেপোলিয়নের দুই স্ত্রীই বিদেশিনী ছিলেন। নেপোলিয়নের চরিত্র নস্ত্রাদামুসকে গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল মনে হয়। দু’জনের মধ্যে প্রায় আড়াইশো বছরের ব্যবধান থাকা সত্বেও নস্ত্রাদামুস নেপোলিয়নের জীবনের মূল ঘটনাগুলির নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে গেছেন ।

নস্ত্রাদামুস ফরাসি ছিলেন, সুতরাং সঙ্গত কারণেই ফ্রান্সের ইতিহাস বা তার মূল চরিত্রগুলি তাঁর রচনার সিংহভাগ অধিকার করে রেখেছে। কিন্তু অন্য দেশ ও ব্যক্তি সম্পর্কে তিনি উদাসীন ছিলেন না। যেমন গ্রেট লন্ডন ফায়ার—


গ্রেট লন্ডন ফায়ার, সমকালীন শিল্পীর তুলিতে

‘নিরপরাধের রক্ত হয়তো বা প্রয়োজন ছিল,
লন্ডন আগুনেতে দগ্ধ হল তিনকুড়ি ছয় সালে।
প্রাচীনা সে বৃদ্ধা দেখো আপন আসন থেকে চ্যুত,
তার মতো অনেকেই একই ভাবে হল ধ্বংসীভূত।’ (স্তবক ২, শ্লোক ৫২)

এই একটি চৌপদীতে নস্ত্রাদামুস সাল তারিখের উল্লেখ করেছেন, তাই এর রহস্য ভেদ করা তুলনামূলকভাবে সহ। তিনকুড়ি ছয় মানে ছেষট্টি— তাঁর মৃত্যুর ঠিক একশো বছর পরে, ১৬৬৬ সালে এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে লন্ডনের অর্ধেকের বেশি অংশ পুড়ে ছাই হয়ে যায়, ইতিহাসে এর নাম 'গ্রেট ফায়ার'। প্রাচীনা বৃদ্ধা হল সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল, অনেক বাড়ীর সঙ্গে সেটিও ধ্বংস হয়েছিল। ক্যাথলিক ধর্মের বহু দিকের উপরে মানবত্ব আরোপ করা নস্ত্রাদামুসের অন্যতম লিপিকৌশল-বৈশিষ্ট্য ।

এর পর দুশো বছর এগিয়ে গিয়ে আমরা দেখছি একজনের নাম নস্ত্রাদামুস স্পষ্ট অক্ষরে লিখছেন—

‘শতাব্দীর লুপ্ত বস্তু অবশেষে আবিষ্কৃত হল,
পাস্তুর সম্মানিত, যেন এক দেবতার মতো।
এ সব ঘটবে যবে চন্দ্রের মহাচক্র সম্পন্ন প্রায়,
গুজব ও অপবাদে যদিও তাঁহার ভাগ্যে হবে অপযশ।’ (স্তবক ১, শ্লোক ২৪)

তিন শতাব্দী আগে নস্ত্রাদামুস কি করে ফরাসি বৈজ্ঞানিক লুই পাস্তুরের কীর্তির কথা জানতে পারলেন, সেকথা যুক্তি দিয়ে বোঝা অসম্ভব। কিন্তু নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা যে কাকতালীয় নয়, তার প্রমাণ চৌপদীর মধ্যেই রয়েছে। পাশ্চাত্য জ্যোতিষের সূত্র অনুযায়ী, চন্দ্রের মহাচক্র (Great Cycle of Moon) চলেছিল ১৫৩৫ থেকে ১৮৮৯ পর্যন্ত। পাস্তুর তাঁর স্বনামাঙ্কিত ইনস্টিটিউটের দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন ১৪ নভেম্বর, ১৮৮৮ সালে। তাঁর কর্মক্ষেত্রে বিপুল অবদান সত্বেও তিনি অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বারে বারে বিবাদ-বিসংবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন। মৃত্যুর পরে তাঁর নোটবই থেকে জানা যায়, তিনি সবসময়ে সোজা রাস্তায় চলেননি। এরও ইঙ্গিত রয়েছে শেষ পংক্তিটিতে ।

এবার আর একটি অভূতপূর্ব ঘটনা, যা ঘটার আগে পর্যন্ত কেউ ভাবতেই পারেনি, এমনটিও হতে পারে। নস্ত্রাদামুস কিন্তু দেখেছিলেন—

‘বিবাহবিচ্ছেদ— কেউ তারা মানতে চায়নি,
ভবিষ্যৎ বলে দেবে সে বিচ্ছেদে মর্যাদা ছিল না।
দ্বীপের রাজাকে তাই সব ছেড়ে চলে যেতে হল
রাজ্য পেল সেই জন, যার কোন আশাই ছিল না।’  (স্তবক ১০, শ্লোক ২২)

১৯৩৬ সালে শ্রীমতী সিম্পসনের প্রণয়মুগ্ধ অষ্টম এডওয়ার্ডের সিংহাসন ত্যাগ ও তাঁর অনুজ ষষ্ঠ জর্জের বৃটিশ সিংহাসন প্রাপ্তি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সাড়া-জাগানো ঘটনা । নস্ত্রাদামুস দেখেছিলেন। মজার কথা, বিবাহবিচ্ছেদ ব্যাপারটাই তখন ছিল না, কিন্তু তাঁর অনুমান করতে অসুবিধা হয়নি। এইভাবেই তাঁর রচনায় স্থান পেয়েছে কাগজের টাকার প্রচলন, মুদ্রাস্ফীতি, সাবমেরিন, টেলিভিশনের আ্যান্টেনা, অন্তরীক্ষযুদ্ধ ও অনেক কিছু, যা ষোড়শ শতাব্দীতে কল্পনা করা যেত না।

ননস্ত্রাদামুসের লেখা পড়তে পড়তে আমি বার বার ভেবেছি, তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে ভারতের কি কোন স্থান ছিল না? আমার ধারণা ছিল, কিন্তু যেহেতু তাঁর টীকাকারেরা পশ্চিমের মানুষ, প্রাচ্য ভূখণ্ডের ইতিহাস তাঁদের জানা নেই, তাই তাঁরা ধরতে পারেননি । যেমন এই চৌপদীটি -

‘এই একজন লোক বার বার অভিযুক্ত হবে,
আপন কল্পনায় চূরমার করেছে সে মন্দিরের সারি।
মানুষজনের চেয়ে পাথরের উপরেই রাগ তার বেশি
বহু অলংকারে ঢাকা বক্তৃতায় ভরে গেছে কান।’ (স্তবক ১, শ্লোক ৯৬)


সম্রাট ঔরঙ্গজেব, মুঘল মিনিয়েচার পেন্টিং

আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই চৌপদীর লক্ষ্য হলেন বাদশাহ ঔরংজেব। ‘দিল্লীশ্বর’ বা ‘জগদীশ্বর’-জাতীয় যে সব স্তুতি ঔরংজেবকে করা হতো, শেষ লাইনে তারই উল্লেখ রয়েছে। আর একটি চৌপদী, যেটা অনেকেই বলেন ইংল্যান্ডের রানিকে নিয়ে, কিন্তু আমার মনে হয় এই চৌপদীতে বর্ণিত যিনি তিনি ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী—

‘প্রত্যাখ্যানের পরে আবার রাজ্ঞীরূপে ফিরবেন তিনি,
শত্রুরা যোগ দেবে ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে।
বিপুল বিজয় হেতু তাঁর রাজত্ব স্মরণীয় হবে,
তিন আর সত্তরেতে মৃত্যু তাঁর হবে সুনিশ্চিত।’ (স্তবক ৬, শ্লোক ৭৫)

বিদেশী টীকাকাররা একমত যে, এই শ্লোকে বর্ণিতা নারী রানি প্রথম এলিজাবেথ। কিন্তু আমি নিশ্চিত, তিনি ইন্দিরা গাঁধী । এলিজাবেথ কখনও প্রত্যাখ্যাত হননি, ইন্দিরা হয়েছিলেন। আর বয়সের হিসাব করলে তো কোন সংশয়ই থাকে না, এলিজাবেথ মারা যান সত্তর বছর বয়সে, ইন্দিরা সাতষট্টি, অর্থাৎ, ৭০-৩. তিন আর সত্তরের হিসাব এই ভাবেও মেলানো যায় ।

নস্ত্রাদামুসের চৌপদীর ওপর কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা পাঠকদের বিবেচনার উপরে ছেড়ে দিলাম। এটুকুই বলতে পারি যে, কোন অনৈসর্গিক উপায়ে নস্ত্রাদামুস ভবিষ্যতের অনেক ঘটনা পরিষ্কার দেখতে পারতেন। তাঁর বর্ণনা এত বেশি ভিস্যুয়াল যে, আর কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো অসম্ভব। কী করে সেটা সম্ভব হয়েছিল, সে আলোচনায় গিয়ে লাভ নেই, আমাদের উন্নত জ্ঞানবিজ্ঞান এর এখনও পর্যন্ত কোনও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। চারশো বছর ধরে এই রহস্যময় ত্রিকালজ্ঞ পুরুষের লেখা তাই প্রহেলিকাই রয়ে গিয়েছে। প্রয়োজনে কেউ ব্যবহার করেছেন, কখনও ‘কাকতালীয়’ বলে হেয় করা হয়েছে ।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -