SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

মেয়েদের শরীরী সমস্যার শরিক কি হতে পারে পুরুষ! কী জানাল বলিউড 

মার্চ ২০, ২০১৮
Share it on
তার জীবনে একটাই প্যাশন— নিজের বউ-সুদ্ধ গাঁয়ের সমস্ত মেয়েবউদের মাসিক-কালের নরকযন্ত্রণা, ওই ঘিনঘিনে, ব্যাকটেরিয়া-থিকথিকে, নোংরা-পচা ন্যাকড়া-ন্যাতাকানির দুনিয়া থেকে উদ্ধার করা।

আলেকজান্ডার যেটা সেলুকাসকে ফিসফিস করে বলেছিলেন, আর দ্বিজেন্দ্রলাল চুপিচুপি শুনে ফেলে ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে টুকে দিয়েছিলেন, সেই ডায়ালগটা যদি কেউ কারোকে না-ই বলত, তা হলেও ভারতবর্ষ যে সত্যি ‘কী বিচিত্র দেশ’, তাই নিয়ে আপনার কোনও সন্দেহ থাকত? আমার তো নেই!আমাদের দেশটা ভারি অদ্ভুত, তাই এখানে মেয়েদের শরীর নিয়ে কবি-পুরুষরা কবিতায়, আর বাকি পুরুষরা পাবলিক টয়লেটের দেওয়াল থেকে ফেসবুকের ‘ওয়াল’ পর্যন্ত ভরিয়ে ফেললেও,মেয়েরা পুরুষের শরীরের এটা-ওটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে একটা কিছু বললেই আর রক্ষে নেই।এ কেবারে বিধবা পিসিমার হবিষ্যিঘরের হাঁড়ি এঁটো হয়ে যাওয়ার মতো হল্লা উঠে যাবে।
            
আর শুধু ছেলেদের শরীর কেন? মেয়েরা নিজেদের শরীর নিয়ে কিছু বললেও কি রেহাই আছে? এই তো সঞ্জয় লীলা ভংশালীর ‘পদ্মাবত’-এ রাজপুতানি নারীর সতীত্ব নিয়ে অ্যায়সা বাড়াবাড়ি আছে, যা দেখে অভিনেত্রী স্বরা ভাস্করের মনে হয়েছিল, একটা মেয়ের শরীরে যেন যোনি ছাড়া কোন অঙ্গ নেই! স্বরা কেন এমন মন্তব্য করছেন, তার স্বপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি দিয়েছিলেন। এখন সে যুক্তি আপনি মানতে না-ই পারেন! কিন্তূ তাই বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বরার সঙ্গে যেটা করা হল,সেটা আক্ষরিক অর্থেই প্রায় শ্লীলতাহানি! ‘আনারকলি অফ আরা’ ছবিটায় স্বরা যে মফস্বলি নাচনে-গানেওয়ালির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, সেই মেয়েটির ক্লায়েন্টেলও বোধহয়, সোশ্যাল মিডিয়ার এই খাপ-পঞ্চায়েতিরাজের তুলনায় অনেক সভ্য ও মানবিক ছিল।


‘আনারকলি অফ আরা’ (২০১৭) ছবিতে স্বরা ভাস্কর। ছবি: ইউটিউব

এখন সাইবার-দুনিয়াবাসী নাগরিক খাপ-পঞ্চায়েতওয়ালারাই যদি এতটা উগ্র-উৎকট নারী-বিদ্বেষী হতে পারে, তা হলে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ-হরিয়ানার আসলি খাপ-এর দাপটটা ভাবুন! সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ সবে বলেছে, সাবালক ছেলে-মেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে সমাজের নাক গলানোর কিছু নেই— অমনি রে-রে করে গর্জে উঠেছে ‘খাপ’।এখানে ‘বালন’, ‘তোমর’, ‘মালিক’— সব খাপ-এরই এক রা!আমার মেয়ের বিয়ে কার সঙ্গে দেব বা দেব না, সে ব্যাপারে কোর্ট বলার কে?খাপ-এর সঙ্গে বেশি খাপ খুলতে এসো না— একেবারে খাপ-এ ভরে দেব! তেমন হলে মেয়েদের জন্ম দেওয়াই বন্ধ করে দেব।আর সমাজে মেয়েদের সংখ্যা কমে গেলে কি অনর্থটা হতে পারে, সেটা নিশ্চয়ই সুপ্রিম কোর্টের জানা আছে।

বুঝতেই পারছেন, আগের বাক্যটা যদি কন্যা-ভ্রূণহত্যার প্রকাশ্য ঘোষণা হয়ে থাকে তো পরেরটা পরিস্কার ধর্ষণের হুমকি! মানে ঘরে ঘরে ক্যাডার ঢুকিয়ে ‘রেপ করিয়ে দেওয়ার’ একদা বঙ্গীয় সুবচনের হরিয়ানভি সংস্করণ। কেউ কেউ বলতেই পারেন, ‘খাপ’ এদেশের পিতৃতন্ত্রের একটা চরম বিকৃত চেহারা। এটা একটা ব্যাতিক্রমই। ভারতীয় পৌরুষ এমনিতে অতটা গনগনে লড়াইক্ষ্যাপা, অসহিষ্ণু টাইপ নয়! তারা বেশ ভদ্র, উদার কায়দায় মেয়েদের উপরে দখলদারি কায়েম রাখে। তারা মেয়েদের ঘোমটা উড়িয়ে,পর্দা সরিয়ে ঘরের জানলা দিয়ে বাইরের হাওয়া খাওয়ায়। আবার পায়ে শিকল পরিয়ে সরি-ও বলে।এরা কক্ষণও হোলির আগে পরে গার্লস কলেজের সামনে গিয়ে বীর্য-ভরা বেলুন ছুঁড়ে মর্দাঙ্গি দেখাবে না। কিন্তু মালয়ালম পাক্ষিকের প্রচ্ছদে কেরলের মডেল-অভিনেত্রী জিলু জোসেফের শিশুকে স্তন্যপান করানোর ছবি নিয়ে মাথা ফাটাফাটি করতে পারে।

আরে মেয়েমানুষের শরীরের একটু আব্রু-হায়া থাকবে না? কোন মা অমন খুল্লমখুল্লা, দুনিয়ার পাবলিককে নিজের স্তন দেখিয়ে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায় গো? এমনকী, ‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি’-তেও ‘গঙ্গা’ মানে মন্দাকিনীর সিফন শাড়ি যতই ফিনফিনে পাতলা হোক, সন্তানকে স্তন্যপান করানোর সময়ে অন্তত আঁচল দিয়ে একটু ঢাকাঢাকি করার চেষ্টা ছিল। আর এ মেয়ে তো ক্যামেরার সামনে আধখানা বুক দেখিয়ে বসে আছে। মাতৃস্নেহ না ‘মায়ের’ নগ্নতা, কোনটা আসলে দেখানোর উদ্দেশ্য কে বুঝবে! যদিও পাক্ষিক পত্রিকাটি মায়েদের প্রকাশ্যে স্তন্যদান করানোর অধিকারের পক্ষেই একটা ‘ক্যাম্পেন’ করছিল। আর পেশাদার মডেল হিসেবে জিলু জোসেফ সেই প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন। স্বেচ্ছায়। বিষয়টার প্রতি তাঁর নৈতিক সমর্থন আছে বলেই।


‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি’ (১৯৮৫)  ছবিতে মন্দাকীনি। 

কিন্তু ভারতমাতা থেকে ‘গোমাতা’ টিকির ডগা থেকে জুতোর সুখতলা অবধি কঠোর মাতৃভক্ত পুরুষদের এইদেশে একজন অভিনেত্রী মেয়েরও নিজের শরীরের স্বাধীনতা নেই। তার শরীরের কতটা ‘পাবলিকলি’ খোলা বা ঢাকা থাকবে, তা নিয়েও কথা বলবে অন্য লোক। সে দেশে একজন পুরুষমানুষ যদি আচমকা একান্তই মেয়েলি শরীরী সুখ-দুঃখ, সুবিধে-অসুবিধে, সমস্যা-সমাধান নিয়ে মাথা ঘামাতে বসেন, তা হলে এই সমাজে তাঁর কি পরিমাণ হেনস্থা হতে পারে ভাবুন। এই তো রাজস্থানে খোদ সরকারি মহিলা কমিশনের চেয়ার-পার্সন, আজকালকার কানে দুল, লো-ওয়েস্ট জিন্স পরা, বুকের লোম কামানো, রোগা-সোগা,নরম-সরম, কোমল-কমনীয় চেহারার তথাকথিত মেট্রো-সেক্সুয়াল যুবকদের দু-চোক্ষে দেখতে পারেন না। নারী-দিবসের দিনকয়েক আগেই তিনি রীতিমত হা-হুতাশ করেছেন— হায়, ইয়া চওড়া রোমশ বুকের ছাতিওয়ালা সেইসব আসলি পুরুষরা কোথায় গেলেন— মেয়েদের সুরক্ষা আর কারাই বা দেবেন?
    
তো এই বাজারে লক্ষ্মীকান্ত চৌহান নামে এক হাট্টা-কাট্টা জোয়ান রাজপুত পুরুষ যদি যেচে ক্ষত্রিয় বংশের নাম ডোবায়— মাসের ঐ পাঁচটা বিশেষ দিনে ঋতুমতী মেয়েদের লজ্জা-অস্বস্তি-ব্যথা-সঙ্কোচ বুঝতে বেরোয়, তা হলে লোক তো তাকে হয় পাগল, নয় ‘পারভার্ট’ ভাববেই। তার উপরে যদি লক্ষ্মীকান্তের ভূমিকায় বলিউডের মাচোপনার ‘খিলাড়িয়োঁ কা খিলাড়ি’ স্বয়ং অক্ষয়কুমারকে দেখা যায়, তা হলে দর্শকের চেনা-জানা ছকটা আর একটু গুলিয়ে যেতে বাধ্য। আসলে অ্যাড-ফিল্ম দুনিয়ার সুলতান-বাদশা, আর.বালকি যখনই সিনেমা বানাতে আসেন, সেখানে এরকমই কোনও না কোনও চমক থাকবেই! ‘চিনি কম’-এ ৬০ বছরের পরেশ রাওয়ালের ভাবী-জামাই ৬৪ বছরের অমিতাভ বচ্চন!আবার ‘পা’-এ বেটা অভিষেককে তিনি ‘পাপা’ অমিতাভের ‘পা’ মানে বাবা বানিয়ে দিলেন।
        
আর ‘প্যাডম্যান’-এ বলিউডি ‘রাউডি’, ‘রাফ এন্ড টাফ’ , ‘খতরোঁ কি খিলাড়ি’ শ্রী অক্ষয়কুমার গ্রামের কামারশালার নিরীহ, গোবেচারা, ‘বউ-সোহাগে’ নেহাতই গেরস্ত মানুষ। তার জীবনে একটাই প্যাশন— নিজের বউ-সুদ্ধ গাঁয়ের সমস্ত মেয়েবউদের মাসিক-কালের নরকযন্ত্রণা, ওই ঘিনঘিনে, ব্যাকটেরিয়া-থিকথিকে, নোংরা-পচা ন্যাকড়া-ন্যাতাকানির দুনিয়া থেকে উদ্ধার করা। বাস্তবের যে চরিত্রের ছায়ায় প্যাডম্যান-এর লক্ষীকান্তকে বানানো হয়েছে, সেই অরুণাচলম্ মুরুগানাথমকেও পিছিয়ে থাকা গ্রামসমাজের অনেক ট্যাবু-সংস্কার, ভুলভাল অন্ধবিশ্বাস, ধারণা ইত্যাদি ভাঙতে হয়েছিল। তা নইলে তিনি প্রান্তিক-গরিব মেয়েদের শস্তায় স্যানিটারি ন্যাপকিন যোগানোর ওই নির্ভেজাল দেশি ভেন্ডিং মেসিনটা বানাতে পারতেন না।


‘প্যাডমান’ (২০১৮) ছবিতে অক্ষয়কুমার। ছবি: ইউটিউব

তামিলনাড়ুর অরুণাচলমের কাহিনীকে বালকি এখানে মধ্যপ্রদেশে নিয়ে এসেছেন। মানে গোবলয় ঘেরা হিন্দি হৃদয়পুরের একেবারে মধ্যিখানে-যেখানে ‘খাপ’ আর ‘বাপ’, সমাজ আর পিতৃতন্ত্রের দাপট-রোয়াব আরও কয়েকগুণ বেশি। সেখানে প্রতি মিনিটে বেরাদরি-র নাক কাটা যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও লক্ষ্মীকান্ত একটা বিশুদ্ধ ‘মেয়েলি’ ব্যাপার নিয়ে তার জীবন-যৌবন-মর্দাঙ্গি সব কিছু খরচ করে ফেলল। কোনও খরখরে তীব্র নারীবাদী একদা বলেছিলেন, ‘নারীবাদী পুরুষ’ কথাটা অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতই-হতে পারে, কিন্তু হয় না। অরুণাচলম বা লক্ষ্মীকান্তরা কিন্তু মহিলাকে ভুল প্রমাণ করে ছেড়েছেন। বালকি নিজে অবশ্যই তাঁর ‘প্যাডম্যান’এর গায়ে কোনো নারীবাদী তকমা আঁটতে পছন্দ করবেন না। তাঁর লক্ষ্মীকান্ত দেশি ব্যবস্থায় বিলিতি মানের ন্যাপকিন বানালেও নরেন্দ্র মোদীর ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নিয়ে তাঁর বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। এটা ঠিক অরুণাচলমের বায়োপিকও নয়।বলিউডি ঘরানায় সেখানে ফিকশন-এর মাধুরী মিশেছে অনেক। ইচ্ছাপূরণের সেই অতি-সরল রূপকথায় লক্ষ্মীর আটপৌরে জীবনের রানওয়ে-তে এক ঝলমলে বাহারওয়ালি-শহরওয়ালি প্রেমের ইশারা নিয়ে ল্যান্ড করে-আবার উড়েও যায়।লক্ষী তার লক্ষীমন্ত,গেঁয়ো ঘরওয়ালির ঘরেই ফিরে যায়।দিকে দিকে মাসল ফোলানো,পৌরুষ-ফলানো ব্যাডম্যান-দের ভিড়ে সে সেই একলা ‘প্যাডম্যান’ হয়েই থেকে যেতে চায়— যে নিজের পুরুষাঙ্গের গর্বে ধরাকে সরা না দেখে মেয়েদের যোনিদ্বারের সুরক্ষার কথাও ভাবে।আন্তরিকতা আর সমবেদনা দিয়েই ভাবে।ছবিটা সেইজন্যেই মনে রাখার।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -