SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

বাঙালির ভ্যালেন্টাইন: সরস্বতী পুজো এবং তার পর...

ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৭
Share it on
স্কুলে পড়াকালীন প্রেম করে এমন পাবলিক, যারা বছরভর বাধানিষেধ আড়াল আবডাল মেনটেন করে কোনোক্রমে প্রণয়লীলা চালায়, তারা এই একটি দিনের জন্য খাঁচাখোলা পাখি।

আরও একটা সরস্বতী পুজো চলে গেল। ইস্কুল কলেজ জাতীয় ধম্মনিরপেক্ষ পেতিষ্ঠানে সরস্বতী পুজো কেন হবে— এ নিয়ে বিস্তর ঘোটালা রয়েছে। তবে বীণাবাদিনীর পুজো, অঞ্জলি, এবং শুক্লাপঞ্চমীর দিনটা জুড়ে রাস্তাঘাটে রঙিন কপোত-কপোতীর নির্ভয়ে স্পর্ধিত উড়ে বেড়ানো— সব মিলিয়ে একখান সেকুলার সিদ্ধান্তে আসা যায়, যে এ দিনটা ধর্মীয় আচার ইত্যাদি প্রভৃতির উর্ধ্বে উঠে হেব্বি প্রেমের দিন, হৃদয়কমলবনমাঝে মধুর ধ্বনি বেজে ওঠার দিন। আর পোস্ট কলোনিয়াল বাঙালি সন্ত ভ্যালেন্টাইনের গল্প-ফল্প আগাপাশতলা ভুলে মেরে দিয়ে চোদ্দই ফেব্রুয়ারিকে দিব্য খুল্লমখুল্লা প্রেমের লাইসেন্স পাওয়ার দিন বলে ধরে নিয়েছে। অতএব এহেন কলোনিয়াল হ্যাংওভার লইয়া বাঙালি কী করিবে? উত্তর ঔপনিবেশিক বাঙালি এই মওকায় আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা সরস্বতী পুজোকে আখ্যা দিয়েছে 'বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে'। ব্যস, কেল্লা ফতে। এদিকে পাশ্চাত্যও রইল অক্ষুন্ন, অন্যদিকে 'হাম কিসিসে কম নেহি'-মার্কা ওরিয়েন্টালপনা এবং স্বাদেশিকতাও অটুট। আলো ক্রমে ...আসিতেছে।

এই ঘটনায় সবথেকে বেশি লাভ হয়েছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের। স্কুলে পড়াকালীন প্রেম করে এমন পাবলিক, যারা বছরভর বাধানিষেধ আড়াল আবডাল মেনটেন করে কোনোক্রমে প্রণয়লীলা চালায়, তারা এই একটি দিনের জন্য খাঁচাখোলা পাখি। সারা বছর কোচিং এ লুকিয়ে হাত ধরার সুযোগসন্ধানী আজ সরাসরি কবি মৃদুল দাশগুপ্তর ভাষায়, ‘তবে মুখ তোলো, এসো ধরো হাত’ বলে নিবেদন জানাতে পারে। তবে মাধ্যমিকিমাউস বা উচ্চমাধ্যমিকিমাউসরা যেহেতু বিদ্যাবুদ্ধিতে কিঞ্চিৎ উচ্চাসন লাভ করে, এবং জীবনের এহেন সন্ধিক্ষণে পৌঁছে তারা খানিক গাম্ভীর্য লাভ করে, ফলে তাদের এত বিহ্বল হতে দেখা যায় না, অন্তত মনোযোগী ছাত্রছাত্রীদের তো নয়ই। কিছু চটুল এবং এসব মধ্যশিক্ষা উচ্চশিক্ষা এসব বিষয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব অবলম্বনকারী ছাত্ররা তখনও মেয়েদের স্কুলে ঢুকতে পারাকে এলডোরাডো অভিযানের সামিল মনে করে, কোনও কোনও বেয়াড়া ছেলেপুলে কলেজ চত্বরেও পা রাখার চেষ্টা করে। তবে আমাদের সোশ্যাল কনস্ট্রাক্টের কল্যাণে মেয়েদের মধ্যে এই চপলতা দেখা যায় না সচরাচর। তারা নিজেদের স্কুলের গণ্ডির বাইরে বিশেষ বেরোয় না।

এর পর পড়ে থাকে কলেজজীবন। কলেজে উঠলেই বোঝা যায়, ইস্টিশন ছেড়ে রওনা দিয়েছে ট্রেন। ছোট্টবেলার সেসব রোমাঞ্চ এখন ভোঁ ভাঁ। স্কুলে গিয়ে পুরনো বন্ধুদের দেখা পাওয়া, স্যারেদের সঙ্গে মোলাকাত করে নিজের বয়ঃসন্ধি-কৈশোরকে ফিরে দেখার নস্টালজিক প্রচেষ্টা বাদ দিয়ে পড়ে থাকে আচমকা প্রথম প্রেমকে রাস্তায় দেখে ফেলার চিনচিনে গল্প, অথবা প্রাক্তন প্রেমিকা অথবা প্রেমিককে অন্য কারোর সঙ্গে সহাস্য হন্টন করতে দেখে ভেতরে ভেতরে খানিক জ্বলেপুড়ে যাওয়া। এমনিতেই 'প্রাক্তন' বাংলাবাজারে হট টপিক, বর্তমানকে ভুলে থাকার দাওয়াই হিসেবে তা বেশ জনপ্রিয়। আর কলেজের ভিতরে এসব সিনেমামার্কা অ্যাডভেঞ্চারের পাটবালাই নেই। সেখানে তো প্রেম ভাঙাগড়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কান্নাকাটি হল্লাহাটি চোখে চোখে কথা বলা— এরকম নানান নাটকীয় উত্থানপতন নিয়ে সেখানে বিশেষ হেলদোল নেই। বরং ইউনিয়নগত কারণে যেখানে সারা বছর কুরুক্ষেত্র লেগে থাকে, সেখানে এই একটা দিন অনেক শান্ত সমাহিত। আর এসবের ফাঁকে আরেকটা ছোট্ট চাটনি যোগ করা যাক। তা হল পরকীয়া। বাংলা সিনেমার দাক্ষিণ্যে দাম্পত্যে পরকীয়া এখন জলভাত, কিন্তু স্কুলকলেজে পরকীয়ার খোঁজ কজন রাখে? পরিবার পরিজন গুরুজন এদের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার পরেও যেখানে লুকোচুরি চলে গোয়েন্দাগল্পের মতন, সেখানে বিশেষ আলো পড়ে না। ঈষৎ চোখ চাওয়ার মধ্যে যে কত অছিলা খেলা করে সেখানে, প্রেম সেখানে মোটেই বিশেষ নিরীহ নয়। সে প্রেম একবারই আসে বড়জোর, নীরবে।

তবে এসব ছেড়েছুড়ে একটা অন্য বিষয় ভাবা যাক। এই যে বীণাপুস্তক রঞ্জিতহস্তের পবিত্রতা, এই যে বিদ্যে দাও বুদ্ধি দাও-এর অপার আলোকমহল, এসবকে তোয়াক্কা না করে বাঙালির কাছে এই দিনটাই হঠাৎ প্রেমের জন্য এত্তো পপুলার হয়ে উঠল কেন? সরস্বতীর ইতর সন্তান হয়ে ওঠার এই তাগিদ বঙ্গবাসীর এলো কোত্থেকে? সরস্বতী কামের দেবী হিসেবেও উপাস্য। ছোট থেকে যৌনতাকে ট্যাবু করে রাখার চর্চা বাঙালি পরিসরে রয়েছেই, তার ফলে অবদমিত যৌনতার যে ঢেউ বয়ঃসন্ধি কৈশোরের মগজের কোষে কোষে ধাক্কা মেরে বেড়ায়, তার একরকমের সাবলিমেশন কি এই উদ্যোগ? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার জীবনের প্রথম সাহসী চুম্বন রেখেছিলেন সরস্বতী প্রতিমার ঠোঁটে। এইরকম ঘটনা উল্লেখ করে ফ্রয়েডীয় তাত্ত্বিক ঘাঁতঘোঁত টেনে প্রেমের সমস্ত প্লেটনিক সত্তাকে অগ্রাহ্য করে শুধুই যৌনতাকে চ্যাম্পিয়ন করতে চাওয়া হচ্ছে— কেসটা এরকম নয়। কাজেই কেউ ‘শরীর শরীর, তোমার মন নাই’ জিজ্ঞেস করলে বিপদে পড়তে হবে। তবে অস্বীকার কি করা যায়, ক্লাসে এবং ক্যাম্পাসে যৌনতার যে সমস্ত বেড়াজাল রয়েছে, তাকে কিঞ্চিৎ হলেও উপেক্ষা করা যায় এই দিনে? দুম করে হাত ধরে ফেলা, কাঁপা কাঁপা চুম্বন বা এ জাতীয় ঘনিষ্ঠতার বাধাহীন সুযোগ অনেকক্ষেত্রেই আজকের দিনেই মেলে— একথা অস্বীকার করবে কোন বান্দা?

অতএব আজকের মন্ত্রোচ্চারণ পুষ্পাঞ্জলি-পাঞ্জাবী-বাসন্তী শাড়ির ফাঁকেই কাহানি মে টুইস্ট লুকিয়ে বাঙালি সমাজমানসের কোনো এক চোরাগলিতে। কে দেবে আলো সেখানে? প্রশ্ন কতটা সহজ জানা নেই, আর উত্তরও নিঃসন্দেহে অজানা।

Saraswati Puja Love relations Valentine's Day
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -