SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

তরুণ বাঙালি কি ঈর্ষায় ডুবে থাকা এক প্রজন্ম, কী বলছে জেনারেশন-ওয়াই

মার্চ ২৮, ২০১৭
Share it on
নব্বইয়ের বদলে পঁচাশি পাওয়া ছেলেটিকে বাবা যখন ভর্ৎসনা করছে, কাগজের একদম প্রথম পাতায় থাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছে, তখন ব্যাক পাওয়া ছেলেটি বাথরুম পরিষ্কারের অ্যাসিড হাতে তুলে নেয় কাগজের প্রথম পাতায় ঠাঁই পেতে।

অ-এ অজগর তেড়ে আসে। আ-এ আমটি পেড়ে খেতে হয়। এই হল গে তফাৎ। অর্থাৎ প্রথমেই বুঝে নিতে হবে যে, ‘তেড়ে আসা’ আর ‘পেড়ে খাওয়া’-র মধ্যে তফাৎ আছে। আপনি যখনই দেখবেন, অমল বিমল কমল যথাক্রমে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে, অর্থাৎ অমল ফার্স্ট বিমল সেকেন্ড কমল থার্ড, তখনই বুঝতে হবে যে অজগর কেন তেড়ে আসে, আর আম কেন পেড়ে খেতে হয়। আর ই তো আরও সমস্যার। ইঁদুরছানা ভয়ে মরে। কাজেই থার্ডের অবস্থা সঙ্গীন। ঈগলপাখি পাছে ধরে। এই ঈগলপাখি কে? গ্লোবালাইজড দুনিয়ার প্রতিযোগিতামুখর ইঁদুরদৌড়ের জুজু? এই দুনিয়ায় একবার ফার্স্ট ব্লকের উচ্চতায় উঠতে পারলেই অজগরে প্রোমোশন হয় ইঁদুর থেকে। আর যে কোনও হান্ড্রেড মিটারের শেষের ওই তিন ধাপের সিঁড়ির নীচের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিযোগী ইঁদুর সেজেই থেকে যায়। যাকে ব্যর্থতাবোধের ঈগলপাখি ছোঁ মেরে কোথায় নিয়ে চলে যাবে, ঠিক নেই।

জয় গোস্বামীর 'টিউটোরিয়াল' কবিতাটি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন গল্পটা। নব্বইয়ের বদলে পঁচাশি পাওয়া ছেলেটিকে বাবা যখন ভর্ৎসনা করছে, কাগজের একদম প্রথম পাতায় থাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছে, তখন ব্যাক পাওয়া ছেলেটি বাথরুম পরিষ্কারের অ্যাসিড হাতে তুলে নেয় কাগজের প্রথম পাতায় ঠাঁই পেতে।

এই তো মাধ্যমিক শুরু হল। কিছুদিনের মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক। প্রতি বছর এই মরসুমে খবরের কাগজের পাতায় যে অবশ্যম্ভাবী আত্মহত্যার খবরগুলো উঠে আসে, সেগুলিতে জয়ের কবিতার ওই ছেলেটির মতো চরিত্র খুঁজে পাওয়া দুষ্কর নয়। তারা হল ইঁদুরছানার দলে। কিন্তু ওই যাদের আমটি পেড়ে খেতে শিখতে হয়, নির্বিঘ্নে তেড়ে যাওয়ার ক্ষমতা যাদের নেই প্রথম স্থানাধিকারী অজগরের মতো? মধ্যবিত্ত ক্রাইসিসাক্রান্ত সমাজমানসে তারা চিরন্তন মিডিওকার। এই ‘মিডিওকার’ শব্দটি মধ্যবিত্তের কাছে অতিপরিচিত লব্জ। কর্পোরেট উচ্চবিত্ত বিলাসবৈভব ঝোলানো খুড়োর কলের পিছনে ছোটানোর জন্য উপযুক্ত ঘোড়া হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা। তারাই ওই আমটি শেষমেষ পেড়ে এনে দেবে তার কাছের লোকজনদের কাছে। এইভাবেই তাদের আশা মেটাবে তারা। কিন্তু এই ম্যারাথন দৌড়ের ফাঁকেই ওই প্রথম আর দ্বিতীয়র মধ্যে যে অন্তঃসলিলা স্রোত বয়ে চলেছে চুপিচুপি, কোনও প্রত্যক্ষদর্শীকে সাক্ষী না রেখেই; সেই স্রোতটির নাম ঈর্ষা।

ঈর্ষা আদিম। ফ্রয়েড-কথিত ঈদিপাস কমপ্লেক্সের ফলের বীজ। কিন্তু এই বিশেষ পরিসরটিতে ঈর্ষার আদানপ্রদান অদ্ভুত। আমরা মাধ্যমিকে 'মালগুড়ি ডেজ'-এর একটি গল্প পড়েছিলুম, যেখানে ক্লাসের নবাগত ছাত্র ক্লাসের সমস্ত জৌলুস কেড়ে নিচ্ছিল প্রোটাগনিস্ট স্বামীনাথনের থেকে। সিংহাসনচ্যুত হওয়ার মতো ব্যাপার। কাজেই নানান ঘাত -প্রতিঘাতের পরে অবশেষে ইজ্জত বাঁচাতে স্বামীনাথন সেই নবাগতটিকে মেরে পঙ্গু করে দিতে উদ্যত হয়। কিন্তু শেষমেষ মিটমাট হয়ে যায় সব। মধুরেণ সমাপয়েৎ। কিন্তু এই মারামারি কাটাকাটির মধ্যে না গিয়েও প্রথম এবং দ্বিতীয়ের মধ্যে, স্বীকৃত জিনিয়াস এবং মার্কামারা মিডিওকারদের মধ্যে সংঘর্ষের অন্ত নেই। সেইসব ঘটনা কচ্চিৎ কদাচিৎ সরাসরি খুনোখুনির চেহারা নিলে তবেই মিডিয়ার সার্চলাইট পড়ে সেই এলাকাতে। কিন্তু সেই ভয়াবহতায় পৌঁছনোর আগের চোরাস্রোতের খবর ক’জন রাখে? আর সমাজের আর্থসামাজিক পিরামিডের একদম ওপরতলা আর একেবারে নীচেরতলা ;এই দুই জায়গাতেই দাহ্যবস্তু থেকে সরাসরি বিস্ফোরণ হয়। বাদবাকি জায়গায় আগুন থাকে ছাইচাপা।

ইংলিশ মিডিয়াম হোক বা বাংলা মিডিয়াম, একচিলতে নম্বরের জন্য শুধু ছাত্রছাত্রী নয়, অভিভাবকরা মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দেন— এ ঘটনা মোটেই বিরল নয়। কী করে অমুক ওই সাবজেক্টে একশোয় বিরানব্বই পেল-এ প্রশ্ন যিনি করলেন, দেখা যাবে ওই সাবজেক্টটিতে তার ছেলের প্রাপ্ত নম্বর হয়তো একানব্বই। এবার ষাট সত্তরে আটকে থাকা জনগণের কী হবে? আঙুর ফল টক ভেবে নিলেই তাদের সমস্যা মিটে যেত। ষাট সত্তর পেয়েই বা জীবনের কী এমন ক্ষতি হয়? কিন্তু মা বাবা ফুলপিসিমা ন’জ্যাঠাদের কল্যাণে এমনটা ভাবার জো নেই। পাখির চোখ সেই নব্বইয়ের ঘরে আটকে। ফলে তাদের ভেতর জারিত হয় ঈর্ষা। ষাট আর সত্তরের দশকের মতই অশান্ত হয়ে থাকে তাদের এই ষাট সত্তরের ঘরে আটকে থাকা ছাত্রছাত্রীদের অন্তঃস্থল। টেস্টপেপারের পাতায় মুখ গুঁজে থেকে তারা একবারও আনমনা হতে পারে না ভয়ে। যদি ফস্কে যায়? বিশ্বায়িত পড়াশোনা পরীক্ষাব্যবস্থাতে কাজেই ঈর্ষা সর্বত্র চ্যাম্পিয়ন।

কিন্তু এ তো গেলো বিদ্যাবুদ্ধির প্রসঙ্গ। বিদ্যে কমললোচনে থাকুক। কিন্তু স্কুল বা কোচিংবেলায় যখন প্রথম ধরেছে কলি মল্লিকাবনে, ঈর্ষা তো তখনও ঘাপটি মেরে ঘুনপোকার মতন প্রবেশ করে সেসব গল্পের ভেতর। 'সুরঞ্জনা কী কথা তাহার সাথে, তার সাথে'— এ পংক্তি বৃথা যাওয়ার নয়। আঠারোবার প্রোপোজ করে ব্যর্থ হওয়া ছেলেটির ঈর্ষার তালিকাভুক্ত হয়ে পড়ে মেয়েটির সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন সব ছেলেই। মলিন মেয়েটির ঈর্ষা হতেই পারে কাঙ্ক্ষিত ছেলেটির উজ্জ্বল প্রেমিকাটিকে দেখে। কোচিং এ পড়ার ফাঁকে যুগল যখন হাত ধরে, বা তাকায় আড়চোখে সংকেতবাহী হাসি সমেত, তখন কার হৃদয় জতুগৃহতে পরিণত হচ্ছে আশেপাশে, সে কুশল সবাই জানে না। শুধু স্কুল বা কোচিং কেন, কলেজ-ইউনি চত্বরেও এ গল্প সমান। সেখানে জমা-খরচের হিসেব আরেকটু অন্যরকম। ইউনিয়নের ক্ষমতাচক্র, কালচারাল কেচ্ছাকেলেঙ্কারিতে নেতৃত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করে সেখানে কখনও ভেতরে ভেতরে কখনও প্রকাশ্যে লড়াই চলে নিরন্তর। তার মধ্যেই যখন দেখা যায়, আকুল প্রেমিকের চোখের সামনেই মেয়েটির প্রগলভ হাসির শরিক হচ্ছে তারই কোনো কাছের বন্ধু হয়তো, বা আলতো করে সিনিয়রের কাঁধে মাথা রাখার ছলে মেয়েটি বুঝিয়ে দিচ্ছে ছেলেটিকে যে প্রশ্ন যেমন সহজ তেমন উত্তরও জানা, তখন এইসব 'পাওয়ার' এবং না পাওয়া-র হিসেবগুলো জোরদার হয়ে ওঠে কখনও-সখনও।

তবে এমন নয় যে এই গোটা প্রজন্মটাই ডুবে আছে এমনই ঈর্ষার আঁধারে। এরই মধ্যে ‘ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে’-র প্রত্যয়ও আছে। বন্ধুনির্ভর বিকেলগুলোই আয়ুধ হয়ে অন্তর্ঘাত ঘটায় এহেন ইঁদুরদৌড়ের সভ্যতার কলুষতায়।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -