SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

ক্লাস-ক্যান্টিন-ক্যাম্পাস: পরীক্ষা শেষ, এবার বিদায় বলতে হবে

মে ২১, ২০১৭
Share it on
...কোচিংয়েএ ওই দিনটায় চুপচাপ থাকা গম্ভীর মেয়েটি হঠাৎ পাশের ছেলেটিকে মিষ্টি হেসে হঠাৎ কোনও একটি প্রশ্ন করে বসত।

বিকেল শেষ হয়ে সন্ধে নামবে নামবে দেখলেই মনে হয় বুঝি গঙ্গার ধার বেয়ে, কোচিং যাওয়ার রাস্তা ধরে, স্কুলফেরতা জল জমে যাওয়া গলি দিয়ে, ঘাস উঠে যাওয়া মাঠ দিয়ে চেনা দুঃখ চেনা সুখের সময় চলে যাচ্ছে ওই। ভাস্কর চক্রবর্তীর 'জিরাফের ভাষা'-র আটচল্লিশ নম্বর কবিতার একটি পংক্তি প্রবল জনপ্রিয়, ‘তোমাকে দুঃখিত করা আমার জীবনধর্ম নয়/চলে যেতে হয় তাই চলে যাচ্ছি’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, "টুটবে আগল বারে বারে/লাগবে আমায় ফিরে ফিরে/ফিরে আসার হাওয়া"। চলে যাওয়া ফিরে আসা মুখর হয়ে বেঁচে থাকে ফিকে সময়ের স্মৃতিতে।

একটু পক্ষপাতী হয়ে নেওয়া ভাল প্রথমেই। এ লেখার রসদ আপাদমস্তক জমে রয়েছে উত্তর কলকাতার বড় হওয়ায়, উত্তর কলকাতার কৈশোরে। তবে ডিপার্চারের হাওয়ার তো আর দেশকাল হয় না, তা ছুঁয়ে যায় সব জায়গাকেই, তার উত্তর-দক্ষিণ হয় না। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শেষ হল। রেজাল্ট প্রকাশিতব্য। বিভিন্ন কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়েও স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ফুরোবে। বন্ধুযাপন শেষ হওয়া অনেকটা ক্যারামের জমাট বাঁধা ঘুঁটির এদিকওদিক ছিটকে যাওয়ার মতন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়টা আদতে টিকে থাকে 'অবান্তর স্মৃতির ভিতর'। সেই ক্লাস সিক্সে বেঞ্চের পাশে বসা যে বন্ধুটার থেকে প্রথম গালাগাল শেখা, পর্ণোগ্রাফি কী এবং কেন নিয়ে সিরিয়াস গোপন আলোচনা ঘুমপাড়ানি কোনো ইতিহাসের ক্লাসের ফাঁকে, ক্রিকেট থেকে বলিউড, স্পাইডারম্যান থেকে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড নিয়ে কথাবার্তার মেহফিল, সেই বন্ধুটিকে মনে পড়বে স্কুলসংলগ্ন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়ে কোনও গরমকালের সন্ধেতে হয়তো বা।

পেনফাইট বলে একটা খেলার খুব চল ছিল আমাদের সিক্স কি সেভেনবেলায়। হ্যান্ডক্রিকেট, বুকক্রিকেট— এসব খেলার কথাও মনে পড়ে। ক্লাসরুমের ভিতরের খেলা এগুলো। বেঞ্চে বসে বসে এই খেলা জমে উঠত অচিরেই। এই খেলাগুলোর কথা হয়তো একদিন হঠাৎ মনে পড়ে মেঘ করে এলে স্কুলের পাশের গলিতে দাঁড়িয়ে। স্কুল সেরে ফেরার সময় কোচিং এর কোনও সতীর্থকে দেখে ফেলা কত বিকেলকে পাল্টে দিয়েছে! এমন কোনও সতীর্থ যাকে দেখলেই ছ্যাঁৎ করে ওঠে বুক, সাহস করে একটা চিরকুটে হাবিজাবি লিখে দিতে গিয়ে বা বাবা বা মা-এর ফোন থেকে এস এম এস করতে গিয়ে থমকে যেতে হয়েছে। সে একটা সময় যখন বাবা মা-এর অফিস বা বাড়ির কাজের যাবতীয় ব্যস্ততার থেকেও জরুরি হয়ে উঠত অমুক স্যারের কোচিংয়ের নোট কার থেকে পাওয়া যাবে, কোন স্যারের বই পড়লে ভৌতবিজ্ঞান জলবৎতরলং হয়ে যাবে। সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে মিলিটারি তৎপরতায় পড়াশোনা শুরু হওয়ার আগে মাঠের ধুলো মেখে ফেরার সময়ে কী মনে হত, আর দশবছর বাদে এই রাস্তা দিয়ে এই ফেরাটা আবছা কোনও জলছবির মতো ব্যথাতুর স্মৃতিসুখের উপাদান হয়ে যাবে? বিকেলের আলো পড়তে পড়তে ল্যাম্পপোস্ট জ্বলে উঠল যখন, তখন ঘরে ফেরা পাখিদের সব ডাক উথালপাথাল করে মনে করাবে একটা প্রশ্ন, ‘কাল বিকেলে খেলতে আসবি?’।


সেই সব প্রথম নেশা আর প্রথম স্বপ্নের দিন, ‘যো জিতা ওহি সিকন্দর’ (১৯৯২)

মাধ্যমিকের আগের থমথমে টেস্টপেপারনিবিড় সময়ে একবার অঙ্ক করতে করতে আনমনা হয়ে পড়ে যে ভেবেছে, এই বুঝি দিঘি থেকে সমুদ্রে নাও ভাসাতে হবে। এবং সে কথা ভেবে যার ভয় হয়েছে, কষ্ট হয়েছে, রোমাঞ্চ হয়েছে সে বয়ঃসন্ধি পেরনোর ওই আগুনরঙা গোধূলিকে ভুলে যাবে কী করে? পুজোয় প্রথমবার বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে বাবা মা-র দেওয়া একশো টাকার কয়েকটা নোটের ভিতর থেকে যাকে সাবধানে খরচ করতে হয়েছে ফুচকা-চাউমিন বা বেলুন ফাটানোর জন্য, সে সেই পুজোটাকে মনে তো রাখবেই সারাজীবন। যে ছেলেটি বা মেয়েটিকে কোচিংয়ে ভীষণ সিরিয়াস পড়ুয়া মনে হয়েছে, তাকে রঙচঙে জামাকাপড়ে পুজোয় বেরোতে দেখে চোখে ধাঁধা লেগেছে। রোজকার রাস্তাকে আলোঝলমল হয়ে উঠতে দেখার জন্য যে অপেক্ষা, তা-ও মনে পড়ে যায় আচমকাই। পুজোর আগের শেষ স্কুলের দিনে রাগী ভূগোলের স্যার হঠাৎ ক্লাসে এসে গল্প জুড়তেন, কোচিংয়েএ ওই দিনটায় চুপচাপ থাকা গম্ভীর মেয়েটি হঠাৎ পাশের ছেলেটিকে মিষ্টি হেসে হঠাৎ কোনও একটি প্রশ্ন করে বসত।

কলেজ যাওয়া কলেজ থেকে ফেরার ফাঁকে এসব স্মৃতি মনের অতলে ঘাই মারে আচমকা। ডুব দিয়ে ভেসে ওঠে আবার আসাযাওয়ার সমীকরণ। নতুন জীবন, নতুন রুটিন, নতুন বন্ধু এসে ঘেঁটে দেয় মুখস্থজীবন। পুরনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখার পরে 'হঠাৎ অকারণে হেসে ওঠার দিন'-এর স্মৃতিচারণ, কোনো স্যারের সঙ্গে আচমকা দেখা হলে ঢিপ করে পেন্নাম ঠোকা, তার ক্লাসে তাকে নিয়ে টোন-টিটকিরি কাটার কথা মনে পড়ে আলতো হাসা এসব জারি থাকে। হিমানীশ গোস্বামীর জিব্রাম বা সুকুমার রায়ের পাগলা দাশুর কাছাকাছি কেউ একটা থেকে যায় স্কুলবেলায়, তার কথা এক একদিন মধ্যরাতে ধাক্কা দেয় এসে।


খেলার সাথি, বিদায়দ্বার খোলো , ‘ওপেন টি বাইস্কোপ’ (২০১৫)

দেখতে দেখতে কলেজবেলাও ফুরিয়ে আসে। স্কুল বা কোচিং কেটে একবার কি দু’বার সিনেমা দেখতে বা ময়দানে হাওয়া খেতে গেছে যারা, কলেজে অফ পিরিয়ডে বা অনিচ্ছায় ক্লাস না করে ঘুরতে যেতে তাদের আর কোনও অ্যাডভেঞ্চারবোধ কাজ করে না। লুকোছাপার দিন ফুরোয়। প্রেম অপ্রেম অনেক পরিণত হয়ে ওঠে, বড়দের মতন। ক্রমে ক্যান্টিন বা লাইব্রেরির যেসব মানুষ কলেজজীবন জুড়ে খানিক অলক্ষিত থেকে গেল, শেষবেলায় এসে তাদের কথাও মনে থেকে যাওয়ার অঙ্গীকার দানা বাঁধে।

নস্ট্যালজিয়া বাঙালির বদরোগ, বলেন অনেকে। অনেকেই অভিযোগের সুরে বলেন, টিভি সিনেমা খবরের কাগজের সাপ্লিমেন্টারি— সর্বত্র নস্ট্যালজিয়ার রসে ভিজে চুপচুপে হয়ে থাকাটাই দস্তুর হয়ে উঠছে বাঙালির পক্ষে। কিন্তু এই নীরবে পেরিয়ে যাওয়া সময়টুকু ক’জনের বুকে বেজে ওঠে না তিলক কামোদের মতো মেঘলা কোনও সুরে? চলে যাওয়া, ছেড়ে যাওয়া সময়ের স্বভাব। তবু তার মাঝেই গেয়ে ওঠা যায় দিব্যি, ‘স্যাড টু সে/আই অ্যাম অন মাই ওয়ে’।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -