SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

চিকিৎসক জানালেন আমি ‘এইচআইভি আক্রান্ত’, বুঝতেও পারলাম না’

জুন ২৮, ২০১৬
Share it on
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার কেবিনে হাজির সেই ডাক্তারনী। যিনি আমার পরিচয় না জেনই অস্ত্রোপচার করেছেন। তাঁর সঙ্গেই চলে এসেছেন সুপারও। পিছন পিছন কয়েক জন নার্স।

(পূর্ব কাহিনি— গুরু তেগ বাহাদুর হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হয়েছে মগরাহাটের সাহসিনীর। হাসপাতালের এক মহিলা ডাক্তার নিজের দায়িত্বে সাহসিনীর এই অস্ত্রোপচার করেন। জ্ঞান ফিরতেই সাহসিনী জানল, আসলাম ধরা পড়েছে। ধরা পড়ার সময় পুলিশকে নাকি বারবার সে বলার চেষ্টা করেছিল যে সাহসিনী তাঁর ভাইঝি। একথা শুনে সাহসিনীর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। তারপর...) 

সবই হল। কিন্তু, বড্ড দেরিতে। আর একটা বছর আগে পুলিশ যথাযথ উদ্যোগ নিত তাহলে এই দিন দেখতে হত না। ডাক্তারনী কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ছাদের দিকে তাকিয়ে এইসবই সাত সতেরো ভাবছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম যদি আসলামকে একটিবার চোখের সামনে দেখতে পেতাম। তাহলে কত সুখই না পেতাম। যে অত্যাচারের বোঝা আমি গত এক বছর ধরে সয়েছি, আজ আসলামের সঙ্গে যদি সেই সব করতে বলা হয় তাহলে ওর কী অবস্থা হবে? আমি দেখতে চাই আসলাম কষ্টে তড়পাচ্ছে। অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কাতরাচ্ছে। যে ভাবে আমি প্রতিটি দিন কাতরেছি, ঠিক তেমন ভাবে তড়পাতে হবে আসলাম এবং তাঁদের গ্যাঙের প্রতিটি লোককে। ছাদের দিকে দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমি যেন আরও তেতে উঠেছিলাম। একটা সময় চিৎকার করে কেঁদে ওঠলাম। ছিটকে বেডের উপর বসে পড়লাম। প্রাণপণে এক চিৎকার জুড়লাম। এতদিন ধরে শরীর জুড়ে বয়ে চলা সমস্ত যন্ত্রণা যেন এক লহমায় বেরিয়ে আসতে চাইল। আমি সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে ওঠেছি। আমার চোখগুলো যেন কোঠর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এত উত্তেজনা কখন আমার শরীরে চলা ওষুধের চ্যানেলগুলো ছিঁড়ে গেল। 
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার কেবিনে হাজির সেই ডাক্তারনী। যিনি আমার পরিচয় না জেনই অস্ত্রোপচার করেছেন। তাঁর সঙ্গেই চলে এসেছেন সুপারও। পিছন পিছন কয়েক জন নার্স। কয়েক জন ওয়ার্ড বয়ও ছুঁটে এসেছেন। কিন্তু, ততক্ষণে আমার আর্তনাদের সঙ্গে মিশেছে গভীর কান্না। ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠছি। আমার অবস্থা দেখে মহিলা ডাক্তার আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন। আমার কান্না যেন আরও বেগ পেল।
আমাকে অনেক চেষ্টা করেও শান্ত করা গেল না। আমার কান্না থামছিল না। কান্নার চোটে সমানে কাঁশিও শুরু হয়ে গিয়েছে। চিকিৎসকরা আর ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। তাঁদের আশঙ্কা অস্ত্রোপচার হওয়া স্থানে এই প্রভাব পড়বে। সেই মহিলা ডাক্তার ফের আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আমার শরীরটাকে বিছানার উপর এলিয়ে দিলেন। এক নার্স তৈরি ছিলেন। আমার শরীরটা বিছানার কাছাকাছি আসতেই তিনি আমাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে দিলেন। এর থেকে আর কোনও সহজ রাস্তা ছিল না আমাকে শান্ত করার। আস্তে আস্তে আমার চোখে নেমে এল ঘুম। 

সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন খিদেয় পেট ফেটে যাচ্ছে। প্রবল খিদে পেয়েছে। ঘড়িতে ক’টা বাজে জানি না। মনটা বেশ ভালো লাগছে। কিছুক্ষণ পরে আমার কেবিনে এক ওয়ার্ড বয় এল। আমার জ্ঞান ফিরেছে আমার দিকে চেয়ে থাকল। আমি বললাম, খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে দাও না। ওয়ার্ড বয় কি বুঝল বুঝতে পারলাম না। খানিক পরে এক নার্সকে সঙ্গে করে এনে হাজির। নার্স আমাকে বলল— ‘কি হয়েছে?’ বললাম, ‘খিদে পেয়েছ।’নার্স চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে সকালের ওই ওয়ার্ড বয় খাবার এনে হাজির করল। 
সকাল ১০টা বাজে এখন। শুয়ে শুয়েই কেটে যাচ্ছে দিনগুলি। হাসপাতালের সেই মহিলা ডাক্তার আমার কাছে এলেন। বললেন, ‘জরুরি কিছু কথা আছে।’আমি বললাম কি হয়েছে। মহিলা ডাক্তার বললেন, ‘তুমি এইচআইভি পজিটিভ’হয়ে গিয়েছো। বুঝলাম না ডাক্তারনী কী বললেন। আমি মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার কাছে এগিয়ে এলেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘ভয় পেও না। নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। ভাল হয়ে যাবে’। আমি বললাম, এটা কি গো? ডাক্তারনী আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। এই প্রথম দেখলাম ডাক্তারনী চোখের কোণায় এক টুকরো জল চিকচিক করছে। আমি বুঝলাম গুরুতর কিছু হয়েছে আমার। ডাক্তারনী বলল, ‘এইচআইভি পজিটিভ মানে এডস’। আমি কিছুই বুঝলাম না। আমার মাথায় ফের হাত দিয়ে বলল, ‘কাউন্সেলিং করলে ভাল থাকবে।’ চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তারনী। আমি কেমন উদাস দৃষ্টিতে তাঁর প্রস্থান পথ থেকে চোখ সরাতে পারলাম না। আমার চোখটাও জ্বালা করে উঠল। কি জন্য? জানি না। আসলে অচেনা-অজানা এমন এক মানুষের কাছে এমন স্নেহই হয়তো আমার চোখটাতে জ্বালা ধরিয়ে দিল। 
(ক্রমশঃ)

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -