SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

দোকানঘর: তুন্দ্রা রঙের আইসক্রিম আর হিমঘরে শোয়ানো ছোটবেলা

জুন ৮, ২০১৭
Share it on
‘‘ওই বয়সেই কী ভাবে যেন বুঝে যেতাম, যা পাচ্ছি, তার বেশি চাইলে কষ্ট পাবে বাবা আর মা। তাই গরম পড়লে আমি ভাবতে শুরু করতাম আইসক্রিমের কথা। কাউকে কিছু না জানিয়ে।’’

যখন খুব গরম পড়ত ছোটবেলায়, আমি ভাবতাম আইসক্রিমের কথা। আইসক্রিম খাবার কথা ভাবতাম না কিন্তু। কেবল আইসক্রিমের কথা ভাবতাম। দুপুরবেলায় নিঝুম পাড়ায় হেঁটে যাওয়া আইসক্রিমওলার গাড়ি থেকে বার করে আনা চার আনার কমলা রঙের কাঠি আইসক্রিম নয়। সে তো আমরা খেয়েছি একেকদিন। খাইনি তখনও যে-আইসক্রিম, সেই কাগজের বেঁটেখাটো কাপের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আইসক্রিমের কথা ভাবতাম। ভেবে ভারি আরাম পেতাম একরকম।

খাওয়ার কথা ভাবতাম না মোটেই, কেন না সে তো আমার হাতে নেই। আমাদের ছোটবেলায় এমনকী চাওয়াও থাকত না আমাদের হাতে। মুখ ফুটে কিছু যে চাইব বাবা-মা’র কাছে, পারতাম না বিশেষ। ওই বয়সেই কী ভাবে যেন বুঝে যেতাম, যা পাচ্ছি, তার বেশি চাইলে কষ্ট পাবে বাবা আর মা। বাবা’র মাইনে, মা’র উপার্জন দিয়ে সেলাই করা ভাড়াবাড়ি’র ছোট্ট জীবনে এটুকু বুঝতে আমাদের দেরি হতো না। তাই গরম পড়লে আমি ভাবতে শুরু করতাম আইসক্রিমের কথা। কাউকে কিছু না জানিয়ে।

কিন্তু একদিন কীভাবে সেই ভাবনার কথা জেনে গেল দু’জনে। বাবা আর মা। কী কারণে যে তারা খুশি হয়ে উঠেছিল সেই সন্ধেবেলায়, তা ঠিক জানতে পারিনি। কিন্তু শুনলাম, বাইরের ঘরে বাবা বলছে মা’কে, ‘‘ওকে তাহলে একটু আইসক্রিম খাইয়ে আনি’’। সেইদিন একটা ব্যাপার হল।
এমনিতে আমাদের বাড়ি থেকে গড়িয়ার মোড় মিনিট দশেকের হাঁটাপথ ছিল। বাবা কখনও সন্ধেবেলায় বাড়ি ফেরার পর কোনও কাজে গড়িয়ার মোড়ে গেলে আমিও হাত ধরে যেতে চাইতাম। বাবা নিয়েও যেত আমায়। হয়তো ছোটখাটো কোনও জিনিস কেনার আছে, কিংবা দেখা করার কথা আছে কারও সঙ্গে, চললাম আমি পাশেপাশে। শান্ত নিরিবিলি টিমটিমে একটা পাড়া থেকে এইটুকু হাঁটলেই গমগমে ধোঁয়া ওঠা রাস্তাঘাট আর ভিড়ের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া ভিড় আর নানান পসরা সাজানো দোকানপাটের সারি আর ট্যাক্সি অটো বাস রিক্সার জমকালো নক্সা। সেসব আমার এতই ভাল লাগত যে তাকিয়েই থাকতাম হাঁ করে। আর তাকিয়ে থাকতাম একটা দোকানের দিকে, আড়চোখে।


স্লেজগাড়ির শীতকাল নেমে আসত প্রথম কামড়েই। ছবি: পিক্সঅ্যাবে

দোকানের নাম ছিল ‘টুকটাক’, হলুদের ওপর লাল দিয়ে লেখা থাকত ‘TUK TAK’। গড়িয়ার মোড়ে একমাত্র ইংরেজি নামের দোকান বলে তার যত না খ্যাতি ছিল, তার চেয়েও বেশি নামডাক ছিল রোল বিক্রেতা হিসেবে। সারাক্ষণ মানুষের গমগমে আসা-যাওয়া লেগেই আছে, সেইসঙ্গে চলছে বিরাট তাওয়ার উপরে পেঁয়াজ আর মাংসকুচির ছ্যাঁকছোঁক। পাঁচ-সাতটা দোকান আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছে গন্ধ, ওই বুঝি এগরোল চাপল এবারে। এই যে ‘TUK TAK’-এর দিকে আমার আন্তরিক চেয়ে থাকা, তা কিন্তু ওইসব রোলের কারণে নয়। অদ্ভুত একটা অল্প আলোর মধ্যে, রোল কাউন্টারের সামনে রাখা থাকত একটা ছোট্ট ফ্রিজার। যার গায়ে ‘K’ দিয়ে কোয়ালিটি লেখা। আমি জানতাম ওর মধ্যে কী আছে। তখন সেই কোম্পানির লোগো নীল ছিল, লাল হয়ে যায়নি তখনও। সাদার উপরে নীল দিয়ে লেখা সেই শব্দের জাদু আমি চেটেপুটে খেতাম চোখ দিয়েই।

সেইদিন বাবার হাত ধরে যখন পাড়ার সরু সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, পেরিয়ে যাচ্ছি খালের উপর ঢেউ খেলানো সিমেন্টের ব্রিজ, এগোচ্ছি গড়িয়ার ভিড়ভাট্টা মোড়ের দিকে, কেবলই আমার মনে পাক খাচ্ছে সেই সাদা চৌকোনো ঠান্ডাবাক্সের কথা, যার ডালা আজ প্রথমবার আমার জন্যে খুলবে, আমার জন্যে রোলের গরম ধোঁয়ায় মিশে যাবে হিমশীতল সাদাটে কুয়াশা, কেবল আমার জন্যে বেরিয়ে আসবে চ্যাপ্টা গোলগাল একটা কাপ। আর সেইসঙ্গে, যা আমার বিশেষ ভাল লাগে, খুব হালকা বাদামি সেই কাঠি, যে কিনা অনেকটা পেটমোটা ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেটের মতো দেখতে। এইসব যে সত্যি সেদিন আমারই জন্যে হবে, সেইটা বিশ্বাস করতে করতেই দেখি বাবা আমার হাত ধরে ‘TUK TAK’-এ ঢুকছে।  


শান্ত তুন্দ্রার স্বাদ পাওয়া গিয়েছিল সেই আইস ক্রিমে। ছবি: পিক্সঅ্যাবে

আমি ভ্যানিলা চেয়েছিলাম। কারণ সে ছিল সাদা। দুধসাদা। সে ছিল বরফের ছোট বোনের মতোই দেখতে। শান্ত। নিরীহ। কারণ সে ছিল সবচাইতে কমদামি। দু’টাকা বোধহয় দাম ছিল তখন, দুপুরের কাঠি আইসক্রিমের আট গুণ। প্রথম বার কাপের উপরকার পাতলা কাগজের ঢাকা টেনে সরানোর মধ্যে যে-খুশি, তা আর কোনও দিন একভাবে ফিরে পাইনি। সেই কাগজের উল্টোপিঠে লেগে থাকা বরফের ছোপ চেটে খেয়ে নেওয়া প্রথমেই। তারপর জমাট মোলায়েম বরফের মধ্যে খুব আস্তে চালিয়ে দেওয়া শাবল। লম্বালম্বি খুঁড়ে ফেলা চলবে না মোটেই। মসৃণ বরফের উপর থেকে আলতো করে চেঁছে নিতে হবে একটু একটু। আস্তে আস্তে তৈরি হবে রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে রাতের বেলা ছুটে যাবে স্লেজগাড়ি, এক ডজন বল্গা হরিণ যার সামনে ছুটছে শিং বাগিয়ে। ঠান্ডায় লোকজন বাড়ি থেকে বেরোবে না একেবারে। দূরে বেঞ্চের হাতলে, গির্জার চুড়োয়, গাছের মাথায় জমে থাকবে ঝুপঝুপ বরফ। আমি কেবল, ওই প্রথম সন্ধেবেলাতেই, ভ্যানিলার সাদায় নখে দাগ কেটে তৈরি করেছিলাম পায়ের ছাপ। কেউ একজন হয়তো বেরিয়েছে এই ঠান্ডার মধ্যেও, কাছেই কোথাও যাওয়ার আছে তার। কাজে, নয়তো বা এমনিই। কিন্তু যাচ্ছে সে। ওই স্লেজের দাগের পিছুপিছু, বরফঢাকা বেঞ্চিটার দিকেই মনে হয় হেঁটে চলেছে। বাবার হাত ছাড়িয়ে, গড়িয়ার মোড় পেরিয়ে, বেয়াল্লিশটা বছর পার ক’রে, একটা শেষ-না-হওয়া ভ্যানিলা আইসক্রিমের উপর দিয়ে সে পার হতে চাইছে পৃথিবী। আমি, এই হাফপ্যান্ট পরা, ক্লাস থ্রি’র ছোট্ট আমি, সেই নীল-সাদা ঠান্ডাবাক্সের পাশে দাঁড়িয়ে কাগজের কাপের মধ্যে তাকে হেঁটে যেতে দেখছি আজও। তুন্দ্রা রঙের আইসক্রিম পেরিয়ে যেতে দেখছি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত ধরে।  

আমাদের ছোটবেলাটাও আসলে ওই আইসক্রিমের মতোই। ঠান্ডাবাক্সে বন্দি। হিমঘরে শোয়ানো। মিথ। কিংবা হয়তো মিথ্যেও। বাইরে আনলেই গলে যাবে।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -