SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

এই বেশ ভাল আছি: গোড়ার কথা

ডিসেম্বর ২৬, ২০১৫
Share it on
আমেরিকায় দীর্ঘদিন বসবাস করা নির্জন কারাবাসের থেকেও এক হিসেবে কঠিন। এতটা সামাজিক ও বৌদ্ধিক বিপর্যয় আর কারও হয়েছে বলে চোখে পড়ে না।

আমাদের বাঙালিদের কতগুলো গুণ ছিল। তার মধ্যে একটা হল চুপ করে থাকা ও অন্যের মূর্খামি দেখে মনে মনে হাসা। যা এখনও একটু-আধটু অবশিষ্ট আছে আমাদের মেয়েদের মধ্যে। তাঁরা আমাদের মতো ছেলেদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসেন। আমাদের আর একটা গুণ ছিল। তা হল, যে বিষয়ে জানি না, সে বিষয়ে বেশি কথা না-বলা। কোথায় থামতে হয়, কখন থামতে হয়, তার ধারণা থাকা। আসলে, এই দুটোই একটা আয়নার মধ্যে দিয়ে একই জিনিস দেখা, দু’রকমভাবে।

গত তিরিশ বছরে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে এই দুটোই একেবারে লোপ পেয়েছে — মুষ্টিমেয় কিছু লোকের মধ্যে ছাড়া। মাথায় চড়ে যারা বসেছে, তারা এত মূর্খ আর এত বেশি বাজে কথা বলে যে, লোকে মনে মনে হাসলেও তারা সেটা বোঝে না। বাঙালি মূলত কবি, শিল্পী, গায়কের জাত। সংবেদনশীল জাত। সে শহরেই হোক বা গ্রামে। আমরা কল্পনা করতে পারতাম। স্বপ্ন দেখতে পারতাম। আমরা স্বপ্ন দেখিয়েছি সারা দেশকে। সে স্বপ্ন কীভাবে সফল করতে হয়, তার রাস্তাও দেখিয়েছি। আজকে স্বপ্ন দেখানোর, কল্পনা করানোর কেউ নেই। সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আজ সব কিছুই একেবারে উলঙ্গ। ঠিক বলিউড সিনেমার মতো। মাইকে তারস্বরে বাজানো হিন্দি গানের মতো। ব্লু ফিল্মের লজ্জার নেপথ্য  নায়িকাদের গৃহস্থবাড়ির অন্দরমহলে ঢুকে পড়ার মতো। যেখানে বুদ্ধি, বিশ্লেষণ  এবং বিবেকের আর কোনও  জায়গাই নেই। যেখানে তিরিশ বছরের পুরুষ দশ বছরের বালকের মতো ব্যবহার করে। এবং অন্যায় আবদার করে। আর একটা পঁচিশ বছরের মেয়ের চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়, কিন্তু সমাজ ও পরিবার তাকে ‘‘অতি পাকা’’ বা ‘‘অ্যাবনর্মাল’’ বলে অগ্রাহ্য করে।

অদ্ভুত, আমরা রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সত্যজিৎ রায়, নজরুল ইসলাম— এঁদের নাম শুনলেই কেঁদে ভাসিয়ে দিই। অন্য কত দেশ দেখি, কত দেশের কত মানুষ দেখি। আমেরিকায় তিরিশ বছরে এত দেশের মানুষ এত কাছ থেকে দেখলাম। এতটা সামাজিক ও বৌদ্ধিক বিপর্যয় আর কারও হয়েছে বলে চোখে পড়ে না। কেউ ভাবে না। বিশ্লেষণ করে না। কোনও উপলব্ধি আর নেই।

ওঃ, বলতে ভুলে গিয়েছি। এ লেখার কোনও রাজনৈতিক রং নেই।

যারা বিদেশে থাকেনি, বিশেষ করে আমেরিকা বা জার্মানির মতো দেশে থাকেনি, এবং দীর্ঘদিন থাকেনি, তারা বুঝতেই পারবে না নিঃসঙ্গতা কী ভয়ানক হতে পারে। আমার বিভিন্ন লেখায় আমি এই নিঃসঙ্গতাকে আন্দামান সেল্যুলার জেলে বিপ্লবীদের কয়েদ করে রাখার সঙ্গে তুলনা করেছি।
কিন্তু, আমার মনে হয় আমেরিকায় দীর্ঘদিন বসবাস করা এবং ছোট ছোট জায়গায় বসবাস করা সেই নির্জন কারাবাসের থেকেও এক হিসেবে কঠিন। ওখানে তা-ও মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়। এক ধরনের মানুষ। এক ধরনের বন্দি, যারা একই রাজনীতি, সমাজনীতি, সাংস্কৃতিক ভাবনাচিন্তা পোষণ করেন। কিন্তু আমেরিকায় যে সব বাঙালি আছেন, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি, তাঁদের খুব কাছ থেকে না-দেখলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না বাঙালি এ রকম হতে পারে।

আগে আগে যখন বয়স কম ছিল আর এনার্জি অনেক বেশি ছিল, তখন অধার্মিক হয়েও দুর্গাপুজো, সরস্বতী পুজো অর্গানাইজ করেছি কেবলমাত্র সেখানে একটু গানবাজনা, নাটক, হইচই করা যাবে বলে। এছাড়া রবীন্দ্রজয়ন্তী, নববর্ষ তো করেইছি। প্রতি বছর একটা করে নাটক নামিয়েছি। বাদল সরকার থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়। একবার ‘খগম’ গল্পের নাটকের রূপ দিয়ে নামিয়ে দিলাম। আর একবার ‘বিরিঞ্চি বাবা’। আমি করলাম রবি ঘোষের রোলটা। উচ্চতার দিক থেকে খুব মানিয়ে গিয়েছিল। মানে, দৈহিক উচ্চতা।

একবার আমাকে একটা ছোট শহরের বাঙালি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা নিয়ে সে সমাজ মাঝখান থেকে রুটি ছেঁড়ার মতো করে ছিঁড়েই গেল। কারণ আমরা গরিব ছাত্র, আমাদের এত দুঃসাহস প্রেসিডেন্ট হওয়ার, যেখানে বাড়িতে সুইমিং পুল, মার্সিডিজ-ওয়ালা বাঙালি এতগুলো রয়েছে! একবার এক বাঙালি ডাক্তার আর বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার দু’জনের মধ্যে হাতাহাতি লেগে গেল হেমন্ত বড় না মান্না বড় — এই নিয়ে। আমরা দু’-একজন ছাত্র মাঝখানে পড়ে মারামারি থামালাম। একবার আইআইটি-র এক বীরপুঙ্গবের বাড়ি জরুরি ফোন পেয়ে গিয়ে দেখি বউটাকে মেরে সারা মুখে কালশিটে বসিয়ে দিয়েছে। আর কত বলব!

অবশ্য অনেক উদারহৃদয়, বন্ধুবৎসল, প্রগতিশীল বাঙালিও এদেশে আছেন। তাঁদের কাছে অনেক স্নেহ ভালবাসা, প্রেরণা, উৎসাহ পেয়েছি। তাঁদের কথা না-বললে অন্যায় হবে। তাঁদের কথাও বলব।

বাঙালি জাতটাকে বিদেশে না-এলে চিনতে পারতাম না। এত সত্যদর্শন হত না। এক জীবনে কোথা থেকে কোথায় এসে পৌঁছলাম! সেই উত্তর কলকাতার পেয়ারাবাগান আর মদের গলির বস্তি থেকে নিউ ইয়র্ক শহরে স্থায়ী বাসিন্দা। আমেরিকানরা ভক্তিছেদ্দা করে।
খুব ভাল আছি। বাজে কথা বলি না। বাজে সময় নষ্ট করি না। জীবন একটা পূর্ণতা পেয়েছে।

এই বেশ ভাল আছি!

 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -