SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

এই বেশ ভাল আছি: ৯/১১-র জন্য আর কতদিন মায়াকান্না কাঁদবে বাঙালি?

সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৬
Share it on
উগ্রবাদীরা আবার নতুন করে চোখের বদলে চোখ উপড়ে নিতে চাইবে। আর, এক বিরাট সংখ্যক লোক সবাইকে বোঝাবে, তাদের সকলেরই কেউ না কেউ নিউ ইয়র্ক-এ সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল।

সেই ভয়াবহ দিনটা পনেরো বছর পার করে আবার সামনে এসে উপস্থিত। কাগজে কাগজে, টিভি-রেডিওতে, অনলাইন মিডিয়াতে বড় বড় লোকেদের বড় বড় কথার ফুলঝুরি ছুটবে। লোকে শুনে কাঁদবে, পড়ে আবেগাপ্লুত হয়ে যাবে।

আমরা যারা ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সেই ভয়ংকর, মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি, তাদের কাছে এখনো সেদিনটা জ্বলন্ত বাস্তব। যাঁরা দেশে বসে টিভিতে টুইন টাওয়ার্স ভেঙে পড়ার দৃশ্য দেখে, আর খবরের কাগজে ইংরিজি হিন্দিতে বাংলায় বিশদ বিবরণ পড়ে মনে করেছেন তাঁরা সব কিছুই জানেন, তাঁদের জন্যে আমার অনুকম্পা রইল। 

কথাটা মনে হলো, কারণ এবার ৯/১১-র পনেরো বছর পূর্তি নিয়ে দেশের কাগজে আর টিভি-রেডিওতে বিস্তর অশ্রুমোচন হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায়— ফেসবুকে, টুইটারে— অসংখ্য লাইক পড়বে। রি-টুইট করবে লোকে। বিশাল বিশাল ব্যক্তিত্বরা বাছা বাছা উক্তি করবেন। ওবামা, হিলারি, ট্রাম্প, বিল ক্লিন্টন, আর আমাদের মোদী, রাহুল, সোনিয়া। 

উগ্রবাদীরা আবার নতুন করে চোখের বদলে চোখ উপড়ে নিতে চাইবে। আর অনেকে তাদের কথায় মনে মনে সায় দেবে। 

আর, এক বিরাট সংখ্যক লোক সবাইকে বোঝাবে, তাদের সকলেরই কেউ না কেউ নিউ ইয়র্ক-এ সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল। ফলে, তাদের সবাই এ বিষয়ে এক একজন বিশেষজ্ঞ। 

আমেরিকা সম্পর্কে খুব কম জেনেই সবাই আজকাল বিশেষজ্ঞের মতামত দেন। আমরা যখন দেশে যাই, মনে হয়, আমরাই সবচেয়ে কম জানি আমেরিকা সম্পর্কে। কিন্তু আমরা এদেশে আজ তিরিশ বছর রয়েছি। আমাদের মেয়ে ৯/১১-র দিন সারাদিন নিখোঁজ ছিল। আমরা ওকে ফেরত পেয়েছিলাম রাত এগারোটার সময়ে। সারা গায়ে ধূলো, ছাই আর কাদা মেখে ও এক বন্ধুর মায়ের গাড়িতে বাড়ি ফিরে এসেছিল। তার পর ওর কাছ থেকে জেনেছিলাম সারাদিনের ঘটনা। 

দেশের লোকেরা কি এসব জানেন?

কেউ জানেন না। খুব কম লোকই এদেশের প্রকৃত ঘটনা ও তার কারণ জানার চেষ্টা করেন। এদেশে যাঁরা থাকেন, তাঁরাও বেশির ভাগ নিউ ইয়র্ক টাইমস পড়ে বা সি এন এন দেখেই তাঁদের মতামত তৈরি করেন। নোম চমস্কি, কর্নেল ওয়েস্ট, বা এই ধরনের যাঁরা রাষ্ট্রযন্ত্রের ও মিডিয়ার মগজধোলাই মেশিন থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করে যাচ্ছেন সারা জীবন ধরে, তাঁদের নাম কেউ প্রায় শোনেননি বললেই চলে। আমি যখন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে জার্নালিজম পড়তে গেছিলাম, তখন একবার চমস্কিকে নিয়ে এসেছিলাম বক্তৃতা দেওয়ার জন্যে। বললে বিশ্বাস করবেন না, হলভর্তি লোকের মধ্যে আমাদের সাংবাদিকতা ডিপার্টমেন্টের তিনশো পঞ্চাশজন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে মাত্র শ’খানেক উপস্থিত ছিল, আর বাকি সব বাইরের লোক— অন্য ডিপার্টমেন্টের। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েরা হয় চমস্কির নাম শোনেনি, নয়তো তাঁর বক্তৃতা শোনার কোনও দরকার আছে বলে মনে করেনি। এরাই ভবিষ্যতে কেউ নিউ ইয়র্ক টাইমস, কেউ সিএনএন, বা কেউ ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ওয়াশিংটন পোস্টে কাজ করবে। আমাদের দেশের বিখ্যাত সাংবাদিক বরখা দত্তও আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকেই পাশ করা ছাত্রী।

সে যাই হোক। 

সেদিন ইউটিউবে ‘অসময়’ বলে একটা টেলিফিল্ম দেখলাম। ৯/১১-র উপরে করা। সব্যসাচী চক্রবর্তী আর মুনমুন সেন অভিনয় করেছেন। তাঁদের অভিনয় সম্পর্কে আমার কিছু বলা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু, দেখে মনে হল, এতো বড়, এতো সংবেদনশীল একটা ঘটনা নিয়ে আমাদের দেশে কতই না মায়াকান্না কাঁদা হয়! যেভাবে সেদিনের ঘটনাকে এই ছবিতে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা দেখে যাঁরা দেশে থাকেন আর কাগজ পড়ে, টিভি দেখে এসব ঘটনাকে নিয়ে চায়ের পেয়ালায়, বা আজকে যেমন হয়, মদের গ্লাসে তুফান তোলেন, তাঁরা হয়তো আপ্লুত হবেন, শোকে, ক্রোধে বাক্যহারা হবেন, কিন্তু তার সঙ্গে বাস্তবের যোগ অতি সামান্য।

ওই যেমন বলেছিলাম, আমেরিকায় না থেকেই, এখানকার সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতির সঙ্গে কোনওরকম প্রত্যক্ষ সংযোগ ছাড়াই সবাই এদেশ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের মতামত দিতে পারদর্শী। এইরকম আরো ভুলভাল ছবি দেখেছি আমেরিকার সমাজ ও জীবনযাত্রা নিয়ে। যেমন অঞ্জন দত্তের ‘বং কানেকশন’। আরো আছে অনেক। 

প্রশ্ন হলো, এই পনেরো বছরে আমরা কী শিখলাম?

পৃথিবী দু হাজার এক সালের এগারোই সেপ্টেম্বর যা ছিল, এখন এই পনেরো বছরে তার চেয়ে কি শান্তিপূর্ণ হয়েছে? না, হিংসা আরো বেড়ে গিয়েছে? নিজেরাই আপনারা সে প্রশ্নের উত্তর জানেন। আল কায়েদা, তালিবান, জামাত, হুরিয়ত— এসব জঙ্গি ও চরমপন্থী গোষ্ঠী তো ছিলই। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আই এস, বোকো হারাম-জাতীয় ভয়ঙ্কর, হিংস্র সব দল, যাদের ঘাতকেরা যে কোনো মুহূর্তে পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় যে কোনো মানুষকে শেষ করে দেওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছে। প্যারিস, বেলজিয়াম, লন্ডন, আমস্টারডামের মতো সুরক্ষিত শহরও আজ নিরাপদ নয়। নিউ ইয়র্ক তো গেছেই। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, ঢাকা, ইসলামাবাদ— কখন যে কোথায় কত নিরীহ মানুষের মৃত্যু হবে, কেউ বলতে পারে না। 

না, মৌলবাদী হিন্দুত্বওয়ালাদের মতো আমি মুসলমানদের সবাইকে চরমপন্থী বলতে চাই না। এর থেকে বড় মিথ্যে আর হতে পারে না। একটা ক্ষুদ্র অংশের হিংস্র ঘাতকদের অপরাধের জন্যে কোটি কোটি, শান্তিপ্রিয় মুসলমানদের অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। ৯/১১-র সন্ত্রাসী হানায় বহু মুসলমান মানুষ নিহত হয়েছিলেন। আমার মনে আছে, টুইন টাওয়ার্সের একেবারে উপরে — সেই একশো দু’তলায়— ‘উইন্ডোজ অফ দা ওয়ার্ল্ড’ বলে একটা ক্যাফেটেরিয়া ছিল। সেখানে আমরাও কয়েকবার গিয়েছি। সেখানে কাজ করতো গরিব কিছু বাংলাদেশি, ভারতীয় আর পাকিস্তানী মুসলমান। আর সকলের সঙ্গে তারাও শেষ হয়ে গিয়েছিলো সেদিন। তাদের দু’চারজনের ফ্যামিলিকে আমি চিনি। তাদের শোকের এবং দারিদ্র্যের ছবি আমি নিজের চোখে দেখেছি। দু চারজন ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, কিন্তু অন্যরা ভয়েতে ক্ষতিপূরণ দাবি করেনি, কারণ কাগজপত্র না থাকার কারণে তারা অবৈধ। তারা ভেবেছে হয় তাদের ক্ষতিপূরণ চাওয়ার অধিকার নেই, নয়তো ভেবেছে, ক্ষতিপূরণ চাইতে গেলে যদি তাদের অ্যারেস্ট করে, জেলে নিয়ে যায়? 

আজকে ৯/১১-র পনেরো বছর পরে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া প্রেসিডেন্ট ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধ চালাচ্ছেন। ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া। আরও কত যুদ্ধ! কত লক্ষ নিরপরাধ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে প্রতিদিন। কত শিশুর লাশ পড়ে থাকছে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে। 

আর এদিকে আমেরিকার কোণে কোণে হিংসার আবহাওয়া আরও বেড়ে চলেছে। এই সেদিন আমাদের বাড়ির কাছেই পর পর দু সপ্তাহের মধ্যে প্রথমে দুজন বাংলাদেশি ইমাম, আর তারপর একজন ষাট বছর বয়সি বাংলাদেশি মহিলা হেট ক্রাইমের শিকার হলেন। মনে আছে, ৯/১১-র পরে আমরা যখন রাস্তায় নেমে মিটিং-মিছিল করছি, মিডিয়া আর নির্বাচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে, আর আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন জাতীয় সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছি এই ঘৃণামূলক আক্রমণ বন্ধ করার জন্যে, তখন কত পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের অসহায় অবস্থার কথা শুনেছি। 

মানুষ ভেবেছিলো, আর নয়, এবার শান্তি, সামাজিক সংহতি আসবে। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান— ভেদাভেদ দূর হবে। মানুষ সারা পৃথিবীতে একবার অন্ততঃ মানুষ হবার চেষ্টা করবে।

জানি না। আমাদের জীবদ্দশায় যা দেখতে পেলাম না, আমাদের সন্তানেরা তা পাবে কি?

ঈশ্বর, আর কত রক্তপাত তুমি ঘটাবে? এবারে একটু শান্তি নিয়ে এসো এই মর্ত্যলোকে।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -