SEND FEEDBACK

English
Bengali
English
Bengali

আর কত কালিকাপ্রসাদকে দেখতে হবে আমাদের?

মার্চ ৯, ২০১৭
Share it on
যাঁদের হাতে ক্ষমতা, তাঁদের কাছে দাবি, এসব ঘটনা আর যাতে না ঘটে, তার ব্যবস্থা করুন আপনারা— দিদিরা ও দাদারা।

আমি কালিকাপ্রসাদকে তেমন ভাল করে চিনতাম না। ফেসবুকে আমরা বন্ধু ছিলাম ঠিকই, এবং দু’চারবার মেসেজ-এর মাধ্যমে কথা হয়েছে। তবে, সে খুব সংক্ষিপ্ত।

এই কয়েক মাস আগেই এখানে নিউ ইয়র্কে ‘দোহার’ গান গাইতে এসেছিলো। সেখানে বঙ্গ হট্টমেলার আয়োজকদের বিশ্রী বিশৃঙ্খলা এবং চরম অব্যবস্থার কারণে বসার সিটও পাইনি শিল্পীদের গান শোনার জন্যে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে দু’একটা গান শুনেই চলে গিয়েছিলাম। শিল্পীদের ভাল করে দেখতেও পাচ্ছিলাম না।

আর এই কয়েক সপ্তাহ আগে কলকাতায় একটা দরকারে আমার স্ত্রী মুক্তি কালিকাপ্রসাদকে ফোন করেছিল। আমরা কেউ ভাবিনি, এক মাস যেতে না যেতেই তাঁর মৃত্যুসংবাদ আমাদের শুনতে হবে।

এই সুদূর প্রবাসে বসে এমন কত মৃত্যুশোকই না আমাদের শুনতে হলো। অতি প্রিয় বন্ধু, পরিজনের, প্রতিবেশীর, আবার এই লোকগানের শিল্পীর মতো একটু দূরের, কিন্তু কাছের মানুষের। এক একটা খবর পাই, আর শরীরের ভিতর থেকে হঠাৎ একটা শক উঠে এসে মাথাটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে যায়। স্থবির করে দিয়ে যায় আমাদের। যেন একটা মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেলো। কালিকাপ্রসাদের খবরটা পাওয়ার পর থেকে কেমন যেন একটা অবসাদ মনকে গ্রাস করেছে। কাজকর্ম একেবারেই করতে পারছি না।

অনেক ভাল ভাল কথা বলা হবে। বাঙালি সেন্টিমেন্টে কেঁদে ভাসাবে। যেমন ভাসিয়ে থাকে। ভদ্রলোক সত্যিই খুব ভাল মানুষ ছিলেন। সুতরাং, মানুষের যে দুঃখ হবে, কষ্ট হবে, তাঁর আত্মীয়-পরিজনদের যে তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে পড়তে হবে এই হঠাৎ, অপ্রত্যাশিত, মর্মান্তিক ঘটনায়, তা বলা নিষ্প্রয়োজন। আমরা যারা অনেক দূরে থাকি, আমাদের মতো দূরের বন্ধুরাও কষ্ট পাচ্ছি। এমন একটা খবর শোনার জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। এমন ঘটনা ঘটা উচিৎ ছিলো না।

আমি আজ পর্যন্ত কারো কাছে শুনলাম না তাঁর সম্পর্কে কোনোরকম বক্রোক্তি। পরশ্রীকাতর, ঈর্ষান্বিত, আকাশচুম্বী ইগোর বাঙালির কাছে নিরঙ্কুশ প্রশংসা পাওয়া, এ বড় কম কথা নয়। ভগ্নীসমা এক বান্ধবী ফেসবুকে লিখে জানালেন, শুধু ফোনেই দিনের পর দিন কালিকাপ্রসাদ তাঁকে কেমন করে লোকগানের লেসন দিয়েছেন। ‘বোলান’ গানের ওপর যেন ক্লাস দিয়েছেন বাংলার লোকগানের বর্তমান কালের এক এনসাইক্লোপিডিয়া। একেবারেই স্বার্থশূণ্যভাবে।
 
দোহারের গাড়ি কেন সকাল নটার সময়ে এমন দুর্ঘটনায় পড়লো? কে গাড়ি চালাচ্ছিলো? আমাদের ওখানে রাস্তাঘাট কেন এত খারাপ? বার বার এতো অসংখ্য দুর্ঘটনা সত্ত্বেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না কেন? টাকাপয়সাগুলো কোথায় যায়? কারা খেয়ে নেয় সব?

এই তো সেদিন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গাড়ির দুর্ঘটনায় মরতে মরতে বেঁচে গেলেন। এই তো কিছুদিন আগে গুণী, যুবক অভিনেতা পীযুষ গঙ্গোপাধ্যায় রোড একসিডেন্টে মারা গেলেন। আমার এক প্রিয় মহিলা আন্দোলনের নেত্রী এই তো সেদিন গাড়ি উল্টে গিয়ে পাঁজর ভেঙে তিন মাস শয্যাশায়ী হয়ে রইলেন। এত দুর্ঘটনা কেন? এত গাড়ি কেন? যেখানে রাস্তা নেই, সেখানে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত করা হয় না কেন? রাস্তাঘাট ইন্সপেকশন করা হয় না কেন? প্রতিনিয়ত কাগজ পড়লেই দেখি, আজ স্কুলছাত্রী ও তার মা স্কুলে যাবার পথে লরির ধাক্কায় মারা গেছে। কাল নিয়ন্ত্রণহীন মোটরবাইক রাস্তার ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন পথচারীকে পিষে দিয়ে গেছে। ট্রাম থেকে নামার, ট্রামে ওঠার কী ভীষণ ঝুঁকি! যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও মানুষের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আপনাদের কি এসব বিষয়ে কোনো হুঁশই নেই?

কলকাতা ছেড়ে একটু দূরে— পঁচিশ তিরিশ কিলোমিটার দূরে চলে গেলেই গ্রাম বাংলা, শহরতলি বাংলা, মফস্বল বাংলার দুর্দশা চোখে পড়ে। দু’চারটে জায়গা, ওই সিঙ্গুর বা কিছু ট্যুরিস্ট এলাকা ছাড়া, সর্বত্র দারিদ্র্য, বঞ্চনা, উন্নতিহীনতার ছাপ। গত তিরিশ বছরে বামফ্রন্ট কী করল তা হলে? আর এই গত পাঁচ সাত বছরের তৃণমূল সরকারই বা কী করল? জিজ্ঞেস করতে পারি? আমি কোনো পার্টি করি না। বিজেপি ও তার সাম্প্রদায়িক হিংসার ট্রাম্প-জাতীয় রাজনীতি একেবারেই নয়। বহুদূরে থাকি, কিন্তু দেশের প্রতিদিনের সংবাদ রাখি। মাঝে মাঝেই যাই। পাকাপাকি ফিরে গিয়ে এতকালের মার্কিন মুলুকে অর্জন করা শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবো, এমন ইচ্ছেও তীব্রভাবে পোষণ করি। চোখের সামনে যা দেখতে পাচ্ছি, তা কি খোলাখুলি আপনাদের, যাঁরা গদিতে বসে রয়েছেন, তাঁদের জিজ্ঞেস করতে পারি?

এসব কথার উত্তর কে দেবে?

আমার এক ভগ্নিপতি কয়েক বছর আগেই দোলের দিন এক মাচো ড্রাইভারের মত্ততার শিকার হয়েছিল। সাইকেল নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে একটু বেড়াতে বেরিয়েছিল সে। আর ফিরে আসেনি। হাসিখুশি যুবক অসীমের হাসিতে ভরা চোখদুটো আজ আবার বেশি করে মনে পড়ছে। আমার সেই বোনটা তিরিশ বত্রিশ বছর বয়েসেই তার স্বামীকে হারালো। কত মানুষ যে এভাবে প্রাণ হারিয়েছে, এদেশে বসে ভাবলে স্তম্ভিত হতে হয়। এর শেষ হবে কবে?

দোহার-এর অন্য শিল্পীরা ভালো হয়ে উঠুন, এই প্রার্থনা করি। আর যাঁদের হাতে ক্ষমতা, তাঁদের কাছে দাবি, এসব ঘটনা আর যাতে না ঘটে, তার ব্যবস্থা করুন আপনারা— দিদিরা ও দাদারা।

আর কত প্রাণ, আর কত রক্ত আমাদের দিতে হবে?

ও হ্যাঁ, পুনশ্চ— খবরের কাগজগুলো আর টিভির কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ, মৃত ব্যক্তি, সাংঘাতিক আহত ব্যক্তির ছবি প্রকাশ্যে ছাপাবেন না। সাংবাদিক নৈতিকতার মান রক্ষা করুন। প্লীজ।

 

Kalikaprasad Bhattacharjee Dohar Road accident
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -