SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

এই বেশ ভাল আছি: ভারতবর্ষের মানে বদলে যায় তাঁর কথা ভাবলে

মে ৫, ২০১৭
Share it on
আমি ভারতবর্ষ তেমন দেখিনি। শুনেছি, দেশটা আসলে মহান। প্রমাণ খুঁজেছি সারাজীবন ধরে। আজ মনে হয়, অন্য কোথাও খোঁজার দরকার ছিল না।

আমার বৌয়ের ‘মাইমা’র বিয়ে হয়েছিল বোধ হয় বারো কি তেরো বছর বয়েসে। বলতে গেলে বালিকা বধূ হয়ে তিনি এসেছিলেন শ্বশুরবাড়িতে। সে অনেকদিনের কথা।
 
আমার বৌ মুক্তি এই মাইমাকে কুট্টিমাইমা বলে ডাকতো। ওদের পূর্ববঙ্গ থেকে ছিন্নমূল হয়ে আসা সংসারে এই বালিকাবধূ ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠলেন গৃহিণী, এবং বলতে গেলে সর্বময় কর্ত্রী। আমি যতদিন দেখেছি, ওদের হাওড়ার সেই সরু গলিটার বাড়িতে এই চুপচাপ, নম্রস্বভাবের মহিলার কথাই ছিল শেষ কথা। বাড়ির সব পুরুষ ও অন্য মহিলারা কোনো প্রয়োজনীয় বিষয়ে তাঁর মতামত না নিয়ে কাজে হাত দিতেন না। আমাদের বাংলার পুরুষতান্ত্রিকতার জগতে এ ছিল যেন এক নিঃশব্দ বিপ্লব।
 
কুট্টিমাইমার বাপের বাড়িতে সবাই ছিল উচ্চশিক্ষিত মানুষ। ভাইয়েরা, বোনেরা প্রায় সবাই সেই সময়েই এম এ পাশ করে হয় কলেজে পড়াত, নয়তো সরকারে উচ্চপদের চাকরি করত। প্রত্যেকের মেধা ছিল উচ্চমানের।
 
মাইমার নিজের বিয়ে এত কম বয়েসে হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর আর কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়া হয়ে উঠলো না। তিনি সংসারের জাঁতাকলে পড়েই সারা জীবন কাটালেন।
 
তাঁর বিয়ে হয়েছিল সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলের এক উদারমনা শিক্ষকের সঙ্গে। কুট্টিমামা শিক্ষামনস্ক, ছাত্রগতপ্রাণ মানুষ ছিলেন। জন্মদিনে বাড়ির সব বাচ্চাদের তিনি জ্যামিতি বাক্স, গ্লোব, ভালো ভালো বই— এইসব উপহার দিতেন। এখনকার দিনে এসব উপহার পেলে বাচ্চারা আপসেট হবে। বিদ্রোহ করবে, কেন তাদের পিৎজা হাট-এ নিয়ে যাওয়া হলো না, কেন তাদের নিনটেন্ডো বা আই ফোন কিনে দেওয়া হলো না। কিন্তু, পঞ্চাশ বছর আগেও আমাদের দেশটা একটু স্বাভাবিক, শান্ত ছিল। এই ভয়ংকর লোভ আর মার্কিনি পুঁজিবাদ আমাদের দেশটাকে, আর শিশুদের মনকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেনি।


সর্বজয়ার ভূমিকায় করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় (‘অপরাজিত’, ১৯৫৬)


 বাঙালি বাচ্চারা গ্লোব আর জ্যামিতি বাক্স পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হতো।
 
একদিন, স্কুল থেকে পড়িয়ে ফেরার সময়ে, বা যাওয়ার সময়ে, সরকারি বাসে স্ট্রোক হয়ে কুট্টিমামা চলে গেলেন। তাঁর বোধ হয় তখন পঁয়ত্রিশ কি চল্লিশ বছর বয়েস। আর কুট্টিমাইমার বোধহয় চব্বিশ কি পঁচিশ। দুটো ছোট ছোট ছেলে— একজন আট দশ বছরের, আর ছোট ছেলেটা বোধহয় তখন দু’বছর।
 
সেই থেকে বৈধব্য জীবন শুরু। আমি যখন থেকে তাঁকে দেখেছি, এইরকমই দেখেছি। সাদা থান পরা এক মধ্যবয়সি মহিলা, একান্নবর্তী পরিবারে রান্নাঘরে উনুনের সামনে বসে আছেন। পনেরো কি কুড়ি জনের বিরাট সংসারের সমস্ত রান্নার দায়িত্ব তাঁর ঘাড়ে। সঙ্গে চিরসাথী আর এক মাইমা, আর পরবর্তীকালে এক ভাসুরের ছেলের বৌ। কিন্তু শেষ দায়িত্ব কুট্টিমাইমারই। কে কী খাবে, কে কখন অফিসে যাবে, স্কুলে যাবে, কলেজে যাবে— তাদের সব ব্যবস্থা। কার কী ফুড রেস্ট্রিকশন রয়েছে, কোন দেওরের ব্যবসাগত মিটিং চলছে নিচের ঘরে, তাদের চা আর খাবার দিয়ে আসতে হবে, আর এক অনেক বেশি বয়েসের বিধবা জা রয়েছেন, তাঁকে কখন আলাদাভাবে চিঁড়েদই দিয়ে ফলার করার ব্যবস্থা করে দিতে হবে— সব কিছু মাইমার নখদর্পণে।
 
এর মধ্যে আবার একটু সামাজিক কাজকর্ম না করলেই নয়। বাড়ির বহুকালের পরিচারিকা— গরিবের গরিব গীতাদি আর তার অসুস্থ স্বামী এবং কয়েকটি ছোটছোট ছেলেমেয়ে— যেন অভুক্ত না থাকে। তারা সারাদিন এ বাড়িতে খাটবে, আর তাদেরই খাবার জুটবে না, তা কি কখনো হয়? তাদের বাড়ির বড় ছেলেটা আবার স্কিৎজোফ্রেনিক, উন্মাদ হয়ে যাবার প্রবণতা দেখা দেয় মাঝে মাঝেই। পুলিশ অত্যাচার করে। পাড়ার লোকেরা ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে, মারধরও করে মাঝে মাঝেই। তার চিকিৎসার একটু ব্যবস্থা করতেই হয়। নইলে কবে পুলিশের লাঠি খেয়েই শেষ হয়ে যাবে।
 
গীতাদির একটা মেয়ে লেখাপড়ায় খুব ভাল। পড়তে চায়। চোখে স্বপ্ন, মনে আশার আলো। কিন্তু গরিব ঘরে তার আশার আলো যে কোনো মুহূর্তেই নিভে যেতে পারে। বাচ্চা মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দেবার ব্যবস্থা করছে ওরা। কিন্তু মেয়েটা বিয়ে করতে চায় না। পড়তে চায়। মাধ্যমিক পাশ করতে চায় অন্তত। সে জানে, পড়বার সুযোগ পেলে সে ভাল রেজাল্ট করবেই।
 
কুট্টিমাইমা আমার বৌয়ের সঙ্গে কথা বলে তার পড়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। শুধু টাকা দিয়ে নয়, খোঁজখবর নিয়ে তার পড়াশোনার ব্যবস্থা, খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে। মেয়েটি মাধ্যমিক পাশ করল। এখন তার বিয়ে হয়েছে, তাও মাইমার তত্ত্বাবধানে। মেয়েটির শ্বশুরবাড়িতে তাকে সম্মান করে। হেলাফেলা করে না। অত্যাচার, অবহেলা করে না।

এঁরা হয়তো আজ আর নেই। তবু বাঙালির স্মৃতিপটে অমলিন থাকবেন চিরকাল। (‘অপরাজিত’, ১৯৫৬)
 

পাড়ায় কারোর মা হাসপাতালে ভর্তি আছে। তার বাড়ির লোক খবর দিল। পরিচিত, বহুকালের প্রতিবেশী। কুট্টিমাইমা ছুটলেন বিকেলবেলা ভিজিটিং আওয়ার্স-এ তাকে বাড়ির রান্না করা খাবার পৌঁছে দিতে। হাসপাতালের অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে কি কেউ বাঁচে?
 
বছরগুলো কেটে গেলো। একদিন সকালবেলা মাইমার ছোট ছেলে হঠাৎ স্ট্রোক হয়ে মারা গেল কয়েক মিনিটের মধ্যে। বাবার রোগ পেয়েছিলো ছেলেটা। চিকিৎসার সময়ও পাওয়া গেল না। ঠিক যেমন কুট্টিমামার চিকিৎসার সময় পাওয়া যায়নি সেই ভিড়ের বাসে, অনেকদিন আগে। ছোটছেলের বয়েস তখন হয়তো কুড়ি কি পঁচিশ।
 
আরও মৃত্যুশোক। চিরকালের সাথী ছোটোমাইমার বৈধব্য এলো হঠাৎ। ছোটমামা— স্নেহশীল, সদাহাস্যময় একজন মানুষ হার্ট অ্যাটাক হয়ে চলে গেলেন। আর তার ঠিক কয়েকমাস পরেই তাঁদের একমাত্র মেয়ে আমাদের দেশের উদাসীন, অশিক্ষিত, নিষ্ঠুর চিকিৎসাব্যবস্থার শিকার হলো। ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়ে চলে গেলো সদ্যবিবাহিতা রীনা। আবার সবার ভরসা, আশ্রয়স্থল সেই কুট্টিমাইমা। কয়েক বছর পরে আবার এল যমরাজের পরোয়ানা। সেই একই বাড়িতে। আবার শোকতাপ সবচেয়ে প্রথমে ঝেড়ে ফেলে উঠলেন মাইমা। কাছে টেনে নিলেন দুঃখজর্জরিত মানুষগুলোকে।
 
বড়ছেলে সুশান্ত ওই বাড়িতেই, ওই অবস্থার মধ্যে থেকেও এখন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হয়েছে। চক্রবর্তী পরিবারে সুশান্ত একজন স্বনামধন্য মানুষ। প্রতিভাধর আর্টিস্টের প্রতিভা যে ব্যাংকে বা সরকারি দফতরে ধুলোয় ধূসরিত ফাইল ঘেঁটে শেষ হয়ে যায়নি, তারও পিছনে কারণ সেই একজনই। মাইমার উৎসাহ ও প্রশ্রয় ছিল বড়ছেলের প্রতি। তুই ছবি আঁকবি? আঁক। আমি আছি। তোর বাবার পেনশন আছে। ভয় কী তোর?
 
গত পঁচিশে এপ্রিল কুট্টিমাইমা চলে গেলেন পেটের ক্যানসারে কয়েকমাস ভুগে। সেই বারো তেরো বছরের বালিকাবধূ তাঁর চিরকালের প্রিয় সংসার ছেড়ে চলে গেলেন চিরকালের জন্যে। পান আর জর্দা খেতেন খুব। ওই একটাই শখ ছিল। আর একটা শখ ছিল বই পড়ার। কাজের অবসরে, সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে দুপুরবেলা একটু, আর রাতে শোবার সময়ে একটু বই না পড়লে, কাগজ না পড়লে তাঁর চলতোই না। কলেজে পড়ার সুযোগ পাননি তো কী হয়েছে? পৃথিবীর সংবাদ, তথ্য— সবকিছু তাঁর হাতের মুঠোয়। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি। নীরবে, পারিবারিক স্নেহচ্ছায়ায় এক নিঃশব্দ বিপ্লব।
 
আমি ভারতবর্ষ তেমন দেখিনি। শুনেছি, দেশটা আসলে মহান। প্রমাণ খুঁজেছি সারাজীবন ধরে। আজ মনে হয়, অন্য কোথাও খোঁজার দরকার ছিল না।
 
কুট্টিমাইমাই আমাদের ভারতবর্ষ। আমাদের বাংলা দেশ।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -