SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

বাঙালির ‘নিষিদ্ধ’ কথা আর ‘নিষিদ্ধ’ কামনার তলায় বাড়ছে বিকৃতি আর হিংসা

মে ১৫, ২০১৭
Share it on
কলকাতার মতো একদা ওম্যান-ফ্রেন্ডলি শহর এখন রাত দশটায় শুনশান হয়ে যায়। মেয়েরা একা বেরতে ভয় পায়।

সেক্স এমনই একটা বিষয়, যার প্রকাশ্য আলোচনা এখনও আমাদের দেশে ট্যাবু। সামাজিক চোখরাঙানি বা অনুচ্চারিত নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। যেন একটা ভয়ের কারফিউ।

অথচ, সেক্সের মতো নরম্যাল জিনিষ মানুষের জীবনে খুব বেশি নেই। বোধ হয় জল খাওয়ার মতোই নরম্যাল। বা, জলবিয়োগের মতো। সত্যি কথা বলতে, নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো। কিন্তু আমরা, আর বিশেষ করে আমাদের মিডিয়া, আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতা ও নেত্রীরা, ইস্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির মাথারা, আর বাড়িতে বাড়িতে বাবা দাদা কাকা জেঠা মাসি পিসি মামা মেসোর দল এই বিষয়টা মেন্সট্রুয়াল প্যাডের মতোই লুকিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ, সবই হচ্ছে, সবই দেখতে পাচ্ছি। সবই আছে, জানি। কিন্তু, এসব নিয়ে কথা বলা চলবে না। এসব বিষয় অবাঞ্ছিত, নোংরা বিষয়। এসব সাবজেক্ট ভদ্রলোকের বসার ঘরে, পার্টিতে, চায়ের কাপে, ক্লাসরুমে, খবরের কাগজে, টিভিতে প্রকাশ্যে আলোচনার সাবজেক্ট নয়।
সেক্স নিয়ে কোনো জাতীয়, আঞ্চলিক, বা ইউনিভার্সিটি-ভিত্তিক সেমিনার বা কনফারেন্স হয়েছে বলে কখনো শুনিনি। যদি হয়ে থাকে, আমাকে জানাবেন। কোথায় হয়েছে, কবে হয়েছে, কটা হয়েছে, কারা পার্টিসিপেট করেছে। আমি ভীষণ উপকৃত হব। জানাবেন প্লিজ।
 
আমি একাধিক মেয়েকে চিনি, তাদের বয়ঃসন্ধিকালে পিরিয়ডের কথা বাড়িতে তারা বলতে পারত না। বললেই মা মারধর করত। ঘরে তালাবন্ধ করে রেখে দিত। খেতে দিত না। তার পর তারা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ত। আর, পরে এই জটিলতা ও ভয় তাদের ডিপ্রেশনের রোগী করে দিল। তারা আর কারোকে ভালোবাসতে পারত না। সম্পর্ক তৈরি করতে পারত না।

যৌনতা, সেক্স নিয়ে আমি আমার স্মৃতিকথা ‘ঘটিকাহিনি’-তে অনেক লিখেছি। আমার বই পড়ে, গত বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ অপরিচিত দুতিনজন বিদগ্ধ মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাকে ফোন করে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। তার মধ্যে চিত্রপরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, সঙ্গীতপরিচালক বিশ্বদেব দাশগুপ্ত, এবং লেখক সমরেশ মজুমদারের নাম করতেই হয়। এছাড়া, ব্রাত্য বসু, শান্তা সেন ও দেবজ্যোতি মিশ্র— যাঁরা আমার বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন— তাঁদের কথা তো ছেড়েই দিলাম।


‘টোপ’ (২০১৭), এখানেও কি মেয়েরা ঘোরাটোপের বাইরে?

বিশেষ করে, বুদ্ধদা ও সমরেশদা নরনারীর যৌনসম্পর্ক, তার নানাপ্রকার ম্যানিফেস্টেশন, এবং বিকৃতি নিয়ে অনেক লিখেছেন। অনেক ছবি করেছেন। আধুনিক ইন্টেলেকচুয়ালদের মধ্যে এ বিষয়ে তাঁদের পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। আমি আমার বইতে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, আমার কলকাতার কৈশোর ও যৌবনে সেক্স বা যৌনতার যে উলঙ্গ দিক আমি দেখেছি, এবং যেভাবে দেখেছি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, বা সমরেশ মজুমদারও সেভাবে দেখেছেন কি না। তাঁদের ছোট করছি না। তাঁরা আমার সাহিত্যজীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা। বুদ্ধদার ছবি আমাকে শক্তিশালী চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। সেই বুদ্ধদাও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যে ভয়ঙ্কর যৌনবিকৃতির কথা লিখেছি, তা আমি সত্যি দেখেছি কি না। আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমার বইতে আমি একটাও মিথ্যে কথা লিখিনি, একটা কোনও জায়গাতেও আমি অতিরঞ্জন করিনি। আমার লেখার কাছে আমি একশো ভাগ সৎ থেকেছি।

সেক্স নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা ট্যাবু হওয়ার কারণে আমাদের ভারতে এবং বাংলাদেশে সেক্সুয়াল পারভার্সন এখন এক মহামারী আকার ধারণ করেছে। এবং আমার ধারণা, আগামী দশ, পনের বা কুড়ি বছরের মধ্যে যৌনবিকৃতি কলকাতা, ঢাকা, দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর থেকে শুরু করে বর্ধমান, বসিরহাট, পাবনা, খুলনা, করাচি, লাহোর, পাঞ্জাব উড়িষ্যা বিহার উত্তরপ্রদেশ— সমগ্র উপমহাদেশে এক ভয়াবহ চেহারা নেবে। তার কিছু কিছু প্রমাণ আমরা এখনই পাচ্ছি, কিন্তু আসন্ন ভবিষ্যতের তুলনায় তা কিছুই নয়। বলা যেতে পারে, টিপ্ অফ দা আইসবার্গ।

সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স, রেপ, ইনসেস্ট, পেডোফিলিয়া, ওয়ার্কপ্লেস যৌন হ্যারাসমেন্ট, পুলিশ ও মিলিটারির সেক্সুয়াল লালসা ও হিংসা চরিতার্থ করার প্রবণতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সেক্স, লকআপ ও জেলে সেক্সুয়াল টর্চার, যুদ্ধবন্দীদের ওপর, রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর যৌন অত্যাচার, এখনই আমাদের দেশে বিকট আকার ধারণ করেছে। আগে সেই সিদ্ধার্থবাবুর পুলিশ অর্চনাদেবীর ওপর যে যৌন অত্যাচার করেছিল, এখনকার অবস্থা তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। তা ছাড়া, প্রতিদিন কাগজ খুললেই শহরে, উপশহরে, গ্রামে যেসব ঘটনার কথা শোনা যায়, আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন তা ছিল কদাচিৎ সংবাদ। ‘রেপ’ শব্দটা তখন মুখ দিয়ে বেরতো না। বলতে ভয় করতো। কেউ যদি শুনে ফেলে! কলকাতার মতো একদা ওম্যান-ফ্রেন্ডলি শহর এখন রাত দশটায় শুনশান হয়ে যায়। মেয়েরা একা বেরতে ভয় পায়।

কামদুনি, গাইঘাটা, গেদে, নির্ভয়া, গুরগাঁও, ব্যাঙ্গালোরে ফার্স্ট জানুয়ারি। অসংখ্য, অগণিত অত্যাচারের কাহিনি। বাদাউনে রেপ করে কিশোরীদের গাছ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া। মেয়েরা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের মেয়েরা শেষ হয়ে যাচ্ছে। যৌন বিভীষিকা এখন আমাদের দেশগুলোতে মহামারী। এপিডেমিক।

পর্ণোগ্রাফি— যাকে আমরা আগে বলতাম ‘ব্লু ফিল্ম’— মার্কিন ইন্টারনেটের কল্যাণে আমাদের দেশের কোণে কোণে ছড়িয়ে গিয়েছে। এখন তাকে লেজিটিমেট একটা চেহারা দেওয়ার অপচেষ্টা চলেছে। মিডিয়ার দৌলতে এক্স-রেটেড মুভির নায়িকারা এখন মূলস্রোতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, এবং তাদের নিয়ে রীতিমতো গ্লোরিফাই করার প্রতিযোগিতা চলেছে। যে কোনো ইন্টারনেট ক্যাফেতে গিয়ে খোঁজ করুন— বেশিরভাগ ক্যাফে চলছে পিছনের দিকে, কোণের দিকে বসে থাকা কতগুলো ইয়ং ছেলের পর্ন অ্যাডিকশনের উপরে। আর, চাকরির অ্যাপ্লিকেশনের উপরে। কিন্তু, পর্ন যে একটা অ্যাডিকশন, একটা রোগ, তা কেউ জানেই না। স্বীকার করে না। আমি কৌতূহলের পর্ন দেখার কথা বলছি না। বলছি আসক্তির কথা। মারাত্মক আসক্তির কথা। আমাদের দেশে এখন পর্ন আর বি-মুভি আর মেইনস্ট্রিম মুভি— এর মধ্যে তেমন কোনো সীমারেখা নেই। সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। নায়ক ও নায়িকাদের খোঁজ করুন।

ভারতে ও আমেরিকায় তৈরি পর্ন এখন শুধু দেশের বাচ্চা ছেলেদের মধ্যে নেই, আন্তর্জাতিক সামগ্রী হয়ে গেছে। আমেরিকা যে বিষ নিয়ে খেলা শুরু করেছিল, তা এখন ভারত ও বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলেছে।


বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘টোপ’ (২০১৭), বাসনার আর এক দিক উন্মোচিত এ ছবিতে।

আমি খবর রাখি। দেশের, এবং এদেশের। আমাকে অনেকে গালাগালি দেন আমার একটা গুণ বা দোষের জন্যে। কলকাতার একটা স্ল্যাং আছে— ‘আছোলা জিভ’। অর্থাৎ, যার মুখে কোনো কথাই আটকায় না। আমার কাছে আমার এই মুক্ত রসনা একটা গর্বের বিষয়। আমি সব জানি, সব খবর রাখি, সবকিছু বিশ্লেষণ করতে পারি, এবং কোনও রাখঢাক না রেখে গড়গড় করে বলে যেতে পারি। সব জায়গায় বলা যায় না, কারণ হ্রস্বদীর্ঘ জ্ঞান আছে আমার।

কিন্তু, যে অভিজ্ঞতা থেকে আমি উঠে এসেছি, সে অভিজ্ঞতার অন্ধকার দিকটা যদি আমি লিখে রেখে যেতে না পারি, তাহলে আমার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমি অপরাধী থেকে যাবো। একটা অদ্ভুত পর্যবেক্ষণের কথা লিখে রাখি। আমার স্মৃতিকথা ‘ঘটিকাহিনি’-তে আমি আমার ছোটোমাসির কথা লিখেছি। এই মাসি এখন কোমর ভেঙে পঙ্গু হয়ে পড়ে রয়েছেন সত্তর-বাহাত্তর বছর বয়েসে। এই মাসিই আমাকে প্রথম বাংলা গানের পাঠ দিয়েছিলেন, বাংলা আধুনিক গান, রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুল-অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্ত-দ্বিজেন্দ্রলাল-শ্যামাসঙ্গীত ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন। সে ঋণ আমি জীবনে শোধ করতে পারব না। আমি আমার জীবনের এই অপূর্ব সুন্দর অভিজ্ঞতার কথা শুধু বাংলাতে নয়, আমার ইংরিজি ব্লগেও লিখেছিলাম। অনেকে সে লেখা পড়ে আমাকে তাঁদের ভাললাগার কথা জানিয়েছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার মাসি, আমার মামারা আমার জীবনের একটা আনন্দের জায়গা জুড়ে আছেন।
 
কিন্তু, সেই ব্লগ যারা পড়েছেন, তাঁদের মধ্যে একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করলাম। ব্লগের বিষয় নিয়ে সার্চ করছেন যাঁরা, তাঁদের সেই সার্চ প্যাটার্নটার স্ট্যাটিসটিক্স জানা যায়। সেই স্ট্যাটিসটিক্স-এ দেখা যাচ্ছে, যাঁরা সে ব্লগ পড়ছেন, বা অন্তত ব্রাউস করছেন, তাঁদের এক বিরাট অংশ সার্চ করছেন ‘ইন্ডিয়া রেপ’, ‘সেক্স উইথ আন্টি’, ‘ইন্ডিয়া চাইল্ড সেক্স’, এসব কী-ওয়ার্ড ব্যবহার করে। যেহেতু আমার ব্লগের নব্বই শতাংশ পাঠক-পাঠিকাই হয় ভারতের, নয় বাংলাদেশের, নয়তো আমেরিকার, ফলে অনুমান করতে বাধা নেই, এসব সার্চ হচ্ছে বেশির ভাগ এই দেশগুলো থেকেই।
ভাবতে লজ্জা হয়, আমার এই ব্লগের বিষয় যেখানে আমার জীবনের এক পবিত্রতম অধ্যায়, তার এক বিকৃত, জান্তব ছবি পৌঁছে গিয়েছে বিকৃত, জান্তব যৌনকামনার শিকার একদল ক্লীবের কাছে। যাদের কাছে কোনো পবিত্র বিষয়ই আর পবিত্র নেই। থাকবে না। যাদের কাছে নারী কেবলমাত্র ভোগের বস্তু। আর কিছু নয়। হিংসা, লালসা যাদের কাছে একেবারে সিম্পল ম্যাটার। কোনও পুলিশ, কোর্ট, জেল, মায়ের কান্না তাদের সেই ভয়ংকর আই-মাস্ট-ডু-ইট থেকে নিবৃত্ত করতে পারবে না।

পাপ মানুষ জন্মসূত্রে পায় না, আর পূর্বজন্মের ফলেও ভোগ করে না। সে হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান পান্ডা মোল্লা আর পাদ্রীরা যাই বলুক না কেন। পাপ তৈরি হয় মানুষের মনে শিক্ষার অভাব থেকে। যেমন ছত্রাক ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস বাসা বাঁধে রক্তের, খাদ্যের, সূর্যের, ভিটামিনের অভাবহেতু। একমাত্র মুক্ত শিক্ষার আলো নিষিদ্ধ জগৎ থেকে মানুষকে হাত ধরে আলোর পথে বের করে নিয়ে যেতে পারে।

সেক্স পবিত্র সুন্দর স্বাভাবিক হতে পারে প্রকাশ্য আলোচনা ও আশৈশব মুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে। সে আলোচনাকে গলা টিপে মেরে ফেলে নয়।

সেক্স নিয়ে একেবারে সম্পূর্ণ নগ্ন আলোচনার সময় এসেছে।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -