SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

‘‘এক এক ভূত দস রুপাইয়া’’— বাঙালির ঘাড়ে চড়ে থাকা নাছোড়বান্দা ভূতের গল্প

মে ৩০, ২০১৭
Share it on
রাত্তিরবেলা যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন একদল লোক গ্রামের রাস্তায় ক্যানেস্তারা বাজিয়ে ভূত খুঁজে বেড়ায়। আর, কিম্ভুত গান গায়। নাচে ঝমঝম করে। অদ্ভুত, গা শিরশির করা সে গল্প। গা ছমছম করা সে ছবি।

‘‘তো, হামি করলাম কি, হামি বাজারে গিয়ে ভূত কিনে লিলাম বাবুমসা। এক এক ভূত দস রুপাইয়া বিকরি হোলো। মালুম হোলো কি, বহুত সস্তামে মিলা। হাপনি লিবেন?’’ সক্কালবেলা বেনারসি বাবু ঘিউ পরসাদ চমচমওয়ালা— এখন আমাদের কলকাতার বাড়ির বাড়িওয়ালা— দাঁত বের করে খপরটা দিলেন।  ভদ্রলোকের ধারণা, উনি খুব পোয়েস্কার বাংলা বলেন। শালা যত ইয়ে!
 
‘‘এক এক ভূত দস রুপাইয়া’’ প্রথম শুনি হিন্দি সিনেমা ‘শোধ'-এ। আমাদের সুনীলদা— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়— ‘গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’ নাম দিয়ে একটা ছোটগপ্পো লিখেছিলেন বহুকাল আগে। সে গপ্পো নিয়ে বিপ্লব রায়চৌধুরী বলে একজন একটা হিন্দি ছবি করেন। সে ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাত্তিরবেলা যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন একদল লোক গ্রামের রাস্তায় ক্যানেস্তারা বাজিয়ে ভূত খুঁজে বেড়ায়। আর, কিম্ভুত গান গায়। নাচে ঝমঝম করে। অদ্ভুত, গা শিরশির করা সে গল্প। গা ছমছম করা সে ছবি।
 
ছবিটা চলেনি বেশিদিন। সেই ’৭৯ সালে, তখন অমিতাভ বচ্চন বিনোদ খন্না ধরমিন্দার বুড়ো দেবানন্দ আর তার যত কচি পুরুষ্টু চ্যালানন্দ হেমা মালিনী রেখা আর শত্রুঘন সিনহা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। কিশোরকুমার ‘আরে রাফতা রাফতা’ করে পাড়ার মাইকে লাফাচ্ছেন। পড়াশোনা সব শিকেয়। হেমন্ত মান্না শ্যামল আরতি সন্ধ্যার দিন গোধূলিলগ্নে। মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল পর্যন্ত কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়ে। বিবর্ণ লাল, বিরস সবুজ। শহরের রাস্তা গরমে ধুলোয় নোংরা কাদায় পাঁকে পিচে গর্তে বিচ্ছিরি বেসামাল বেআব্রু অশ্লীল। নকশাল মরে ভূত, সিধুবাবুর কংগ্রেস চিকমাগালুর, আর সিপিএম নতুন সন্ন্যাসীর মতো আচরণ করছে। সব মিলিয়ে অতি বাজে দিন। আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে ক্যানসারে। বাড়িতে হাঁড়ি চড়ে না।
 
আমাদের উত্তর কলকাতায় তখন যেসব হলে আগে শুধু বাংলা সিনেমা দেখানো হতো, সেসব হলেও আস্তে আস্তে হিন্দি ‘ঝাড়পিটের বই’ দেখানো শুরু হয়েছে। রাজেশ খন্নার ‘হাতি মেরে সাথি’ চলেছে রমরম করে আমাদের মিত্রা সিনেমায়। পূর্ণশ্রীতে ‘জঞ্জীর’। সেই প্রাণের সায়া পরে নাচ। আর অমিতাভের বোকা বোকা ডায়লগ। পঁচাত্তরের সিটে বসে সিটি মারছে কিছু বদের ধাড়ি অকম্মার দল। দর্পণা-য় আরও কয়েক বছর আগেই খোচরের ব্যাটন আর কাঁচা খিস্তি খাওয়া লাইনে ‘ববি’ হয়ে গেল ফাটাফাটি। সে লাইন ‘বস্তি সে দূর অর পর্বত কে পিছে’। ‘ইয়াদোঁ কী বরাত’ অতি বাজে সস্তা সেন্টিমেন্ট চটকানো। লোকে সেই একই গান চুরালিয়া থেকে পুরুলিয়া পর্যন্ত গাইছে।


‘হাতি মেরে সাথি’ (১৯৭১)


 সেই বোকা বোকা অসহ্য সময়ে আঁতেল সিনেমা ‘শোধ’। কোন শালা পয়সা দিয়ে দেখে? দু’সপ্তাহ চলেই ‘শোধ’ শোধবোধ। সাবান মেখে সাবাড়। পরে অনেক খুঁজেছি। সিনেমাটা পাওয়াও যায় না। বিপ্লব রায়চৌধুরীর কথা একবার শুনেছিলাম বন্ধু দীপক চক্রবর্তীর কাছে। ভদ্রলোক আর বিশেষ একটা সিনেমা করেননি, যদ্দূর জানি। সুমনের গান ‘হাল ছেড়ো না’ তখনো কঠিন ঘুমে ছিল অচেতন।
 
অথচ, ঊনিশশো আশিতে ‘শোধ’ সারা ভারতের শ্রেষ্ঠ ছবি এবং শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রফি— দুটো বিরাট পুরস্কার পেয়েছিলো। আমার কথা সত্যি কি না মিলিয়ে দেখুন। কিন্তু তার পর কী হলো, কেউ জানে না। সুনীলদার বাংলা গপ্পোটার মতোই হিন্দি ছবিটাও কাঁপিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো বুকের ভিতর থেকে প্যান্টের ভিতর পর্যন্ত। ওম পুরী আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা মাথার চুল খাড়া করে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন।


‘শোধ’ (১৯৭৯) ছবির পোস্টার, ঋণ: ‘পোস্টার আর্কাইভ’


 সেই ’৭৯ থেকে এই ’১৭ পর্যন্ত থেকে আমি ভূত খুঁজে বেড়াচ্ছি। তা, এই মর্কট-নন্দনের সাথে সাতসকালে দেখা হয়ে গেলো ছাতুবাবুর বাজারের দিকটায়। শালা দাঁত বের করে হাসছে আবার! বলে কি না, ভূত কিনে লিয়ে এসেচে? বললেই হলো? ভূত কি গরমকালের আম জাম না লিচু না বেল যে, রাস্তায় পড়ে থাকবে, আর টপ করে কুড়িয়ে নিয়ে এলেই হলো? অমনি সবাই বলে। আমি বলে সেই কবে থেকে ...
 
‘শোধ’-এর নায়ক সুরেন্দ্রকে একসময়ে লোকেরা গ্রামছাড়া করেছিল। রাঙা মাটির পথ দিয়ে সুরেন্দ্র চলে গিয়েছিলো চোখের জল ফেলতে ফেলতে, গুপী গাইনের মতো। এখন, আবার সে এসেছে ফিরিয়া। শুধু তাই নয়, সঙ্গে একদল বকাটে চ্যালাচামুন্ডো জুটিয়েছে। শোনা যায়, শহর থেকে নাকি সে ভূত ধরার কায়দা শিখে এসেছে। তার কথাবার্তা কাজকারবার দেখে গ্রামের মোড়লরা আর পণ্ডিতরা ভীত, সতর্ক, সন্দিহান। জমিদার আর তার পেটমোটা মোসায়েবরা তটস্থ। কী হয় কী হয়! সে চ্যালেঞ্জ করে তাদের দশ টাকা দেবে— সে গল্পের সময়ে দশ টাকা অনেক টাকা, এখনকার মুড়িখাওয়া পানখাওয়া বিড়িখাওয়া দশ টাকা নয়— যদি কেউ তাকে একটা ভূত ধরে এনে দেখাতে পারে। গ্রামের সবাই ভূত ধরতে রাস্তায় মাঠে ঘাটে নেমে পড়েছে, চাষি জেলে মজুর বাপমাভাইবোন বেয়াইবোনাই জগাইমাধাই সব্বাই ভূত ধরলেই দশ টাকা পাওয়া যাবে শুনে কাছা খুলে থলে হাতে নেবে পড়েছে। ক্ষেতে ভূত ধরছে, আলে ভূত ধরছে, পুকুরে ভূত ধরছে, জালে ভূত ধরছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কেউ ভূত ধরে দিতে পারেনি। সুরেন্দ্র সারা রাত ধরে নেচেগেয়ে অ্যাডভার্টাইসমেন্ট করে যাচ্ছে গা ছমছম কুয়াশামোড়া গ্রামের রাস্তায়।
 
সে ভূত ধরা নিয়ে কী কাণ্ড! নিরীহ লোককে ভূতে ধরেছে মনে করে তাকে ধরে ঝাঁটা সর্ষে লংকাপোড়া জলপড়া কুলো চালানো। মার্ডার হতে বসেছে সস্তায় ভূত পাওয়া যাবে বলে। তারপর, এক স্বামী পরিত্যক্তা গৃহবধূকে যখন ভূতে ধরলো, মেয়েটা কী যেন যন্ত্রণায় বিবর্ণ হয়ে ছটফট করছে আর কাঁদছে, তখন সুরেন্দ্র তার দলবল নিয়ে এসে উপস্থিত। ভূত ছাড়াবে সে। সুরেন্দ্র বৌয়ের কানে কানে কথা বলে জানতে পারলো সে ভূত আসলে কে। তার পর সেই বৌয়ের মোড়ল-জোতদার শ্বশুরকে ধরা হলো। পুরোটা আর মনে নেই। সুনীলদার গপ্পের সঙ্গে একটু যেন তফাৎ ছিল। কিন্তু, ব্যাপারটা একই রকম মারাত্মক পাওয়ারফুল। বললাম না, প্যান্ট থেকে মাথার চুল পর্যন্ত কুড়কুড়ি?


‘জঞ্জির‘ (১৯৭৩)


 বয়সটা কম ছিল, আর একটুতেই মাথা গরম হয়ে যেত। অন্যায় দেখলে ‘জঞ্জিরে’ আর ‘ডনে’ অমিতাভ মাঠে নেমে পড়তো, গোলাগুলি চলতো, আর আমরা হাসতাম বালখিল্লিপনা দেখে। রেখা নাচতো গাইতো, ‘ইনসাফ কে তারাজু’-তে জিনাত রেপ হয়ে যেত, আর হলভর্তি লোকে উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়তো। ‘শোলে’তে আমজাদ খান তিন মিনিটে একটা সংলাপ বলতো, সঞ্জীবকুমার মাথার গুঁতো দিয়ে ডাকুকে শায়েস্তা করে দিতো একাই, আর হাততালিতে হল ফেটে পড়তো। আর এখানে, ‘শোধ’-এ, পেটমোটা শ্বশুর অসহায় গৃহবধূর শ্লীলতাহানি করেছে দেখে গা কাঁপতে লাগলো রাগে। ভূত? ভূতের গপ্পো? না, জ্যান্ত মানুষ ভূতের স্টোরি?
 
সে সময়টা ছিল ওই রকম। বয়সটাও ছিল ওই রকম। অন্যায় দেখলে, অবিচার দেখলে বোকার মতো রাগটাগ করতাম, চেল্লামেল্লি করতাম। এখন ওসব আর কেউ করে না। আমিও বিদেশে আছি বহু বছর, আর এই সুখের নির্বাসনে থাকতে থাকতে গরম রক্ত সেই অবাক জলপানের মতো আহ্লাদে গলে জল হয়ে গেছে। বুঝিয়ে দিলেও আর বুঝি না, বুঝতে চাই না। কী হবে বুঝে? জানার কোনও শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই।
 
‘শোধ’ মানে সন্ধান। সুরেন্দ্র ভূতের সন্ধান করতো পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে। বাজি ধরে টাকা ফেলতো, ভূত যে ধরে দেবে, তাকে সে দস দস রুপাইয়া দেবে। আমাদের চমচমওয়ালা বাড়িওয়ালাও এখন ভূত কিনে আনছেন বাজার থেকে। যারা ভূত, তারাই এখন ভূত কিনছে। ভূতের সংজ্ঞা আর মানুষের সংজ্ঞা একেবারে বদলে গেছে। একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে সব। সেই জর্জ অরওয়েলের উপন্যাসের মতো ওয়ার এখন পিস, ফ্রিডম এখন স্লেভারি, আর সেই একই কথা, ইগনোরেন্স ইজ স্ট্রেংথ। অর্থাৎ, জানার কোনও শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই। একটু আলঙ্কারিক ভাবে অতি সহজ কথাটা বলা।
 
‘শোধ’ আঁতেল ছবি ছিল, তাই চলেনি। লোকে বোঝেনি। রেখার নাচ নেই, অমিতাভের ফাইট নেই, জিনাতের ঢেউ নেই, আমজাদের ফেউ নেই— চলবে কেন? সুনীলদার ‘গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’ কেউ মনে রাখেনি। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার মতো গল্প। ‘প্রাগৈতিহাসিক’-এর মতো। ‘রৌরব’-এর মতো। ‘ঢোঁড়াইচরিত’-এর মতো। ‘বিবর’-এর মতো। তখন যা আমাদের জেনারেশনের কাছে ছিল দারুণ আকর্ষণীয়, সেরিব্রাল, এখনকার জেনারেশন সেসব পড়ে না, দেখে না। আমরা কিছু না জেনে, না শিখেও জানবার জন্যে, শেখার জন্যে ছটফট করতাম, কেউ কিছু বুঝিয়ে দিলে আহ্লাদে গলে জল হয়ে যেতাম। পা চেটে দিতাম তার। এখন, বোঝাতে গেলে লোকে বিরক্ত হয়। কিছু না জেনেও লোকে সবজান্তা।


গব্বর সিং, ‘শোলে’ (১৯৭৫)

আমরা ভূত খোঁজার গল্প পড়ে শিহরিত হয়েছি, রোমাঞ্চিত হয়েছি, স্বপ্ন দেখেছি। প্রতীকের ‘শোধ’ করেছি ছবির পরতে পরতে, স্তরে স্তরে, মাত্রায় মাত্রায়। অনেক সময়ে অতিকল্পনা করেছি, কষ্টকল্পনা করেছি, যা নয় তাই সত্যি বলে ভেবেছি। কিন্তু কল্পনা করেছি, তীব্র কল্পনা করেছি। ভেবেছি। ডুবে গেছি, মজে গেছি শিল্পে, শব্দে, মায়ায়।
 
সুরেন্দ্র ভূত খুঁজে বেড়াতো নির্বাসন থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিরে এসে। সে পেটমোটা বদমাশদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তাদের সমাজের সামনে উলঙ্গ করে দিয়েছিল। সে একা ছিল না। সে জানতো, একা এসব কাজ করা যায় না। সে দল বেঁধেছিল। নিজের মতো কিছু সঙ্গী খুঁজে নিয়েছিল। তার পর শহর থেকে ফিরে এসেছিল গ্রামে। ভূত খুঁজে বের করার মিশন নিয়ে।
 
আমরাও যারা ‘শিক্ষা’ নিয়ে ফিরে এসে ভূতের খোঁজ করতে চাইছি, তারা কোন ভূতের তালাশ করবো? কী সেই ভূত? কোন মেটাফর? কার ঘাড় সে ভূত মটকাচ্ছে? কোন গ্রামে, কোন শহরে, উপশহরে, গলিতে, মহল্লায়, অট্টালিকায়, হোটেলে, ইটের পাঁজায়, ভোটের গাঁজায়, বারে, তিনতাসের ঠেকে, মুখোশ পরে, রং মেখে সে ভূত ঘুরে বেড়াচ্ছে?
 
আপনাদের কী মনে হয়? কোথায় সে ভূত?
 
ধরে এনে দিন। পয়সা পাবেন। পুরস্কার। লিখে দিলাম এই কাগজে।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -