SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

কী ভাবেন ‘দেশের লোক’ ফরেনে থাকা বাঙালি সম্পর্কে, জানলে তেমন ভাল না-ও লাগতে পারে

অগস্ট ৫, ২০১৭
Share it on
এখানে অদৃশ্য থেকে মনের সুখে গায়ের ঝাল মেটানো যাচ্ছে, সেখানে বাঙালি বিনাপয়সায় সেটা খুব দক্ষতার সঙ্গেই করতে পারে। এ বিষয়ে বাঙালি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

যুবক বয়েসে, গ্রামের এক কলেজে চার বছর পড়িয়ে, আমেরিকা পাড়ি দিয়েছিলাম। দিতে বাধ্য হয়েছিলাম অনেকটা। বিশদ জানতে চাইলে আমার স্মৃতিকথা ‘ঘটিকাহিনি’ পড়ে নিন। কী যে একটা অসহায় অবস্থায় আর কোনো উপায় না দেখে দেশ ছেড়েছিলাম! কোনওদিন ভাবিনি আমার প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে, প্রিয় কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হবে।

আমাকে অনেকেই বলে, বেশ তো ভাল ভাল জ্ঞানের বাণী দিচ্ছেন আমেরিকায় বসে, ভারতের উপরে। আছেন বেশ। গায়ে কোনও আঁচ লাগছে না। কোনও ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে না। অথচ বড় বড় বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। এ শুধু অচেনা লোকেরা নয়, আমার নিজের আত্মীয় ও বন্ধুদের মধ্যেও অনেকে বলে। ডলার কামাচ্ছেন, খাচ্ছেন দাচ্ছেন বেড়াচ্ছেন...

(আর নিজের রান্না, বাসন মাজা, বাড়ি পরিষ্কার, জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ নিজে নিজে করছেন, একা একা ছেলেমেয়ে মানুষ করছেন, তাদেরকে দাদুদিদা মামামাসির ভালোবাসা দিতে পারছেন না, সেটা আর বলে না। কারণ, তা হলে আবার নিজের সুখের জীবনের সঙ্গে কম্পেয়ার করতে হবে, সেটা বেশ অসুবিধেজনক। চাকর বাকর দাসদাসী, ড্রাইভার, রাঁধুনি ইত্যাদি পরিবৃত হয়ে তাঁরা আমাদের থেকেও ভাল আছেন, সেটা বললে একতরফা গালাগালি দেওয়া মুশকিল।)

বোকারা সোজাসুজি বলে, আর চালাকরা কায়দা করে বলে। ব্যাপারটা একই। কিন্তু, এরা কেউই জানে না, বা জানতে চায়ও না, কেন আমি আমেরিকায় এলাম, কেন থেকে যেতে বাধ্য হলাম, ভারত বা বাংলা সম্পর্কে আমার প্যাশনটা ঠিক কেমন...

ওখানকার নেতা ও নেত্রীদের তুলনায় ভারত ও বাংলার ইতিহাস, ভূগোল, ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প, রাজনীতি, সমাজনীতি— এসব বিষয়ে আমার জ্ঞানবুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ ঠিক কেমন, সেটাও প্রশ্নের বাইরে রাখেন তাঁরা। কারণ, সেখানেও কথা বলতে গেলে একটু বিপদে পড়তে হতে পারে, চম্পট দিতে হতে পারে। কী দরকার ওসব ঝামেলা বাড়িয়ে? একতরফা খিস্তি খেউড় করে কেটে পড়। যঃ পলায়তি সঃ জীবতি। শাস্ত্রবাক্য মিথ্যে নয়।

এদেশে বসে আমি কেন মিলিয়নেয়ার হবার সিদ্ধান্ত না নিয়ে অ্যাক্টিভিস্ট হবার সিদ্ধান্ত নিলাম, এবং সায়েন্স ছেড়ে দিয়ে কেনই বা চল্লিশ বছর বয়েসে নতুন করে পড়াশোনা করার জন্যে সমস্ত অর্থ নিঃশেষ করে আবার হিউম্যানিটিজ নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। কেনই বা কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি আমাকে অ্যাডমিশন দিল, আর কেনই বা একটি বিষয়ে আমাকে শ্রেষ্ঠ ছাত্রের পুরস্কার দিল। কেউ জানতেও চায় না, আর আমিও সবসময়ে নিজের ঢাক নিজে পেটাই না, যদিও বধির যারা, অন্ধ যারা, তাদের সামনে ঢাক একটু পেটাতেই হয়, নইলে তারা বুঝবে না কিছুই।


ছবি: পিক্সঅ্যাবে

এর পর আছে, নাগরিকত্ব নামক প্রশ্ন। আপনি ভারত সম্পর্কে কথা বলার অধিকার হারিয়েছেন, কারণ আপনি ভারতের নাগরিকত্ব ছেড়ে মার্কিন নাগরিকত্ব নিয়েছেন। সুতরাং, আপনি হিন্দুধর্ম ছেড়ে মুসলমান হওয়ার মতোই বিধর্মী এখন। দেশদ্রোহী। যদিও আমার এখন ইন্ডিয়া ও ইউ এস এ— দুটো দেশেরই পাসপোর্ট। সে যাই হোক। গালাগালি দিতে তো আর পয়সা লাগে না। আর যেখানে অদৃশ্য থেকে মনের সুখে গায়ের ঝাল মেটানো যাচ্ছে, সেখানে বাঙালি বিনাপয়সায় সেটা খুব দক্ষতার সঙ্গেই করতে পারে। এ বিষয়ে বাঙালি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

তার উপরে যদি আবার মর্কটবাহিনী হয়। এখন আর কোনো প্রশ্ন, আলোচনা, বিতর্ক এসবের দরকার নেই। আমার মনে হলো একজন দেশদ্রোহী, ভারতবিদ্বেষী, আমি তার সম্পর্কে যা খুশি তাই বলতে আরম্ভ করলাম। মাথামোটা হলে নোংরা কদর্য কথা বললাম, একটু কম মাথামোটা হলে বক্রোক্তি করলাম, নিন্দামন্দ করলাম সাধুভাষায়। যার সম্পর্কে বলছেন, সে একা কতক্ষণ আর আত্মরক্ষা করবে? তাকে তখন ঘিরে ফেলেছে অভিমন্যু বধের সপ্তরথী। অভিমন্যুর সে ব্যূহ কেটে বেরোবার কৌশল জানা ছিল না। আমাদেরও অনেকেরই থাকে না। কিছুক্ষণ পরেই রণে ভঙ্গ দেয়।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত জিতে যায় মর্কটবাহিনী। তাদের কোনও পরীক্ষা দিতে হয় না। ইতিহাস ভূগোল রাজনীতি অর্থনীতি কিছুই জানতে হয় না। তাদের তখন রাস্তায় মাসল ও মারণাস্ত্র, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষাক্ত জিহ্বাস্ত্র। বা, চোরাগোপ্তা ভার্বাল অ্যাসল্ট। নাভির নীচে আক্রমণ। অনেক সময়ে আপাত নিরীহ ভাষায়। দর্শক বুঝতেও পারবে না, দুনম্বরিটা কীভাবে হচ্ছে।

এর সঙ্গে লড়বার শক্তি কজনের আছে?

পুনশ্চ: অবশ্য, এদের অনেকেই নিজেরা একসময়ে বিদেশে আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন অনেকেই তাদের ছেলেমেয়ে জামাইকে আমেরিকা ইউরোপে যে কোনও মূল্যে পাঠানোর জন্যে অতি ব্যগ্র। কিন্তু, সেসব কথা থাক। কী দরকার, অপ্রিয় আলোচনা নতুন করে শুরু করবার? সিটিজেন না হতে পারো, গ্রীনকার্ডটা যেন ভুলো না। ওতে আমেরিকাও থাকবে, ডলারও থাকবে, আবার দেশপ্রেমও থাকবে।

ওহ, হাউ বিউটিফুল!

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -