SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

হার্ভি ও আর্মা নামক ঘূর্ণিঝড়, এবং আমেরিকার উলঙ্গ, অজানা দারিদ্র

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭
Share it on
অসভ্য কিউবা আর ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের খবর সভ্য আমেরিকার মিডিয়া রাখে না। ওসব জায়গায় থাকে কারা? হতদরিদ্র কালো কালো রোগা রোগা মানুষ। ওরা বেঁচে থাকবেই যেমন করে হোক।

আগস্টের শেষে ও সেপ্টেম্বরের গোড়ায় হার্ভি ও আর্মা নামে দুটো ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় আমাদের দরজার কাছে এসে যমদূতের পরোয়ানা ধরিয়ে দিয়ে গেছে। যাঁরা এদেশে থাকেন না, তাঁরা কল্পনাও করতে পারবেন না, কী ভীষণ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে আমেরিকা নামক তথাকথিত প্রথম বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ। গরিবের গরিব মানুষ।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন হার্ভি টেক্সাসের হিউস্টন শহরকে সমুদ্রে পরিণত করে দিয়ে চলে গিয়েছে। এতো বিরাট, নাসা-খ্যাত শহরের কয়েক লক্ষ মানুষ এখনও জলের তলায়। বাড়িঘর শেষবারের মতো পিছনে ফেলে রেখে অনেক দূরে চলে গিয়েছে আরো অসংখ্য আমেরিকান। ঠিক সেই নিউ অরলিন্সের ক্যাট্রিনার মতো।

এদিকে হারিকেন আর্মা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে, কিউবার উত্তরাংশের বহু শহর উপশহর গ্রামকে চেঁছেপুঁছে ফেলে, রাজধানী হাভানাকে এক মানুষ জলের তলায় রেখে ফ্লোরিডাকে আতঙ্কে কাঁপিয়ে দিয়ে উত্তরের দিকে ধেয়ে গিয়েছে। এই লেখা যখন লিখছি, তখন উত্তর ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিল ছাড়িয়ে আর্মা হানা দিয়েছে জর্জিয়া, অ্যালাবামা, সাউথ ক্যারোলাইনার আকাশে। যদিও সে ঝড় এখন তার শক্তি হারিয়েছে অনেকটাই। তাও শুনলাম, বন্যায় ভেসে যাচ্ছে সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লস্টন, আর জর্জিয়ার সাভানার ছোট ছোট শহর আর গ্রাম। দুটো ব্রিজ ভেঙে পড়ার মুখে।


হার্ভে হিউস্টনের দৃশ্য। ছবি: লেখক-সূত্রে প্রাপ্ত

মানুষ মরেছে অনেক। এক হার্ভিতেই হিউস্টনে শতাধিক লোক মরেছে। আর্মাতে আরো কত মরেছে সব মিলিয়ে, কে জানে?

অসভ্য কিউবা আর ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের খবর সভ্য আমেরিকার মিডিয়া রাখে না। আমার এক পরিচিত মহিলা সেই সময়ে বাহামার একটি দ্বীপে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। কোনওরকমে সময়মতো ফিরে এসেছেন আমেরিকায়। তিনি জানালেন, মিডিয়াতে চব্বিশ ঘন্টা ধরে আর্মার উপরে যে সতর্কবাণী হরর সিনেমার মতো প্রচারিত হচ্ছিল, তার কোনওটাই ওসব ‘ঈশ্বর-পরিত্যক্ত’ জায়গার মানুষকে সাবধান করে দেবার জন্যে নয়। সেখানকার মানুষ বুঝতেই পারেনি, কতবড় ঝড় ধেয়ে আসছে। সম্পূর্ণ মিডিয়া নাটক কেবলমাত্র আমেরিকা, আমেরিকা, আমেরিকা, কেবল ফ্লোরিডা, ফ্লোরিডা, ফ্লোরিডা। আহা, মায়ামি যদি ডুবে যায়, ভেসে যায়, ভেঙে যায়, মচকে যায়, টসকে যায়! পৃথিবীর কত বড় ক্ষতি! আহা, যদি নেপলস, ট্যাম্পা, অর্ল্যান্ডো তলিয়ে যায়! কত বড় ট্যুরিজম বিপর্যয়!

বারবুডা, আঙ্গুইয়া, সেন্ট মার্টিন চিরকালের মতো ধ্বংস হয়ে গেল? ও এমন একটু হয়েই থাকে। তা ছাড়া, ওসব জায়গায় থাকে কারা? হতদরিদ্র কালো কালো রোগা রোগা মানুষ। ওরা বেঁচে থাকবেই যেমন করে হোক। কেন, আইলার পরে সুন্দরবনের ওই কালো কালো, রোগা রোগা লোকগুলো কি বেঁচে থাকেনি?

হাভানা? ওসব তো কমুনিষ্টি। যত নষ্টের গোড়া তো ওগুলোই। ভগবানের মার। কই, গড-লাভিং আমেরিকার মানুষ তো অতো মরে না। যত্তোসব!

অবশ্য, মার্কিন ভার্জিন আইল্যান্ড আর তার সেন্ট ক্রয়, সেন্ট জন, সেন্ট টমাসও গিয়েছে শেষ হয়ে, কিন্তু সে কথা থাকুক। মিডিয়াতে বেশি না বললেই হল। আহা, ফ্লোরিডা তো বেঁচে গেল! বিকিনি সমুদ্রতট, অসংখ্য ক্যাসিনো, গলফ খেলার মাঠগুলো তো আর শেষ হয়ে যায়নি। ঈশ্বর বাঁচিয়েছেন। আমেরিকা ইজ গ্রেট।


হাভানায় আর্মার পরে। ছবি: লেখক-সূত্রে প্রাপ্ত

মুশকিল হল, আমেরিকা ইজ নট সো গ্রেট। ফ্লোরিডার অসংখ্য মানুষ— সাদা, কালো, হিসপ্যানিক, বাদামি মানুষ— এখনও জলের তলায়। বাড়িঘর ভেসে গিয়েছে, ডুবে আছে জলের তলায়। আমাদের এখানে কয়েক বছর আগে হারিকেন স্যান্ডি নিউ ইয়র্ক শহরকে যেভাবে ডুবিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, সেভাবেই ডুবে গিয়েছে দক্ষিণ ফ্লোরিডা। হাজার হাজার মানুষ এই মুহূর্তে গভর্নমেন্ট শেল্টারে। কোথাও বাস্কেটবল খেলার স্টেডিয়ামকে বাস্তুহারা শিবিরে পরিণত করা হয়েছে, কোথাও প্রাইমারি বা মিডল স্কুলকে। খাবার দিচ্ছে গভর্নমেন্ট, জামাকাপড় দিচ্ছে গভর্নমেন্ট, ওষুধ দিচ্ছে গভর্নমেন্ট, জলের বোতল দিচ্ছে গভর্নমেন্ট। সঙ্গে রয়েছে অনেক ছোটবড় নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠান।

প্রাইভেট কর্পোরেশনের আর বেসরকারিকরণের এই উলঙ্গ জয়োল্লাসের দিনে এই প্রায়-উলঙ্গ গরিবের গরিব মানুষগুলোর পাশে কিন্তু সেই গভর্নমেন্টই। এই কয়েক সপ্তাহ ধরে যে দিবারাত্র সতর্কবাণী টিভি রেডিও সংবাদপত্রে প্রচারিত হয়েছে, তাও কিন্তু এসেছিল সেই গভর্ণমেন্ট-চালিত ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস থেকেই। বা, সেই হিউস্টনের নাসা থেকেই। ফেডারেল এমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি বা ফিমা নামক সরকারি প্রতিষ্ঠানই কিন্তু এই শেল্টারগুলোতে মানুষজনকে নিয়ে আসার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছে। তারাই প্ল্যান তৈরি রেখেছে এই লক্ষ হতদরিদ্র মানুষগুলোকে— মেয়ে পুরুষ শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে কী ভাবে বিপদ, মৃত্যু ও অনাহারের হাত থেকে বাঁচানো যায়।

রোনাল্ড রেগান বলেছিলেন, গভর্নমেন্ট দরকার নেই, কারণ ‘গভর্নমেন্ট ইজ দা প্রবলেম’। নো স্যার, ইওর অনার, গভর্নমেন্ট ইজ নট দ্য প্রবলেম। মাত্রা ছাড়া বেসরকারিকরণ, এবং প্রাইভেট কর্পোরেশন ও তাদের মাত্রাছাড়া লোভই আসল প্রবলেম। তাদের আউট অফ কন্ট্রোল ফসিল ফুয়েল উত্তোলন— তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা— তার সঙ্গে ভয়ঙ্কর বনোচ্ছেদন মা-প্রকৃতির সমস্ত ভারসাম্য চিরকালের জন্যে ধ্বংস করে দিয়েছে। জলবায়ুর মাত্রাছাড়া কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাস বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বিজ্ঞানীরা বহুবার সতর্ক করে দিয়েছেন, কিন্তু বিশেষ করে আমেরিকা, চিন ও ভারতের শাসকশ্রেণী তাতে কর্ণপাত করেনি। পরিবেশ আজ এক মহাবিপর্যয়ের মুখে। মহাবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও অবিশ্বাস্য জনসংখ্যা পৃথিবীকে আর একশো বছরের মধ্যেই বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য করে তুলবে। মহামারী, হারিকেন আর্মা, হার্ভি ও আইলার মতো মহাপ্রলয়, এবং সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ-বিপর্যয়-হেতু বাস্তুহারাদের বিপুল তরঙ্গ পৃথিবীর কোণে কোণে নতুন নতুন যুদ্ধ ও হিংসা ডেকে আনবে।


ফ্লোরিডায় আশ্রয়প্রার্থীদের লাইন। ছবি: লেখক-সূত্রে প্রাপ্ত

হার্ভি, আর্মার পরেও ধেয়ে আসছে হারিকেন হোজে। গালফ অফ মেক্সিকোতে হানা দিয়েছে ঘূর্ণিঝড় কাচিয়া। আরো আসছে, আরো আসছে, আরো আসছে। মেক্সিকোতে ভূমিকম্প হয়ে গেল একই সঙ্গে। ক্যালিফোর্নিয়া ওদিকে ভয়ংকর তাপপ্রবাহে জ্বলছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এক বিজ্ঞান-বিরোধী প্রেসিডেন্ট ও তাঁর মানবসভ্যতা-বিরোধী সাঙ্গপাঙ্গরা এর পরেও ক্লাইমেট চেঞ্জ নামক বৈজ্ঞানিক সত্যকে অস্বীকার করে চলেছেন। এই গণশত্রুর দল। তাঁদের মিডিয়া মানুষকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বলে এসেছে, "ঝড় আসছে না। এলেও তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাবার কোনও দরকার নেই। ওসব নাসা আর গভর্নমেন্ট-বাজদের প্রোপাগান্ডা।"

তার পর সেই অতি-দক্ষিণ, ফ্যাসিস্ট মিডিয়ার লোকগুলো নিজেরাই সরে পড়েছে বেগতিক দেখে। কিন্তু সেই মানুষগুলো, যারা তাদের কথা শুনেছিল, তারা ইভাকুয়েট না করায় আরও বিপদের তলায় তলিয়ে গিয়েছে।

কী আর বলব? এই হলো আমাদের আমেরিকা। এখানেই আমরা থাকি। একদিকে হিংস্র শাসকদের হিংসা ও ঘৃণার বিরুদ্ধে লড়াই করছি, অন্যদিকে তাদের নিরন্তর মগজধোলাইয়ের বিরুদ্ধে।

কিন্তু হার্ভি, আর্মা, স্যান্ডি আর এই সেদিনের হারিকেন ক্যাট্রিনা যে আমেরিকার উলঙ্গ দারিদ্র ও অশিক্ষাকে আরো উলঙ্গ করে দিয়ে চলে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বলতে গেলে, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’ — এই প্রশ্নটাই বোধহয় আমাদের মতো মুষ্টিমেয় প্রশ্নকারীদের এখন একমাত্র সান্ত্বনা।

ভারত, বাংলাদেশ কি এসব ঘটনা থেকে কিছু শিখবে? কলকাতা, বাংলার মানুষ? সত্যের সন্ধান করবে? মিথ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে? আমেরিকা নামক মিথ যে আসলে কত বড় মিথ্যে— তা উপলব্ধি করবে?

যত তাড়াতাড়ি করে, ততই মঙ্গল।

Irma Disaster USA Storm
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -