SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

বোমা, দোদমা, বোতল বোমার কালী পুজো কিন্তু ‘দেওয়ালি’ নয় কখনওই

অক্টোবর ১৯, ২০১৭
Share it on
কালীপটকার কালীপুজো। ধানিপটকা। দোদমা। চকলেট বোম। বোতল বোম। কালীপুজোর রাতে উত্তর কলকাতা আউট অফ কন্ট্রোল ফাটছে।

আসলে, আমরা ‘দেওয়ালি’ কখনো বলতামই না।
 
‘দেওয়ালি’ কথাটা কলকাতায় তেমন শুনিই নি কখনও। ওই বড়বাজার, জোড়াসাঁকো ওইসব দিকে যেখানে হিন্দিভাষী লোকজন খুব বেশি থাকত, সেখানেই ‘দেওয়ালি’ কথাটা চলতো বেশি। ওই গণেশ টকি ছাড়ালেই যে কোলকাতাটা কেমন যেন ভীষণ জ্যামে আর ঘামে ভিজে থাকে, ওইদিকটা। ওখানে আমরা যেতাম শুধু হাওড়া স্টেশন যাওয়ার জন্যে পুজোর ছুটিতে। আর ফিরে আসার সময়ে। ওটা আমাদের কলকাতা ছিল না কখনো।
 
‘দেওয়ালি’ কথাটা আর চলত আমাদের হিন্দিভাষী আর এস এস, জনসঙ্ঘ সার্কলে। ওই রোহিত গুপ্তা, হরিশ চোপরা, রামানন্দ রাস্তোগি— এইসব লোকেদের মধ্যে। জানেন তো, আমি ছ'বছর বয়েস থেকে প্রায় বাইশ বছর বয়েস পর্যন্ত ওই ওদের মধ্যেই ছিলাম? জানেন না? এঃ, বড্ডো ভুল হয়ে গেছে। বলা হয়নি আগে। এজ্ঞে, এট্টু খ্যামাঘেন্না করে দেবেন। আমিও নিজেকে করে দিয়েছি।

ছবি: পিক্সঅ্যাবে

 আমরা বাঙালিরা কখনো ‘দেওয়ালি’ বলিনি। আমাদের কাছে কালীপুজো ছিল কালীপুজোই। ওল্ড ফ্যাশনড রক্ষেকালী। সেই যে, জিভ বের করা নীল রঙের ঠাকুর, চার হাত যা এক হাতে চোখ আঁকা খাঁড়া, গলায় মুণ্ডমালা, পায়ের নীচে শিব, আর দু’পাশে রক্তমুখী ডাকিনি যোগিনী।
 
যেমন আমাদের কাছে হ্যাপি দশেরা, বা হ্যাপি ধনত্রাস— এসব সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা শব্দ ছিল। আমাদের ধন ছিল না, তাই তার কোনো ত্রাসও ছিল না। আমরা তার রাহুগ্রাসে পড়িনি কখনো। কালীপুজোর অমাবস্যার রাতেও আমাদের কোনও অন্ধকার কখনো স্পর্শ করেনি। আমরা ছিলাম উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রার মতো সূর্যের উজ্জ্বল রৌদ্রে। আমরা চঞ্চল পাখনায় উড়ে উড়ে বেড়াতাম।
 
আমরা ওই হ্যাপি হোয়াটস্যাপ আর হ্যাপি ফেসবুক গ্রিটিংস দিবারাত্র না পেয়েও দিব্বি হ্যাপি ছিলাম। বিশ্বাস করুন। দারুন হ্যাপি ছিলাম দিবারাত্র। আর হ্যাপি মহালয়া যে কী জিনিস, তা তখনও জানতাম না, আর এখনও জানি না। মহালয়া, যদ্দূর জানি, মোটেই কোনও হ্যাপি ব্যাপারই না।
 
তা, সে আর কে কাকে বোঝাবে? বোঝানো ব্যাপারটাই আজকাল একটা বোঝা। কারোকে বোঝাই যায় না ভাল করে।

ছবি: পিক্সঅ্যাবে

যাই হোক। বল বাউন্ডারির বাইরে চলে যাবার আগে ব্যাটের ডগা দিয়ে এট্টু টেনে আনি। বিষয়ান্তরে চলে যাবার আগে ফিরে আসি বিষয়ে। নইলে লেখা হয়ে যাবে বিষম বিষময়।
 

হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম। কালীপুজো। আমাদের সেই সময়। সুনীল গাঙ্গুলির ‘সেই সময়’ নয়। আমাদের উত্তর কলকাতার ষাট আর সত্তর দশকের ধোঁয়া ধোঁয়া, গলি গলি, ধুলো ধুলো, রবারের বল, ইট পেতে শীতের উইকেট, ভাঙা ব্যাট ধূসর আলোয়ান গায়ে বাজারের থলে হাতে সেই সময়। যখন আমাদের গোরাচাঁদ বোস রোডের গলির ভিতরে তস্য গলির দেওয়ালে কয়লা দিয়ে লেখা থাকতো, "শ্রীকাকুলামে তিনশো গ্রাম মুক্ত’’। আর আমরা হাপ্-প্যান্ট পরা মূর্খ বালকের দল অবাক হয়ে বলাবলি করতাম, "আচ্ছা, তিনশো গ্রাম কী মুক্ত বল দিকিনি?" তিনশো গ্রাম আলু, না পটল, না মুসুর ডাল, না ময়দা, না উচ্ছে?
 
এই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বুঝতে না পারার অনিচ্ছাকৃত অনিচ্ছের জন্যেই একেবারে উচ্ছন্নে যেতে বসেছিলাম।
 
এই আবার বল গড়িয়ে চলে যাচ্ছে। যাচ্চলে! যাকে বলে, বলতে চাইছি দেওয়ালি, কিন্তু করে ফেলছি দেয়ালা। এ যেন এক বিচ্ছিরি খামখেয়ালা।
 

ছবি: পিক্সঅ্যাবে

আমাদের কালীপুজোতে বাজি ফাটানোর ব্যাপারটাই আসল ছিল। ছেলেবেলার কথা যদি বলতে হয়, তাহলে সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতো একটু একটু করে বলতে হবে। কারণ, শুরুটা হয়েছিল হাপ্-প্যান্ট পরারও আগের অবস্থা থেকে। তখন ওই একটু ফুলঝুরি, রংমশাল, আর একটু সাপবাজি। আর, লাল নীল দেশলাই। আর খেলনা পিস্তলে ক্যাপ ফাটানো ফটাস ফটাস। বর্ণের সঙ্গে গন্ধের যে একটা আশ্চর্য আর্টিস্টিক সহাবস্থান আছে, সেটা বুঝতে শুরু করেছিলাম সেই বয়েসেই। বাঙালির জিনে আর্ট আছে না? না বুঝে যাবে কোথায়?
 
ওই যেমন পড়তাম দুলে দুলে, "অকারের সঙ্গে অকার মিশিয়া দুয়ে মিলিয়া আকার হয়।" ঠিক সেইভাবে, লাল নীল দেশলাই'এর কাঠি ঠুকলেই যে একটা অদ্ভুত আলো ফসস করে জ্বলে ওঠে, তেমনি তার সঙ্গে সঙ্গে একটা অদ্ভুত মিষ্টি মিষ্টি, ঝাঁঝ ঝাঁঝ কেমন গন্ধ বেরোয়, আর টপ টপ করে ফোঁটা ফোঁটা ফুলকি ঝরে পড়ে। ফুলঝুরি জ্বালালেও পড়ে। রংমশালেও। আর কালো দড়ির মতো এঁকেবেঁকে পাকিয়ে পাকিয়ে ওঠা সাপবাজি। তার সঙ্গে কালো ধোঁয়া, গোড়ার কাছটায় একটা জ্বলে থাকা আগুন, আর তীব্র গন্ধ। ছেলেবেলায় ওই গন্ধটা কালীপুজো শেষ হয়ে যাবার কতদিন পরেও নাকে লেগে থাকতো। সাপবাজি জ্বালানো গলির ভাঙাচোরা মেঝেটায় কালো কালো দাগগুলো খুঁজে বেড়াতাম, আর নাক ঠেকিয়ে গন্ধ শুঁকতাম।

তার পর হাপ্-প্যান্ট পরা বালক আমি বন্ধু জুটিয়ে নিলাম সেই গোরাচাঁদের গলির গলি তস্য গলিতেই। জুটে গেলো সুব্রত। জুটে গেলো বাবু, বুড়ো, কল্যাণ, পরেশ, নেপাল, অশোক, কার্তিক গণেশ...আরো সব কত কে। হাজার হাজার ডক্টর হাজরার মতো শয়ে শয়ে না হোক, ডজন ডজন ডানপিটে ডাংগুলি ছোঁড়ার দল। দুচারটে ভালমানুষ ওই সুব্রতর মতো। আর বাকিগুলো বেশির ভাগ সব বাঁধিয়ে রাখার মতো। তিনশো গ্রাম নয়, একেবারে হাজার গ্রাম, মানে কিলো কিলো মুক্ত মুখ তাদের। হাজার কিলোলেও তাদের মুখ বন্ধ করা যাবে না। তাদের গল্পের মুখবন্ধই হবে না ওই দু’চার কথায়। মুক্তমুখে শ্রী কথামৃত। যে অমৃত-কথা শুনলে জীবিত মৃত হয়, আর মৃত জীবিত।

ছবি: পিক্সঅ্যাবে

তাদের সঙ্গে হাপ্-প্যান্ট থেকে ফুলপ্যান্ট... আর ফুলপ্যান্ট থেকে বেলবটস। তাদের সঙ্গে তস্য গলিতে টগরকুমারের ম্যাজিক থেকে শুরু করে শ্রী সিনেমায় এ-মার্কা ‘নিশিপদ্ম’। আর তারপর বেলবটস-শোভিত হয়ে টাইগার সিনেমার ভীষণ হট এবং হিউমিড উড়িয়ে-ওড়না-লু-হাওয়ায় ‘ব্লো হট ব্লো কোল্ড’। মার্কিনি বিবসনা পরীনটিনী নেচে যায়। দুলে দুলে দুলে সুদূ-উ-উ-র।
 
হ্যাঁ, ওই যাচ্চলে, রুমাল থেকে আবার সেই বেড়াল। ফিরে আসি রুমালে।

শব্দ আর গন্ধের সন্ধি। আলী আকবর-কেরামত উল্লার যুগলবন্দি। কালীপটকার কালীপুজো। আরো সব আছে। ধানিপটকা। দোদমা। চকলেট বোম। বোতল বোম। কালীপুজোর রাতে উত্তর কলকাতা আউট অফ কন্ট্রোল ফাটছে। দূরে দূরে কাছে কাছে। ...এখানে (প্রতিধ্বনি) ...ওখানে (প্রতিধ্বনি) ...ওই একপাতা কালিপটকা ফাটলো চটপটাপট চটপটাপট। ...কে যেন একটার পর একটা দোদমা বাজাচ্ছে কানের কাছে। ...হঠাৎ একটা বিরাট শব্দ হলো গদাআআম। বোতল বোম। চীনেবাজার থেকে ওই ঘোষদের বাড়ির ছেলেরা কিনে এনেছে। রোদে শুকিয়েছে খুব দুদিন তিনদিন ধরে। ওঃ কী আওয়াজ মাইরি!
 
আমার হাতে তৈরি তুবড়ির মুখাগ্নি করে ছেড়ে দিলাম। সামনের বাড়ির ওরা তিন সুন্দরী বোন মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে। না, আমাকে না, আমার তুবড়িকে। আমি চিরদুঃখী।
 
চিড়বিড় চিড়বিড় করে হাত চরকি ঘুরছে সামনের বাড়ির দত্তদের ছেলের হাতে। বেআইনি ছুঁচোবাজি ছেড়ে দিয়েছে কে যেন— সেটা আবার তিন পাক খেয়ে উড়ে বেঁকে চলে গেল কার বাড়ির বসার ঘরে। হু-উ-উ-স। হই হই করে সে বাড়ির দুই ছেলে বেরিয়ে পড়েছে ছুঁচোবাজির ছোঁচা মালিককে ধরবে বলে। সে ততক্ষণে তিন লাফ দিয়ে পগার পার।
 
আমার বুড়ি দিদিমা সেই সন্ধে থেকে কানে আঙুল দিয়ে বসে আছে। কোনওরকমে রাতটা কাটলে সে বাঁচে।
 
কিন্তু ওই দু’একটা রাতই। কালীপুজোর এক সপ্তাহ আগে থেকে আর এক সপ্তাহ পর পর্যন্ত অসভ্যতা ইতরামি আজকের মতো দেখিনি তখন। শব্দদূষণ এমন শালীনতা লঙ্ঘন করেনি কখনও তেমন করে। একটা আইনের শাসন ছিল। ভয় ছিল। একটু মানবিকতাও অবশিষ্ট ছিল তখনও। অসুস্থ রোগীর বাড়ির লোক নেমে এসে রিকোয়েস্ট করলে লোকে শুনত তার কথা। থ্রেট করত না। বাড়ির বৃদ্ধ মালিককে মারধর করত  না চাঁদার নাম করে। হ্যাঁ, ওই ফাটাকেষ্ট ওরা... আমি বলছি সাধারণ এ-পলিটিকাল পুজোগুলোর কথা।

                                                                                              ছবি: পিক্সঅ্যাবে 
 
কালীপুজোর রাতে পাড়ার যত লোক— ছেলেমেয়ে বুড়োবুড়ি ছোঁড়াছুঁড়ি— সব আমাদের গোরাচাঁদ যুবসংঘের প্যান্ডেলে রাত বারোটায়। "হাইলি অস-পিশাস।" ঢাক আর কাঁসর আর শাঁখ আর উলুধ্বনি আর ঘন্টা আর ধুনো আর মন্ত্রোচ্চারণ আর আরতি। দোদমার দামামা তখন চুপ।
 
শব্দগন্ধদ্রুম একবার দেখেছিলাম। চণ্ডীবাড়ি স্ট্রিটের সরু গলির বারোয়ারি কালীপুজোর প্যান্ডেলে উড়নতুবড়ির আগুন লেগে সব পুড়ে ছাই। পাশের বাড়ির বারান্দায় শাড়ি শুকোচ্ছিলো কাদের, সেগুলোতেও আগুন ধরে মহামারী কাণ্ড। ফায়ার ব্রিগেডের গাড়িও সে তস্যাতিতস্য গলির মধ্যে ঢোকে না। ওদের পুজো সেবার ওখানেই শেষ। কর্পোরেট স্পনসরশিপ পুজোর নামে তখনও বাজারে আসেনি। ইনসিওরেন্সও কেনা হতো না পুজোর।
 
আমাদের বাড়ির সামনের প্যান্ডেলেও একবার উড়ন্ত সাইরেন বাজি থেকে আগুন ধরে হুলুস্থুলু কান্ড। তারপর দেখি সেই কার্তিক— যে নিজের হাতে হাই-ভোল্টেজ ইলেক্ট্রিসিটির কাজ শিখেছিল শুধু সাহস আর মনের জোরে— সে লাফিয়ে উঠলো প্যান্ডেলের বাঁশে পা দিয়ে দিয়ে। তারপর নিজের হাতে নিবিয়ে ফেললো আগুন। নাঃ, কোনো পুরষ্কার ওকে দেয়নি কেউ।
 
সেবারে মাঝরাতের আরতি জমে উঠেছিল খুব।
 
পরের দিন ভাসান। এখনকার মতো পুজো নিয়ে ছেলেখেলা ছিল  না তখন। ফাটাকেষ্ট আর সোমেনের পুজোও সেই যুগযুগজিওর দিনে বেশিদিন ঠাকুরকে একা না খাইয়ে বসিয়ে রাখতো না। একশো আট লরি, আর একশো আট আলোর গেট, আর একশো পার্টি ব্যান্ড সহযোগে বিডন স্ট্রিট আর হেদো কাঁপিয়ে নিমতলা ঘাটের দিকে চলে যেত রাত দুটোর সময়ে।

আমরা গোরাচাঁদ যুব সংঘ তার অনেক আগেই তাসাপার্টি নিয়ে নাচতে নাচতে ভাসান দিয়ে এসেছি। গঙ্গাজলের সরুমুখের কলসি দড়ি দিয়ে টাঙানো আছে আমাদের রজত জয়ন্তী পুজোর খাঁ খাঁ প্যান্ডেলের পাশে স্বপনদাদের বাড়ির দেওয়ালে।
 
পাড়া নিস্তব্ধ, শান্ত। পাড়ার প্রহরী কুকুর ভুলো আর তার ছোট পরিবার সুখী পরিবারও ঘুমিয়ে পড়েছে। শান্তির জল কি ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিলও ওদের গায়েও?

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -