SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

একে ‘কালো’, তায় ‘মুসলমান’! বিদেশে ‘বাঙালি’র বড় দায়

ফেব্রুয়ারি ৫, ২০১৮
Share it on
প্রকাশ্যে বাজে কথা বলার সাহস বঙ্গপুঙ্গবদের নেই। কিন্তু আড়ালে তারা ‘কালুয়া’ বা ‘কাল্লু’ বলে সবসময়েই। এবং ব্ল্যাকরাও জানে, ইন্ডিয়ানরা বন্ধু বলে মনে করে না তাদের।

বহুকাল ধরে লক্ষ করছি, যেসব লোক মুসলমানদের নিয়ে অনেক বাজে বকেন, তাঁদের প্রায় কেউই মুসলমানদের সঙ্গে তেমন করে মেশেননি। বলতে গেলে তাঁদের কারোরই মুসলমান বন্ধু নেই, আর বান্ধবী তো দূরের কথা! মুসলমানদের বাড়িতে তাঁরা কখনও যাননি, থাকেননি। মুসলমানদের বিরুদ্ধে অনেক কথা তাঁরা বলেন, কিন্তু সব কথাই একরকম অন্যের মুখে শোনা।

এদেশে, এই আমেরিকায় বাঙালি বা ভারতীয়রা যেমন ব্ল্যাকদের সম্পর্কেও সবসময়েই বিষাক্ত মন্তব্য করেন। এঁরাও কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে কখনও কাছ থেকে মেলামেশা করেননি, বন্ধুত্ব করেননি, তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কথাবার্তা বলেননি, তাঁদের সম্পর্কে জানতে চাননি। কাগজ পড়ে, আর কয়েকটা হলিউডি সিনেমা দেখেই তাঁরা সব বিষয়ে সবজান্তা।

কিন্তু, নেগেটিভ কথা বলতে তো আর পয়সা লাগে না। আর পয়সা যাতে না লাগে, সেসব দ্রব্য নির্বিচারে হাতিয়ে তার ঝোল ঝাল আর অম্বল নিজের কোলে টেনে নিয়ে খাওয়ায় বাঙালি বা ভারতীদের কোনও জুড়ি নেই।

কালোদের বাঙালিরা কখনো ‘ব্ল্যাক’ বলে না। আগে বলতো ‘নিগ্রো’। এখন নিগ্রো বললে কালোরাও ছাড়বে না। দুশো বছর মনুষ্যেতর জীবন কাটিয়ে তারা আজ স্বাধীনতার আলোয় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। অসম্মান, অপমান তারা আর সহ্য করবে না। সুতরাং তাদের সামনে প্রকাশ্যে বাজে কথা বলার সাহস বঙ্গপুঙ্গবদের নেই। কিন্তু আড়ালে তারা ‘কালুয়া’ বা ‘কাল্লু’ বলে সবসময়েই। এবং ব্ল্যাকরাও জানে, ইন্ডিয়ানরা বন্ধু বলে মনে করে না তাদের।

আর ইন্ডিয়ান বলতে এদেশে আমরা ভারতীয়, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি, নেপালি, ভুটানি— সবাই। হিন্দু বৌদ্ধ শিখো জইন্য পারোসিকো মুসলমানো খৃস্টানি। আমেরিকানরা পাকিস্তানি রেস্টুরেন্টে গিয়েও ইন্ডিয়ান খাবার খোঁজে, আর বাংলাদেশি নাস্তার দোকানের নামও এদেশে গাঁধী। গাঁধীর নামে আমেরিকায় সামোসা আর চিকেন টিক্কাও বেশি বিক্কিরি হয়। ব্ল্যাকরা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে খুব একটা যায় না। ওই এদিক ওদিক দু’চারজন। গেলেও পায় উদাসীন, পাশকাটানো ব্যবহার। ইন্ডিয়ানরা ব্ল্যাক পাড়ায় থাকে না, বাড়ি কেনে না। আমাদের ব্রুকলিনের বাড়ির চারপাশে ব্ল্যাক প্রতিবেশী। আমাদের সবচেয়ে উপকারী বন্ধুরা, বিপদে আপদে উদ্ধারকর্তারা ব্ল্যাক।

আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে পরে লেখা যাবে। এখন লিখছি আমাদের মুসলমান বন্ধুদের কথা। আগেও দু’কিস্তি লেখা হয়ে গেছে এবেলা.ইন-এ। পড়ে নেবেন। এই নিয়ে আস্ত একটা কিতাব হো সকতা।

দেশে থাকতে মুসলমান বন্ধু ও ছাত্র পেয়েছিলাম। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার সারা জীবনের সবচেয়ে ভাল বন্ধু। আর আমেরিকায় বত্রিশ বছরে পৃথিবী আমারে আপন করেছে, ভুলেছি নিজের ঘর। আমরাও যাযাবর, আর বন্ধুবর আমাদের সারা বিশ্বের যাযাবর। সেনেগাল থেকে সুদান, ইন্দোনেশিয়া থেকে ইথিওপিয়া, জর্ডন থেকে জিবুতি। নাঃ, জিবুতির বন্ধু হলোনা এখনো। এই জীবৎকালে হল না। কী হল ওদের? যঃ পলায়তি, সঃ জিবুতি? কে জানে!

হলো পাকিস্তানি। হলো বাংলাদেশী। হলো ইন্ডিয়ান।

ইন্দোনেশিয়া আর মালয়েশিয়ার মুসলমান মেয়েরা আমাদের কার্বনডেলের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে কী তুড়ে ব্যাডমিন্টন খেলতো মুখখোলা বোরখা পরেই! বোঁ বোঁ করে ভীমরুলের মতো শব্দ হতো তাদের র‌্যাকেটের। র‌্যাকেট তো নয়, যেন রকেট!

কোথায় আড়াল থেকে যায়? ছবি: শাটারস্টক

না, ওদের হাজব্যান্ডদের চারটে করে বিয়ে কখনও দেখিনি। এই আমাদের মতোই একটা করেই বউ থাকতো। আর একটা কি দুটো ছেলেমেয়ে। জর্ডনের লোকগুলোও ওইরকমই ‘একদারা’ ছিল। উদারা মুদারা তারা দেখিনি কখনও। সেনেগালের আবুবকর না কি যেন নাম ছেলেটার, খুব লম্বা আর খুব কালো, আর হাসলে দাঁতগুলো পূর্ণিমার চাঁদের মতো ঝকঝক করে উঠত, আর থাকত আমাদের ম্যারেড স্টুডেন্ট হাউসিংয়ের দোতলায়, দুটো দরজা পরেই। যদ্দুর মনে পড়ছে, একটার বেশি বৌ দেখিনি। জানি না, ভেতরের ঘরে আরো তিনটে বউ লুকিয়ে রাখতো কি না। দু বছর ওখানে ছিলাম, ওই একটা বউকেই দেখতাম বাইরে। আর বউটাও দেখা হলে হেসে হেসেই কথা বলতো। তালাকের কোনো সম্ভাবনা কখনো দেখিনি। ছেলেমেয়ে ছিল না। ইয়ং কাপল। সন্ধেবেলা সেজেগুজে বেড়াতে যেত কোথায়। 

পাকিস্তানের কবি ইয়ার বন্ধু হায়দর রিজভির সঙ্গে আলাপ হল কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম পড়তে গিয়ে। দিলদরিয়া, একমুখ— না, একমুখ দাড়ি নয়— একমুখ হাসি। উচ্চকন্ঠে হো হো হাসি। পাগল আর মাতাল একটু, কিন্তু কী একখানা বিরাট হৃদয়। সে হৃদয়ে ঘৃণা হিংসা শত্রুতার কোনো স্থান নেই। নাইন ইলেভেনের পরে পার্ক স্লোপ বলে ব্রুকলিনের এক উচ্চবিত্ত মহল্লায় শেষরাতে একদল বর্বর শ্বেতাঙ্গ পিটিয়ে দাঁত ভেঙে রক্তারক্তি করে দিলো হায়দারকে। পরে শুনলাম হায়দারকে জিজ্ঞেস করেছিল তারা, "hey you motherফা... মুসলিম..." আর বোকা হায়দার তার উত্তরে বলেছিল, "listen buddies, I am not a Muslim, my religion is humanity"। বোকা জানত না, ‘হিউম্যানিটি’ কথাটা আগে ওরা শোনেইনি কখনও।

বহু বছর পরে হায়দার লাহোরে গিয়েছিলো মাকে একবার দেখতে। সেখান থেকে আর ফিরে আসেনি। হায়দর ছিল সাহসী সাংবাদিক। রাষ্ট্রসংঘের অর্ধ-অনুমোদিত আন্তর্জাতিক পত্রিকায় হায়দর সারা পৃথিবীর অত্যাচারী শাসকদের অত্যাচারের কথা লিখত। হায়দরের মতো সাংবাদিককে সে নির্মম শাসকশ্রেণি যে বাঁচতে দেবে না বেশিদিন, আমরা জানতাম। ওকে সাবধান করেও দিয়েছিলাম কেউ কেউ। ও হাসতো হা হা করে। উর্দুতে কী সব শায়েরি আওড়াত। তার মূল কথা হলো, ‘‘একটাই তো জীবন বন্ধু। পিঁপড়ের মতো না বেঁচে, শেরের মতো বাঁচো। দুর্বৃত্তরা আমার বন্ধু হায়দর রিজভিকে শেষ করে দিলো।
 
ঠিক যেমন শেষ করে দিল আমার খুব কম সময়ের রুমমেট জাফর হামজা সিদ্দিককে। নিউ ইয়র্কের সানিসাইড এলাকায় ঘরভাড়া নিয়েছিলাম জাফর আর তার কয়েকজন স্বদেশি ইন্দোনেশিয়ার আচে দ্বীপপুঞ্জের ছেলের সঙ্গে। জাফর বলেছিলো আমাকে তার গরিব দেশের কথা। সি আই এ মদতপুষ্ট ডিকটেটর সুহার্তোর অত্যাচারের কথা। আর আচে দ্বীপের মানুষদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। আলাপ হওয়ার কদিনের মধ্যেই জাফর আমাকে তার ঘর ছেড়ে দিল। বলল, কয়েক মাসের জন্যে বৃদ্ধ বাবা মা’র সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। আমি তার ঘরে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি।

জাফরও আর ফিরে আসেনি। সুহার্তোর খুনি গুন্ডাদের হাতে জাফর শেষ হয়ে গেল। শুনেছিলাম, ওর চোখ দুটো উপড়ে নিয়েছিল ওরা। হাত পা বেঁধে অত্যাচার করে ওর মৃতদেহটা কোনও নদীর ধারে নাকি ফেলে রেখে গিয়েছিল।

নিউ ইয়র্কে আলাপ হয়েছিল বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলনের স্বনামধন্য সৈনিক শাহরিয়ার কবীরের সঙ্গে। হিন্দুদের উপরে অত্যাচার ফেনী, ভোলা, হিঙ্গলগঞ্জে? শাহরিয়ার ভাই সেখানে রয়েছেন হিন্দুদের পাশে। মন্দির ভাঙছে জামাতিরা? শাহরিয়ার ভাই সেখানে উপস্থিত। নাইন ইলেভেনের পরে যখন আমরা লড়াই করছি নিউ ইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়া— সেই সময়ে শাহরিয়ার কবীরের সঙ্গে দোস্তি হয়ে গেল জ্যাকসন হাইটসের এক বাঙালির বাড়িতে। যোগাযোগটা থেকেই গিয়েছে। পদাতিক সৈন্যের স্যালিউট জেনারেলের জন্যে থেকেই যাবে সারা জীবন।

কত বন্ধু। কত গল্প। কত অভিজ্ঞতা। মুসলমান হিন্দু না খৃষ্টান, আস্তিক না নাস্তিক— এসব কখনো ভাবিনি। হিন্দুদের মধ্যেও দেবতা, দেবীকে দেখেছি। আর মুসলমানদের মধ্যেও। আবার দুই ধর্মের লোকেদের মধ্যেই শয়তান আর ইবলিশদের ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। ভয় পাইনি, কিন্তু সতর্ক থেকেছি। আজকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক আছি ট্রাম্প নামক অত্যাচারী, জাতিবিদ্বেষী, ধর্মবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী, ইমিগ্রেন্ট-বিদ্বেষী অপশাসকের সম্পর্কে। আর ট্রাম্পের ভারতীয় সমর্থক শাসকশ্রেণির সম্পর্কে। পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে উদ্যত হয়েছে ওরা। আমাদের লড়াই জারি থাকবে ওদের বিরুদ্ধে।

হায়দর রিজভির স্মরণসভায় লেখক। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

বহুকালের সাংবাদিক-লেখক বন্ধু আশফাক স্বপনও সেই একই কথা বলে। স্বপনের সঙ্গে সর্বসাকুল্যে দেখা হয়েছে তিন কি চার বার। কিন্তু একেবারে হৃদয়ের সম্পর্ক। একই কথা বলে সামনাসামনি কখনও না দেখা হওয়া পাকিস্তানি বন্ধু সাজিদ সামুন, আর বান্ধবী বিনা সারওয়ার। বিনা আর আমি দুজনে মিলে হায়দরকে নিয়ে একটা স্মৃতিসভা করেছিলাম। এই ব্রুকলিনের এক পাকিস্তানি রেস্টুরেন্টে বেসমেন্টের একটা হলে। ছোট্ট রেস্টুরেন্ট। নাম মাস-আল্লা। একটা ছবি, আর দুটো ফুলদানিতে কিছু ফুল। ধূপকাঠি। পাকিস্তানি, ভারতীয় আর মার্কিন বন্ধুরা সবাই মিলে সেই পাগল মাতাল বন্ধুটার স্মৃতিচারণ। বিনা সারওয়ার আর ওর কয়েকজন বন্ধু বস্টন থেকে অনলাইনে যোগ দিয়েছিল। এসেছিলো আমার চাইনিজ-আমেরিকান সাংবাদিক-ডাক্তার বন্ধু মাইকেল।

 মুসলমান অনেক দেখলাম এ জীবনে। হিন্দুও। কারোকেও কখনো শত্রু মনে হয়নি। যেমন কখনও এক নিমেষের জন্যেও শত্রু মনে হয়নি ব্ল্যাক আমেরিকানদের।

লিখলাম সংক্ষেপে, মানবধর্ম নিয়ে। যে ধর্মবিশ্বাস ট্রাম্প আর তার অন্ধকারের সঙ্গীদের অপরাধের থেকে, অত্যাচারের থেকে মানুষকে বাঁচাবে। লড়াই জারি থাকবে। সে লড়াইতে হিন্দু, মুসলমান, আস্তিক, নাস্তিক, বাঙালি ভারতীয় পাকিস্তানি ইউরোপিয়ান আমেরিকান সাদা কালো বাদামি— সবাইকে চাই।

সবাইকে দরকার।“শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা…”

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -