SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

শহরের কুশ্রী কোলাহলের বাইরে এক জীবন, কলকাতার শান্ত বানপ্রস্থ

সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৭
Share it on
বাড়িটা কেমন যেন নিঝঝুম, নিস্তব্ধ। তালাবন্ধ। যা আমাদের বাড়িতে কখনো ভাবা যায়নি। ভাবা হয়নি। রাতের অন্ধকারে জানলার গ্রিল দিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়ে বাবার প্রিয় বিছানাটায়।

গত ৬ই আগস্ট আমার বাবা জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। পরিণত বয়েসে পরলোকে প্রস্থান করলেন। তিরানব্বই বছর বয়েস হয়েছিল। খবর পেয়ে বেশ কয়েকজন বন্ধু জানালেন, দুঃখ পাওয়ার তেমন কিছু নেই। অনেককালের মানুষ ছিলেন তিনি, সব দায়িত্ব পালন করে চলে গেলেন। একদিন তো সবাইকে যেতেই হবে। এইসব। সত্যি বলতে কি, ভুল তাঁরা বলেননি। আমি জানি, দুঃখে ভেঙে পড়ার মতো কিছুই হয়নি।

 
আমিও বাবার মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই সপরিবারে কলকাতায় গিয়ে উপস্থিত হতে পেরেছিলাম। ভেন্টিলেশন থেকে বেরিয়ে এসে একদিন বা দু’দিন বাবা চোখ খুলে তাকিয়েছিলেন আমাদের দিকে। হেসেছিলেন। আমরা যে এসেছি তাঁর শেষ সময়ে, তা জেনে আনন্দ পেয়েছিলেন। অবশ্য নিজের জন্যে যেহেতু তিনি সারাজীবন কিছুই চাননি, তাই অবাক হয়েছিলেন একটু। সপরিবারে আমেরিকা থেকে একদিনের নোটিসে দেশে চলে আসা খুব সহজ নয়। তাই একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আমার জন্যে এসেছো?"

তার পর আবার একটু একটু করে ঘুমের দেশে চলে গেলেন দিনের শেষে।

আমরাও তাঁর পারলৌকিক কর্তব্য সমাধা করে নিউ ইয়র্কে ফিরে এলাম। আমার বোন ও তার ফ্যামিলি চিরকাল বাবাকে দেখাশোনা করেছে। সেই ১৯৭৮ সালে মা চলে গিয়েছিলেন বিয়াল্লিশ বছর বয়েসে। সেই থেকে। তা, কষ্ট বেশি পেতে হচ্ছে ওদেরই। চিরকাল ঘিরে থাকা একজন মানুষের হঠাৎ অনুপস্থিতির তীব্র বিষাদ। আমরা তো পৃথিবীর উল্টোদিকেই তিন দশক কাটালাম। আমাদের দুঃখ, আমাদের মৃত্যুশোক— সবই তো কেমন যেন দূর থেকে দেখা। কিছুটা বাস্তব, কিছুটা অবাস্তব। কিছুটা ছোঁয়া, কিছুটা কল্পিত। এই একবার মৃত্যুকে সামনাসামনি দেখলাম বহুকাল পরে, ছুঁয়ে এলাম, দশদিন ধরে নার্সিং হোমে দুবেলা ছোটাছুটি করলাম। বর্ষার কলকাতাও সেই দু’দশক পরে। গাছপালাগুলোও কেমন সবুজ, স্নিগ্ধ, শীতল। পিচঢালা, বৃষ্টির রাস্তার উপর দিয়ে উবার বা হলুদ ট্যাক্সির চাকার কেমন যেন একটা চুমু খাবার মতো মিচমিচ, মিষ্টি শব্দ। চেনা রাস্তা, চেনা পাড়া, চেনা পথে কড়ানাড়া। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড, বেলতলা রোড, ল্যান্সডাউন পদ্মপুকুর। জানি পৌঁছে যাবো ঠিক। সে ড্রাইভার রাস্তা চিনুক বা না চিনুক। কলকাতা শহরে কেউ হারিয়ে যায় না।

তিনি বৃদ্ধ হলেন। ছবি: লেখক

ডাক্তার, ওষুধ, টেলিফোন, ব্যস্ততা, স্ট্রেস, উৎকণ্ঠা, অনিদ্রা। তারপর শ্মশান, মুখাগ্নি, ইলেকট্রিক চুল্লি, অস্থি সংগ্রহ, এগারো দিনের অশৌচ, শ্রাদ্ধশান্তি, নিয়মভঙ্গ, এবং শেষে বিশ্রাম।

আমাদের আমেরিকায় জন্ম নেওয়া ও বড় হওয়া মেয়ের অদম্য সাহস ও শক্তি— সে জীবনে প্রথমবার শ্মশানের বিয়োগান্ত, ইনটেন্স ট্র্যাজেডির অভিজ্ঞতাতেও একেবারে স্টেডি। পাশাপাশি মৃতদেহ শোয়ানো রয়েছে, তার মধ্যে তার দাদুকেও শোয়ানো আছে মুখাগ্নির প্রতীক্ষায়। অন্তিমলগ্নে চিরপরিচিত, স্নেহশীল দাদু— যিনি তাকে আমেরিকায় বেড়াতে এসে বাংলা পড়তে, লিখতে শিখিয়ে গেছেন এক সময়ে— তাঁর মুখ পাণ্ডুর, চোখ চিরতরে বন্ধ, মৃত্যুদেব তাঁকে নিয়ে চলেছেন বৈতরণী পারের উদ্দেশ্যে। দুঃখ আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু এই যে জীবনের এক মহামূল্যবান অভিজ্ঞতা, এই অভিজ্ঞতা থেকে সে নিজেকে বঞ্চিত করবে কী করে?

অবাক হয়েছি আমরা। ভেবেছিলাম আমরাই বোধহয় মনের জোরের গর্ব করতে পারি শুধু।

বাবার সঙ্গে দিবারাত্র থাকা কাজের দিদিরা একজন দশ বছর, আর একজন তিন বছর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সেবা করার শেষে ছুটি পেলেন। জানি না, এখন ওঁরা হারিয়ে যাবেন কোথায়।

বাড়িটা কেমন যেন নিঝঝুম, নিস্তব্ধ। তালাবন্ধ। যা আমাদের বাড়িতে কখনো ভাবা যায়নি। ভাবা হয়নি। রাতের অন্ধকারে জানলার গ্রিল দিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়ে বাবার প্রিয় বিছানাটায়। বোন তাই খবর দিল। ওখানেই ছিল জিতেন্দ্রনাথের জগৎ— তাঁর খবরের কাগজ, তাঁর ম্যাগাজিন, তাঁর অনেক বই, আর মাঝে মাঝে বই-কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে টিভিতে তাঁর প্রিয় ক্রিকেট খেলা, মহাভারত, বা উত্তমকুমার অথবা সত্যজিৎ রায়, নয়তো তপন সিংহ। আর, দু’তিন দিন পর পর ছেলে আর ছেলের বউ আমেরিকা থেকে ফোন করবে, তার জন্যে অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করা।

ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা সংসারে এক সন্ন্যাসীর অতি ডিসিপ্লিনড, অনুশাসিত জীবনবোধ।

জীবন গিয়েছে চলে বহু বহু বছরের পার।

শহরে এখনও বেঁচে আছে এই দৃশ্য। ছবি: লেখক

শেষ জীবনে কানে ভাল শুনতে পেতেন না। কলকাতার ভয়াবহ শব্দদূষণ তাঁর শ্রবণশক্তিকে চিরকালের মতো নষ্ট করে দিয়েছিল। তা, একদিক থেকে ভালই হয়েছিল। অশ্ৰাব্য-কুশ্রাব্য পোস্ট-মডার্ন গালিগালাজ, রাস্তার কুকুরের নিরবচ্ছিন্ন চিৎকার, যে কোনও কারণে বা অকারণে বাজি আর বোমা, অথবা বুমবক্স আর লাউডস্পিকারে রক্তচাপ ও ক্রোধ উদ্রেক করা নিম্নস্তরের হিন্দি গান তিনি শুনতে পেতেন না। শুনতে হয়নি। চোখটা ভালই ছিল। হার্ট ভাল ছিল। এই বিশ্রী, কুশ্রী, অমানবিকতার জগৎ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে নিয়ে বাণপ্রস্থ যাপন করতেন।

রবীন্দ্রনাথের গান ভালোবাসতেন। বাড়িতে গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করত আমার বোন পূর্ণা, আমরা কলকাতায় গেলেই। তার ছাত্রছাত্রীরা আসতো উৎসাহে অংশগ্রহণ করতে। আমরা সবাই গান গাইতাম। বাবা জানলার ধারের সেই বিছানাতে আধশোয়া হয়ে শুনতেন। কিছুটা শুনতেন, কিছুটা কল্পনা করে নিতেন। তারপর রাত ন’টা বাজলে কাজের দিদির হাত ধরে আস্তে আস্তে চলে যেতেন তাঁর শোবার ঘরে। এই দৃশ্য আমরা দেখে আসছি কতকাল।

এই নিরিবিলিতে কি ফেরা হবে কখনও? ছবি: লেখক

বাবার শরীরটা যখন নিয়ে আসা হলো নার্সিং হোম থেকে, তখন সেই বিছানাতেই তাঁকে শোয়ানো হলো। সেই আমরাই গান গাইলাম। রবীন্দ্রনাথের গান। আগুনের পরশমণি শেষবারের মতো তিনি ছুঁয়ে দিলেন আমাদের মনে।

আর একবার একটা স্মৃতিসভা, সেই ঘরেই। এবারে বিছানায় তিনি নেই। তার বদলে রজনীগন্ধার মালা দেওয়া তাঁর একটা ছবি।

আমরা আবার রবীন্দ্রনাথের গান গাইলাম।

"তোমার আশিস আমার কাজে
সফল হবে বিশ্বমাঝে
জ্বলবে তোমার দীপ্তশিখা
আমার সকল বেদনাতে।
তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো
আমার দখিন হাতে। "

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -