SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

‘ভালবাসার শহর’ যেন এক ঝলক শেষ সূর্যকিরণের গল্প

জুলাই ১৩, ২০১৭
Share it on
একটা জায়গা শেষ হয়ে গেছে দ্রুত, আর তার কঙ্কাল পড়ে রয়েছে। আর একটা জায়গা কঙ্কালের মতোই বেঁচে আছে তার তিনশো বছরের শোষণের, বঞ্চনার, দারিদ্র্যের ইতিহাস বুকে নিয়ে।

‘ভালবাসার শহর’ নামে একটা তিরিশ মিনিটের ছবি দেখলাম। ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর পরিচালনা। আগেও তাঁর ‘ফড়িং’ দেখেছিলাম। মুগ্ধ হয়েছিলাম।

‘ভালবাসার শহর’ শুধু একটা ভালবাসার শহরের ছবি নয়। কলকাতার ছবি নয়। আমাদের বাঙালি সেন্টিমেন্টের, আর কলকাতা কলকাতা করে কেঁদে ভাসানোর ছবি নয়। এ ছবি পৃথিবীর ভালবাসার ছবি। মানবজাতি নামে একটা জাতির ছবি। হোমো সেপিয়েন্স নামে যে প্রজাতিটা খুব দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যে প্রজাতির বৈশিষ্ট্য ছিল উদারনৈতিকতা, হৃদয়বৃত্তি, হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান বৌদ্ধ ভুলে গিয়ে কেবলমাত্র প্রেম নামের এক কোমলতার শৃঙ্খলে মানুষকে চিরকালের জন্যে একসূত্রে বেঁধে ফেলার ক্ষমতা। যে ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে, লোভ ও লালসার চোরাবালির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। ইন্দ্রনীল সেই দানবীয়, জান্তব চোরাবালি থেকে মানুষ নামক প্রজাতিকে টেনে বাঁচাবার গল্প বলেছেন।

আদিল হায়দার ও অন্নপূর্ণা দাসের প্রেম তাদের টেনে নিয়ে গেলো একদা-সুন্দর সিরিয়ান শহর হোমসে। মুসলমান, হিন্দিভাষী আদিল, ও হিন্দু, বাংলাভাষী অন্নপূর্ণা। সেই সুন্দর, দু’হাজার বছরের পুরনো শহর হোমস বিধ্বস্ত হলো যুদ্ধে, বোমায়, গ্রেনেডে, কামানের গোলায়। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক জায়গার মতো, ইরাকের মতো, ইরানের মতো, আফগানিস্তানের মতো সিরিয়া ধ্বংস হলো। তার সঙ্গে ধ্বংস হলো আদিল ও অন্নপূর্ণার জীবন। আদিল পড়ে রইল সিরিয়ায়, বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে। গোলায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া শিশুসন্তানকে নিয়ে অন্নপূর্ণা ফিরে এলো তার পুরোনো শহর কলকাতায়, যেখানে কয়েক বছর আগে তার সঙ্গে আদিলের প্রথম দেখা হয়েছিল, ভালোবাসা হয়েছিল।

শুরু হলো অন্নপূর্ণার নতুন যুদ্ধের জীবন। সে যুদ্ধ বন্দুক কামান বোমারু বিমানের যুদ্ধ নয়। সে যুদ্ধ অর্থনৈতিক যুদ্ধ, সামাজিক যুদ্ধ। এক গরিব যুবতী মায়ের দিনে চোদ্দ-পনেরো ঘণ্টা স্কুলবাসের অ্যাটেনডেন্টের জীবন, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চকোটি সমাজের মহিলাদের বাড়ি গিয়ে তাদের ম্যাসাজ দেওয়ার জীবন। যেখানে প্রলোভন, লালসা, চোখরাঙানির সঙ্গে মর্যাদা ও স্নায়ুর যুদ্ধ। যেখানে বৃদ্ধ বাবার আশ্রয়ে কোনোরকমে শিশুসন্তানকে বুকে জড়িয়ে বাঁচার আশা। তার চিরকালের মতো জখম হয়ে যাওয়া শরীরটাকে সুস্থ করে তোলার আশা। আর একই সঙ্গে ফেলে আসা আদিলের খোঁজখবর নেওয়া, আমলাতন্ত্রের নাগপাশ পেরিয়ে তার কাছে পৌঁছনোর আশা, তাকে একবার জীবিত দেখতে পাওয়ার আশা।

• ভারত ও বাংলাদেশের দর্শকরা ‘ভালবাসার শহর’ ছবিটি দেখুন এখানে

 

হোমস বীভৎস বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেল। হারিয়ে গেল দুটো সুন্দর ভালবাসার জীবন। সেই বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া বিধ্বস্ত হোমস আর আমাদের এই বাইরে থেকে না দেখতে পাওয়া, অথবা না দেখতে চাওয়া, কলকাতা শহরের মধ্যে কী আশ্চর্য মিল! একটা দেশ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে মার্কিনি ও শাসকশ্রেণির মিলিটারি যুদ্ধের বোমার আঘাতে, আর একটা দেশ ধূলিসাৎ হয়ে যেতে বসেছে লোভ, লালসা, পুঁজিবাদ ও শাসকশ্রেণীর অর্থনৈতিক যুদ্ধের বোমার আঘাতে। একটা জায়গা শেষ হয়ে গেছে দ্রুত, আর তার কঙ্কাল পড়ে রয়েছে। আর একটা জায়গা কঙ্কালের মতোই বেঁচে আছে তার তিনশো বছরের শোষণের, বঞ্চনার, দারিদ্র্যের ইতিহাস বুকে নিয়ে।

স্কুলের বাচ্চারা খেলা করছে, হাসছে, নাচছে। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। যে কোনো রকমের যুদ্ধের হিংসায় ঘৃণায় বঞ্চনায় অবহেলায় তাদের জীবন যে কোনো মুহূর্তেই শেষ হয়ে যেতে পারে। আমরা প্রহর গুনছি সেই শেষের ভয়ঙ্কর সেদিনের। ঘণ্টা বাজছে ঢং ঢং ঢং ...

তারই মধ্যে হোমসের মানুষের মতোই কলকাতার মানুষও ভালবাসছে, একসাথে জীবন কাটাচ্ছে পরম মমতায়, বেদনায়, বিচ্ছেদে। সন্তানের জন্ম দিচ্ছে, বড়ো করছে তাকে বুকে করে। আশা নিয়ে বেঁচে রয়েছে। সুসময়ের আশা। অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের আশা। সে আশা শেষ হয়ে গেলে স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকছে, স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকছে।

• অন্য দেশের দর্শকরা ছবিটি দেখুন এখানে ক্লিক করে

ভালবাসার শহর শুধু তাই কলকাতা বা হোমসের গল্প নয়। এ গল্প আমাদের মতো নিরানব্বই শতাংশ মানুষের জীবনের গল্প। আমাদের মতো পিছনে পড়ে থাকা মানুষের— নারী পুরুষ ও শিশুদের—  জীবনসংগ্রামের গল্প।

আদিল ও অন্নপূর্ণার গল্প মানবতার গল্প। দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির ইতিহাসের, শেষ অধ্যায়ের, এক ঝলক শেষ সূর্যকিরণের গল্প।

আর হ্যাঁ। জয়া আহসানের অভিনয় নিয়ে কিছু বলার নেই। জয়া আমাদের এই অস্থির, বিপজ্জনক, ভয়ঙ্কর হিংসা ও ঘৃণার সময়ে ভালোবাসা, করুণা ও মমত্বের যে ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন, তার তুলনা নেই। জয়া, সোহিনী— এরা এখনকার অসাধারণ অভিনয়-ব্যক্তিত্ব। 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -