SEND FEEDBACK

English
Bengali
English
Bengali

কলকাতায় কি সেই মিউজিয়ামটা হতে পারে না!

ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৭
Share it on
অনেক রাস্তা এখন চিহ্নিত হয়েছে, ইতিহাসের পাতায় দাগ দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। কিন্তু অনেক বাড়ি, অনেক রাস্তা, অনেক পাড়া অজানা, অচেনা থেকে গেছে।

কলকাতায় গিয়ে কী কী দেখি, তার লিস্টি না দিয়ে কী কী দেখি না, করি না, খাই না, গায়ে মাখি না— তার লিস্টি দিলে অনেক সহজ হবে।
 
 
কারণ, কিছুই প্রায় দেখা হয় না। করা হয় না। শিবপুরের বটগাছটা কতদিন দেখিনি। বোধ হয় আমেরিকার এই একত্রিশ-বত্রিশ বছরে একবারও দেখিনি। গাছটা রয়েছে তো? কে জানে! সবই তো চলে যাচ্ছে। শান্তিনিকেতন থেকে নোবেল প্রাইজটাই চলে গেল। গাছটাও হয়তো একদিন শুনব কে বা কারা কেটে নিয়ে চলে গেছে। কোনও বিশ্বাস নেই আর।
 
 
দুর্গাপুজো দেখেছি সেই উনিশশো পঁচাশি থেকে এই দুহাজার সতেরো— এর মধ্যে মাত্র একবার। এইতো লিখলাম সেদিন এবেলা-র এই ব্লগেই। তার পর ধরুন, গরমকালে যাওয়া আজকাল আর হয়ে ওঠে না। তাই কালোজাম খাওয়াও হয় না। মনে পড়ছে, চুরানব্বইতে প্রথম যেবার গিয়েছিলাম, সেবার সেই ঝাঁ ঝাঁ রোদের এপ্রিলে কে যেন কালোজাম কিনে এনে দিল এক বাটি। সেই সাবধানে খাওয়া অনেককাল পরে, যাতে টসটসে বেগুনি-পার্পল রং জামাকাপড়ে লেগে না যায়। কালোজামের রং একবার লাগলে আর তোলা যাবে না। এই ব্যাপারটাও ধাঁ করে মনে পড়ে গেল সেবার, সেই ছোটবেলায় ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে লোকের বাড়ির ফেলে দেওয়া এঁটো ভাত দিয়ে ঘুড়ি জোড়ার মতন।


 এক একটা স্মৃতি যেন পরশমণির মতো। একটা দরজা খুলে গেলেই আরো অনেকগুলো দরজা খুলে যাবে একের পরে এক। সেই পরশমণির ছোঁয়ায় খুলে যাবে ভুলে যাওয়া স্মৃতির ঝাঁপি।
 
 
আজকাল কলকাতায় গিয়ে আমাদের পুরনো মানিকতলা গোয়াবাগান হাতিবাগানে এতো কম সময়ের জন্যে যাই যে, দরজাগুলো খুলে দেখবার অবসর হয় না। হাতিবাগান বাজারে রবিবারের সেই পাখি আর রঙিন মাছের হাটটা কতদিন দেখা হয়নি। ন্যাশনাল ভ্যারাইটি স্টোর্স, স্টার থিয়েটারের সেই গরুড়ের স্ট্যাচুদুটো, আর ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া। ট্রামে চড়ে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়, আর নেতাজির ঘোড়ায় চড়া বীরের মূর্তি। গতবার ওখানে একটু গিয়েছিলাম লেখক সমরেশ মজুমদারের বাড়ি শ্যামপুকুরে। যেখানে হেমন্ত বসুকে খুন করা হয়েছিল, সেইখানে তাঁর শহীদবেদির পাশে বসে লোকে এগ রোল আর সিগারেট খায়। এবারে আর যাওয়া হল না ওদিকটা।
 
 
এবারে আমাদের চণ্ডীবাড়ি স্ট্রিটের সেই বিরাট জালার মতো ঢাকটা তালাবন্ধ লোহার গেটের বাইরে থেকেই দেখে এলাম। গোয়াবাগান পার্কের সেই ধুলোয় ধূসরিত কাঠের ভাঙা বেঞ্চিগুলো আর দেখা হয়ে উঠল না। যে রাস্তাটায় উনিশশো পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট একটা পানের দোকানের রেডিওতে শেখ মুজিব আর তাঁর পরিবারের সকলের খুনের খবর শুনেছিলাম, আর ওই রাস্তারই দেড়তলার যে ছোট্ট ঘরটায় বসে বসে জনসঙ্ঘের হেরো প্রার্থী মিহির সাহার হয়ে পোস্টার লিখতাম, সে রাস্তাটা দিয়েও একবার হেঁটে যাওয়া হলো না। আর, সেই ঘরটার ঠিক উল্টোদিকেই বিদ্যাসাগর অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। এখানে যেতাম প্রবাদপ্রতিম ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেনের বাড়ি। আমার বাবা কী যেন সূত্রে এঁকে চিনতেন, আর আমাকে পাঠাতেন কী যেন ট্রান্সলেশনের কাজের কাগজপত্র ওঁর কাছ থেকে নিয়ে আসতে। বাবার ঊষা কারখানায় মাঝে মাঝেই লকআউট আর স্ট্রাইক হতো, আর আমাদের তখন প্রায় না খেয়ে থাকার অবস্থা। বাবাকে অতএব হাজার এটাসেটা করে অন্নাভাব মেটানোর ব্যবস্থা করতে হতো।


 
 সুকুমার সেন বোধহয় কিছু কাজ পাইয়ে দিতেন বাবাকে। ঠিক জানি না। বাবা কখনও বলেননি।
 
 
কলকাতায় গিয়ে প্রতিবার ভাবি, এবারে ডোভার লেন বা ওই ধরনের কিছু একটা সঙ্গীত সম্মেলন শুনতে যাব। কিন্তু, কোথায় টিকিট পাওয়া যায় তা-ও জানি না, কতদিন আগে থেকে টিকিট কাটতে হবে, তাও জানি না। সত্তরের দশকে বাবা কোথা থেকে যেন ডোভার লেন, নয়তো পার্ক সার্কাস, নয়তো বা একটা ক্রিকেট ম্যাচের টিকিট জোগাড় করে আনতেন। একবার আমি আর বাবা ভাগাভাগি করে পার্ক সার্কাস সঙ্গীত সম্মেলনে গেলাম। আমি গেলাম মুনব্বর আলি খান, আর এন রাজম শুনতে। সঙ্গে আমার গুরুর গুরু কেরামতউল্লা সাহেবের তবলা। আর বাবা পরের দিন গেলেন আমীর খাঁ শুনতে। সেই আমীর খাঁর শেষ অনুষ্ঠান। কলকাতায় গান গেয়ে বেনারস না কোথায় যাওয়ার পথে খাঁ সাহেবের গাড়ি একসিডেন্টে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। আজকাল ডোভার লেন, সদারং বা পার্ক স্ট্রিটের সে জৌলুশ নেই। কখন হয়, কখন শেষ হয়, কেউ ঠিকমতো বলতে পারে না। আমাদেরও আর যাওয়া হয়ে ওঠে না ওই তিন সপ্তার ঝটিকাসফরে।
 
 
আমি জানতামই না সুকুমার সেন কে, বা কী মাপের মানুষ। ঠিক যেমন জানতাম না আমার স্কটিশ চার্চ স্কুলের পিছনের বাড়িটায় একতলার ঘরের বিছানায় বালিশে বুক দিয়ে শুয়ে যে সত্যেন্দ্রনাথ বসু কী যেন লিখতেন, পড়তেন, তিনি ঠিক কত বড় বিজ্ঞানী। কেউ বলে দেয়নি কখনও। কেউ কখনো বলে দেয়নি, রামকুমার চট্টোপাধ্যায় থাকতেন আমাদের স্কুলের খুব কাছেই, মান্না দে’ও থাকতেন কলকাতায় এলে ওই পাড়াতেই, আর স্কটিশেরই প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। আর এক স্কটিশ স্কুল প্রাক্তনী বাদল সরকারের নাটকের রিহার্সাল হতো আমাদের পাড়ায় প্যারী রো-র সরু গলিটায়, কিন্তু আমি জানতাম না বাদল সরকারের কদর। বা, প্যারী রো-র নাম কার নামে প্যারী রো। কেউ বলে দেয়নি।
 
 
আজকাল কলকাতায় গিয়ে সেই সব একদা-না-জানা, অল্প-জানা মানুষগুলোর স্মৃতি, আর সেইসব রাস্তাগুলো, বাড়িগুলো যেখানে তাঁদের চরণস্পর্শ পড়েছিল, সেই জায়গাগুলো দেখলে তীর্থস্থানের অনুভূতি হয়। অনেক রাস্তা এখন চিহ্নিত হয়েছে, ইতিহাসের পাতায় দাগ দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। কিন্তু অনেক বাড়ি, অনেক রাস্তা, অনেক পাড়া অজানা, অচেনা থেকে গেছে।
 
 
যেতে ইচ্ছে করে খুব সবক’টা রাস্তা, সবক’টা বাড়ি, সবগুলো পাড়া একবার করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে, কিন্তু সময়ের অভাবে যাওয়া হয়ে ওঠে না। সেই অপূর্ণতা নিয়ে ফিরে আসি আমেরিকায়। আর ভাবি, পরের বার নিশ্চয়ই একবার যাবো। যাবোই একবার আকাশবাণী ভবন, ইডেন গার্ডেন, হাইকোর্ট প্রান্তে আর ময়দান প্রান্তে একবার যাবোই যাবো। স্বপ্ন দেখি, সেই ইস্টবেঙ্গল বা এরিয়ান ক্লাবের গেট দিয়ে একটা কমপ্লিমেন্টারি স্লিপ নিয়ে ঢুকে যাচ্ছি গ্যালারিতে আমি বারো চোদ্দ বছরের হাফপ্যান্ট পরা বালক। আজকে মোহন সিং, গৌতম সরকার আর সমরেশ চৌধুরী খেলবেন ইরানের পাস্ ক্লাবের সঙ্গে। সারা কলকাতা কাঁপছে উত্তেজনায়। সেই পরিমল দে, আর সুকুমার সমাজপতি। সেই বলাই দে, হাবিব, আর প্রণব গাঙ্গুলি।
 
 
এই তো আমার তীর্থ। কালীঘাট তারাপীঠে দরকার নেই আমার।
 


 
ইচ্ছে করে, আমাদের কলকাতায় যদি বিখ্যাত শিল্পীদের স্মৃতি নিয়ে একটা মিউজিয়াম, সংগ্রহশালা করা হতো। কত গায়ক গায়িকা, কত চলচ্চিত্রকার, কত বাদক, কত আবৃত্তিকার, কত নাটকের যুগান্তকারী শিল্পী, ফিল্মের প্রবাদপ্রতিম সব ব্যক্তিত্ব! ধরুন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মৃণাল চক্রবর্তী, সুবীর সেন, পান্নালাল ভট্টাচার্য, জগন্ময় মিত্র, সুধীরলাল, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের দিকপাল রবিশঙ্কর, আলী আকবর, বিলায়েত খাঁ থেকে শুরু করে রামকুমার, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরামত সাহেব, পান্নালাল ঘোষ— এঁদের তবলা বাঁশি, আর এখনো আমাদের মধ্যে যাঁরা রয়েছেন, সেই দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়— এঁদের গানের খাতা, দিনলিপি, হারমোনিয়াম, কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় ফাংশনের, জলসার ছবি— এসবের একটা সংগ্রহশালা কলকাতায় তৈরি হলো। ঐসব বাজে, সাবস্ট্যান্ডার্ড মোমের পুতুলের মিউজিয়াম না করে এমন একটা জিনিস হলে এসব শিল্পীদের স্মৃতিরক্ষার একটা ব্যবস্থা করা যেত।
 
 
শুনেছি, তুলসী চক্রবর্তী গত হবার পরে তাঁর স্ত্রীর প্রায় না খেয়ে থাকার অবস্থা হয়েছিল। এ শুধু আমাদের দেশেই সম্ভব! তুলসী চক্রবর্তী, রবি ঘোষ, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, তপেন চট্টোপাধ্যায়, মলিনা দেবী, ইন্দুবালা, আঙুরবালা, উৎপলা সেন, ইলা বসু, কমলা ঝরিয়া, আরো হাজার শিল্পী— তাঁদের স্মৃতিরক্ষার ব্যবস্থা কে করবে?
 
 
আর তার পর লেখকদের কথা, পরিচালকদের কথা তো বলাই হলো না! সেই বিমল কর থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী থেকে মহাশ্বেতা থেকে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কমল মজুমদার, ঋত্বিক-তপন সিংহ-ঋতুপর্ণ। সুনীল-শক্তি-নরেন্দ্রনাথ মিত্র থেকে এই সেদিনের সুচিত্রা ভট্টাচার্য বা সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ! ভাবুন তো দেখি! গায়ে কাঁটা দেয়! কলকাতার ইতিহাস। মানবতার ইতিহাস। তার দলিল থাকবে না একটা ভাল?
 
 
বোধ হয় একটু প্রসঙ্গান্তরে চলে গেলাম। কিন্তু কলকাতায় গিয়ে মনে হয়, যাঁদের হাতে শাসনক্ষমতা আছে, বা আগে ছিল, তাঁদের কি কখনও এইসব বিষয় নিয়ে কোনো কিছু করার কথা মনে হয় না? মনে হয়নি? এতই কল্পনাশক্তিহীন তাঁরা?

Nostalgia Memoir North Kolkata
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -