SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

পুরনো কলকাতার গলি থেকে আওয়াজ ভেসে আসে— ট্রাম্প তুমি জবাব দাও

জুন ১৫, ২০১৭
Share it on
সবাই গুমগুম করে ঘোষণা করলো, "জবাব চাই, জবাব দাও।" বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা হতো। কিছু না বুঝেই ভেতরে প্রতিধ্বনি হতো, "জবাব চাই, জবাব দাও।"

হ্যাঁ, এবেলাতে ব্লগ লিখলেই ট্রাম্প ওমনি ট্রামে চড়ে কলকাতায় এসে জবাব দিয়ে যাবে কি না! যত্ত সব ধ্যাষ্টামো!
 
কিন্তু জবাব আমার চাই। এই মুহূর্তে আমার স্লোগান— "ট্রাম্প আমি জবাব চাই। জবাব চাই, জবাব দাও।"
 
ঠিক সেই সত্তরের সিপিএমের মতো। স্লোগানের ওঠানামাটা একটু পরেই শিখিয়ে দিচ্ছি। ধৈর্য ধরুন, দাদারা, দিদিরা। এটডু অপেংখা করুন।
 

আমাদের সেই রবারের বল পেটানো উনুনের ধোঁয়া দেয়া সন্ধে সন্ধে উত্তর কলকাতায় আমরা পড়তে বসতাম, আর সিপিএমের মিছিল বেরোতো। একেবারে ঘড়ি ধরে।
 
সে এক জমকালো ব্যাপার। কয়েক ডজন লোক— বেশিরভাগই ছেলে আর বুড়ো, আর কয়েকটা মেয়ে— লাল পতাকা হাতে আমাদের গোরাচাঁদ বোস রোডের সরু রাস্তা দিয়ে গুমগুম করতে করতে যাচ্ছে। আমরা পড়াটড়া ফেলে রেখে জানলার গরাদে মুখ চেপে ধরে দেখতাম। দু একটা চেনা মুখ, আর বাকি সবই যেন কোথা থেকে এসে জুটেছে। তাদের আমরা চিনি না। ওই যে, কারবালা ট্যাংকের বড় বাবুয়া। ওই যে প্যারীমোহন সুর লেনের ঘোষদা। চায়ের দোকানে রোজ সকালবেলা দেখি লুঙ্গি পরে বিরাট বাতেলা ঝাড়ছে। ওঃ হ্যাঁ, ওই যে বড় কারবালার মিনতিদি। মিনতিদি বোধহয় সেই করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গের সময় থেকে পার্টি করছে। ওঃ না, সেটা তো আবার গান্ধী কংগ্রেস। ভুলে যাই! সেই এক সাদা শাড়ি আর কাঁচাপাকা চুল। আর একটা অতি অ-ফ্যাশনের বাদামি রঙের বিরাট চামড়ার ব্যাগ কাঁধে ঝোলানো।
 
সব গুমগুম স্লোগান দিতে দিতে কোথায় যেন যাচ্ছে।
 
তাদের চটির শব্দ হচ্ছে আমাদের পিচঢালা রাস্তায়— খচ খচ খচ। তাদের কোনও কুচকাওয়াজের মতো ব্যাপার নেই। যে যেমন করে পারছে, যাচ্ছে। দু চারটে সাইকেলও দেখছি রয়েছে ওর মধ্যে। ওরা বোধহয় সব লিডার। আমার ঘুড়ি ওড়ানো আর মাঞ্জা দেওয়া দুই বন্ধু অসকা আর নেপাল বলেছে, ওই সাইকেল যারা নিয়ে যাচ্ছে, ওদের ঝোলানো থলের মধ্যে পেটো থাকে। দু’একটা মেশিনও থাকে। মেশিন মানে পিস্তল।


‘কালবেলা’(২০০৯) ছবির দৃশ্য


 আমি তো শুনে হাঁ! বলে কী রে!
 
তবে, সিপিএম শুধু নয়। আমাদের পাড়ায় সিপিএম ছিল সব রকগুলো দখল করে। বিল্টুদারা কালি তুলে আবার ভোট দিতে যেত কর্পোরেশন স্কুলে। আমাদের উল্টোদিকের বাড়িতে ওদের কালি তোলার ব্যাপারটা হতো। যাচ্ছে, আর আসছে। একটা লোকই দশবার ভোট দিয়ে এলো।
 
নকশালরা আমাদের ওদিকটায় সুবিধে করতে পারেনি বেশি। আমাদের ইসকুল ‘ছুটিস চার্চ’, মানে স্কটিশ চার্চ, দু’বছরের মতো মাও সে তুঙের চ্যালাদের তাণ্ডবের জন্যে পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছিল বটে, কিন্তু তারপর একদিকে ‘ছিপি’-র টিয়ার গ্যাস আর অন্যদিকে মুক্তিসূর্যের সি আর পি এবং মিলিটারির গুলিতে সব ঝাঁঝরা হয়ে গেল কয়েক মাসের মধ্যেই। আমাদের পাড়া ঘিরে কয়েক রাত ধরে রেড হল, ভাল ভাল আর খারাপ খারাপ কয়েকটা ছেলেকে তুলে নিয়ে গেলো ছিপি, আর তারপর শরীরের নানা কোমল অংশে নানাপ্রকার যন্ত্রণার লাল লাল চিহ্ন নিয়ে সেগুলো ফিরে এলো। দু’একটা আমাদের অন্ধগলির শেষদিকে ভোরবেলা পাজামায় শেষবারের মতো পেচ্ছাপ করে পড়ে থাকলো। আর বড়োলোকের পাখনা গজানো দু’চারটে সুন্দরমতো ছেলেকে তাদের বড়লোক বাবাজ্যাঠারা বোম্বে, ব্যাঙ্গালোর, নয়তো লন্ডন-নিউ ইয়র্কে পাঠিয়ে দিল।


‘কালবেলা’(২০০৯) ছবি থেকে


 
তবে সে অনেক পরের কথা। কোথা দিয়ে যে কোথায় স্মৃতির গলি এক মোচড়ে ঘুরে যায়!
 
কেমন যেন সবাই ঢুলুঢুলু চোখে আকাশের দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে যাচ্ছে। কেমন যেন একটা শহীদ শহীদ ভাব। যেন ফাঁসিকাঠে চড়তে যাচ্ছে সব আজ রাতেই। এই ব্যাপার হতো প্রতি সন্ধেবেলা। ওদের মিছিল গুমগুম করতে করতে ওদিকে গোয়াবাগানের দিক থেকে আসতো, আর আমাদের বাড়ির সামনে এসে যেখানে ব্যাটারির গলি আর আমাদের পাঁচতলা বাড়িটা একটা তেমাথার মতো তৈরি করেছে, সেখানে বিশাল ইমোশনালভাবে কয়েকটা বাছা বাছা স্লোগান মারতো। ঠিক যেমন জগদ্ধাত্রীপুজোর তাসাপার্টি ওই তিনমুড়োতেই খড়ের আগুন জ্বেলে কুড়কুড়ি গরম করতো। আর একটা জমিয়ে পাঁচ মিনিটের ক্যাড়াক ক্যাড়াক ঝিং। তারপর গুমগুম মিছিল লুমলুম করতে করতে ফিনফিন করে ওদিকে কারবালার দিকটায় চলে যেত। আমি ওয়াই ইকুয়াল টু এমসি স্কোয়ার নিয়ে বসতাম। কোঅর্ডিনেট ম্যাথটা ম্যানেজ করতে পারছি না কিছুতেই। সামনের মার্চে এইচ এস।
 
যাচ্চলে। কোথা থেকে আবার কোথায় চলে গেলুম। হচ্ছিলো ট্রাম্প, তার মধ্যে এলো তাসাপাটি। যেন বেড়াল থেকে রুমাল।
 
ট্রাম্পের কতা অমৃতসমান। তবে তার আগে ওই স্লোগানের সুরটা একটু সিকিয়ে দিই আপনাদের। একটু শক্ত আছে ওই শিশিবোতলের জায়গাটা, কিন্তু প্যাকটিস করলে সিকে যাবেন।
 
স্লোগানের প্রথম অংশটা একেবারেই আনইম্পরট্যান্ট। ওই যেখানে অনেক লম্বা একটা কিছু লিডার বলে, আর তারপর সবাই বলে, "জবাব চাই, জবাব দাও।" প্রথম অংশটা আমি অনেকবার ভাল করে বোঝার চেষ্টা করেছি। ধরতে পারিনি ঠিকমতো। একটু একটু মনে আছে, বলছি।
 
যেমন ধরুন, লিডার বললো, "কোরিয়াতে সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন হেলিকপ্টার বোমাবর্ষণ করে মাঝরাতে একান্নজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে চলে গেল কেন?" ওই ‘গেল কেন'টা একটু চোখা করে ছুঁড়ে দিতে হবে ওপরের দিকে, যাতে অন্যরা ক্যাম্বিস বলের মতো লুফে নিতে পারে, এই যা।


‘কালবেলা’(২০০৯) ছবির দৃশ্য


 সবাই গুমগুম করে ঘোষণা করলো, "জবাব চাই, জবাব দাও।" বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা হতো। কিছু না বুঝেই ভেতরে প্রতিধ্বনি হতো, "জবাব চাই, জবাব দাও।"
 
কিংবা হয়তো লিডার বললো, "রায়বেরিলিতে রায় বেরোনোর পরেও ইন্দিরা গাঁধী তুমি গদি আঁকড়ে আছো কেন?" আবার সেই একই ফর্মুলা— ‘আছো কেন'টা ছুঁড়ে দিন একটু আলতো করে। লোপপা ক্যাচ। চন্দ্রশেখরের ব্যাটিংয়ের মতো। উত্তর এল (হুঁ হুঁ ঠিক ধরেছেন)— "জবাব চাই, জবাব দাও।"
 
ভাল ভাল সব স্লোগান হতো। পড়াশোনা আর সোডিয়ামের এক্সট্র্যাকশন আর পুষ্প গাছের পরিবর্তিত কাণ্ড আর ইংরিজি ইডিয়াম যেগুলো মনে রাখলে রেজাল্ট ভালো হবে, সে সব মনে থাকতো না। কিন্তু জবাব চাই জবাব দাও সারাদিন ধরে মনের মধ্যে গুমগুম করে বাজতো।
 
আচ্ছা, ওরা কী করে জানলো, ঠিক একান্নজনই মরেছে, তিপ্পান্নজন নয়? এসব প্রশ্ন কাকে করবো? ওই ঘোষদাকে? মিনতিদিকে? একেই তো আমার বাবা জনসঙ্ঘ বলে ব্যানার্জী ফ্যামিলি ওদের ব্ল্যাকলিস্টে। শুধু আমি সবার সঙ্গে সব ব্যাপারে আছি বলে পাড়ায় মোটামুটি টিকে আছি। আর সি আর পির ব্যাটন পাছায় ঢোকেনি। আর কে সাদ বাড়িয়ে আদলাপনা করতে যায়?
 
স্লোগানের স্বরলিপিগুলো হল এইরকম। প্রথম ওই আজেবাজে লাইনগুলো বাদ দিন। ওগুলো বিড়বিড় করে একটানা বলে দিলেই চলবে। ‘জবাব চাই’ কথাটা বলতে হবে এইভাবে, ‘জবাব’ কথাটা এমনভাবে বলতে হবে, যেন শেষ ‘ব’টায় হসন্ত আছে। মানে, ঝপ করে শেষ করে দিতে হবে ‘জবাব’টা। চাইটা বলতে হবে— ‘চা'টা এমনভাবে বলছেন, যেন চাটছেন। চাটার সময়ে যেমন ‘চা’ বলেন। দেখবেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ঐভাবে ‘চা’ বলেন। আর ‘চাই'এর ‘ই'টা দীর্ঘ ঈ হবে। আর একটু সুর খেলিয়ে মন্দ্র সা থেকে তারসপ্তকের সা হয়ে যাবে এক নিঃশ্বাসে। পারবেন তো? চেষ্টা করে দেখুন। বাঙালির অসাধ্য কাজ নেই। ‘চাআ...ইই’। তার পর ‘জবাব দাও’ কথাটা বেশ বিপ্লবী আবেগ দিয়ে বলবেন। আবার মুদারাতে নাবিয়ে আনবেন। ভুলবেন না কিন্তু। তা হলেই জবাব পেয়ে যাবেন। মানে, কার কাছে জবাব চাইছেন, তা তো ঠিক জানিনা, তখনও জানতাম না, আর এখনও জানি না। কিন্তু ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব বলেছেন, সব ভুলে গিয়ে তাঁকে শুধু ডাকো মনপ্রাণ দিয়ে। তিনি দেখা দেবেনই।
 
জবাব চাই, জবাব দাও, তেমন করে ডাকলে পরে, ওই যে রামকুমারবাবুর গান আছে না, "তেমন করে ডাকলে পরে ধরা দেবেন ভগবান।" অনেকটা সেইরকমই। তবে, সিপিএম ঠাকুর ফাকুর মানেনা, এই যা তফাৎ। অন্তত, সেই সত্তরের দশকে মানতোনা। এখন জানিনা। আমি এখন বিদেশে আছি বহুকাল।

ট্রাম্পের কাছে জবাব চাই। সে এবেলাতেই জবাব দিন, নয়তো ওবেলাতে। জবাব দিলেই হলো।
 
আমার স্লোগান (বিড়বিড় করে)— “প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকা শপথ প্রত্যাহার করে নিয়ে সারা বিশ্বকে ভয়ঙ্কর পরিবেশ সংকটের মধ্যে ঠেলে দিল কেন?” (‘দিলো কেন'টা চন্দ্রশেখরের ব্যাটিং— লোপ্পা ক্যাচ ছুঁড়ে দিন একটু আলতো করে। ঠিকমতো করছেন তো?
 
আপনারা সবাই একসঙ্গে বলুন, স্বরলিপিটা ভুলবেননা যেন। জবাব চা ... ইই (চাটার মতন করে চা— তারপর উদারা থেকে তারা), জবাব দাও (ভাব দিয়ে, খুব বিপ্লবী আবেগ দিয়ে। )
 
বার বার বলুন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্যাকটিস করুন। উত্তর আসছে হোয়াইট হাউস থেকে। জবাব।
 
মনপ্রাণ দিয়ে ডাকুন মার্কিন গডকে। সব গডই সমান। সিম্পল বাংলায় যাকে বলে, হোয়ের দেয়ার ইজ এ উইল, দেয়ার ইজ এ ওয়ে।
 
জলবায়ু ধ্বংস করতে দেবেন না। পরিবেশ সন্ত্রাস করতে দেবেন না। মার্কিনি সন্ত্রাস। বহুজাতিক কর্পোরেশনের সন্ত্রাস। তেল কোম্পানির সন্ত্রাস। যুদ্ধের সন্ত্রাস। বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড, আর ভীষণভাবে বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রার সন্ত্রাস। ঝড় আসছে। টর্নেডো, সুনামি, ভীষণ উষ্ণতা, গা পুড়ে যাওয়া চৈত্র বোশেখ জষ্টি। টের পাচ্ছেন তো? ভয়ঙ্কর সব অসুখ। যা আগে ছিল না। ঘরে ঘরে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হাঁপানি, হৃদরোগ। বাচ্চা ছেলেমেয়ের আর্থারাইটিস। বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম ব্যাপকহারে।
 
সিপিএম, কংগ্রেস, নকশাল, তৃণমূল, আর ইয়ে কী যেন বলে, বিজেপি। ... স্লোগান ইজ স্লোগান।
 
ভাল করে স্লোগান প্যাকটিস করে যান।
 
ট্রাম্পকে বলুন, "জবাব চাই ট্রাম্প। জবাব দাও। "
 
জবাব দিতেই হবে।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -