SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

আমেরিকার বউ-পেটানো মহিষাসুর আর মাতাল শুম্ভ-নিশুম্ভের গল্প

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৭
Share it on
মহিষাসুর নানাপ্রকার রূপ পরিবর্তন করেছিল বলে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ বলে গেছেন। আমার চন্ডীমঙ্গল ওই মহালয়ার ভোরবেলাতেই আটকে আছে। তা, এই বাংলা মহিষও নানা রূপে নতুন নিয়ে আসা ওয়াইফির কাছে হাজির হতে লাগলেন।

আমাদের এই আমেরিকাতে কেমন দুগ্গাপুজো হয়, সে নিয়ে আগে লিখেছি। পড়েননি তো? জানতাম। তা, যদি এট্টু সময় পান, পড়ে নিতে পারেন। এই লিংকগুলো বাজিয়ে দেখতে পারেন একবার টিং টং টিং। বা, মতান্তরে, হিং টিং ছট।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

আমাদের এই আমেরিকাতে পুজোর বাজার নেই। এখানে পুজোর প্যান্ডেল নেই। এখানে ওই ইস্কুলবাড়ির কোনো এক কোণে একরকম লুকিয়ে চুরিয়ে যে উইকএন্ডের পুজো হচ্ছে, সেখানে রিয়েল ঢাক বাজানো নেই। এমনকী নিউ ইয়র্ক, টরোন্টো, লস এঞ্জেলেসের মন্দির, বা নিউ জার্সি ভারত সেবাশ্রমের পুজোর চৌহদ্দির বাইরে ঢাক বাজানো বারণ।

আমাদের এই ব্রুকলিনে বাংলাদেশিদের একটা হিন্দু মন্দিরে দু’বছর আগে ঢাক বাজানো হয়েছিল। কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ এসে বন্ধ করে দিয়ে গেল। কারা নাকি রিপোর্ট করে দিয়েছে।

‘হীন-ডু’? সে আবার কী? কেউ জানেই না।
 
সেই সুখের পাখিরাও হে হে, আবার এসে পড়েছে আমেরিকায় সুখ বিতরণ করতে। তারা নাচছে, তারা গাইছে, তারা হাসছে, তারা আরও হাসছে। এখানে সবাই হাসছে। কান্না এখানে দেখা যায় না। এখানে কান্না নিষেধ। লুকিয়ে যারা কাঁদে, তাদের কেউ ভালোবাসে না।

এসব কথাও আগে লিখেছি। অবশ্য, আমাকে অনেকে নিষেধ করেছেন এসব অপ্রিয় সত্য নগ্ন করে দিতে। তাঁরা বলেছেন, নগ্নতা, মানে, ইয়ে, খুব নগ্ন। তাঁরা সাবধান করে দিয়েছেন, আমি তাঁদের মনের গভীর মার্কিন প্রশান্তি নষ্ট করে দিচ্ছি। সম্ভব হলে তাঁরা আমার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন, এমন কথাও শুনেছি কানাঘুষোয়।
 
তা, আমি এখন আমেরিকার বঙ্গ-মহিষদের নিয়ে লিখবো ঠিক করলাম। মহিষমর্দিনীকে নিয়ে লেখার মতো পন্ডিতি আমার নেই। কিছু বাঙালি মোষের কথা লিখে দিলাম। যাদের মর্দন করার মতন দেবী পাওয়া যাচ্ছে না।
 
এই সব মোষাসুর আমার চেনা। তবে, আইনি ব্যবস্থা আমার ভাল লাগে না বলে নামধাম উজ্যু রাকলেম।

ছবি: পিক্সঅ্যাবে
 

 প্রথম মোষটির সঙ্গে আল্লাপি হয়েছিল শিকাগো এলাকায় তার বউয়ের ইন্ট্রোডাকশনে। ওখানে একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম তখন। শুনলাম, মোষটি নাকি মারধর করে মদ্যপান করে। কারণে অকারণে, দিনে ও দুপুরে। এটি হিন্দু মোষ। ভাবত বোধহয় চন্ডীর সঙ্গে চণ্ডামি করছে। যত সব ভণ্ডামি। একদিন বউটির সকাতর ফোন-বিলাপ শুনে কয়েকজনকে নিয়ে হঠাৎ গোয়ালে দিলাম হানা। হানাহানি, হুহুংকার, হল্লাগোল্লা। এক্কেবারে বাণীকুমারের মহালয়া। বউটির মুখে চোখে নানা প্রকার লাল ও বেগুনি চিহ্ন, যা রান্নার তেল ছিটে আসার রং নয়। একটু ব্যবস্থা নিতে হল। যদিও সে কমিউনিটির বেশির ভাগ বাঙালির তাতে প্রবল আপত্তি। মানে, বুজলাম একটু মদ খেয়ে একটু রাগী লোক হয়ে যায়, তা বলে একেবারে এতো বাড়াবাড়ি করতেই হবে? আহা, বউকে তোষক ধুনে দেয় বলে কি মানুষ নয়? মোষ?

ছিঃ, পার্থ!
 
দ্বিতীয় মোষটি মুসলমান মোষ। তা, তাঁকে মর্দন করার জন্যে হিন্দু দেবী পাওয়া গেল না। মুসলমান দেবদেরই দাওয়াত দিতে হলো। সঙ্গে আমি এই বিধর্মী। শোনা গেলো, হবু জামাই আমেরিকায় থাকে শুনে আহ্লাদে আটখানা হয়ে সামিনা না রাবেয়া না মালিহার আব্বা আর চাচা আর খালা আর ফুফা টেলিফোনে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আমেরিকায় যখন থাকে, এত ভাল পাত্র পোস্তাতেও পাওয়া যায় না। গঙ্গারাম তো কোন ছার! জানতে চাও সে কেমন ছেলে?
 
আই মিন, কেমন মোষ?
 
মহিষাসুর নানাপ্রকার রূপ পরিবর্তন করেছিল বলে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ বলে গেছেন। আমার চন্ডীমঙ্গল ওই মহালয়ার ভোরবেলাতেই আটকে আছে। তা, এই বাংলা মহিষও নানা রূপে নতুন নিয়ে আসা ওয়াইফির কাছে হাজির হতে লাগলেন। কখনো মদ্যপ ও ভয়ংকর। কখনো তিনি ব্লু ফিল্ম দেখেন বাড়িতে বসে বসে। উপরে উল্লিখিত শিকাগোর হিন্দু মোষও দেখতেন শোনা গেল অনেক পরে। কখনো তিনি অন্য বান্ধবী নিয়ে আসেন স্ত্রীর উপস্থিতিতেই। কখনো তিনি ইস্তিরিকে খিস্তি করেন মনের সুখে।
 
হস্তক্ষেপ করতেই হলো। কাগজে লিখতে হল নামধাম ভাঁড়িয়ে। আইনি না বেআইনি, সেই ভয়ে। সেই নিয়েও ঝামেলা। আমি কোথাকার কে, কেন আমার এতো সাহস, আরে আমি বউ পেটাচ্ছি না পর্ন দেখছি, তাতে তোর বাবার কী?
 
সে যা হোক। মহিষ মর্দন করা আমার একটা ঘোড়া রোগ। হয়তো আমি গর্দভ। একজন ফেসবুকে বলেছিলো, আমি নাকি ওসব কিছুই না। আসলে আমি শুয়োর। এই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আমার সারা জীবনের। আসলে আমি কী? আত্মা নং বৃদ্ধি। আই মিন, বিদ্ধি।
 
মোষ নং তিন। বউ পড়ে আছেন অসুস্থ হয়ে মার্কিনি হাসপাতালে। এই নিউ ইয়র্ক শহরেই পাঁচ সাত বছর আগের ঘটনা। আপনারা যাঁরা মেডিক্যাল কলেজ, অ্যাপোলো, বা উডল্যান্ডস— এসব জায়গায় ভিজিটিং আওয়ারে প্রিয়জনকে দেখতে গিয়েছেন, নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন আপনারা দেখতে গেলেই রোগী বা রোগিণীর মুখটা কেমন খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে? হ্যাঁ। তিনি সারাদিন অপেক্ষা করে থাকেন আপনাদের দেখা পাওয়ার জন্যে। তাঁর অসহায় লাগে, ভয় লাগে, হতাশ লাগে, আর ভীষণ একা লাগে।
 
এবারে ভাবুন নিউ ইয়র্ক শহরের বিশাল হাসপাতালে পড়ে থাকার কথা। একাকীত্বের গ্রান্ড ড্যাডি। অসহায়তার গ্রেট গ্র্যান্ডপা। আমাদের এই দিদিকে মোষপুঙ্গব ফেলে রেখে দিয়েছেন হাসপাতালে, যদিও তাঁর অর্থের সীমা নেই, এবং বাড়িতে রেখে দেওয়ারও কোনো প্রব্লেমই নেই, উইথ রাউন্ড দা ক্লক নার্সিং কেয়ার। কিন্তু তিনি তা করবেন না, কারণ হ্যাপা সামলাবে কে? এখন, ভেবে দেখুন, যদি আমাদের এই বউদির অসুখ না করে মোষদার এই দশা হতো? বউদি সব কাজ ফেলে দাদার শুশ্রূষা করতেন, বাড়িতে রেখে, কাজের লোক রেখে, নার্স রেখে। কোনওদিনও কল্পনাই করতে পারতেন না স্বামীকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হাসপাতালে ফেলে রাখবেন, আর দিনে একবার করে গিয়ে দেখে আসবেন। পারতেন? আপনাদের কী মনে হয়?


ছবি: পিক্সঅ্যাবে

কিন্তু আমাদের সমাজে পুরুষদের জন্যে একরকম নিয়ম, আর মেয়েদের জন্যে আর এক রকম। আর, এটাই নাকি নরমাল। অন্য কিছু হলেই লোকে বলবে, হ্যাঁ, আদিখ্যেতা। বউয়ের জন্যে আবার বেশি দরদ। আরো কত কী বলবে। মেনিমুখো হলো একটা ছোট্ট স্ল্যাং। আর একটু ভাল বাংলায় যাকে বলে ‘স্ত্রৈণ’।
 
নাঃ, এই হিঁদু মহিষটি নোংভিওলেন্ট। অন্ততঃ, সেরকম কিছু শোনা যায়নি। তবে, বউদি সারা জীবন সেবা করলেন, স্বার্থত্যাগ করলেন, দু’টি ছেলে আর একটি মেয়ে মানুষ করলেন, নিজের কেরিয়ার বিসর্জন দিলেন, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিউ ইয়র্ক চলে এলেন চাকরি ছেড়ে দিয়ে, কেবল স্বামীর কেরিয়ার বাঁচানোর জন্য । আর এখন তার বিনিময়ে শেষ জীবনে পেলেন নিজের একটু একটু করে সাজানো, গড়ে তোলা সংসার থেকে চিরবিদায়। সত্যি, পুরষ্কার বটে। একেবারে যেন নোবেল পেরাইজ।
 
হ্যাঁ, নোংভিওলেন্ট মোষদা রাগ করে সবার সামনে একবার বলে ফেলেছিলেন, মানে এতো বার গাড়ি করে হাসপাতালে আসা যাওয়া করতে হচ্ছে বলে আর বিরক্তি সামলাতে পারেন নি, বলে ফেলেছিলেন, "ও একটা বাজে মেয়েমানুষ।" ঠিক এগজ্যাক্টলি মনে নেই, অনেকদিন হয়ে গেলো, কিন্তু ওই রকমই কী যেন একটা বলেছিলেন। যেটা শুনে আমার মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিল। অনেক কষ্টে কন্ট্রোল করেছিলাম নিজেকে।
 
আহা, ওরকম একটু আধটু আমাদের শিক্ষিত বাঙালি সমাজে হয়েই থাকে। ওরকম তো হতেই পারে, আফটার অল, মোষ বলে কি মানুষ নয়?
 
জয় বজরংবালি। আই মিন, মহিষমর্দিনী।

এই মোষদের কোলে তুলে নাও মা।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -