SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

বাঙালি হিন্দুর ‘মুসলমান-ভয়’ আর গ্লোবাল বাঙালির আরব্য রজনী, পর্ব ১

ডিসেম্বর ২, ২০১৭
Share it on
সব লুঙ্গি আর মাথায় ফেজ টুপি পরে, আর চোখে সুরমা দিয়ে অনেক লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। বোরখা পরা মেয়েরা। অচেনা খাবার বিক্রি হচ্ছে। অচেনা ভাষা। কেমন যেন নোংরা নোংরা রাস্তাগুলো। ভয় ভয় করতে লাগল।

নাঃ, শাবানা আজমি, জাকির হোসেন, বা আমাদের হাবিব, নবাব অফ পতৌদি, বা ধরুন নাসিরুদ্দিন, নওয়াজউদ্দিন, নঈমুদ্দিন— এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হল না এ জীবনে। আঃ, হলে কী ভালোই না হতো! জীবনটাই বদলে যেত। সিনেমায় অভিনয় করতে শিখতাম, তবলার জাদুকর হতে শিখতাম, বা ফুটবল ক্রিকেটে নাম করে অনেক টাকা রোজগার করতে পারতাম। কাগজে ছবি বেরতো। কিছুই হল না। কিস্যু হল না।
 
এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তো হলই না কয়েক বছর আগে পরে জন্মানোর জন্যে। এই ধরুন শাবানাদি। পাঁচ কি দশ বছরের এদিক ওদিক হয়ে গেল। নাসিরদা। জাকির হোসেন। সেই ওই রকমই হবে। হাবিবদা আকবরদা যখন ইস্টবেঙ্গলে ময়দান কাঁপাচ্ছে, আমি তখন দুগ্ধপোষ্য বালক, গ্যালারিতে বসে চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছি। একবার সকালে প্র্যাক্টিসের পরে আকবরদা একটা স্কুটারে বোঁ করে বেরিয়ে গেল, পেছনে বসে হাবিবদা। শুনলাম, পার্ক সার্কাস না ওইদিকে কোথায় যেন থাকে দুই ভাই। ওদিকে তখন খুব একটা যাওয়াই হতো না। বাড়িতে, পাড়ায় সবাই বলত, ওদিকে যখন তখন যাওয়া নাকি একটু ইয়ে। কারণ, ওদিকে সব মুসলমানরা থাকে। তাও আবার বাঙালি মুসলমান না। ওরা নাকি আরো ডেঞ্জারাস। লুঙ্গি পরে। আর সব ছোরা লুকোনো থাকে কোমরে। ওরেব্বাস! সাড়ে সব্বোনাশ!
 
রাজাবাজার নিয়েও সবাই এসব বলত। একবার কোন পাড়া থেকে ফুটবল না কী খেলে ফেরবার সময়ে রাজাবাজারের ভেতর দিয়ে ফিরতে হল। দেখি, একেবারে মুসলমান পাড়া। সব লুঙ্গি আর মাথায় ফেজ টুপি পরে, আর চোখে সুরমা দিয়ে অনেক লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। বোরখা পরা মেয়েরা। অচেনা খাবার বিক্রি হচ্ছে। অচেনা ভাষা। কেমন যেন নোংরা নোংরা রাস্তাগুলো। ভয় ভয় করতে লাগল। কোনওরকমে রাজাবাজার থেকে ডানদিকে ঘুরে ট্রামরাস্তা দিয়ে লেডিজ পার্ক, তারপর রামমোহন লাইব্রেরি, আর তারপর আমাদের মানিকতলায় এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
 
অনেককাল আগে একবার আমার মা আমাকে নিয়ে সেই মানিকতলা পেরিয়েই আমাদের স্কটিশ চার্চ স্কুলের খেলার মাঠে নিয়ে গিয়েছিল। আর নিয়ে যেতে গিয়ে হারিয়ে গিয়ে আরো পূবে বোধহয় ক্যানাল ইস্ট রোডে একটা মুসলমান পাড়ায় হাজির হয়েছিল আমার হাত ধরে। তারপর মা'ও নার্ভাস, আর আমিও। কোনওরকমে রাস্তা খুঁজে ঘুরে ঘুরে স্কটিশ গ্রাউন্ডে গিয়ে হাজির হলাম। স্কুলের স্পোর্টস ছিল। এত হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম যে, দৌড় প্রতিযোগিতায় কিছুই হতে পারিনি। সেই নিয়ে মা'র কী আফশোস! ‘ছেলেটা হেঁটে হেঁটে এতো ক্লান্ত হয়ে গেছিলো যে পোর্টসে কিছু করতে পারলো না।’ 

ছবি: পিক্সঅ্যাবে

এই সব গল্প। এসব গল্পের কিছু কিছু আমার স্মৃতিকথা ‘ঘটিকাহিনি'-তে লিখেছি। বিশেষ করে, ছোটবেলার স্কুলের সহপাঠী চঞ্চল আহমেদকে নিয়ে। তার ছাতা ফুটো করে দেওয়ার গল্প। পারলে পড়ে নেবেন।
 
চঞ্চলকে হারিয়ে ফেলেছি। বাঙালি মুসলমান, কী সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত। তার সঙ্গে যদি কখনো দেখা হয়, বলবেন, আমি ওর ছাতাটার দাম দিয়ে দিতে রাজি আছি। মনে মনে "মার শালাকে" বলে গালাগালি দিয়েছিলাম সেই দুগ্ধপোষ্য বালক বয়েসেই, তার জন্যে মনে মনে অনেক চোখের জল ফেলেছি। কারণ, ওই যে আমার বইতে লিখেছি, "অপমানের দাম শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই।" কী করে শোধ করব বলুন? একবার মুখ থেকে খারাপ কথা বেরিয়ে গেলে আর কি তাকে ফিরিয়ে নেওয়া যায়?
 
চঞ্চলের রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়ার মতো। পেয়েওছিল আমাদের স্কটিশে। কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আর কখনও দেখা হল না ওর সঙ্গে। ওর গানও আর কখনও শোনা হল না। "আলো আমার আলো।" "আমরা সবাই রাজা।" আঃ, এখনো কানে বাজছে।
 
তার পর বহুকাল কেটে গিয়েছে। আমিও বড় হয়েছি। স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি থেকে কলেজে পড়ানো, সেখান থেকে সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হয়ে মার্কিন মুলুকে। সেখানেও কেটে গেল তিরিশ বছর।
 
সুন্দরবন হাজি দেশারৎ কলেজে পড়ানোর সময়ে হাজার হাজার হাজির সঙ্গে আলাপ-দোস্তি হল। হাজার স্টুডেন্ট হাজিরা দিতে লাগল। তাদের কারওর নাম দীনবন্ধু মণ্ডল। নাম দীনবন্ধু, কিন্তু নিজেই অতি দীন। বাড়িতে তাদের দিন আনে দিন খায়। অনেক সময়ে কিছু খায়ই না। দীনের বন্ধু অবশ্য একেবারে ধ্রুবসত্য, কারণ তার বেশির ভাগ কলেজের বন্ধুই সমান দীন। অতি দীন, প্রতিদিন। একদিন প্রতিদিন। 

তার পর ধরুন, এবং এখন ধূসর মেমরি, বীণা। নিজের নাম লিখতো বিনা বিশ্বাস। হয়তো ভাবতো, বিনা বিশ্বাসে কৃষ্ণ মেলেনা। অন্তত আমি তাই ভাবতাম। ওরা সব ওদিকে বোষ্টুম-বোষ্টুমী ছিল কি না। আমি কলকাতার মিচকে ফিচেল। সবজান্তা ।
 
কিন্তু জানা গেল, কে খবর নিয়ে এল, বিনা মুসলমান। তখন বুঝলাম, বিশ্বাস করতে হয় মুসলমানদেরও। তাদের মধ্যে শুধু অন্ধ বিশ্বাসী নয়। অগণিত চক্ষুষ্মান বিশ্বাসীও আছে। ঠিক আমাদের হিন্দুদের মতোই। হিংস্র উন্মাদ ধর্মান্ধ আছে, আবার আছে শান্ত উদার কবি আর প্রেমিক। 

আমার প্রিয় ছাত্র মতিয়ুর রহমান। এখনো আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সবচাইতে ব্রিলিয়ান্ট ছেলেগুলোর মধ্যে একটা। এতো আধুনিক মনের, এত শিক্ষিত, এত ধর্মনিরপেক্ষ ছেলে জীবনে আর বেশি দেখলাম না। হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান না কী ধর্ম— ওকে দেখে একবারও কখনো ভাবিনি। আমার নাম যদি হয় হিন্দু পার্থ, ও মুসলমান মতিয়ুর— এই পর্যন্ত। 

আর সহকর্মী রফিকদা, রফিকুল ইসলাম? নিজের দাদার থেকেও অনেক বেশি প্রিয় সে এখনো আমার কাছে। কলকাতায় গেলেই বারুইপুরে ওদের ওখানে একবার যাওয়ার খুব চেষ্টা করি। নয়তো ওরা আসে।
 
আসলে, আমরা নিজেদের যতই আলোকিত মনে করিনা কেন, আমরা অন্ধ। রবীন্দ্রনাথ যতই গান গেয়ে যান না কেন, অন্ধজনে আলো দিতে আমরা পারিনি। মৃতজনকে প্রাণ দেওয়া তো দূরের কথা। ওটাও প্রতীকী, কিন্তু আমরা সেটা ভুলে গেছি। আমরা দরকারি কথা খুব দ্রুত ভুলে যেতে পারি। সিলেক্টিভ মেমরি  আমাদের। পছন্দ হলে আমরা মনে রাখি, আর সুবিধের না মনে হলেই স্মৃতি থেকে চিরতরে নির্বাসন দিয়ে দিই। এই জন্যেই আমাদের কবি বিষ্ণু দে একবার লিখেছিলেন, "স্মৃতি-সুদ্দু-নির্বাসন।" চমৎকার কথা! ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।

অন্ধজনে আলো দিতে আমরা চাই না । আমরা নিজেরাই অন্ধ ।
 
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে আলাপ হলো আসিফ নামে এক ছোকরা প্রফেসরের সঙ্গে। শহরের নাম নরম্যাল। একই বয়েস, জমে গেলো খুব। ঢাকার বাঙালি। আড্ডা হতো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানের ব্যাপারে দেখলাম ঢাকার এই বাঙালির কোনো রাখঢাক নেই। রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলেই তার নাকি ঘুম পায়। বলে ওঠে, "ওরে, এখন রবীন্দ্ৰ হবে রে। একটা বালিশ নিয়ে আয় রে।" আড্ডা আর জমল না বেশিদিন। ঢাকঢাক গুড়গুড় করে কতদিন আর চলে? দেখা হলেই বুকের ভেতর গুড়গুড় করতে লাগল। নরম্যাল শহরটাকে খুব অ্যাবনরম্যাল মনে হতে লাগল। পালিয়ে বাঁচলাম।

ছবি: পিক্সঅ্যাবে

কিন্তু তার পর সাদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পঁহুছ নে কে বাদ দেখি, মুসলমান বাঙালি আর মুসলমান অবাঙালি আর মুসলমান অ-ভারতীয়— সব চিকন চমৎকার চকমকি। তাদের সঙ্গে ঠোকাঠুকি লাগলে মিষ্টি শব্দ হয়, আর নরম আলো জ্বলে। 

আমাদের রুমমেটের নাম আবাবা কাবাডা।  ইথিওপিয়ার যুবক। বিখ্যাত অলিম্পিক ম্যারাথন চ্যাম্পিয়ন আবাবা বিকিলার দেশের মানুষ। সমান শান্ত, সমান বিনয়ী। সীমাহীন কঠোর পরিশ্রম করার ক্ষমতা। ভারতের জন্য ভালবাসা। আমাদের থালা-বাসন আমাদের পরিষ্কার করতে দেবে না কক্ষনো। বলবে, "না স্যার, না স্যার, আমি করব স্যার।" ভাল, আমরা অলস বেঙ্গলিজ হাতে চাঁদ পেলাম। আমরা রান্না করি, আবাবা রান্নাঘর সাফ করে।

প্রফেসর ডক্টর আল-তায়েব সুদান দেশের খার্তুম শহরের বাসিন্দা। সাদার্ন ইলিনয়ের এই কার্বনডেল শহরে এসেছেন ইউনিভার্সিটিতে কিছু প্রশিক্ষণ নেবার জন্যে। তার পর দেশে ফিরে গিয়ে নিজের লোকেদের সেবা করবেন। তাঁর স্ত্রী সালওয়া আল-তায়েব। আমার বৌয়ের সঙ্গে খুব জমে গেল ইন্টারন্যাশনাল স্পাউসেস গ্রুপে। রান্নাবান্না, পিকনিক। আমাদের বাড়ি মাছ ভাত, ওদের বাড়ি পরিজ আর আল-মুসালামিয়া। 
 
ওঃ, কী দারুণ জামিলা কামিলা রান্না!
 
বাংলাদেশের নাসীম আহমেদ। এক মেয়েকে নিয়ে সিঙ্গল পেরেন্ট পিটসবার্গ থেকে হাজির হলো। অতি সফিস্টিকেটেড, অতি শিক্ষিতা। আমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গলের বাঙালিরা এদেশে শাড়ি পরে কোনোদিনও রাস্তায় বেরোবে না। নাসীম এদিকে দেখি দিব্বি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস প্রোগ্রামে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের চাকরি করতে যাচ্ছে বিউটিফুল সব শাড়ি-শোভিত হয়ে। একদিনও ওকে অন্য কোনো পোশাক পরতে দেখিনি। ঢাকায় গিয়ে নয়া জামাতিদের বোরখা আর নারী-অধিকার শেষ হয়ে যেতে দেখে ফিরে এসে নাসীম চোখের জল ফেলত আমাদের কাছে। অবশ্য, ওর চোখের জল দেখা যেত না কখনও। কিন্তু ওর বিউটিফুল, শান্ত, আর্টিকুলেট বাংলায় অশ্রুজল ছোঁয়া যেত সহজেই।
 
নাসীমের অশ্রুজল কদাচিৎ দু-একবার দেখেছি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের গান শোনার সময়ে।
 
 (ক্রমশ)

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -