SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

বাবা-মায়ের কাছ থেকে কেড়ে খাঁচায় পোরা হচ্ছে দুধের শিশুদের! কোথায় বিচার এর

জুন ২২, ২০১৮
Share it on
এমন কোনও বাঙালি কি আছে, যে বিদেশে থাকে, কিন্তু প্রতিদিন দেশের কথা মনে করে চোখের জল ফেলে না?

আমেরিকার মেক্সিকো সীমান্তে ট্রাম্প এবং তার ইউএস বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বলপূর্বক অভিবাসী (ইমিগ্র্যান্ট) বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাদের সন্তানদের সরিয়ে দিচ্ছে। আলাদা করে দিচ্ছে। এই রকম বর্বর ঘটনা আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসে কখনো ঘটেছে বলে জানা যায়নি।

যেসব রিপোর্ট সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তা থেকে দেখা যাচ্ছে, বহু শিশুকে জোর করে তাদের পরিবারের থেকে আলাদা করে দিয়ে বিভিন্ন শেল্টার-জাতীয় জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ব্রিটেনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’, আমেরিকার ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস,’ ‘সি এন এন’, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ এবং ‘হাফিংটন পোস্ট’ ইত্যাদি সংবাদমাধ্যম এই বর্বরতার বিশদ বিবরণ দিয়েছে। অনেক জায়গায় দু’বছর, তিন বছরের বাচ্চাকেও সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং বড় বড় খাঁচার মতো জায়গায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। ইউটিউব-এর ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বাচ্চাগুলো তাদের বাবা, মা বা অন্য বড়দের নাম ধরে ডাকছে, চিৎকার করছে, কাঁদছে।

এমনকী, আমেরিকার চারজন প্রেসিডেন্টের স্ত্রী— ফার্স্ট লেডি— এই অমানবিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প বলেছে, সে তার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থেকে সরে আসবে না। এখন তার নিজের রিপাবলিকান পার্টির কিছু প্রভাবশালী নেতাও নতুন বিল কংগ্রেসে আনতে চেষ্টা করছেন, যাতে এই নির্দয়, নিষ্ঠুর কাজ অবিলম্বে বন্ধ হয়। কিন্তু রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও এই নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অনেকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলতে চায় না, কারণ সামনের নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে তারা অনেকেই নতুন করে নির্বাচিত হতে চাইছে। ট্রাম্পের রোষে পড়লে তাদের নির্বাচনে জেতা মুশকিল হতে পারে।


মানবিকতার প্রশ্নটিও আজ অবান্তর। ছবি: শাটারস্টক

রিপাবলিকান পার্টি গত তিরিশ চল্লিশ বছর ধরে আমেরিকার মূলস্রোত রাজনীতিকে একেবারে উগ্র অন্ধ দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে পরিণত করেছে। ১৯৮০-তে রোনাল্ড রেগনের সময় থেকেই যদিও এই ধারা শুরু হয়, কিন্তু এখন যা হচ্ছে, তা রেগনের সময়েও কল্পনা করা যেত না। গরিব, অসহায় ইমিগ্র্যান্টদের রেগনের সময়েই একবার অ্যামনেস্টি বা ‘ক্ষমাপ্রদান’ করা হয়েছিল। কয়েক লক্ষ নথিপত্রবিহীন অভিবাসী সে সময়ে আমেরিকায় স্থায়ী আশ্রয় পেয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকে আর কখনো বৈধ পরিচয়হীন ইমিগ্র্যান্টদের পক্ষে তেমন কোনও আইন পাশ হয়নি।

বরং বিল ক্লিনটনের সময়ে ১৯৯৬ সালে যে অভিবাসন-বিরোধী আইন পাশ হয়েছিল, তার ফলে লক্ষ লক্ষ পুরুষ, নারী ও তাদের সন্তানসন্ততি ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছিল। সীমান্তে এবং সারা আমেরিকা জুড়ে বিশাল আকারের ধরপাকড় এই আইন পাশ হওয়ার পরেই শুরু হয়।

২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী ঘটনা আমেরিকার শাসকশ্রেণির হাতে নতুন তুরুপের তাস তুলে দেয়। একদিকে ইমিগ্র্য়ান্ট ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে তাদের ধরপাকড় ও বহিষ্কার শুরু হয়। আমরা নিজেরেই সেই সময়ে এই নিয়ে অনেক আন্দোলন করেছি, লেখালেখি করেছি পত্রপত্রিকায়। টিভিতে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছি। অন্যদিকে, ডাব্লিউএমডি অর্থাৎ গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুত রয়েছে, এই মিথ্যা অজুহাতে ইরাকের উপরে আমেরিকার মিলিটারি নতুন যুদ্ধ শুরু করে। সাদ্দাম হুসেন ও তার ছেলেদের হত্যা করা হয়। ইরাকের যে স্থায়িত্ব ছিল, তা ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে প্রচণ্ড অস্থিরতা শুরু হয়। তালিবান এবং আল কায়েদা-জাতীয় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী তাদের জঙ্গি হত্যালীলা আরো বেশি করে শুরু করে, এবং তাদের পরে আইএস নামক সন্ত্রাসী সংগঠন সিরিয়া, ইয়েমেন, মালি, লিবিয়া এবং অন্যান্য জায়গায় আতঙ্কের বন্যা বইয়ে দেয়। সাদ্দাম হুসেনের মতো লিবিয়াতেও গদ্দাফিকে হত্যা করা হয়। অনেকের অভিযোগ, আমেরিকার শাসকশ্রেণির মদতেই আইএস-এর মতো গোষ্ঠী এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ঠিক যেমন বলা হয়, ইন্দিরা গাঁধী ও সঞ্জয় গাঁধীর মদতেই পাঞ্জাবে খালিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠী তাণ্ডব শুরু করতে পেরেছিলো, যার নির্মম পরিণতি ঘটে দেহরক্ষীর গুলিতে ইন্দিরা গাঁধীর মৃত্যুর মাধ্যমে।


পতাকা বইবার শক্তি কি পাবে এই শিশু? ছবি: শাটারস্টক

বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার শাসকশ্রেণি, সিআইএ, এবং হেনরি কিসিঞ্জারের ভূমিকা কী ছিল, তা আমরা আজ সকলেই জানি। এদের মদতেই রাজাকার ও আলবদর সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানি ঘাতকদের সঙ্গে জোট বেঁধে বাংলাদেশে ত্রাসের রাজত্ব করে নয় মাস ধরে। তা রপরেও স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার পিছনের এদেরই হাত ছিল, এমন কথা বহু সূত্রে জানা যায়।

ঠিক তেমনই, মেক্সিকো, এল সালভাদোর, গুয়াতেমালা, চিলি, বলিভিয়া, কলম্বিয়া ইত্যাদি মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশে কিসিঞ্জার ও আমেরিকার মিলিটারির সাহায্যে সেদে শের ঘাতক একনায়ক শক্তি লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে বহু বছর ধরে। ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া, অ্যাঙ্গোলা ইত্যাদি বহু দেশে আমেরিকার বাহিনী তাদের শাসনক্ষমতা এবং বিশেষ করে কর্পোরেশনগুলোকে একচেটিয়া পুঁজি ও ব্যবসার ক্ষমতা দেবার জন্যে কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ বজায় রেখেছে। ভিয়েতনামের এক দশকব্যাপী নারকীয় বর্বরতার কথা তো ছেড়েই দিলাম।

নোম চমস্কি, হাওয়ার্ড জিন এবং আরও অনেক বুদ্ধিজীবী চিন্তানায়ক তাঁদের রচনায় আমেরিকার শাসকশ্রেণির এই ধিক্কৃত অত্যাচারের কাহিনী ও তার পিছনের প্রধান কারণগুলির কথা তুলে ধরেছেন। আজকের এই বিশ্বায়িত ভোগবাদের দিনে সেসব কথা মন দিয়ে আর কেউ পড়ে না।

বৈধ পরিচয়হীন, উদ্বাস্তু, গরিব, অসহায় ইমিগ্র্যান্টরা কেন তাদের নিজের দেশ ছেড়ে, পরিবার পরিজন ছেড়ে, পরিচিত স্বদেশ সমাজ ছেড়ে আমেরিকায় বা ইউরোপে আসে? কোনও দিন দেখেছেন, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফ্রান্স বা সুইজারল্যান্ড থেকে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী আমেরিকায় এসে থেকে যাচ্ছে? বা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকে? কেন তারা আসতে যাবে এদেশে, নিজের উন্নত দেশ ছেড়ে?

আমরা কেন এসেছিলাম? আমরা বেশির ভাগই এদেশে এসেছি ভাগ্যের তাড়নায়। আমাদের দেশের অবস্থা আমাদের মতো সাধারণ ও গরিব মানুষের জন্যে অনুকূল ছিল না। কেউ বা এসেছি দারিদ্র থেকে মুক্তি পেতে, কেউ বা এসেছি রাজনৈতিক দমনপীড়ন জেল হাজত থেকে মুক্তি পেতে। কেউ বা এসেছি দেশের ব্যবস্থা আমাদের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং দেশপ্রেমের স্বীকৃতি দেয়নি, তাই। যদি দিত, আমরা কে কজন দেশ ছেড়ে, বাবা-মা, দাদু-দিদার স্নেহ-ভালোবাসা ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিতাম? এমন কোনও বাঙালি কি আছে, যে বিদেশে থাকে, কিন্তু প্রতিদিন দেশের কথা মনে করে চোখের জল ফেলে না?


সংহতিও কি কোনও ফল দিচ্ছে মার্কিন দেশে? ছবি: শাটারস্টক

আমাদের জীবনের যা অভিজ্ঞতা, ওই নিকারাগুয়া, মেক্সিকো, হণ্ডুরাস, গুয়াতেমালা, হাইতি, ফিলিপিন্স, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ইউক্রেন, বসনিয়া, সেনেগাল, মিশর, প্যালেস্টাইন, পাকিস্তানের গরিব নিরীহ অভিবাসীদেরও ঠিক তেমনই। আমরা এদেশে সবাই বহিরাগত, কেউ হয়তো ভাগ্যের জোরে কাগজপত্র পেয়ে গিয়েছি, কেউ পাইনি। আমি এমন অনেক বাংলাদেশী, ভারতীয়, পাকিস্তানী এবং মেক্সিকান ইমিগ্র্য়ান্ট পরিবারকে চিনি, যারা দশ পনেরো কুড়ি বছর ধরে ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টে ধরনা দিচ্ছেন, সেই কবে অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়েছেন, কিন্তু এখনও তার কোনো কিনারা হলো না।

মেক্সিকো থেকে আসা এই ছিন্নমূল মানুষগুলোও তেমনই করেছিল অনেকেই। বিল ক্লিনটনের ন্যাফটা নামক আন্তর্জাতিক অর্থচুক্তি তাদের দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর করেছে, তারা তাদের চাষবাস জমি জায়গা বসত— সবকিছু হারিয়েছে। তারা তাদের স্ত্রীপুত্রকন্যার হাত ধরে চলে এসেছে এদেশে সব কিছু পিছনে ফেলে রেখে।

এখন তাদের বাচ্চাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে খাঁচায় পুরে রাখছে যে বর্বর শাসকশ্রেণী, মানুষ কি কোনওদিন তাদের অপরাধ, চরম নিষ্ঠুর মানবাধিকার লঙ্ঘন, ক্ষমা করবে? এই দেশের নাম আমেরিকা, যে দেশ ‘ল্যান্ড অফ ইমিগ্র্যান্টস’ বলে নিজেদের বড়াই করে?

চরম ধিক্কার এই ট্রাম্পকে।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -