SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

দৌড় শুরুর গান

ডিসেম্বর ২১, ২০১৫
Share it on
‘‘আমার জীবনে আর ফাইভে পড়াই হল না। ওই যে একটা ফাঁক থেকে গেল, সেই থেকেই একটা কী নেই-কী নেই ভাব তাড়া করে বেড়ায়।’’ আজ থেকে শুরু হল দেবশঙ্কর হালদারের ব্লগ ‘ফোর্থ বেল’। এবার থেকে নিয়মিত আপনাদের সামনে তাঁর জীবনের স্ক্রিপ্ট খুলবেন দেবশঙ্কর।

বাবা যাত্রা করতেন। কথায় বলে— ‘‘যাত্রা করে ফাতরা লোকে।’’ সেই কহাবতের যুগে একটা গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের একমাত্র ছেলে কী করে যাত্রার অভিনেতা হয়, সেটা নিয়ে ইদানীং ভাবতে ইচ্ছে করে। রীতিমতো দিনে দু’বার নারায়ণ পুজো হয়, এমন একটা পরিবার থেকে যাত্রার আসরটা যে এক দুঃসাহসী কষ্টকল্পনা, সেটা বালক অবস্থাতেও বুঝতে পারতাম। বাবা শ্রী অভয় হালদার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিতে। কী একটা কারণে যেন চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। তার পরে এক ঘোর অনিশ্চিত জীবন। আমাদের দুটো বাড়ির পরেই ছিল একটা দর্জির দোকান। সেই দোকানে যিনি দর্জির কাজ করতেন, তাঁর সঙ্গে চিৎপুরের যাত্রাপাড়ার একটা যোগাযোগ ছিল। তাঁর সুবাদেই বাবা একটা দলে অভিনয়ের সুযোগ পান। তার পর থেকে টানা ৩৫ বছর যাত্রাই ছিল আমাদের খাওয়া-পরার উৎস। বাবা শুরু করেছিলেন সেই সময়ের বিখ্যাত  দল ‘প্রভাস অপেরা’-য়। পরে অনেক বার দল বদল করেছেন। সেটা অবশ্য সেই সময়কার রেওয়াজ ছিল। সে একবারেই একটা অন্য রকমের সময়। ‘আনন্দবাজার’-এ প্রবোধবন্ধু অধিকারী জমিয়ে রিভিউ লিখতেন যাত্রার। রথ, সরস্বতী পুজো ইত্যাদিতে যাত্রার জাঁকালো বিজ্ঞাপন বেরতো। প্রতি রবিবারেও থাকত যাত্রার অ্যাড। বাবার অভিনেতা-খ্যাতিটা ঘটে মূলত ভিলেন হিসেবে। ছোটখাটো চেহারা, টাক পড়তে আরম্ভ করেছিল বেশ অল্প বয়সেই। ভিলেন হিসেবে কেবল নাম করা নয়, সরকারি স্বীকৃতিও বাবা পেয়েছিলেন সেই সময়ে। ‘মায়ামৃগ’ পালায় অভিনয়ের কারণে যাত্রা উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার শিরোপা জুটেছিল বাবার। দাদু চাকরি করতেন এক সাহেবি ফার্মে। সম্ভবত মায়ায় পড়েই ছেলেকে ত্যজ্যপুত্র করেননি। আর ঠাকুমা ছিলেন প্রকৃত অর্থেই বিদুষী। সারাদিন বই নিয়েই কাটত তাঁর।

এমন একটা পরিমণ্ডলে আমার অভিনেতা হয়ে ওঠাটা কি অনিবার্য ছিলই? কে জানে! বাঙালি মধ্যবিত্ত চৌহদ্দিতে ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, কেরানির ছেলে কেরানি হওয়াটাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হত। এমন প্রশ্ন আত্মীয়-পরিজনের কাছ থেকে শুনতেই হয়েছে— ‘‘ছেলে কি বাবার লাইনেই যাবে?’’ এর উত্তর কী, তা বলা তখন অন্তত সম্ভব ছিল না। আমার লেখাপড়া শুরু হয়েছিল পাড়ার একটা মেয়েদের স্কুলে। সেখান থেকে যখন বড় স্কুলে ভর্তির কথা শুরু হয়, আমি গোঁ ধরলাম, পাড়ার স্কুল পাইকপাড়া রামকৃষ্ণ বিদ্যালয়েই পড়ব। ওদিকে পাড়ার বন্ধুরা হিন্দু, হেয়ার ইত্যাদি নামজাদা ইস্কুলে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। আমার যুক্তি ছিল, দাদাও তো ওই স্কুলে পড়ে। আসলে আমি পাড়ার মৌতাত ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে একবিন্দু রাজি ছিলাম না। ক্লাস ফোর-এ ভর্তি হতে গিয়ে কী যে হল, ভর্তির পরীক্ষায় কী সব লিখে-টিখে ইমপ্রেস করে ফেলেছিলাম স্কুলের মাস্টার মশাইদের। ভর্তির মুহূর্তেই একেবারে ডবল প্রোমোশন দিয়ে আমাকে বসিয়ে দেওয়া হল ক্লাস সিক্স-এ। আমার জীবনে আর ফাইভে পড়াই হল না। ওই যে একটা ফাঁক থেকে গেল, সেই থেকেই একটা কী নেই-কী নেই ভাব তাড়া করে বেড়ায়।   

পাইকপাড়া রামকৃষ্ণ বিদ্যালয়ের সেই সময়ের হাল ও হকিকত যা, তাতে তাকে বাইরে থেকে দেখলে কেউ স্কুল বলে মনেও করবে না। কিন্তু ভর্তি হয়ে টের পেলাম, সেখানকার পড়ুয়ারা আর যা-ই হোক, প্রাণশক্তিতে ভরপুর। অধিকাংশ ছেলেই রেগুলার বিড়ি ফোঁকে, অন‌েকের বাবা-মা নেই, অনেকের আবার সেই সংক্রান্ত কোনও স্মৃতিও নেই। সর্বোপরি, সেই স্কুলে আমি এমন কিছু শিক্ষকের সান্নিধ্যে আসি, অন্য কোথাও ভর্তি হলে এই অভিজ্ঞতা ঘটত না।

ক্লাস সিক্স-এ বাংলা পড়াতেন শিবশম্ভু পাল। ভারী চেহারার মানুষ, টাক পড়তে শুরু করেছে। মানুষটির চরিত্র কোমলে-কঠিনে। ওঁর কাছ থেকেই যৌবনের পাঠগ্রহণ শুরু হয়। কিছু দিন পরে জানতে পারি, শিবশম্ভুবাবু কবি। যেঁও-তেঁও কবি নন, সুনীল-শক্তির সঙ্গে কাঁধ মেলানো কবি। ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার অন্যতম কুশীলব। ওঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ঘরে দূরে দিগন্তরেখায়’-এর নামটা কেমন করে যেন মনে গেঁথে গিয়েছিল। শব্দবন্ধটা মাথায় ঘুরত। আমাদের স্কুলে সরস্বতী পুজোর যারা ভার নিত, তারা সকলেই তথাকথিত ‘বখা’ ছেলে। এদের কমন সিম্পটমই ছিল— ‘বিড়ি খায়’। শিববাবুর প্রেরণাতেই আমরা, ‘ভাল ছেলে’ হিসেবে তকমাপ্রাপ্তরা, সরস্বতী পুজোর ভার নিই। সে এক আশ্চর্য সামূহিক উৎসব। তার স্বাদ সারা জীবনেও ভোলা গেল না।

শিববাবুর কারণেই কি না জানি না, বেশ অল্প বয়স থেকে কবিতা পড়তে শুরু করি। লেখালিখির বদভ্যাসও জন্মায়। ইলেভেনে পড়তে পড়তে অনিবার্যভাবে দেখা দেয় লিটল ম্যাগাজিনের ঘোড়ারোগ। সুনীল-শক্তি না-ই বা হল, শিবশম্ভুবাবু তো রয়েছেন! এক দৌড়েই চলে যাওয়া যায় ওঁর কাছে। এর পরের ফেজটায় চুটিয়ে ছাত্ররাজনীতি। লেখালিখি থেকে নিস্তার। সরোজ দত্তর লেখা পড়ে মনে হল, কবিতা লেখার চাইতে অনেক জরুরি বন্ধ কারখানার শ্রমিকের সামনে দাঁড়ানো। সেই শুরু রাত জাগার, রাত জেগে পোস্টার লেখার। ঠিক তখনই টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তিন মাসের জন্য ঘরবন্দি হয়ে পড়ি। ব্যস্, রাজনীতিও বন্ধ।

এই সময়েই খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেখি নান্দীকার-পরিচালিত নাটকের ওয়ার্কশপের। আবেদন করে বসলাম। আচ্ছা, সেদিন ওই  বিজ্ঞাপন না-দেখলে কী হত? জীবনের পুরোটাই কি সমাপতন আর অনিশ্চয়তার বালিয়াড়ির উপরে দাঁড়িয়ে নেই!  মনে আছে, স্কুলের স্পোর্টসে একবার দৌড়নোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। শিবশম্ভুবাবু অ্যানাউন্স করছিলেন। হঠাৎই ঘোযণার ফাঁকে মাইকেই গেয়ে উঠলেন— ‘‘প্রাণ চায়, চক্ষু না চায়।’’ রবীন্দ্রসংগীত বস্তুটা সম্পর্কে হ্যাংওভার তখনও শুরু হয়নি। কী করে যেন এই গানটা সেঁধিয়ে গেল জিনের গহীনে। এখনও কোনও কিছুর শুরুর মুহূর্তে মনে হয়, নেপথ্য থেকে শিববাবুর গলায় ভেসে আসছে — ‘‘মাল্য যে দংশিছে হায়, তব শয্যা যে কণ্টকশয্যা...’’।

 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -