SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন

ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫
Share it on
কলকাতায় সম্প্রতি প্রকাশিত ‘নেতাজি-ফাইল’ সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান রহস্যের কিছুমাত্র আলোকপাত করে না। কিন্তু এগুলো থেকে এটা বোঝা যায় যে, আমাদের ‘ইন্টালিজেন্স’ বিভাগ ঠিক কতটা ‘ইন্টালিজেন্ট’।

পাঞ্চিং ব্যাগ

প্রকাশিত ৬৪টি ফাইলের অধিকাংশই হাবিজাবি তথ্যে ভরা। এতটাই আবোল-তাবোল সে সবের মধ্যে রয়েছে যে, এগুলোকে গোয়েন্দা বিভাগের নথি বলে বিশ্বাসই হবে না। এই প্রতিবেদনগুলিতে নেতাজির অস্ট্রীয় স্ত্রী-কে চেকোস্লোভাকিয়ান বলে সন্দেহ প্রকাশ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে নেতাজি-কন্যার ভুল নাম। ৬৪টির মধ্যে বেশ কয়েকটি আবার সংবাদপত্রের রিপোর্টের ভিত্তিতে রচিত। ঝিম মেরে থাকা সরকারি গোয়েন্দাদের উদ্ধারকার্য অনেক সময়েই যে করিৎকর্মা গণমাধ্যমকর্মীরা করে থাকেন, তা অবশ্য আমরা ভালভাবেই জানি।

কার্গিল অনুপ্রবেশ থেকে কান্দাহার হাইজ্যাক, লোকসভা-হামলা থেকে ২৬/১১-র মুম্বই-ঘটনা— ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের ব্যর্থতার তালিকাটি দীর্ঘ এবং লজ্জাজনক। জমানা নির্বিশেষে এই ব্যর্থতা প্রশাসন যন্ত্রের ক্ষতকে বারে বারে তুলে ধরেছে। কার্গিলের পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী সুব্রহ্মণ্যম কমিটি নিয়োগ করেন। সেই কমিটি গোয়েন্দা বিভাগের উন্নতিকল্পে কিছু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছিল। মনমোহন সিংহ-সরকার শুধুমাত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাটিল এবং তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এম কে নারায়ণনকে ২৬/১১-র পরে সরিয়ে দেয়। বলার কথা এটাই যে, কোনও সরকারই গোয়েন্দা বিভাগের কর্মদক্ষতা বাড়াতে কোনও রকমের কাঠামোগত সংস্কারের চেষ্টা করেনি।

কেউ আশা করতেই পারেন, মোদীর মতো একজন প্রধানমন্ত্রী, যাঁর স্পষ্ট নির্দেশনামা আর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা যায়, গোয়েন্দা বিভাগের আধুনিকীকরণে উদ্যোগ নিয়ে, করদাতার টাকার সদ্ব্যবহারের একটা নজির রাখবেন। ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের ভাবমূর্তি উদ্ধারের দায় প্রকৃতই বর্তায় মোদী-সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উপরে। ইন্টালিজেন্স ব্যুরো-র প্রাক্তন কর্তা এই ব্যক্তির ট্র্যাক রেকর্ড বেশ জাঁকালো। ভারতের গুপ্তচরপ্রবরদের মধ্যে অন্যতম, বি বি নন্দী একসময়ে জানিয়েছিলেন, তাঁর এক ঘনিষ্ঠ অধস্তন (পরবর্তীকালে ইনি আবার রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং-এর সেক্রেটারি হন) দু’খানা ফরেন পোস্টিং সমাধা করেই তাঁকে বোঝাতে চান, কোন পদ্ধতিতে একজন ‘সোর্স’-কে টাকা দিয়ে প্রলুব্ধ করতে হয়। দোভাল মোটেও এই সব খাঞ্জা খাঁ-র মতো নন। তিনি মোটেও তাঁর গোটা কেরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ‘সোর্স’-বিহীন অবস্থায় কাটাননি। আই বি অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তিনি ডোমেস্টিক ইন্টালিজেন্স-এর (কাউন্টার ইন্টালিজেন্স-ও) বাইরেও কাজ করেছেন।  পাকিস্তান আর লন্ডনে (মনে রাখা দরকার, লন্ডন থেকে পাক-বিরোধী ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকাণ্ড প্রায়শই নিয়ন্ত্রিত হয়) দোভাল কর্মরত ছিলেন।

এহেন দোভালের সামনে এই মুহূর্তে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বিরাজ করছে।

প্রথমেই গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরস্পর বিবদমান বিভিন্ন এজেন্সির মধ্যে সমন্বয়সাধন করে একটা সহযোগিতার বাতাবরণ তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে তথ্যের আহরণ ইত্যাদি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ এব‌ং বহির্দেশীয় ইন্টালিজেন্স এজেন্সিগুলোর পারস্পরিক চাপান-উতোর খুব স্পষ্ট, সেটাকে কাজে লাগানোটা জরুরি। তা না-করে যদি অর্থহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দিন কাটে, তাহলে সমস্যার সমাধান অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত, কার্যকর গোয়েন্দাবৃত্তির গুণগত মানের বিবর্ধন প্রয়োজন। রাজ্য সরকারগুলির তরফে একটি অভিযোগ নিয়মিত আসে। তা হল, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির থেকে নিয়মিত যে সব সতর্কবার্তা অথবা অন্য তথ্য তারা পেয়ে থাকে, সেগুলি যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না।

তৃতীয়ত, হিউম্যান ইন্টালিজেন্সের বিকাশে সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ আশু প্রয়োজন। বিষয়টি ইদানীং কালে প্রায় বিস্মৃতিতে চলে গিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ‘সিগইন্ট’ (সিগন্যাল ইন্টালিজেন্স, অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থার মধ্যে আদান-প্রদানরত সংকেত থেকে প্রাপ্ত) এবং ‘টেকইন্ট’ (টেকনিক্যাল ইন্টালিজেন্স বা অন্য রাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার ও অন্যান্য সামরিক যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত তথ্য আহরণ)। প্রযুক্তির উপরে এই সুবিশাল নির্ভরতার সমস্যাগুলি সি আই এ এবং এম আই-৬-এর মতো গোয়েন্দা সংস্থাও বুঝতে শুরু করেছে। এবং তারা বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীতে যোগ্য গুপ্তচর নিয়োগ করেছে। এটা অবশ্যই একটা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল কর্মকাণ্ড। কিন্তু কোনও ‘টার্গেট’ রাষ্ট্রের বিদেশমন্ত্রকে গুপ্তচর রাখার কি কোনও বিকল্প আছে? সেই সূত্র থেকে যে সমস্ত তথ্য আসতে পারে, যা কখনোই ‘সিগইন্ট’ বা ‘টেকইন্ট’ দিতে পারবে না।

চতুর্থ চ্যালেঞ্জটি তৃতীয়টির সঙ্গে যুক্ত। ইন্টালিজেন্স সার্ভিসে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও বেশি মাত্রায় সতর্কতা প্রয়োজন, যাতে সবথেকে যোগ্য ব্যক্তিটিকে কাজে লাগানো যায়। বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে নিয়োগ করাটা জরুরি। এর সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে নিরন্তর প্রশিক্ষণের বিষয়টি, যাতে জরুরি পরিস্থিতির মোকাবিলা সহজ হয়। নরেন্দ্র মোদীর প্রথম ক্যাবিনেট মিটিংয়ে কালো টাকা উদ্ধারের জন্য একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠিত হয়। ‘র’ এবং আই বি-র কর্তাদের এই দলভুক্ত করা হয়। এই দুই এজেন্সিরই ফিন্যান্সিয়াল ইন্টালিজেন্স-এ অভিজ্ঞ অফিসারের প্রয়োজন ছিল, যাঁরা দেশে-বিদেশে কাল‌ো টাকা গচ্ছিতকারীদের ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ করতে পারেন।

পঞ্চম তথা শেষ চ্যালেঞ্জটি দায়বদ্ধতার। এটি ভারতীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থায় অনুপস্থিত বললে ভুল হবে না। এই বিষয়ে অবশ্যই সংসদীয় নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। সি আই এ, এম আই-৫, এম আই -৬, এমনকী মোসাদ-এর মতো দুর্মর এজেন্সিও অপারেশন্যাল এবং  ফিন্যান্সিয়াল অডিট চালু করে তাদের কর্মকুশলতা বাড়িয়ে নিয়েছে। এখন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকেও এ ধরনের কার্যকর অথচ হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা নজরদারির মধ্যে আনা প্রয়োজন।

যদি মোদী গোয়েন্দা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসে উদ্যোগী হন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দোভালের গুরুত্ব নির্ভর করছে ভূতপূর্ব কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মণীশ তিওয়ারির আনা একটি প্রাইভেট মেম্বার্স বিলের উপর। ‘দ্য ইন্টালিজেন্স সার্ভিসেস (পাওয়ারস অ্যান্ড রেগুলেশন) বিল, ২০১৫’-এর উদ্দেশ্য ছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে তদারকি-সংক্রান্ত এক সুস্পষ্ট আইনি সনদের দ্বারা আরও বেশি ক্ষমতায়িত করা। তিওয়ারির প্রতিবেদনের পিছনে যথেষ্ট পরিশ্রম ছিল, গবেষণা ছিল। এবং জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মান্ধাতা-আমলের যাবতীয় ধ্যান-ধারণার বিরোধিতা করছিল এই বিল। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই বিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য একটা আইনি বন্ধনকে নিশ্চিত করতে চাইছিল। এতে প্রতিটি সংস্থার জন্য পৃথক সনদের উল্লেখ ছিল। এ ধরনের সনদ ছাড়া তাদের পক্ষে কোনও স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ সম্ভব নয়। আর এটাও সত্য যে, সনদের অনুপস্থিতিতে অনেক সময়েই কর্তাদের ব্যক্তিগত মর্জির ওঠানামায় তদন্তকার্যের গুরুত্বও ওঠানামা করে।

যদি ১৯৯০-র দশকে ‘র’-এর একটা স্পষ্ট সনদ থাকত, তবে সে আইনগতভাবেই  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরালের কাছ থেকে পাকিস্তানে ‘র’-এর অপারেশন বন্ধ করার প্রত্যক্ষ নির্দেশ পেতে পারত। এতে ভারতের গ্রাউন্ড অ্যাসেট বেঁচে যেত।  এই বিল জোরালোভাবে অডিটের কথা বলেছিল। এতে অর্থ অপচয়ের ব্যাপারটাকেও সামলানো যেত।

ভারতের আসলে একটা জাতীয় গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নজরদারি কমিটি প্রয়োজন, যা নিয়ন্ত্রণ, সহযোগিতা এবং যৌথ দায়বদ্ধতার বিষয়ে তদারকি করবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন একটা জাতীয় গোয়েন্দা ট্রাইব্যুনালের, যা নাগরিক এবং কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থা— উভয়ের স্বার্থরক্ষা করবে। বিরোধীপক্ষ-সহ সংসদ সদস্যদের এই কমিটির সভ্য হিসেবে পরিগণিত হবেন, যাতে ব্যবস্থাটিকে রাজনৈতিক দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখা যায়। মনে রাখতে হবে, গোয়েন্দা ব্যবস্থা সেই হাতেগোনা কয়েকটি সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম, যাতে তেমন কোনও ‘সামন্ততান্ত্রিক’ টান-বাঁধন নেই। জাতীয় শক্তির ভিত্তিমূলস্বরূপ এই ক্ষেত্রটির আধুনিকীকরণ বা পরিপূর্ণভাবে এটিকে পেশাদারি স্তরে উন্নীত করার ভার প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। তিওয়ারির আনা এই বিলকে বিবেচনা করা এবং গভীরভাবে পর্যালোচনা করাটা একান্ত জরুরি।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হওয়ার আগে দোভোল বলতেন, পাকিস্তানকে তার ‘সহস্র ক্ষত’-র নীতি থেকে বিচ্যুত করাটা ভারতের কর্তব্য। ‘‘সে মুম্বই হামলা চালাতেই পারে, কিন্তু তার বদলে তাকে বালুচিস্তান হারাতে হবে’’— একটি আলোচনাসভায় দোভাল এ কথা বলেছিলেন পাকিস্তানি অভ্যাগতদের সমক্ষেই। তখনও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হয়ে উঠতে দু’বছর দেরি ছিল। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘‘পাকিস্তানের সমস্যা বিস্তর, ভারতের চাইতে অনেক বেশি, আমরা সেই সব সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারি।’’

ভারতের এই ‘ঢাকা-চাপা রণনীতি’ দিয়ে পাকিস্তানকে সিন্ধু বা বালুচিস্তানে মার দেওয়ার ব্যাপারটাকে  মাথায় রেখেও বলা যায়,  মোদী কি দোভালের কথাটাই কানে লেবেল, বিদেশমন্ত্রকের পরামর্শ না-শুনে, যখন কিনা বিদেশমন্ত্রক পাকিস্তানের সঙ্গে আলাপচারিতাতেই বেশি আস্থা রাখছে?  ডোভালপন্থী গোয়েন্দা অফিসাররা বলবেন, পাকিস্তান এমনিতেই ভারতকে দোষারোপ করবে তার ঘরেলু মামলায় নাক গলনোর অজুহাতে। তো কেন ইসলামাবাদকে সমস্যা তৈরি বন্ধ করতে বাধ্য করা হবে না? ‘র’-ভেটেরান বি রমন তাঁর ‘কাউবয়েজ অফ র’ বইটিতে জানিয়েছিলেন, ১৯৮০-র দশকে রাজীব গাঁধী তৎকালীন র-প্রধান এ কে বর্মাকে সিন্ধু অঞ্চলে এক গোপন অভিযান চালাতে অনুমতি দিয়েছিলেন। এর ফলেই পঞ্জাবে পাকিস্তানি হানাদারি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -