SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

‘মার খাওয়া আর ধর্ষিত হওয়া এটাই হয়ে উঠেছিল আমার নিত্য নিয়তি’

মার্চ ২৪, ২০১৬
Share it on
আমাকে অপহরণ করা ছেলেটা যখন চলে গেল, তখন বাড়ির জন্য আমার মনটা কেমন যেন করে উঠল। মনের ভেতরে দলা বেঁধে ওঠা কষ্টটা আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছিল। বাড়ি ফিরে যাওয়ার শেষ রাস্তাটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অপহরণকারী ওই ছেলেটা চলে যাওয়ায়। তবু আশা ছাড়িনি আমি। বাড়িতে ফোন করায়, আসলাম আমাকে সারারাত ধরে ধর্ষণ করল। আমি কিন্তু হার মানিনি।

(পূর্ব কাহিনি— ২০১৪-সালের ডিসেম্বরে অপহরণের পরই মগরাহাটের সাহসিনীকে নয়াদিল্লি নিয়ে যায় তার অপহরণকারী। সেখানে আসলাম নামে এক যুবকের বাড়িতে রাখা হয় মগরাহাটের সাহসিনীকে। আসলামের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকাও পেয়েছিল অপহরণকারী। নয়াদিল্লিতে দ্বিতীয় রাতেই আসলামের হাতে ধর্ষিত হয় মগরহাটের সাহসিনী। তারপর...

কেঁদেই যাচ্ছিলাম। খেয়াল পড়ে যাচ্ছিল মা-র মুখটা। দাদার মুখটা। মা-রাতদিন বলত ভাল করে পড়াশোনাটা কর। ফাঁকি দিস না। ভাল করে পড়াশোনা করলে ভাল চাকরি করবি। ভাল বর পাবি। মনে পড়ে যাচ্ছিল দাদার মুখটা। পাড়ার একটা ছেলে কয়েক দিন আমাদের বাড়ির সামনে ঘোরাফেরা করেছিল বলে দাদা আমাকে কি মারটাই না মেরেছিল। বাড়ির এত শাসন, সব কোথায় গেল? আমি তো নষ্টই হয়ে গেলাম। একটা পশুর মতো লোক রাতের অন্ধকারে তার ঘরেই আমার সঙ্গে খারাপ কাজ করল। আমি বাধা দিয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারলাম না। ভয়ে-আতঙ্কে পা-দুটো কেমন যেন অসাড় হয়েছিল। শরীর জুড়ে অসম্ভব ব্যাথা। গোটা শরীরটাই কেমন করছে, মনে হচ্ছিল বমি করে ফেলব। সারা শরীর ঘেমে গিয়েছিল। সারা গায়ে কেমন যেন উৎকট গন্ধ। এই গন্ধটা আসলে আসলামের। ওর শরীর থেকে এমন বাজে গন্ধ ছাড়ে। আমার পরনের পোশাক এক্কেবারে ছিন্নভিন্ন। শীতের রাত বলে গায়ের উপরে কম্বলটা চাপা দিয়ে নিজের নগ্নতাকে আড়াল করার চেষ্টা করছিলাম। 

কিছুক্ষণ পর আসলাম ফের এল। আমার মুখের উপর সমানে চুমু খেতে লাগল। কিন্তু, মাঝপথে থেমে গেল। আমার মুখটা চেপে ধরে বলল, ‘এ তো সবে শুরু! আরও তো অনেক কিছু হবে! তখন কি করবি। এভাবে কাঁদবি তো মেরে হাড় গুঁড়িয়ে দেব।’ এই বলে চৌকির উপর শুয়ে পড়ল। আমার ঘুম আসছিল না। কেমন করে চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। কখন যে চোখ ঢলে পড়েছিল, খেয়াল নেই।

হঠাৎ কানে এল কর্কশ একটা গলা। সমানে বলছে ‘এই লেড়কি ওঠ।’ আমি কোনওমতে চোখ খুললাম। দেখলাম সামনে আসলাম একটা প্লাস্টিকের কাপে চা ধরে আছে। চোখ খুলতেই আসলাম বলল, ‘নে চা খেয়ে নে’। কোনওমতে কম্বল মোড়া দিয়ে উঠে বসলাম। পেটের ব্যাথাটা যায়নি। চা-এর কাপটা নিয়ে বসেছিলাম। গলায় এক ঢোক ঢালতেই গরমের আরাম পেলাম। আমাকে অপহরণ করে নিয়ে আসা ছেলেটা চৌকির উপরই বসে আছে। বলল, ‘ওভাবে বসে আছিস কেন?’ কোনওমতে বললাম জামা ছিঁড়ে গেছে। বলল ‘চিন্তা করিস না, আসলাম কিনে আনবে। কিন্তু, যত জোর খাটাবি তত এরকম জামা ছিঁড়বে।’ ছেলেটা হাঁসছিল। রাগ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মাথা ফাটিয়ে খুন করে দেই। কিন্তু, আমার এই পলকা চেহারায় ওদের সঙ্গে লড়াইয়ে যে পারব না তা ভালই টের পেয়িছলাম। 


কম্বল গায়েই মেঝের উপর করা বিছানাটায় বসেছিলাম। আসলাম বলল, ‘কি-রে উঠবি না?’ আমি কোনও কথা বললাম না। আমাকে অপহরণ করে আনা ছেলেটা আস্তে আস্তে আসলামকে কি বলল ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর আসলাম এল, হাতে খাবারের প্যাকেট ও একটি কাগজের প্যাকেট নিয়ে। আমার দিকে কাগজের প্যাকেটটা ছুড়ে দিল। দেখি ভিতরে একটা নাইটি। বাইরে বেরিয়ে নাইটি পরার উপায় নেই। আর আসলাম এবং ওই ছেলেটাকে বাইরে যাওয়ার কথা বলার মতো সাহস আমার ছিল না। কোনওমতে কম্বলের তলায় হাত দিয়ে নাইটিটা পরে নিলাম। 

ওই দিন দুপুরে আসলামরা আর বের হল না। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর আমাকে অপহরণ করা ছেলেটা জামা-প্যান্ট পরতে থাকল। আমি দেখলাম। ছেলেটা বলল, ‘তা হলে দিল্লি এখন তোর ঘর-বাড়ি। ঠিকমতো থাকবি। কোনও অভিযোগ যেন না শুনতে হয়।’ আমার চোখটা ফের ছলছল করে উঠল। কান্না বেরিয়ে আসতে লাগল। আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে না শুনে কাঁদতে থাকলাম। কোনওমতে বললাম, ‘আমাকে ফেলে চলে যাবেন না। আমাকে নিয়ে চলুন। আমি এখানে থাকতে পারব না। আমি বাড়ি যাব। মা-দাদা-বউদির কাছে যাব।’ উত্তরে ছেলেটা বলল, ‘অবশ্যই যাবি, আসলামই তোকে বাড়ি নিয়ে যাবে। ওই এখন তোর সবকিছু।’ আমার কান্না কোনও কাজেই এল না। আমাকে ঘরবন্দি করে ছেলেটাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল আসলাম। রাতে যখন ফিরল, তখন অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। মত্ত অবস্থায় ফিরেছে সে। হাতে একটা ছোট পাউরুটির প্যাকেট আর ভাঁড়ে তরকারি। আমার হাতে দিয়েই বিছানায় গড়িয়ে পড়ল।


৫ মাসের বেশি সময় কেটে গেছে আমার দিল্লিতে। তীব্র গরমের ঝাঁঝ। গতরাতেই আসলামের হাতে প্রবল মার খেতে হয়েছে। শুধু এতে শেষ হয়নি আমার উপর পশুর মত ঝাঁপিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করতেও পিছপা হয়নি। সারা রাত উন্মত্ত ষাঁড়ের মতো আমাকে পেষাই করেছিল আসলাম। আমি আমার শাস্তির মাত্রাটা জানতাম। তাই আসলামের আচরণে আমি আর বিচলিত হই না। বাড়িতে ফোন করার কথা শুনে আসলাম যে এতটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে তা আঁচ করতে পারিনি। অন্ধকার ঘরে পড়েছিলাম। মাথার উপরে গরাদের মতো ছোট্ট জানলাটা দিয়ে ভোরের আলো ঢুকতেই ধড়ে একটু প্রাণ এল। তেষ্টায় গলা ফেটে যাচ্ছিল। পারলাম না। দরজা ধরে ধাক্কা মারতে লাগলাম। বাইরে থেকে বন্ধ করা ছিল। কিছুক্ষণ পরে দেখি দীপা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে বিরক্তি। কোনওভাবে বললাম জল খাব। ভিতর থেকে আসলামের গলা পেলাম। ‘...-কে জল দিবি না। বুঝুক, বাড়িতে ফোন করার সাজা কি।’ দীপা আমার দিকে তাকিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর হাতে জলের বোতল নিয়ে ফিরে এল। আমাকে বলল ভিতরে যেতে। দীপা দরজায় ছিটকানি দিল না, পাল্লা ভেজিয়ে রেখে গেল। আমি কোনওমতে বোতলভর্তি জলটা গলায় ঢেলে একটু শান্তি পেলাম। 

একদিন সাতসকালে দিল্লি থেকে বেরিয়েছি আমরা। রোহিনী যাচ্ছি। মোটরবাইকটা চালাচ্ছে আসলাম। পিছনে আমি। দিল্লিতে আসার দ্বিতীয় রাতে যেদিন আসলাম পোশাক ছিঁড়ে ফালাফালা করেছিল, তারপরে বেশ কয়েকটি সালোয়ার কামিজ কিনে দিয়েছে। তার মধ্যে একটা পরে আছি এখন। রোহিনী যাওয়ার পথে একটি গ্যারাজে মোটরবাইক ঢুকিয়েছিল আসলাম। আমি পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম। গ্যারাজের পাশেই একটা দোকানে এসটিডি বুথ। সেদিন বাড়িতে ফোন করে পুরো কথা বলতে পারিনি। আসলামকে জিজ্ঞেস করলাম, কতক্ষণ লাগবে। প্রচণ্ড বিরক্তিমুখে বলল— ‘সময় লাগবে’। আমি আসলামের অলক্ষ্যেই এসটিডি বুথের দিকে চলে গেলাম। তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমার কাছে ছোট্ট ব্যাগটায় একশো টাকার মতো ছিল। এসটিডি বুথেই ঢুকেই চটজলদি বাড়ির মোবাইল ফোনের নম্বরটা ডায়াল করলাম। ওপার থেকে ভেসে এল মা-এর গলা। কোনওমতে বললাম আমি বলছি। দিল্লি থেকে। বললাম, আগে আমি যা বলছি শোন। আমাকে দিয়ে দিল্লিতে খারাপ কাজ করানো হচ্ছে। আমাকে গাড়িতে করে ঘোরাচ্ছে। আসলামের গাড়ির নম্বরটা দিলাম। বললাম কাল ফোন করব। বুথের কাঁচ ঘেরা ঘর থেকে দেখছিলাম আসলাম উসখুশ করছে। আমি তাড়াতাড়ি ফোন কেটে বেরিয়ে এলাম। গ্যারাজ মালিককে টাকা দিয়ে আসলাম আমাকে নিয়ে ছুটল। রোহিণীতে একটি হোটেলের সামনে দাঁড়াল মোটরবাইক। আমাকে একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। দেখি একটা মোটা লোক হোটেলের ঘরের খাটে আধশোয়া হয়ে আছে। আসলাম দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল। গোটা ঘরে আমি আর সেই লোকটা।
ক্রমশঃ 

মগরাহাটের সাহসিনীর লেখা আগের ব্লগ পড়তে ক্লিক করুন...

১৬ বছর বয়সেই বুঝলাম আমি ‘খারাপ মেয়ে’ হয়ে গিয়েছি

‘মগরাহাটের সাহসিনী: এভাবেও ফিরে আসা যায়, দ্বিতীয় পর্ব

মগরাহাটের সাহসিনী: এক ধর্ষিতার জবানবন্দি...পর্ব ১

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -