SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

নেটঘুঘুদের আড্ডা: ব্যাবেজের হাসি

জানুয়ারি ২, ২০১৬
Share it on
ব্যাবেজের মাথা থেকে ম্যাথমেটিক্যাল টেবল বেরিয়ে গিয়ে যন্ত্রের ক্ষমতা উন্মোচন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সরকারের দরকার ছিল ম্যাথমেটিক্যাল টেবল। এই যন্ত্রের গুরুত্ব তারা বুঝতে পারেনি।

লন্ডন সায়েন্স মিউজিয়মের এগারো ফুট জায়গা জুড়ে একটি কম্পিউটার দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেটি বানাতে পাঁচ টন লোহালক্কড় এবং ব্রোঞ্জ লেগেছে। সিলিকন নয়, এটি চলার কথা ছিল আটহাজার গিয়ার এবং লিভারের পিলে চমকানো হিং টিং ছট শব্দে। ইলেকট্রিসিটি নয়, এটি চলার কথা ছিল স্টিমে বা কলের গানের মতো হাতল ঘুরিয়ে। কারণ, যখন এটির কথা ভাবা হয়েছিল, তখন ইলেকট্রিসিটি আসেনি।

ছোটবেলায় আমরা যে নামতা মুখস্ত করতাম, তা আসলে একটি ম্যাথমেটিকাল টেবল। ইনফর্মেশন প্রসেসিং-এর প্রথম চেষ্টা হিসেবে ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দিতে আরেকটু জটিল ট্রিগোনোমেট্রিক এবং লগারিদমিক টেবল-এর আবির্ভাব হয়। ধরা যাক, ১.২৩৫ x ১২, ১.২৩৫ x ১৩ বা ১.২৩৫ x ১৪-এর মান কত, তা যদি সায়েন্টিস্টদের প্রতি পদে পদে অঙ্ক করে বার করতে হয়, তো মূল গবেষণাটা আর হবে না। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউশন-এর ফলে অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, ব্যাংকিং অপারেশনের অভূতপূর্ব প্রসার হয় এবং অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবল, নটিক্যাল অ্যালমানাক, আর্কিটেক্টস টেবল, ইনসিওরেন্স টেবল, ইন্টারেস্ট টেবল ইত্যাদির চাহিদা বেড়ে ওঠে। প্রশ্ন হল, কীভাবে এগুলো বানানো হত। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে ‘computer’ শব্দের আদিতম মানে দেওয়া আছে ‘one who computes; specifically a person employed to make calculations in an observatory, in surveying’ ইত্যাদি। অর্থাৎ কম্পিউটার বলতে তখন যন্ত্র বোঝাত না, মানুষ বোঝাত।
১৮২১ সালে ব্রিটিশ ম্যাথামেটিশিয়ান চার্লস ব্যাবেজ গ্রিনউইচ অবজারভেটরিতে রাখা কয়েকটি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিলে হুদো হুদো ভুল পান। এই টেবিলগুলোর উপরে নির্ভর করে নাবিকরা তখন জাহাজ নিয়ে আমেরিকা আর ভারতবর্ষে পাড়ি জমাতেন। তাতে ভুল থাকা মানে জলের তলায় লুকিয়ে থাকা বিপজ্জনক পাহাড়ে ধাক্কার সম্ভাবনা। নটিক্যাল অ্যালমানাকের ভ্রান্তিতে অসীম নৌ-ক্ষমতার উপরে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতটাই নড়বড়ে হয়ে যেতে পারত।

১৭৯০ সালে ফরাসী বিপ্লবের পরে ফ্রান্সে জনমুখী সরকার আসে এবং বিখ্যাত ম্যাথামেটিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়ার ব্যারন গাসপার দ্য প্রোনির উপরে দায়িত্ব পড়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ এক টেবল তৈরির, যাতে প্রপার্টি ট্যাক্সেসন ও জমি ম্যাপিং পদ্ধতির আমূল সংস্কার করা যায়। দ্য প্রোনি তাঁর কম্পিউটিং ফ্যাক্টরির মাথায় রেখেছিলেন কয়েকজন ম্যাথমেটিশিয়ানকে, যাঁরা কোন কাজে কোন ফর্মূলা ব্যবহার করতে হয় সে ব্যাপারে দক্ষ, তার তলায় রাখলেন এক মিডল ম্যানেজমেন্ট গ্রুপকে, যাঁরা ফর্মুলাগুলো প্রয়োগ করবেন, তার ফলগুলো একত্র করবেন এবং প্রিন্টে পাঠাবেন, তার তলায় আর এক দল থাকবে, যাদের কাজ হবে মিডিল ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজন অনুযায়ী শুধু যোগ-বিয়োগ করে ফিগারগুলো জুটিয়ে দেওয়া। খানদানি ফরাসীরা নারীপুরুষ নির্বিশেষে নানা বিচিত্র ঢং-এ চুল বাঁধতেন। এই কাজের জন্য ছিল বিপুল এক হেয়ারড্রেসার গোষ্ঠী। ফরাসী বিপ্লবের সময়ে অভিজাতদের অধিকাংশ-ই গিলোটিনে কচুকাটা হয় বা লুকিয়ে পড়ে। ফলে ওই হেয়ারড্রেসাররা বেকার হয়ে যায়। শুধু তো যোগ-বিয়োগ! তাদেরকে দ্য প্রোনি এই কাজে লাগিয়ে দেন।

ফরাসী অভিজাতদের হেয়ারড্রেসিং
 

ব্যাবেজ এই ফ্যাক্টরি দেখেছিলেন। তিনি ভাবতে থাকেন, যোগ-বিয়োগের এই সরল কাজটা যদি মেশিনকে দিয়ে করানো যায় তো ভুলভ্রান্তি হবে না, কাজটাও হবে দ্রুত। গুণ, ভাগ, এপি-জিপি সিরিজ, ডিফারেন্সিয়াল এবং ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাস সমস্ত ম্যাথামেটিকাল ক্যালকুলেশন আসলে যোগ অথবা বিয়োগ। যেমন ৫ x ৬ মানে ৫কে ৬বার যোগ করা। ব্যাবেজ দ্য প্রোনির থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন এবং কমপ্লিট মেকানাইজেশনের কথা ভেবেছিলেন। এই ধরনের প্রোডাকশনই তো আমরা আজকাল দেখছি।

 

তিনি তাঁর মেশিনটির নাম দেন ‘ডিফারেন্স ইঞ্জিন’ এবং এটি তৈরির জন্য সরকার থেকে ১৭,০০০ পাউন্ড অনুদান আদায় করেন, যা দিয়ে সে জমানায় কুড়িটি রেল ইঞ্জিন তৈরি হয়ে যেত। উচ্চবিত্ত ব্যাঙ্কার পরিবারে জন্ম হওয়ায় নিজেও সমপরিমাণ টাকা ঢালেন। সূক্ষ্ণ থেকে সূক্ষ্ণতর, একেবারে নিখুঁত মাপের গিয়ার বানাতে দক্ষ ব্রিটেনের বাছা বাছা কারিগরদের যোগাড় করেন। কারণ এই যন্ত্রদানবে ০ থেকে ৯— প্রতিটি নম্বরের জন্য আলাদা আলাদা ব্যাসের নানা গিয়ার ছিল। ৫ এবং ৬ গুণ করতে হলে সেই নির্দিষ্ট গিয়ারের দাঁতগুলো খাঁজে খাঁজে আটকে গিয়ে জরুরি উত্তরটি বার করে আনত।


 
গিয়ার মানে আসলে নানা মাপের দাঁত।

গাড়ির গিয়ার-ও এই নীতিতে এক থেকে চার-এ ওঠে। শুধু গুণ ভাগ নয়, অনেক জটিল টেবল মেশিনটির মাধ্যমে করা সম্ভব হত। তার জন্য গিয়ারে গিয়ারে যে কামড়াকামড়ি, ঠোকাঠুকি এবং চঞ্চলতার সৃষ্টি হয়, তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। উৎসাহীরা https://www.youtube.com/watch?v=BlbQsKpq3Ak –এ গিয়ে এই ইঞ্জিনিয়ারিং মার্ভেলটি চাক্ষুষ করতে পারেন।


 
ডিফারেন্স ইঞ্জিনের ভেতর নানা নম্বরের জন্য নির্দিষ্ট সারি সারি গিয়ার।         

ম্যাথামেটিক্যাল টেবলের প্রুফ দেখা খুব বিরক্তিকর এবং যন্ত্রণাময় কাজ। প্রুফ দেখা এবং টাইপ কেস থেকে মুভেবল টাইপ তোলা নামানোর সময়ে নানা ভুল হয়ে যায়। ব্যাবেজ একটি প্রিন্টারের পরিকল্পনা করেছিলেন, যেটি সরাসরি মেশিন থেকে ডেটা আউটপুট প্রিন্ট করে দেবে। আজকে আমরা প্রিন্টারের যে সুবিধে ভোগ করছি, তা-ও ব্যাবেজের অবদান। ১৮২৯ থেকে ১৮৩৪ পর্যন্ত কাজ করার পরে ব্যাবেজের মাথায় আরও উন্নত একটি মেশিনের ভাবনা আসে – অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন। ডিফারেন্স ইঞ্জিন আসলে একটি ক্যালকুলেটর বই আর কিছু নয়। অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন আধুনিক অর্থে একটি কম্পিউটার। যদিও তার চালিকা শক্তি হত সেই গিয়ার-ই। ব্যাবেজ সরকারের কাছে আবেদন জানান, হচ্ছে যখন তখন উন্নত মেশিনটি-ই হোক। ব্যাবেজের মাথা থেকে তখন ম্যাথমেটিক্যাল টেবল বেরিয়ে গিয়ে যন্ত্রের ক্ষমতা উন্মোচন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সরকারের দরকার ছিল ম্যাথমেটিক্যাল টেবল। এই যন্ত্রের গুরুত্ব তারা বুঝতে পারেনি। তারা ব্যাবেজকে প্রতারক বা পাগল ঠাউরে নেয়, যিনি সরকারি টাকা নয়ছয় করছেন। ফলে পুরো প্রজেক্টটি-ই পরিত্যক্ত হয় এবং কম্পিউটিং-এর ইতিহাস থেকে ব্যাবেজের নাম হারিয়ে যায়। থেকে যায় শুধু তাড়া তাড়া নোট আর ড্রইং।

তার ভিত্তিতে ১৯৮৫ সালে লন্ডন মিউজিয়মের কিউরেটর ডোরোন সোয়েডের নেতৃত্বে বিরাট একটি টিম পাঁচ বছর ধরে ডিফারেন্স ইঞ্জিন রিকনস্ট্রাক্ট করে। ১৯৯১ সালে ব্যাবেজের দ্বিশততম জন্মদিনে সেটি সকলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। মালটিবিলিয়ন ডলার প্রোজেক্টটি ফান্ডিং করে মাইক্রোসফট করপোরেশন। ২০১১ সালে দশ বছরের আর একটি প্রোজেক্ট নেওয়া হয়েছে অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন রিকনস্ট্রাক্ট করা জন্য। এ কি শুধুই ইতিহাসের প্রতি ভালবাসা, নাকি ভবিষ্যতের কোনও কথা এর মধ্যে আছে? নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং মহাকাশের কিছু কিছু অঞ্চলে ইলেকট্রনিক চিপের উপরে খোদিত ট্রানজিস্টরের ইলেকট্রনগুলো অতিরিক্ত উত্তাপ বা রেডিয়েশনে উল্টোপাল্টা আচরণ করে, কম্পিউটারও ভুল করতে থাকে। মেকানিক্যাল কম্পিউটার সেখানে বেশি কার্যকরী, কারণ তা বেশি উত্তাপ এবং রেডিয়েশন সহ্য করতে পারে। মেকানিকাল কম্পিউটারের পার্টগুলোকে মাইক্রো-স্তরে নামিয়ে আনার জন্য এখন গবেষণা শুরু হয়েছে। কবরে শুয়ে কমপিউটারের জনক চার্লস ব্যাবেজ নিশ্চয় শেষ হাসিটা হাসছেন আর ভাবছেন আমার কাছেই ফিরতে হল তাহলে!

 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -